ফিরে দেখা ।। মোঃ আশরাফুল ইসলাম (চাঁদ)
নাতি নাতনীদের সাথে হৈ-হল্লোল আর খুনসুটির মধ্যদিয়ে বেশ সময় কেটে যায়, তারপরেও অজানা এক কিসের টানে বাসা বাড়িতে মন টিকতে চায় না। সবসময় মনকে তাড়া করে বেড়ায় যেন কিসের এক অদৃশ্য টানে।
আস্হা নামক সমবায় ভিত্তিক সমাজ উন্নয়ন মূলক একটি সংস্হা। সংস্হাটির একটি ব্রাঞ্চ অফিস ঝিনাইদহ জামাই এর বসার সন্নিকটে হওয়ায় সময় সময় সেখানে গিয়ে সময় কাটিয়ে থাকি। এ কদিনেই সংস্হার পরিচালক ও কর্মীদের সাথে বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছে আমার। সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধিত সংস্হাটি পরিচালিত হয়ে আসছে বেশ সাফল্যের সাথে সমমনা পাঁচ বন্ধুর সমন্বয়ে গঠিত পরিচালনা পরিষদ এর মাধ্যমে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বিমানচত্তর, কুুষ্টিয়া শহরের চৌড়হাস মোড় ফুলতলা সংস্হাটির হেড অফিস। আস্হা আর বিশ্বস্ততার মেইলবন্ধনে পাঁচজন পার্টনারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সংস্থাটি বিস্তৃতি লাভ করে ব্রাঞ্চ খুলে আস্হা আর নিষ্ঠা নামক মজবুত শেকড়ের উপর ভর করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে সমাজে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। সংস্হাটির কার্য্যক্রম দেখে বেশ ভালো লাগলো। সহজ কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য সাংসারিক আসবাবপত্রের বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী দিয়ে থাকে সংস্থাটি।
সংস্হাটির সি, ই, ও রফিক সাহেব। তিনি একজন সদালাপী মিষ্টভাষী দুরদৃষ্টি সম্পন্ন সাংগঠনিক ও মানবিক ব্যাক্তিত্বের একজন সাদা মনের মানুষ। তিনি কিছু দিনের জন্য ঝিনাইদহ ব্রাঞ্চে অবস্হান করছিলেন, আমাকে আঙ্কেল বলে সন্মোধন করে থাকেন। একদিন ছুটির দিনে তিনি আমাকে বলেন। আঙ্কেল, চলেন আজ আমরা একটা ঐতিহাসিক স্হান দেখতে যাবো।
বললাম, হ্যাঁ যাওয়া যায়। বিকেলে ঝিনাইদহ শহরের মর্ডান মোড় থেকে মোটরসাইকেল যোগে রওনা দিলাম সেই ঐতিহাসিক স্হানের উদ্দ্যেশে। ঘন্টা খানেক চলার পর পৌঁছে গেলাম সেই কাঙ্খিত স্হানে। অবশ্য এতোখানি সময় লাগার কথা নয়, অচেনা পথ, পথিমধ্যে মোড়ে মোড়ে জিঙ্গাসা করতে করতে যেতে হয়েছে। একসময়তো ভুল করে অন্য রাস্তায় চলে গিয়েছিলাম। ঝিনাইদহ জেলার একটি থানা কালিগন্জ। ঐ থানার প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটা গ্রাম মল্লিকপুর সেখানে শত বছেরের এক নিদর্শন। বিশাল এক বট গাছ। দেখেতো একেবারে হতবাক। কয়েক একর জমি দখল করে কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি বটগাছ। স্হানটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্বাবধানে সংরক্ষিত।
মূল গাছ থেকে বাঁও (শেকড়) নেমে শাখা-প্রশাখা গুলি এক একটি গাছে রূপ নিয়ে বিস্তৃর্ণ এলাকা জুড়ে আছে। ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকি আর অনুসন্ধান করতে থাকি মূল গাছটির। কিন্তু মূল গাছ কোনটি তা বুঝে উঠা সম্ভব হয়নি। বাঁও (শেকড়) নেমে কাণ্ডে পরিনত হয়ে এক একটি নূতন গাছের রূপ ধারণ করে মূল গাছটি যেন বিলিন হয়ে গেছে। তাকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। স্মৃতি ফলকের তথ্য মতে জানা প্রায় বিশ বিঘা জমি জুড়ে বিস্তৃত বট গাছটি। আর প্রায় চারশো বছর ধরে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে ঐ বট গাছটি।দেখতে দেখতে মনের অজান্তে এক ভাবনা ভাবিয়ে তুললো। এটাই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির রহস্য। প্রকৃতির বিচিত্র বৈশিষ্ট্য। নবীনের মাঝে প্রবীণ এর অস্তিত্ব বিলিন হয়ে অতীতের গহীনে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে।
কেউ কেউ আবার তাদের সৃজনশীল কৃতিত্বের মাঝে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকে। যেমন কবি, সাহিত্যিক, সমাজ সংষ্কারক, বৈজ্ঞানিক, গবেষক তাদের গবেষণালব্ধ আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে তাদের সৃজনশীল কৃতিত্বের মাঝে নিজেকে বিলিন করে ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। যেমন ঐ বটগাছের মূল কাণ্ডটি নূতন শাখা প্রশাখার মাঝে নিজেকে বিলিন করে দিয়ে নতুন নতুন শাখা প্রশাখার মাঝে কালের স্বাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে। আবার অনেক কিছুই চিরতরে হারিয়ে যায় অতীতের অতল গহ্বরে। কেউ তার খোঁজ পর্যন্ত রাখে না। এটাই প্রকৃতির নিয়ম।
বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে দেখতে দেখতে মনের অজান্তে কখন যেন কোথায় হারিয়ে গেলাম। মনে হলো আপন ঠিকানার সন্ধান পেলাম। মানুষের আদি নিবাস যে পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, হ্রদ-লেকের আসেপাশে গড়ে উঠেছিল তা সহজেই অনুমান করা যায়, যখন মানুষ শহরের কোলাহল থেকে একটু স্বস্তির জন্য পিকনিক বা আনন্দ ভ্রমন যায় বলা হয়ে থাকুক না কেন স্হান নির্বাচন করে থাকে কোন পৌরাণিক ঐতিহাসিক স্হান, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় পাহাড় পর্বত, বন-জঙ্গল অথবা নদীর কিনারা কিংবা সমুদ্র সৈকত। এমন সময় রফিক সাহেব এসে বলেন আঙ্কেল, চলেন এবার যাওয়া যাক। সম্বিত ফিরে পেয়ে বললাম হাঁ ঠিক আছে। একরাশ ভাবনা মাথায় নিয়ে শত বছরের ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখে বাসায় ফিরে আসি। আর ভাবতে থাকি সৃষ্টিকর্তার কী অপরূপ বিস্ময়কর সৃষ্টি।
শত চেষ্টা করেও দু'চোখের পাতা এক করতে পারিনি সেই রাতে। এক অজানা ভাবনা তাড়া করে বেড়াতে থাকে।
সকালের নাস্তা সেরে বারন্দায় বসে ভবছি। এমন সময়
নাতনী এসে বলে.....
- এই যে নানু তুমি এখানে? কী ভাবছো এখানে একা একা বসে?
- দেখছি আর ভাবছি....।
- কী দেখছো? আর ভাবছোই বা কী?
- দেখছি ফেলে আসা দিন গুলি। আর ভাবছি ছাই ফেলতে এই ভাঙা কুলোটার খোঁজ কেউ করে নাকি।
- হ্যাঁ, ছাই ফেলতে এই ভাঙা কুলোটাইতো এতক্ষণ ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছি। অনেক ছাই জমা হয়ে গেছে কিনা?
- রহস্য করছিস তাই না?
- না না রহস্য করবো কেনো! ফেলে আসা দিন গুলি আবার দেখা যায় নাকি?
- হ্যাঁ হ্যাঁ, দেখা যায় বইকি। একটু ভাবলেই মনের কোণে ভেসে উঠবে ফেলে আসা দিন গুলির স্মৃতি বিজড়িত কতইনা ঘটনাবলি। দেখতে পাবি প্রতিটি মুহুর্ত যুক্ত হচ্ছে ফেলে আসা দিন গুলির মিছিলে। আচ্ছা সিনথিয়া ঐ ইয়েটার খবর কী রে?
- ইয়ে মানে? ইয়ে আবার কী?
- ইশ্, ভাজা মাছ টা যেনো উল্টে খেতে জানেন না। আমার চোখে ফাঁকি। ঐ যে সেদিন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ইশারাই হায় হ্যালো করলি? ছোঁড়া টা কে রে?
- কী? কাকে ছোঁড়া বললে? জানো ও কে?
- হ্যাঁ সেই "ও" টাইতো জানতে চাইছি। ছোঁড়া টা কে?
- আবার সেই একই কথা? বুড়ো শালিক...
- কী? আমি বুড়ো?
- না না। উনি বুড়ো হবেন কেনো? সবে দুধের দাঁত উঠছে উনার?
- হ্যাঁ, বুড়ো বললি ঠিক আছে। তার সাথে আবার শালিকের কী সম্পর্ক?
- খারাপ কিছু বলেছি নাকি? শালিকতো একটি পাখি।
- হ্যাঁ, শালিক একটি পাখি, সে তো সবাই জানে। তবে পাখির মধ্যে শালিক হচ্ছে চতুর এক ঝগড়াটে পাখি। দল বেঁধে চেঁচা-মেঁচি করে ঝগড়া করতে থাকে। আমি কী তোর সাথে......
- সরী নানু সরী। আমার ঘাট হয়েছে। বুড় শালিক বলাতে রাগ করলে? আরে আমিতো আদর করে বলেছি।
- আরে না না। তোর কথায় কী আর রাগ করতে পারি? তোর মুখে বুড়ো ডাক টা শুনতে বেশ ভালই লাগে। কিন্তু বিপত্তি টা কোথায় জানিস? কুড়িকে ছুঁড়ী বললেই যত আপত্তি। কুড়িকে ছুঁড়ি বললে আর রক্ষা নেই!
- নানু, এ কথার অর্থ কী দাঁড়লো?
- আরে না না। আমি তোকে ছুঁড়ি বলতে পারি। তুই যে আমাদের আদরের নাতনী থ্রী জী।
- মানে? এ কথার মানে কী।
- বুঝলি না? থ্রী জী হচ্ছে থার্ড জেনারেশন। তৃতীয় প্রজন্ম। তুইতো আমাদের তৃতীয় প্রজন্ম। আমাদের চেয়ে তিন ধাপ এগিয়ে। আর তোর মধ্যে উঁকি দিচ্ছে ফোর্থ জেনারেশন অর্থাৎ চতুর্থ প্রজন্ম।
- নানু, তোমার কথায় যেন কিসের একটা গন্ধ পাচ্ছি।
- আরে গন্ধ থাকবে কেন। আমিতো নিয়মিত খাবর আগে ও পরে ব্রাশ করে থাকি।
- আরে না না। সেই গন্ধ না। তোমার কথায় যেন একটা কিসের ইঙ্গিতপূরণ রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি।
- হ্যাঁ রে নানু, বলতো শুনি মানুষের চোখ কয়টি?
- হাঃ হাঃ হাঃ। এতক্ষণ পর হাসালে।
- আরে হাসছিস যে? হাসার মত কিছু বলেছি নাকি?
- হাসার মত প্রশ্ন করলে। আর হাসবো না?
- হাসার মত প্রশ্ন?
- নয়তো কী? মানুষের চোখ দুইটি।
- দুইটি চোখ?
-
হ্যাঁ হ্যাঁ দুইটি। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে
দেখো জ্বল জ্বল করছে দুইটি চোখ। দেখতে পাচ্ছো না?
- এই জন্যই তোকে বলি গাধা।
- কী আমি গাধা? আমাকে গাধা বললে?
-
ও হ্যাঁ। তাইতো আমার ভুল হয়ে গেছে। তুই গাধা
হবি ক্যান। তুইতো দেখছি একটা আস্ত গাধী।
- নানু তুমি কিন্তু... তোমার সাথে আড়ি। এই আমি
চললাম।
- আরে শোন শোন একটা কথা বলি শোন। তাহলেই সব বুঝতে পারবি। আমরা তখন খুব ছোট্টো। সবে স্কুলে যাওয়া ধরেছি। ক্লাস বলা যায় না। বলা হতো এ্যান ফ্যান। আমাদেরকে স্কুলের মাঠে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে স্যার পড়াতেন। আর আমরা একসাথে সুর করে পড়তাম এক-এ চন্দ্র, দুই-এ পক্ষ, তিন-এ নেত্র.....কী মজাইনা লাগতো। এইযে নেত্র। নেত্র মানে কী বলতে পারিস?
- নেত্র-! নেত্র-! না বলতে পারবো না।
- বলতে পারলি না? তেবে শোন, নেত্র মানে হচ্ছে চোখ। তিন-এ নেত্র,তাহলে মানে কী দাঁড়ালো? চোখ তিনটি বাহিরের দুইটি চোখ আর অন্তরের অনুভব-অনুভুতির চোখ। বাহ্যিক দুইটি চোখ দিয়ে কেবল আমরা দেখে থাকি। এই দুইটি চোখের দৃষ্টি শক্তির নিদৃষ্ট সীমারেখা রয়েছে আর অন্তরের চোখের সাহায্যে আমরা দেখতে পাই অতিতের স্মৃতিবিজড়ি অনেক ঘটনাবলি। এই চোখের দৃষ্টিশক্তির কোনো পরিসীমা নেই। এই চোখের দৃষ্টি শক্তি যার যত প্রখর-প্রশার, নির্মল-সচ্ছ সেই জীবনটাকে সুন্দর সফলভাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
- নানু, তোমার কথায় আজ খুলে গেল আমার অনুভব-অনুভুতির চোখ।
- একটু খুলে বললে আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে। পিকনিক থেকে ফেরার পথে বাস দুর্ঘনায় আল্লাহ্পাকের অশেষ রহমতে সেদিন প্রাণহানি না ঘটলেও গুরুতর আহত অবস্হায় আনতে হয়েছিল কয়েকজনকে।
- উহঃ নানু। সেদিনের দৃশ্য মনে হলে আমি শিউরে উঠি। ঐ দিনের কথা কোনো দিনই ভুলতে পারবো না।
- কী করে ভুলবি বল। তোর কপালে যে অঙ্কিত হয়ে আছে ঐ দিনের স্মৃতিচিন্হ, আইডেন্টক্যাল কাটমার্ক। অবশ্য অনেকেই ভুলে যায় তার অতিতকে। স্বীকার করতে চায় না যার উপর ভর করে এপর্যন্ত আসা সেই অতিতের অস্তিত্বকে। হ্যাঁ রে নানু------
- কী হলো আবার, কিছু বলবে নাকি?
- হ্যাঁ। আজ বাংলা মাসের কত তারিখ রে?
- বাংলা মাসের তারিখ....! না ঠিক বলতে পারবো না। তবে এতটুকু বলতে পারি এখন মাঘ মাস চলছে। বাংলা তারিখের তেমন কোনো প্রোয়জন পড়ে না। তাইতো বাংলা মাসের তারিখ কারো মনে থাকে না।
- হ্যাঁ তুই ঠিকই বলেছিস। প্রয়োজন পড়ে না বলেইতো কারো মনে থাকে না। আর অপ্রয়োজনীয় কোনো কিছুর কদরও থাকে না।
- তুমি কিন্তু আবার একটা প্যাঁচের কথা বললে নানু।
-
আরে না না প্যাঁচের কথা হবে কেন! এটাইতো বাস্তব
না কী?
নে বাদ দে সেসব কথা।
- নানু এবার শুনতে চাই তোমর ছোট্টো বেলার কিছু
কথা।
- কি! সেই ছয় যুগ আগের কথা? মানে পঞ্চাশ দশকের কথা? বলে ফেল কি শুনতে চাস?
- নানু, তুমি কখনো স্কুল ফাঁকি দিয়েছিলে?
- আরে এ আবার কি রকম প্রশ্ন? স্কুল ফাঁকি দেবো কেনো। তবে হ্যাঁ,সঙ্গদোষে পড়ে দু'একদিন যে সেই অপকর্ম করে বসিনি তা নয়। তা হলে একদিনের ঘটনা বলি শোন। যতদুর সম্ভব তখন ক্লাস থ্রী কিংবা ফোরে পড়ি। তখনকার দিনে মাঠকে মাঠ জুড়ে ছিল কুশার (আঁখ) ক্ষেত। স্কুলে যাওয়ার পথে আমি, আকাইলি আর আশিক তিন জনের মাথায় চেপে বসলো এক দুষ্টু বুদ্ধি। স্হীর হলো স্কুলে না গিয়ে কুশার (আঁখ) ক্ষেতে ঢুকে কুশার খাবো। যে কথা সেই কাজ। কুশার ক্ষেতের ভিতর ঢুকতেই ভয়ে আমার সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে শিউরে উঠলো। বরাবরই আমার ভয়টা একটু বেশি। একদিকে মনের সুখে রসে ভরা পাঁচশো সাতাশ কুশার খাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে বাবা-মা জানতে পারলে তাঁদের বকুনির ভয় আবার কুশার ক্ষেতের ভিতরে থাকা শেয়াল আর দাঁতাল হেরীর ভয়ে ভয়ার্ত এক সঙ্কায় কাটাতে হয়েছিল সারাক্ষণ। আকাইলি আর আশিকের সাহসের উপর ভর করে স্কুল ছুটির সময় হলে অবশেষে বাড়ি ফিরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ি।
- কী নাম যেনো বললে? আকাইলী, আচ্ছা আকাইলী নামের অর্থ কী?
- বলতে পারবো না। হয়তোবা আকাল মাথায় নিয়ে জন্মেছিল। তাই তার বাব-মা আদর করে ডাকতো আকাইলী বলে। সেই থেকে সে হয়ে উঠেছিল আকাইলী।
- এই যে বললে আকাল। আকাল কাকে বলে?
- আরে বোকা আকাল বুঝলি না? আর বুঝবিইবা কী করে। এখনতো সব কিছুই তোদের হাতের মুঠোয়। বাটন টিপলেই সব কিছু পেয়ে যাচ্ছিস। আকাল হচ্ছে অভাব দুর্ভিক্ষ। তখনকার দিনে অনেক অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করতে হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা ছিল খুবই কষ্টের। তবে তখনকার দিনে পারিবারীক ও সামাজিক বন্ধন ছিল অটুট। পরস্পর পরস্পরের প্রতি ছিল সামাজিক দায়বদ্ধতা। সারাদিন কাজ কর্ম শেষে সান্ধকালীন বিনোদনের একমাত্র উৎস পিদীম জ্বালিয়ে খানকাঘরের একপাশে বসতো পুঁথিপাঠের আসর আর একপাশে বোসতো কড়ি খেলা। আর সেই সাথে লম্বা নলযুক্ত হুঁকাতে তামাক সাজিয়ে একে অপরের মাঝে চলতো হুঁকা খাওয়া। সে এক সৌহার্দ্যপূর্ণ সহ অবস্হান। সেই সাথে চলতো নিত্যদিনের খবরা-খবর।
- আচ্ছা নানু। ফিরে দেখা.... সেকাল আর একাল কিভাবে মল্যায়ন করবে তুমি। অল্পকথায় শুনতে চাই। যেহেতু অনেকক্ষণ ধরে কথা হলো। এখন উঠতে হবে।
- অল্পকথায় বলতে গেলে বলতে হয় সেকালের অভাব আর একালের শখ।
- বুঝতে পারলাম না। একটু বুঝিয়ে বলবে?
- বুঝিয়ে বলতে গেলে অনেক কিছুই বলতে হয়।
- তাহলে এখন আর শুনা হলো না। অন্য কোনো এক সময় শুনবো। কলেজে বেরুতে হবে। গল্পে গল্পে কখন যে এতো সময় হয়ে গেছে বুঝে উঠতে পারিনি। এখন উঠি নানু। আবার কথা হবে।
রাতে খাবার টেবিলে মেয়ে জামাইকে বললাম বেশ কয়েক দিন হয়ে গেল এবার বড়িতে যেতে হবে। নাতনী বলে উঠলো আর কয়েক দিন থেকে যাও না নানু। আবার কবে আসবে। বললাম একসময় এসে থেকে যাবো। এবারে মত ছাড়পত্রটা দিয়ে দে নানু ভাই। আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে আগামী শুক্রবার যাবে ঠিক আছে? অনেক যুক্তি তর্ক খণ্ডন করে অবশেষে বুধবার যাওয়ার অনুমতি পেলাম। ভাবতে থাকি আজ কেবল শনিবার। এ কদিন কাটবে কী ভাবে। বাসায় নাতী নাতনী সাথে হৈ হল্লোল আর খুনসুটির মধ্যে এতো সুখে থাকার পরেও বুঝি না কিসের টানে বাসা বাড়িতে মন টিকতে চায় না। রাতের খাবার সেরে বুক সেল্ফ থেকে একটা বই নিয়ে পড়তে থাকি। হঠাৎ মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। ডিসপ্লেতে দেখি রফিক সাহেব। রিসভ বাটন টিপতেই অপর প্রান্ত থেকে ছালাম দিয়ে বলেন আঙ্কেল আপনি এখন কোথায়, আপনার শরীর এখন কেমন?
বললাম আমি এখন ঝিনাইদহতে আর হ্যাঁ শারীরিক অবস্হা বর্তমানে আল্লাহ'র রহমতে বেশ ভালোই আছে। রফিক সাহেব আবার বলেন, আঙ্কেল আগামী শুক্রবার আমাদের সংস্হা আস্হা লিমিটেডের পক্ষ থেকে মুজিবনগর এক শিক্ষাশফরের আয়োজন করেছি। আপনি ঐ দিন আমাদের সফরসঙ্গী হলে আমাদের বেশ ভালো লাগতো যদি আপনার শরীর পারমিট করে। বললাম, হ্যাঁ বাবাজী যাওয়া যাবে ইনশাহ্আল্লাহ্। বড়ি যেতে চেয়েছিলাম। মুজিবনগর কখনও যাওয়া হয়নি বেশ ভালই লাগবে। রফিক সাহেব বলেন ঠিক আছে আঙ্কেল আমাদের ঝিনাইদহ ব্রাঞ্চের ম্যানেজার সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করে কুষ্টিয়াতে চলে আসবেন। রাখি আঙ্কেল? আসছালামুআলাইকুম। ফোন রেখেই নাতনীকে ডাকলাম। নানুভাই একটু শুনে যাতো নানুভাই।
নাতনী এসে বলে, হ্যাঁ বলো কী বলবে?
বললাম, তোর জন্য একটা সুখবর আছে। ভেবে দেখলাম, তুই যা বলেছিস তাই হবে। আগামী বুধবার বড়িতে যাচ্ছি না। তোর কথা ভেবে এই সিদ্ধান্ত নিলাম।
নাতনী বলে, আমার কথা ভেবে? এতো শুনছি ভুতের মুখে রাম নাম! যখনই বলেছো যাব আর তোমাকে আটকানো যায়নি। সেই ছোট্ট বেলা থেকে দেখছি। না না, এর মধ্যে একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি। হঠাৎ করে তোমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের হেতুটা কী? বলোতো শুনি।
হ্যাঁ না মানে..... মানে হচ্ছে..... আগামী শুক্রবার ....।
হ্যাঁ, তো? শুক্রবার, তো কী হয়েছে?
মানে হচ্ছে ঐ যে আস্হা নামক সংস্হা আছে না? আগামী শুক্রবার সংস্হা থেকে মেহেরপুর মুজিবনগর এক শিক্ষাসফরের আয়োজন করেছে। সেই শিক্ষাসফরে আমাকে আমন্ত্রন জানানো হয়েছে। তাই ভাবলাম এক ঢিলে তিন পাখি মারা হবে। একদিকে তোর কথা রাখা হলো, রফিক সাহেবের কথা রাখা হলো আবার মুজিবনগরও ঘুরা হলো। কী, ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি না? কী বলিস?
হুঁ এতক্ষণে রহস্যের জট খুলে গেল। মাছের গন্ধ পেলে বিড়াল যেমন ঘুর ঘুর করে। লাঠি দেখিয়েও সরানো যায় না। আমি আগেই এমন একটা কিছু সন্দেহ করেছিলাম। নিশ্চয় তুমি একটা কিছুর গন্ধ পয়েছো। তা না হলে তোমার বাড়ি যাওয়ার বাতিক কী কারণে থেমে গেল। তুমি একটা.....।
কী? আমি একটা কী? আর তুই আমাকে লাঠি দেখালি?
না না তোমাকে লাঠি দেখাতে পারি। তাছাড়া আমার হাতে লাঠি দেখলে কোথায়। আর এই বুড়ো বয়সে তোমার শিক্ষাসফরের কী প্রয়োজন? শিক্ষাসফরতো ছাত্রদের জন্য।
আরে শিক্ষার আবার বয়স বলতে কিছু আছে নাকি? সে বুড়ো হউক আর বালক হউক। এই ধর তোদের কাছ থেকে কত কিছু শিখতে হচ্ছে আমাদেরকে এই ডিজিটাল যুগে। তাহলে শুক্রবার যাচ্ছি শিক্ষাশফরে?
আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে তাই হবে। এবার বই পড়ো। আমি চললাম।
আস্হা লিমিটেড এর সিইও জনাব মোঃ রফিকুল ইসলাম সাহেবের আমন্ত্রনে শিক্ষাসফর, খুশিতে একদিন..... এর কার্যক্রমে এক আনন্দ ভ্রমনে সফর সঙ্গী হওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। তদানিন্তন পূর্ব-পাকিস্তান এর একটি মহুকুমা শহর মেহেরপুর এর নিভৃত পল্লি বৈদ্যনাথতলা গ্রামের অম্রকাননে। ১৯৭১ সালে ১৭ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অস্হায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার এর অস্হায়ী সরকার গঠন করার মধ্য দিয়ে উদিত হয় স্বাধীনতার লাল সূর্য। নাম দেওয়া হয়েছিল মুজিবনগর সরকার। সেই থেকে বৈদনাথতলা হয়ে উঠে মুজিবনগর। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল বিজয় দিবসের আগপর্যন্ত মুজিবনগর ছিল অস্হায়ী বাংলাদেশ সরকারের রাজধানী। সেই স্হানে নির্মিত হয় ত্রীকোণী ২৩ টি স্তম্ভ বিশিষ্ট স্মৃতিস্তম্ভ। তদানীন্তন পাকিস্তানী পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর ২৩ বছর ধরে পূর্ব-পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) বাঙালীদের উপর নিপিড়ন, দুঃশাসন, নিস্পেষণ,বঞ্চনা, বৈষম্যমূলক আচরণের সাক্ষ্য বহণ করছে ত্রিকোণী ২৩ টি স্তম্ভ বিশিষ্ট স্মৃতিস্তম্ভ। পাশাপাশি বীরত্বগাঁথা স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মরণে নির্মিত ভাস্কর্যের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে ভবিষ্যত প্রজন্মের উদ্দেশ্যে। কৌতুহলী পর্যটকদের পদচারণায় এলাকা জুড়ে এক উৎসব মূখর পরিবেশে সবাই ঘুরে ঘুরে দেখে বেড়াচ্ছে যার যার দৃষ্টিকোণ থেকে। অম্রকাননের বিশাল বিশাল আমগাছ গুলো কালের স্বাক্ষী হয়ে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে বিস্তির্ণ এলাকা জুড়ে।
দুপুরের খাওয়া শেষে বিশ্রমের এক পর্যায় রফিক সাহেব জিঙ্গেস করলেন। আঙ্কেল আপনার এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় সেকাল আর একালের মধ্যে পার্থক্য কি দেখতে পাচ্ছেন? অর্থাৎ সেকাল আর একালকে কী ভাবে মূল্যায়ন করবেন? যদি সহজ ভাবে একটু বুঝায়ে বলতেন।
বললাম বাবাজী আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে বিশদ আলোচনার বিষয়। তবে বিস্তারিত দিক বাদ দিয়ে অল্প কথায় বলা যায় সেকালের অভাব আর একালের সখ। তখনকার দিনে অভাবের তাড়নায় বাধ্য হয়ে মানুুষ যা করেছে এখনকার দিনে মানুষ সখের বশে তা করে থাকে।
রফিক সাহেব বলেন যদি আরও একটু পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বলতেন আঙ্কে!
বললাম এই যেমন প্রথমেই ধরা যাক এখনকার দিনে মানুষ উৎসব মুখর পরিবেশে সখ করে পিঁয়াজ-মরিজ বাঁটা দিয়ে কালায় রুটি খেয়ে থাকে। আর ঢাক-ঢোল পিটিয়ে পান্তা উৎসব করে থাকে শহর-গন্জে, এমনকি গ্রামেও দেখা যায় ডেকোরেশন করে শামিয়ানা টাঙিয়ে পান্তা উৎব করতে। অথচ তখকার দিনে একজন দিনমুজুর উদয়-অস্ত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে পাঁচ সিকি (এক টাকা চার আনা) মজুরী পেয়ে টাকায় শোয়াসের (এক সের এক পোয়া) চাউল কিনতে হয়েছে। আর অভাবের তাড়নায় পান্তা আর কালাই রুটি সেই সাথে গোটাল মসুরির সাদা খেঁচুড়ি শুকনা মরিজ ও পেঁয়াজ বাঁটা দিয়ে ছিল তাদের দৈনন্দিন অভাবের খাবার। এখনকার দিনের জীবনযাত্রা অনেক সহজ তখনকার দিনে মানুষের জীবনযাত্রা ছিল খুবই দুর্বিসহ। এভাবে বলতে গেলে বলার শেষ হবে না।
রফিক সাহেব বলেন, না আঙ্কেল আর বলতে হবে না। অল্পকথাতেই আপনি যা তুলে ধরেছেন আর বেশি কিছু বলার প্রোয়জন পড়ে না। যদিও এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের বাজর আকাশছোঁয়া। এক কেজি চাউল যেখানে ৭০/৮০ টাকায় কিনতে হচ্ছে, তারপরেও চা-এর দোকানে মানুষের আড্ডার কমতি নেই। আর শীতকাল আসলেই মোড়ে মোড়ে কালাই রুটির দোকানের সামনে মানুষের লাইন চোখে পড়ার মত।
নভেম্বর মাস ছোট বেলা। যেহেতু এটি একটি আনন্দ ভ্রমন সেহেতু কিছু বিনোদন মূলক কর্মসূচী না থাকলে কী আনন্দ ভ্রমনের স্বার্থকতা থাকে? কিছু খেলাধুলা, গান, কবিতা আবৃত্তি ও কৌতুক পরিবেশনার মধ্যে সীমিত সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে চলতে নির্ধারিত সময়ের দ্বারপ্রান্তে এসে রফিক সাহেব এক সংক্ষীপপ্ত ব্রিফিং এর মাধ্যমে শিক্ষাশফর খুশিতে একদিন.... এর সমাপ্তি ঘোষণা করেন। অতঃপর গন্তব্য স্হানের উদ্দ্যশে রওনা দেই। বসায় এসে ভাবতে থাকি কবে বাড়িতে যাবো।
আসরের নামায শেষে একটু হাটা হাঁটি করে একটি মোড়ের চা দোকানে বসে চা খেতে খেতে মাগরীবের সময় পর্যন্ত সময় কাটিয়ে থাকি। এরই মধ্যে এক ভদ্রলোকের সাথে বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছে। ভদ্রলোকের নাম জাকির হোসেন ছেলের বাসায় বেড়াতে এসেছেন। আলাপচারিতার একপর্যায়ে একদিন ভদ্রলোকের কাছে জনতে চাইলাম তাঁর অতিতে কিছু স্মৃতিকথা। অর্থাৎ ছোট্ট বেলা থেকে কিভাবে কি পরিবেশে বেড়ে উঠা ও পড়া লেখা। একেকজন একেক পরিবেশের মধ্যদিয়ে আমরা বড় হয়েছি। প্রসঙ্গক্ষেত্রে বিশিষ্ট সাহিত্যক মার্ক টোয়েনের একটি উক্তি উল্লেখ না করে পারলাম না। "পরিবেশ মানুষকে যে শিক্ষা দেয়, পাঠ্যপুস্তক তা দিতে পারে না "। আমার প্রশ্নের জবাবে ভদ্রলোক বলেন। দেখুন আজ থেকে প্রায় সত্তর বছর আগের কথা অনেক কিছুই কালের বিবর্তনে স্মৃতির পাতা থেকে মুছে গেছ। তবে কিছু কিছু ঘটনাবলি স্মৃতির শীলালিপিতে খোদায় করা যা কোনো কিছু দিয়ে মুছে ফেলা যায় না।
আমি বললাম হ্যাঁ ভাই সাহেব বলুন এমন দু'একটি ঘটনা একটু স্মৃচারণ হয়ে যাক। জাকির সাহেব বলেন ঐ সময়কার কথা বলতে গেলে মানুষ উপহাস করবে আর এখনকার ছেলেদের কাছে বললেতো বলবে পাগলের প্রলাপ।
আমি আবার বললাম আপনি বলুন, যে যাই বলুক আর যাই ভাবুক তাতে কি? আমরা আমাদের স্মৃতিচারণ করবো।
জাকির সাহেব বলতে থাকেন। আমরা যখন প্রথমে স্কুলে যাই যাকে বলা হয়ে থাকে হাতেখড়ি। তখন চারপাতা বিশিষ্ট বর্ণমালার ছোট্টো একটি চটি বই নিয়ে স্কুলে গেছি। কিছুদিনপর কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা মাটির শ্লেটপেনসিল হাতে ধরিয়ে স্কুলে পাঠিয়ে দিতেন আমাদের বাবা-মায়েরা। অবশ্য এসব কথা আপনার কাছে বলার অর্থ মায়ের কাছে মামার বাড়ির গল্প বলা হচ্ছে আরকি। আমি গ্রাম্য পরিবেশের কথা বলছি। জানি না আপনার কি পরিবেশে বেড়ে উঠা। যাইহউক যা বলছিলাম আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি। তখনকার একটা ঘটনা আপনাকে বলবো। একদিন আমাদের স্কুলের কেরারী স্যার হঠাৎ আমদের বাড়িতে এসে হাজির। অবশ্য তিনি একদিকে আমার শিক্ষক আবার অন্যদিকে আমার মামা সম্পর্ক। অর্থাৎ আমার মায়ের ফুফাতো ভাই। তিনিতো মায়ের নাম ধরে ডকতে ডাকতে বাড়ির মধ্যে ঢুকে বলে উঠলেন কিরে সুলতানা কেমন আছিস? মা তার ভাইজানকে দেখেতো একেবার খুশি আর আমি এক অজানা আশঙ্খায় ভাবছি, হঠাৎ স্যার আমাদের বড়িতে! আমার অতোটুকু বয়সে আমাদের বাড়িতে তাঁকে আসতে দেখিনি। মা অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তার ভাইয়ের দিকে। মামা বলে উঠলেন কিরে সুলতানা আমাকে বসতে বলবি না? মা বলে উঠলেন হ্যাঁ ভাইজান বসুন বসুন তা হঠাৎ আমাদের বাড়িতে কোনোদিন আসেন না তো তাই। মামা বলেন হ্যাঁ তুই ঠিকই বলেছিস । সেই যে তোর বিয়ের সময় তোর সাথে শেষ বারের মত দেখা। বিভিন্ন কাজের চাপে আসা হয়ে উঠে না। আজকেও এদিকে এসেছিলাম এক কাজে। ভাবলাম তোর সাথে দেখা করে যাই আর একটা অভিযোগ জানিয়ে যাই তোর ছেলের ব্যাপারে। তোর ছেলেকেও পেয়ে গেলাম ওর সামনেই কথাটা বলি। আর হ্যাঁ আসাদ ভাই কোথায় গেছে? মামার কথা শুনে লজ্জায় মা'র ধবধবে ফর্শা পুর্ণিমার চাঁদের মত মুখখানা এক অজানা আশঙ্খায় যেন লাল হয়ে উঠলো। সন্তানের বিরুদ্ধে মা-বাবা'র কাছে অভিযোগ আসলে একটা লজ্জারই বিষয়। তার উপর ভাই বোনের বাড়িতে এসে ভাগ্নের বিরুদ্ধে অভযোগ! আমারতো ভয়ে জিহব্বা শুকিয়ে আসতে থাকে। উদ্বিগ্ন চিত্তে জিঙ্গেস করলেন কেন ভাইজান আমার ছেলে কী করেছে? ওর বাবা একটা চাকরীর ব্যপারে একখানে গেছে।
মামা বলেন,দেখ সুলতানা যেদিন আসাদ ভাই তোর এই ছেলেকে ভর্তি করে দিয়ে আসে সেদিন আমাকে বলেছিল আমার ছেলটার দিকে একটু খেয়াল রাখবেন ভাই সাহেব। সেই থেকে তোর ছেলের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখি। ওকেতো হাফ ফ্রী করে দিয়েছি। তাছাড়া তোর ছেলেতো লেখা পড়ায় খারাপ না অর্থাৎ দশের মধ্যে যাদের রোল নম্বর থাকে তাদেরকে আমরা ভালোর মধ্যে বিবেচনায় নিয়ে থাকি। কিন্তু কথা হচ্ছে কী আজ প্রায় মাস হয়ে আসলো তোর ছেলে স্কুলে যায় না আবার মাঝে মধ্যেই দুই-চার দিন করে অনুপস্হিত থাকে এর কারণটা কী? বিশেষকরে এই কারণে আজ তোদের এখানে আসা। এতক্ষণে মা স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে উঠলেন যেন মেঘে ঢাঁকা পুর্ণিমার চাঁদের উপর থেকে এক খণ্ড কালো মেঘ সরে গেল। একটু শুকনো হাসি মাঝে মা বলে উঠলেন। ও এই কথা? এতে আমার ছেলের কোনো দোষ নেই ভাইজান। এর জন্য দ্বায়ী আমরা নিজে ভাইজান।
মামা বলেন কেমন করে? বুঝিয়ে বল শুনি। কেমন করে তোরা দ্বায়ী?
মা বলেন, ভাইজান আপনিতো জানেন না আমাদের সাংসারীক অবস্হা। তোমার ভগ্নিপতির তেমন কোনো কাজ নেই। কোথায় কাজ করতে যাবে। কাজ বলতেতো মাঠের কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজ নেই। তাঁর মতো মানুষ কার জমিতে দিনমজুর দিতে যাবে। তাই ছেলেকে মাঝে মধ্যে কাজে পাঠাই। আর ধান কাটার সময় হলে কারো খোলাই দশ-পনের দিন ধান কাটে সেই জন্যই ও স্কুলে যেতে পারে না। মা'র কথাগুলো শুনে আমি ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনি। সরে গিয়ে আমি কেঁদে ফেললাম। আমার সম্পূর্ণ দোষ মা নিজের কাঁধে নিয়ে নিল! এই না হলে মা! সংসারের চাপ যতটুকু ছিল তার উপর আমার নিজেরও কিছুটা গাফিলতি ছিল। একে গাফলতি বলবো না কী বলবো ভেবে পাচ্ছি না। স্কুলে যাওয়ার স্বাভাবিক নিয়ম যখন থাকে না দীর্ঘ দিন অনুপস্থিত হলে আর স্কুলে যেতে মন চাইতো না। নদীর স্বাভাবিক গতি যদি বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পলি পড়ে পড়ে একসময় সেই নদীর স্বাভাবিক গতি থাকে না। ঠিক তেমন অবস্হা ছিল আমার। পরে দুই ভাই-বোনের আর কী কথা হয়েছিল বলতে পারবো না। পরে আমাকে ডাকলে আমি সামনে এসে দাঁড়ালে মামা বলেন শোনো বাবা আমি সবকিছু শুনলাম সংসারের কাজ যতদুর সম্ভব এড়িয়ে তুমি স্কুলে যাবে। তোমার সমস্যাগুলো আমাকে বলবে। আর একটা ফুল ফ্রীর দরখাস্ত নিয়ে যাবে। আর হ্যাঁ সুলতানা তোর ছেলেদের জন্য কিছু আনতে পারিনি, নে এই কটা টাকা রাখ ওদের কিছু কিনে দিস আজ আমি উঠি। অভিযোগ জানাতে এসে আমি নিজেই অভিযুক্ত হয়ে গেলাম। আচ্ছা আজ আসিরে বলে মামা চলে গেলে আমি মা'কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠে বলি, মা তুমি আমার দোষের সম্পূর্ণ দ্বায়ীত্বভার কাঁধে তুলে নিলে মা! মা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলেন ওরে পাগল ছেলে তোর আর কতটুকু বয়স, আর দোষই বা কতটুকু তোকেতো জোর দিয়ে স্কুলে যেতে বলতে পারি না। একদিকে স্কুলের মাইনে বাঁকি অন্যদিকে এই বয়সে তোকে কাজে পাঠাতে হচ্ছে। সন্তানের ভালো-মন্দ যাই হউক না কেনো বাবা-মা'ই যে দ্বায়ী। মা'র কথাগুলি শুনে আমি আর স্হীর থাকতে পারলাম না। তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললাম অমন কথা বলো না মা আমি তোমদের বড় সন্তান তোমাদের প্রতি আর ছোট্টো ছোট্টো ভাই-বোনদের প্রতি কর্তব্য আছে না আমার! ঠিক আছে মা, এখন থেকে আমি নিয়মিত স্কুলে যাবো তুমি ভেবো না মা। কিন্তু কথা কী জানো মা শুনছি আগামী শুক্রবার থেকে ছোট চাচাদের জমিতে ধান কাটা শুরু হবে। যদি ধান কাটতে পারতাম তাহলে কিছু খাবার জোগাড় হতো। কী বলবো বাবা আগামীকাল চুলাই কী চড়াবো সেটাই ভাবছি। দেখ যদি পারিস দুই-এক দিন তারপর....। এমন অবস্হা থাকবে না বাপধন আয় আমরা সবাই মিলে আল্লাহ'র কাছে দোয়া করি তোর বাবা'র চাকরীটা যেন হয়ে যায়। বলতে বলতে ভদ্রলোক আবেগ আপ্লুত হয়ে কাঁধের হাজিরুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে আর কিছু না বলে থেমে যায়।
আমি বললাম বলুন ভাইসাহেব তারপর কী হলো। আপনার বাবার সেই চাকরীটা কী হয়েছিল? আর আপনার পড়া লেখার কতদুর কী হয়েছিল?
ভদ্রলোক কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বলতে থাকেন আমি আগ্রহভরে উনার অতিতের ফিরে দেখা গল্পটি শুনে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, হ্যাঁ ভাইসাহেব বাবার চাকরীটা মাসখানেক পরে হয়েছিল। কিন্তু এই এক মাসের মধ্য আমার স্কুলে যাওয়া হয়ে উঠে নাই এমনকি ঐ বছরে আমার ফাইনাল পরীক্ষাও দেওয়া হয়ে উঠেনি যে কারণে তাহলো নভেম্বর ডিসেম্বর মাস অর্থাৎ অগ্রহায়ণ মাসে আমনধান কাটা হয়ে থাকে আর তখনই বাৎসরীর পরীক্ষা হয়ে থাকে। ইচ্ছা করলেই যে কোনো গেরস্তের কিষাণের সাথে ধান কাটা যেতো না। নিয়ম ছিল যারা ধান রোপণ করা থেকে শুরু করে ধান কাটা পর্যন্ত কাজ করবে তারাই কেবল ধান কাটার সুযোগ পাবে। কাচি-মাথাল নিয়ে আমার এক চাচা'র জমিতে ধান কাটতে গেলে আমাকে ধান কাটতে দিতে রাজি হয় না। বলে তুমি ধান লাগাও নাই নিড়াও নাই তোমাকে ধান কাটতে দেওয়া যাবে না। হতাশ হয়ে ফিরে আসছি, পাশের জমিতে আরও কয়েকজন ধান কাটতেছিল। আমাকে ফিরে যেতে দেখে এক চাচা বলেন কীগো চলে যাচ্ছো যে ধান কাটলে না? আমি বিস্তারিত খুলে বললে তিনি বলেন আমদের সাথে ধান কাটো। আরে বাবা তুমি পড়া-লেখা করা ছেলে। তুমি কী সব কাজ করতে পারো? এ কেমন কথা জমির উপর থেকে ফেরৎ দিতে পারলো? সেই মহানুভব মানুুষটির কথা আজও ভুলতে পারিনি। মহান রাব্বুল আল্ আমিন তাঁকে যেন জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন।বলতে বলতে তিনি আবারও কাছে থাকা হাজিরুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন না ভাইসাহেব আর কিছু বলতে পারবো না।
বললাম না না ঠিক আছে, আর কিছু বলতে হবে না। আপনার অতিতকে সামনে এনে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি ভাইসাহেব। কিছু মনে করবেন না। আমাকে ক্ষমা করবেন।
ভদ্রলোক বলেন। না ভাইসাহেব মনে করবো কেনো। এতো দিন এভাবে কেউ শুনতে চায়নি। জীবন সায়ন্নে এসে অতিতের কিছু স্মৃতি কথা আপনার মাধ্যমে তুলে ধরতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি।
বললাম হ্যাঁ ভাই সাহেব এসব কথা এখনকার প্রজন্মের কেউ শুনতে চায় না। তাদের কাছে এসব রূপকথার গল্প মনে হয়।

আমার গ্রন্থাগারের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url