বিজ্ঞানী মেরি কুরি (Marie Curie)

বিজ্ঞানী মেরি কুরি (জন্ম ঃ- ০৭ই নভেম্বর ১৮৬৭, মৃত্যু ঃ- ৪ঠা জুলাই ১৯৩৪)




“ঘৃণিত এই পৃথিবী থেকে আমি বিদায় নিতে চাই। ক্ষতি হবে খুব সামান্য....” এ কথাগুলো লিখেছিলেন সপ্তদশ বর্ষীয়া প্রেমপাগল একটি তরুণী। কিন্তু বিজ্ঞান ও আমাদের সৌভাগ্য বলতে হবে-- সুন্দরী তরুণীটি তার প্রেমঘটিত দুঃখ ভুলে যান এবং সর্বকালের একজন শ্রেষ্ট বিজ্ঞানীর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। 
পোল্যান্ডের ওয়ারশ’তে ১৮৬৭ সালের ৭ই- নভেম্বর ম্যানিয়া স্কলোদোভস্কা জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতামাতা ছিলেন পোল্যান্ডের কৃষিজীবী পরিবার। কিন্তু শিক্ষার প্রতি অনুরাগে তাঁরা কৃষি পেশা ত্যাগ করেন। 
তাঁর পিতা ছিলেন দক্ষ একজন পিয়ানোবাদক। বাল্যকালেই ম্যানিয়ার জীবনে দুঃখ নেমে আসে। মেরীর ১০ বছর বয়সে যক্ষারোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মা পরলোক গমন করেন। 
সেই সময়ে পোল্যান্ড ছিলো ‘জার’ শাসিত রাশিয়ার কলোনী। পোলিশদের বিদ্রোহের প্রচেষ্টার প্রতিশোধরূপে পেট্রোগ্রান্ড সরকার তাঁদের উপর কঠিন বিধি-নিষেধ জারি করেন। ম্যানিয়ার পিত তাঁর স্কুলের চাকুরি হারান। কারণ, পোল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবিতে তিনি ছিলেন প্রতিবাদমুখর। এই পরিস্থিতিতে অবশিষ্ট চারটি সন্তানের (তাদের একটি সন্তান টাইফয়েডে মারা যায়) ভরণপোষণের জন্য তিনি একটি বোডিং স্কুল খোলেন। এই প্রচেষ্টাও বেশী সফল হয়নি, অবশ্য কোনক্রমে পরিবারের ভরণপোষণ চলে যায়। 
১৮৮৩ সালে হাই স্কুলের সমাপনী পরীক্ষায় ম্যানিয়া স্বর্ণ পদক লাভ করেন। পদক ভাল স্কলোদোভস্কী পরিবারের পুরনো ঐতিহ্য। পরিবারে পদক প্রাপ্তদের  মধ্যে ম্যানিয়া হলে তৃতীয়। আর্থিক অবস্থা ফিরাতে ব্যর্থ হয়ে অধ্যাপক স্কলোদোভস্কী তাঁর সন্তানদের কৃতিত্বের মধ্যে আনন্দ ও সুখ খুঁজে পান। হাই স্কুলের শিক্ষা সমাপ্ত হওয়ার পর ম্যানিয়াকে এক বছরের জন্য দেশের বড়িতে পাঠানো হয়। যক্ষায় আক্রান্ত হওয়ার আশংকা তাঁর পিতাকে ব্যাকুল করে রেখেছিলো। গ্রামের বাড়িতে দীর্ঘ অবকাশ যাপন তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মের জন্য ভাল হতে পারে- এটা তাঁর পিতার ধারণা। 
পোল্যান্ডের পল্লীনৃত্যে যথেষ্ট শক্তি সামর্থের প্রয়োজন হতো। এই নাচ সূর্যস্তে শুরু হত, সারারাত চলতো, পরবর্তী দিনও নাচ অব্যাহত থাকতো এবং তার পরের রাত্রিতে শেষ হতো। ম্যানিয়াও নাচকে খুবই ভালোবাসতেন। 
তাঁর অবকাশের দিন এক সময় শেষ হয়ে গেল। তিনি ওয়ারশ’তে ফিরে এলেন, তাঁর ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে বাড়িতে আলোচনা হল। কিন্তু অর্থ ছাড়া তিনি কি করে প্যারিসের সোরবোনে যেতে পারেন? বড়ো বোন ব্রোনিয়া’র সঙ্গে অনেক আলাপ আলোচনার পর দুই বোন মিলে একটি পথ বের করলেন। ম্যানিয়া চাকুরী নেবে এবং ব্রোনিয়াকে বিশ্বদ্যিালয়ে ভর্তি হতে সাহায্য করবে। তারপর ব্রোনিয়া চাকরী নিয়ে ম্যানিয়ার পড়াশোনার খরচ যোগবে। যথা চিন্তা- একদিন হলও তাই। 
একজন অভিজাত রাশিয়ানের গৃহে গভর্নেস ও শিক্ষিকার চাকুরি লাভ করেন ম্যানিয়া। কিন্তু তাঁর গৃতকর্তী ছিলেন অসহিষ্ণু এবং বদরাগী, তাই তাঁর কপালে চাকুরি বেশিদিন স্থায়ী হলো না। সৌভাগ্যবশতঃ ম্যানিয়া পূর্বের চাইতে ভালো পরিবেশে অন্য একটি চাকুরী লাভ করেন। এই পরিবারের বড়ো ছেলেটি ছিলেন ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ছুটিতে ছেলেটি বাড়ি আসেন এবং সহজেই সুন্দরী গভর্নেসের প্রেমে পড়েন। ছেলেটি নাচতে পারতো এবং তাঁর কতাবার্তা ছিলো পন্ডিতদের মতো। নিঃসঙ্গ ম্যানিয়া প্রেমের আবেদনে সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিলেন। কিন্তু ছেলের মা এই বিয়েতে বাঁধ সাধলেন। তিনি কিছুতেই তাঁর ছেলেকে একজন গভর্নেস বিয়ে করতে দিবেন না। তখন ম্যানিয়া ঐ গৃহ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং একটি চিরকুটে ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে লিখলেন, - “ঘৃণিত এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে চাই। ক্ষতি হবে খুব সামান্য..।” এরপর ম্যানিয়া অন্যত্র শিক্ষকতার চাকুরি নেনে এবং সোরবোনে বড়ো বোনের নিকট টাকা পাঠাতে থাকেন। অবশেষে একদিন ম্যানিয়ার পালা এলো। বড়ো বোন প্যারিস থেকে শুধু মেডিক্যাল ডিগ্রিই নিয়ে এলেন না, সাথে একজন সহপাঠী মেডিক্যাল ছাত্রকে ভালোবেসে বিয়ে করে নিয়ে এলেন। 
২৩ বছর বয়সে তাঁর প্রতীক্ষিত স্বপ্ন বাস্তবের ছোঁয়া পেলো। মেরী সোরবোনের বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। চার চারটি বছর ধরে তিনি কাজ এবং পড়াশোনা চালিয়ে যান। হঠাৎ  করেই তিনি রোগের শিকার হলেন। তিনি একটা চিলেকোঠায় থাকতেন এবং সেখানে তাপ ব্যবস্থা ছিলো না। খাদ্যের জন্য তাঁর অর্থ অত্যন্ত সামান্যই ছিলো। তাঁর খাবার মূলতঃ রুটি, মাখন এবং চা। একদিন তো পুরো ২৪ ঘন্টা তিনি মূলো খেয়ে কাটিয়ে ছিলেন। তাঁর খাদ্যের তালিকায় মাংস এবং ডিম খুব কমই স্থান পেতো। 
কিন্তু তিনি বেঁচে রইলেন এবং বেঁচে থেকে গণিত, রসায়ন, পদার্থ বিজ্ঞান, জ্যেতির্বিজ্ঞান, সঙ্গীত ও কাব্য অধ্যয়ন করলেন। অধ্যয়নের ফাঁকে ফাঁকে তিনি রাসায়নিক গবেষণাগারের বোতল পরিষ্কারের কাজ করতেন। পদার্থ বিজ্ঞানে ফাইনাল পরীক্ষায় তিনি স্টার মার্কসহ প্রথম স্থান লাভ করেন এবং পরবর্তী বছরেই গণিতে সর্বোচ্চ পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। এই সময়ে মেরীর বয়স ছিল মাত্র ২৭ বছর। প্রেমের প্রথম নীল অভিজ্ঞতা তাঁর মধ্যে লুকায়িত থাকে। সুন্দরী, স্বর্ণকেশী, নমনীয় আকৃতির মেরী যাকে আমরা ম্যানিয়া বলে জেনেছি সে নিজের মধ্যেই মগ্ন ছিলেন। 
২২ বছর বয়সে পিয়েরে কুরী লিখেছিলেন, - “প্রতিভাময়ী নারী খুবই বিরল এবং নারীরা সাধারণত  বিজ্ঞান সাধনায় সক্রিয় প্রতিবন্ধক। 
পিয়েরের বয়স যখন ৩৫ তখন বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি দূর্বল হওয়ার পরিবর্তে আরো জোরদার হলো। তিনি বিদ্যুৎ এবং চুম্বকতত্ত্ব সম্পর্কে এক জটিল গবেষণা করেছিলেন। অধ্যাপক পল শৎজেনবার্জারের গবেষণাগারে তিনি তাঁর ভ্রাতা জ্যাকুেইসকে নিয়ে কাজ করছিলেন। পিয়েরে কুরী মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ইতিমধ্যেই তিনি “পিজো-বিদ্যুৎ” সূত্র উদ্ভাবন করে বিজ্ঞান ভূবনে সম্মানিত আসনে উন্নীত হয়েছিলেন। রেকর্ড প্লেয়ারের স্বচ্ছ আওয়াজের সঙ্গে েএই পিজো-বিদ্যুতের সূত্র জড়িত। রেকর্ড প্লেয়ারের স্বচ্ছ কাঁচের চাকতি ঘোরালে অল্প পরিমানে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। 
পিয়েরে ও মেরী সর্বপ্রথম অধ্যাপক কোভ্যালস্কীর গৃহে পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হন। কোভ্যালস্কী ছিলেন একজন পোলিশ বিজ্ঞানী এবং তিনি সে সময়ে প্যারিস সফর করছিলেন। প্রথম সাক্ষাতে তাঁদের মধ্যে বিজ্ঞান নিয়েই কথাবার্তা হয়েছিলো। মেরী তাঁর সঙ্গে পুনরায় দেখা করার জন্য পিয়েরেকে অনুরোধ করেন। মুধু বিজ্ঞান নিয়েই কি কথা হয়েছিলো? নাহ, আলোচনার ফলে মেরী পিয়েরের সঙ্গে অধ্যাপক শুৎজেনবার্জারের গবেষণাগারে কাজ করার অনুমতি লাভ করেন। পরবর্তী এক বছরের মধ্যেই ম্যানিয়া স্কলোদোভস্কা মেরী কুরী নামে পরিচিত হন। 
পিয়েরে লিখেছিনে,- “প্রতিভাময়ী নারী বিরল।...” সেই বিরল নারীরই সন্ধান তিনি পেয়েছিলেন। তাঁর পত্নী ছিলেন একজন প্রতিভাময়ী নারী। মেরী সানন্দে তাঁর স্বামীর সঙ্গে গবেষণাগারে চুম্বক ও বিদ্যুতের সমস্যাবলী নিয়ে কাজ করতে থাকেন। 
জার্মানীতে বিজ্ঞানী উইলহেম্ রান্টজান একটি নতুন রশ্মি আবিষ্কার করেছিলেন। এই রশ্নি অধিক তীক্ষ্মশক্তি সম্পন্ন। ১৮৯৬ সালের জানুয়ারীতে বিশ্ব বিজ্ঞানী সংস্থার নিকট তিনি এই রশ্মির কতা ব্যাখ্যা করেন। তিনি এর নাম দেন ‘এক্স রশ্মি’ এবং প্রমাণ করেন যে, এই রশ্মি কঠিনতম পদার্থ ভেদ করতেও সমর্থ। এদিকে ফ্রান্সে অধ্যাপক হেনরী বেকুয়ারেল অণুপ্রভার সমস্যা নিয়ে গবেষণা করছিলেন- এটা হল কতগুলো পদার্থ অন্ধকারেও জ্বল জ্বল করে। কিন্তু কেনো? পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে তার মনে  এই বিশ্বাস জন্ম  নেয় যে, অপরিশোধিত খনিজ পদার্থ ইউরেনিয়াম পিচ-ব্লেন্ডের মধ্যে ইউরেনিয়াম ছাড়া অন্য  আরো কিছু ভিন্ন পদার্থ আছে। 
গবেষণার ক্ষেত্রে মেরী কুরীর দক্ষতায় অধ্যাপক বেকুয়ারেল অনেক আগেই মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি  এই সমস্যাটা কুরীর নিকটেই তুলে ধরলেন। যে উপাদানটা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করছেন, তা কোন পরিচিত উপাদান হতে পারে না। এটা নিশ্চই নতুন কোন উপাদান হবে। স্বামী-স্ত্রী তখন অন্যসব কাজের চিন্তা বাদ দিয়ে এই রহস্য উদঘাটনেই উঠে পড়ে লাগলেন। 
পিচ-ব্লেন্ড অত্যান্ত মূল্যবান খনিজ পদার্থ এবং এট অস্ট্রিয়া ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এখন তাদের ভাবনা বিনা পয়সায় কি করে কিছুটা পিচ-ব্লেন্ড পাওয়া যেতে পারে? তাঁরা ভাবলেন যে, পিচ-ব্রেন্ডে এই অজ্ঞাত উপাদান থেকে থাকলে ইউরেনিয়াম  বের করে নেওয়ার পরও উচ্ছিৃষ্ট অংশে এই উপাদান থেকে যাবে। তাঁরা তখন অস্ট্রিয়া সরকারের সাথে যোগাযোগ করলেন। অস্ট্রিয়া সরকার পিচ-ব্লেন্ডের উচ্ছিষ্ট অংশ শুধুমাত্র পরিবহণ খরচের বিনিময়ে তাঁদের পাঠাতে রাজী হলেন। 
একদিন পিচ-ব্লেন্ডের কয়েক টন উচ্ছিষ্ট পুরো জাহাজ ভরে তাঁদের গবেষণার জন্য প্রেরণ করা হলো। এর পর শুরু হলো বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি অতি রোমাষ্ণকর গবেষণা পর্ব। কুরী দম্পতি অপরিশোধিত খনিজ পদার্থকে পরিশোধন করতে লেগে গেলেন। একটা বিরাট পাত্রে তাঁরা তাঁদের কর্মকান্ড সাবগৃহের পেছনের আঙিনায় স্থানান্তরিত করেন। এবং তাঁরা সর্বক্ষণ গবেষণা অব্যাহত রাখেন। 
১৮৯৬ সালের পুরোটা শীতকাল মেরী দম্পতি তাঁদের ময়লা স্টোভ নিয়ে পরিশ্রম করেই চলছিলেন। প্রচুর খাঁটুরি ফলে মেরী নিউমোনিয়ায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। পিয়েরে চুল্লী গুতিয়েই চললেন। এদিকে তিন মাস রোগ ভোগের পর মেরী কেলী-কড়াইয়ের রাজ্যে আবার ফিরে এলেন। 
১৮৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে মেরীকে দ্বিতীয়বার শয্যাগ্রহণ করতে হয়। তখনও তিনি ময়লা সব আবর্জনা পরিশোধন এবং পরিশুদ্ধ করেই চলেছিলেন। তবে এবারে তার শয্যা গ্রহণ অবশ্য মাতৃত্ব লাভের কারণে। মেরী একটি কন্যা সন্তান জন্ম দিলেন। তাঁর কন্যার নাম রাখা হল ‘আইরিন’।  এক সপ্তাহ সময়ের মধ্যেই মেরী পুনরায় গবেষণাগারে ফিরে গেলেন। শয্যাশায়ী থাকা অবস্থায় তিনি কি একটা নতুন চিন্তা করেছিলেন, এবার তিনি সেটার পরীক্ষা করতে লেগে গেলেন। একবার মনে হল যে, বেবী আইরিনের দেকাশোনার জ্য তাঁকে গবেষণাগারের কাজ গুছিয়ে আনতে হবে। কিন্তু সদ্য বিপত্নীক ভাই কুরীও পিয়েরে ও মেরীর সঙ্গেই বসবাসের জন্য চলে এলেন। এবং  বোনের সব কথা শুনে তিনি আনন্দে শিশু আইরিনকে দেখাশোনা করতে রাজী হলেন। এতে তিনি নিজেও বেশ শান্তি খুঁজে পেলেন। 
 মেরী পিচ-ব্লেন্ড পরিশোধনের কাজে ফিরে গেলেন। দু’বছরের কঠোর পরিশ্রমের পর তাঁরা তাঁদের পরিশ্রমের ফল স্বরূপ পেলেন সামান্য পরিমাণ ‘বিসমাথ যৌগিক’ উপাদান। কিন্তু এই বিসমাথ, ইউরোনিয়াম থেকে ৩০০ গুণ অধিক কার্যকর। ছবি তোলার ফিল্মে বিসমাথ অশ্চর্যজনকভাবে কাজ করে। বিসমাথের মধ্যে নিশ্চই তাঁদের প্রাপ্ত উপাদানের বাইরেও কিছু রয়েছে একথা ভেবে আরো নতুন কিছুর সন্ধানের জন্যে মেরী আবারও গবেষণাগারে ফিরে গেলেন। 
১৮৯৮ সালের জুলাই মাসে তিনি এক নতুন উপাদান আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করেন। তাঁর প্রিয় মাতৃভূমির নাম অনুসারে তিনি এই নতুন উপাদানের নাম রাখলেন, ‘পোলোনিয়াম’। কিন্তু কুরী দম্পতি এতেও সন্তুষ্ট হলেন না। কারণ, তাঁদের মনে হলো, পোলোনিয়াম আহরণের পরেও অবশিষ্ট পদার্থ পোলোনিয়াম থেকে অধিক উজ্জ্বল থেকে যায়। 
হয়তো আরো ভিন্ন নতুন উপাদান রয়ে গেছে, তাই পরিশোধন এবং স্বচ্ছতা রক্ষার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখলেন। অবশেষে কিছুদিন পর আরো একটা নতুন উপাদান পাওয়া গেল। এই নতুন উপাদান হলো সামান্য পরিমাণ স্ফটিক। তাঁরা এই নতুন পদার্থটির নাম দিলেন ‘রেডিয়াম’।
রেডিয়াম এক অদ্ভত উপাদান। রেডিয়াম ইউরেনিয়াম থেকে ১০ লক্ষ গুণ অধিক তেজস্ক্রিয়তা শক্তি সম্পন্ন। ছবি তোলার ফিল্মের আলোক সচেতন উপাদানকে রেডিয়াম স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রভাবিত করে। এমন কি, ফিল্ম আলো প্রতিরোধক কাগজে আবৃত থাকলেও এই অঘটন ঘটে যায়। রেডিয়াম বায়ুতে গ্যাসের মালিকিউলকে বিদ্যুতায়িত করে- অর্থাৎ এটা গ্যাসকে বিদ্যুৎ বহণের উপযোগী করে। অন্যান্য  যৌগিক পদার্থের সাথে মিশ্রণের ফলে রেডিয়াম যৌগিক ফ্লোরেসেন্স উৎপন্ন করে। কোনো কোনো হাত ঘড়ির চিহ্ন ঔজ্জ্বল্যের কারণ একটাই, তাতে সামান্য পরিমাণ রেডিয়াম রয়েছে। রেডিয়াম বিকিরণ বীজের উদ্গমন বন্ধ করতে, রোগ জীবাণু ধ্বংস করতে, এমনকি ক্ষুদ্র প্রাণীকেও হত্যা করতে পারে এক মুহূর্তে। 
বিকিরণ মাংসপেশী নষ্ট করতেও সক্ষম। তাই ক্যান্সার এবং নির্দিষ্ট অনেকগুলো চর্মরোগের চিকিৎসায় আজকাল রেডিয়াম ব্যবহৃত হয়। এটা ক্রমাগত তাপ নিঃসরণ করে। রেডিয়াম নিজের থেকেই এই তাপ বিকিরণ করে। অর্থাৎ রেডিয়াম সহজে পরমাণুতে নিজেকে বিলিয়ে দেয়  এবং এই ভাবে তেজ নিঃসৃত করে দেয়। নিঃসন্দেহে রেডিয়াম যুগ-যুগান্তরের এক অনন্য উপাদান এ কথাটি বাতাসের আগে ছড়িয়ে পড়লো বিশ্বময়। 
এবার সমস্ত পৃথিবীর কুরী দম্পতির পিছনে লেগে গেল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তাঁদের নিকট বিভিন্ন প্রস্তাব আসতে লাগলো। কিন্তু তাঁরা তাঁদের আবিষ্কারকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে অস্বীকার করলেন। এই কীর্তির জন্যই বেকুয়ারেলের সঙ্গে মিলিত ভাবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল পুরস্কারের অর্থ দিয়ে তাঁরা তাঁদের পুরনো ঋণ শোধ করেন। পিচ-ব্লেন্ড নিয়ে পরিশোধন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক-বছরে তাঁদের ধার-দেনা করতে হয়েছিলো প্রচুর। 
নোবেল প্রাপ্তির পরে পিয়েরে কুরী সোরবোন বিশ্বদ্যিালয়ে অধ্যাপকের পদ লাভ করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অত্যন্ত সুসজ্জিত গবেষণাগার ব্যবহারের সুযোগও লাভ করেন একই সাথে। 
১৯০৪ সালে দ্বিতীয় কন্যা ‘ইভ’ জন্মগ্রহণ করেন। এই সময়ে তাঁরা পূর্বের যে কোন সময়ের চাইতে অনেক বেশী সুখী দম্পতিরূপে জীবন অতিবাহিত করছিলেন। কিন্তু অকস্মাৎ  এক নির্মম দুর্ঘটনা এই সুখী যুগল জীবনের অবসান ঘটায়। 
১৯০৬ সালের ১৯ শে এপ্রিল পিয়েরে কুরী বিজ্ঞান সভা থেকে ঘরে ফেরার সময় হঠাৎ রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়েন। একটা ঘোড়ার গাড়ি আচমকা এসে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়  এবং পরক্ষণেই বিপরীত দিক থেকে আগত একটা ভারী গাড়ি তাঁর উপর দিয়ে চলে যায়। রাজপথে সঙ্গে সঙ্গেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। 
ভগ্ন হৃদয় মেরী পাথর হয়ে গেলেন। গবেষণাগরে কাজের মধ্যে ডুবে থেকেই তিনি সান্তনা খুঁজতে চেষ্টা করলেন। রাতে তিনি স্বর্গত স্বামীর উদ্দেশ্যে পত্র লিখেই সময় পার করতেন। এইসব পত্রে তিনি দিনের গবেষণাগারের সমস্ত কাজের বিবরণ লিপিবদ্ধ করতে থাকলেন। ফ্রান্স সরকার সকল পুরনো ঐতিহ্য মুছে দিয়ে মেরীকে পিয়েরের শূন্য ‘পদার্থ বিজ্ঞানের সম্মানী আসন’ গ্রহণের প্রস্তাব দিলেন। 
এতে কোন কোন বিজ্ঞানী হিংসায় প্রতিবাদ শুরু করেছিলেন। একজন নারী পাবেন  এই সম্মানীয় আসন? অসম্ভব, অচিন্তনীয়! তাঁরা আরো বললেন, - ‘পিয়েরেই তো ছিলেন আসল ব্যক্তি, মেরীতো মাত্র স্বামী কে কিছু মাত্র সহায়তা করেছেন শুধু। 
এক সময় মেরী কুরী প্রমান করলেন- না, এককভাবে তিনিও তাঁর স্বামীর মতোই কৃতি বিজ্ঞানী। ১৯১০ সালে মেরী কুরী একক প্রচেষ্টায় বিশুদ্ধ অবস্থায় রেডিয়ামকে বিছিন্ন করতে সক্ষম হন। গলিত রেডিয়ামের ক্লোরাইডের ভিতর দিয়ে তিনি বিদ্যুৎ-তরঙ্গ প্রবাহিত করেন এবং পারদপূর্ণ ঋণাত্মক ইলেকট্রোডে পারদের উপস্থিতি লক্ষ্য করেন এবং তিনি চুলোয় জ্বাল দিয়ে পারদ মুক্ত করে ফেলেন। দেখা গেল মুক্ত উপাদান রেডিয়াম নিচে পড়ে রয়েছে। এই একক কৃতিত্বের জন্য দ্বিতীয়বার নোবেল পুরস্কার লাভ করেন বিজ্ঞানী মেরী কুরী। 
১৯৩৪ সালের ৪ঠা জুলাই এই কৃতী মহিলা বিজ্ঞানী পরোলোক গমন করেন। বহু বছর ধরে বিকিরণের মধ্যে কাজ করায় তাঁর শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো এক এক করে নষ্ট হয়ে গিয়োছিলো। কর্মের প্রতি তিনি এতোটা নিবেদিত ছিলেন যার ফলে তিনি বুঝতে পারেননি কী ঘটতে যাচ্ছে। 

তাঁর আবিস্কৃৃত রেডিয়ামই তাঁকে জয় করে নিয়ে যায় নিয়তির বিধান তাঁর চিরদিনের বাসভূমে। 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আমার গ্রন্থাগারের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url