লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি (Leonardo da Vinci)

লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি (১৪৫২-১৫১৯)


তরুণ এক যুবক। মাথাভর্তি সোনালী চুল। একদিন ফ্লোরেন্সের এক পাহাড় চুড়োয় খাঁচা থেকে কতগুলো পাখি ছেড়ে দিলেন। পাখিগুলো ছিলো দোয়েল।  খাঁচা থেকে মুক্ত পাখিগুলো খোলা আকাশের বুকে উড়তে লাগলো। ইচ্ছেমত আকাশে বিচরণ করতে লাগলো। আর যুবকটি একমনে তা দেখছেন তো দেখছেনই। এই যুবকটি হচ্ছেন বিজ্ঞানী লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি। মুক্ত আকাশে পাখির বিচরণ মনোযোগ সহকারে প্রত্যক্ষ করতে করতে তিনি খাতায় কি সব নোট লিখে নিলেন।

পাখির উড্ডয়ন তিনি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন কারণ, তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে উড্ডয়নের এই একই পন্থা মানুষের বেলায়ও প্রযোজ্য হতে পারে। গবেষণালব্ধ তথ্য সবার থেকে গোপন রাখার উদ্দেশ্যে তিনি সাংকেতিক লিপিতে তাঁর পর্যবেক্ষণের ফলাফল লিপিবদ্ধ করেন। তখন ইটালির অনেকেই তাকে একটা আস্ত পাগল মনে করতো। মানুষ আবার উড়বে! এটাও সম্ভব! তাই সাধারণ মানুষের হাসির খোরাকে ইন্ধন যোগাতে তিনি ইচ্ছুক ছিলেন না। এজন্যই তিনি তখন সাংকেতিক ভাষায় তাঁর পর্যবেক্ষণ তথ্যাবলি লিপিবদ্ধ  করতেন।

অনেক ঐতিহাদিকই লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চিকে তার সমকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠতম প্রয়োগিক বিজ্ঞান বলে মত প্রকাশ করেছেন। এবং সর্বকালের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ( The Last Supper)  "শেষ ভোজ" ক্রসেফাইড হওয়ার পূর্বে যীশু খ্রিষ্টের শেষ আহারপর্ব এবং  'মোনালিসা'র স্রেষ্টারূপেই সম্ভবত তিনি সমাধিক পরিচিত। তিনি বহু সংখ্যক বিশ্ববিখ্যাত চিত্রাঙ্কন করেছেন। এছাড়া তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্ঞান এবং তাঁর আবিষ্কারসমূহ লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন; তাঁর হাতে লিখিত পৃষ্ঠা সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও উপরে হবে, তিনি লিখেছেনও খুব সুক্ষ্ম করে। ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের প্রয়োজনে লেখার ফাঁকে ফাঁকে আবার সুন্দর-সুন্দর চিত্র এঁকে রেখেছেন। গোপনীয়তা রক্ষার জন্যে তিনি সব কিছুই সাংকেতিক লিপিতেই লিপিবদ্ধ করেছেন আজীবন।

লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি’র বহুবিধ প্রতিভার পরিচয় দেওয়ার জন্য বলতে হয়- তিনি ছিলেন একজন আবিষ্কারক, সামরিক ও বেসামরিক ইঞ্জিনিয়ার, জ্যোতির্বিদ, শারীরবিদ, ভূতাত্ত্বিক এবং আজকের বিজ্ঞানীদের পথিকৃৎ। তিনি ছিলেন একক ও অনন্য। শিল্পকলার অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বিজ্ঞনের দিকে ঝুঁকে পড়েন, আর তাঁর বৈজ্ঞানিক তথ্যাবলীই সম্ভবতঃ তাঁকে শিল্পীর আসনে প্রতিষ্ঠা লাভে সাহায্য করেছে বেশি।

১৪৫২ সালের  ইতালীর ফ্লোরেন্স শহরের নিকটবর্তী ‘ভিঞ্চি’ নামক গ্রামে নিওনার্দো জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন সামান্য গ্রাম্য গেরস্থের কর্মচারী, মাতা ছিলেন গ্রাম্য সরাইখানার সামান্য চাকরানী। তাই পিতামহের সঙ্গেই তাঁর বাল্যকাল পুরোটা অতিবাহিত হয়।

স্কুল জীবনেই লিওনার্দো নিজ প্রতিভার পরিচয় দেন। ছোট্ট বালক লিওনার্দো স্কুলে অংকের কঠিন সমস্যাগুলোর সমাধান করে দিতেন অতি সহজেই। একই সঙ্গে তিনি চিত্রাঙ্কনেও উল্লেখযোগ্য প্রতিভার পরিচয় দেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি শিক্ষানবিসরূপে সর্বকালের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী আঁদ্রেয়া দেল ভেরেশিও’র সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর নিকট লিওনার্দো কাঠ, মার্বেল এবং ধাতব পদার্থের উপর চিত্রাঙ্কন পদ্ধতি শিক্ষা লাভ করেন। কিশোর বালক লিওনার্দোর প্রতিভায় ভোরোশিও আশ্চর্য হয়ে যান এবং তাঁকে ল্যাটিন, গ্রীক, দর্শন, অংক ও শরীর ব্যবচ্ছেদ শাস্ত্র অধ্যায়নের জন্য পরামর্শ দেন। ভেরোশি’র মতে- ‘সত্যিকার দক্ষ শিল্পী হওয়ার জন্য লিওনার্দোকে এসব বিষয় অবশ্যই অধ্যায়ন করতে হবে। এবং হলোও তাই।’

২৬ বছর বয়সে লিওনার্দোর শিক্ষানবিশী শেষ হয় এবং তাঁকে শিল্পী সংঘের সদস্যপদ প্রদান করা হয়। সেখানে তিনি স্বাধীনভাবে নিজ পৃষ্ঠপোষক বেছে নেওয়ার সুযোগ লাভ করেন। লিওনার্দো বিশেষ এক ধরণের বাদ্যযন্ত্রও তৈরি করেছেন। যন্ত্রটা হচ্ছে ঘোড়ার মস্তকের আকার বিশিষ্ট এক ধরণের বিশেষ বীণা। এর দাঁতের সাহায্যে বিশেষ-বিশেষ সুর বাজানো যেতো। এই নতুন বাদ্যযন্ত্র নির্মান করে লিওনার্দো মিলানে’র তদানীন্তন শাসক ডিউক লুদোভিকো- এর স্ফোর্জার সুদৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

সে সময় ইতালীর বিভিন্ন ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র রাজ্যের শাসনকর্তা পরস্পর যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত ছিলো। তাই সমরাস্ত্রের নকশা তৈরীর জন্যে লিওনার্দো নতুন কর্মে মন দিলেন। ডিউকের দরবারে থাকতেই তিনি মহামারী বিধ্বস্ত শহরের পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা ও নকশা তৈরি করেন। তিনি নগর পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থার গুরুত্ব অবলোকন করেছিলেন। এ সম্পর্কে তিনি নগর পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে অনেকগুলো পরিকল্পনা পেশ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ কোনটিই গৃহিত হয়নি। ডিউকের নির্দেশে তাঁর একমাত্র কাজ হলো “শেষ ভোজ” চিত্রটি অংকন করা। সান্তা মেরিয়া’র ডাইনিংরুমের জন্য উপহার প্রদানের উদ্দেশ্যে ডিউক তাঁকে এই চিত্রাঙ্কনের জরুরী নির্দেশ দিয়েছিলেন।

মিলানে থাকতেই তিনি শরীর-ব্যবচ্ছেদ শাস্ত্রে উৎসাহী হয়ে পড়েন। এ ব্যাপারে তিনি তদানীন্তন সময়ের খ্যাতনামা চিকিৎকদের শরণাপন্ন হন এবং তাঁদের শরীর-ব্যবচ্ছেদ কাজ করার পদ্ধতি প্রত্যক্ষ করেন। তার ফলে বৈজ্ঞানিক তৎপরতার ক্ষেত্রে তিনি শরীর-ব্যবচ্ছেদ সম্পর্কিত কতকগুলো অনন্য সাধারণ চিত্রও অংকন করেছিলেন।

একদিন ফরসীরজ ডিউক লুদোভিকো স্ফোর্জারকে পরাজিত ও গ্রেফতার করেন। লিওনার্দো ডিউকের পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হন। এই সঙ্কটকালে সমরাস্ত্র সম্পর্কিত তাঁর নতুন নতুন আবিষ্কারগুলো ভেনিসের কর্তৃপক্ষকে প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে তিনি ভেনিস যাত্রা করেন। ডুবুরির পোশাক এবং ডুবো জাহাজের পরিকল্পনা সম্পর্কেও তিনি তাঁর নোট বইতে বিস্তারিত বিশ্লেষণ তখনও করেননি। অবশ্য এর সপক্ষে কারণটিও তিনি বলেছে। তিনি বলেছেন,- “মানুষের মন্দ প্রকৃতি সম্পর্কেও তিনি সমান অবহিত। তাই এগুলোর নির্মানকৌশল প্রকাশ করলে মহাসমুদ্রে হত্যাকান্ডের উদ্দেশ্যে এগুলো ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে প্রচুর।”

এরপর লিওনার্দো স্বল্পকালের জন্য চেযারে বরজার দরবারে মানচিত্র অংকনকারীর চাকুরি লাভ করেন। বরজা ছিলেন  একজন স্বৈরাচারী শাসক। সমগ্র ইতালী বিজয়ই ছিলো তাঁর একমাত্র ইচ্ছা। টাসক্যানী ও আমব্রিয়ার মানচিত্র অংকনের জন্যে তিনি লিওনার্দোকে নিযুক্ত করেন। লিওনার্দো নিজেই জরিপ ও পরিমাপ করে এসব মানচিত্র অংকন করেছিলেন।

১৫০০ সালে লিওনার্দো নিজ জন্মভূমি ফ্লোরেন্সে ফিরে আসেন। তারপর ছয়-ছয়টি বছর তিনি ফ্লোরেন্সেই বসাবাস করেন। তখন তাঁর বয়স পঞ্চাশের মতো। এই সময়েই তিনি তাঁর বিশ্ব নন্দিত চিত্র “মোনালিসা” অংকন করেন। ‘মোনালিসা’র আকর্ষণীয় হাসি এখনো রহস্যের মায়াজাল বিস্তার করে আছে পৃথিবীর জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবার হৃদয়ে। প্যারিসের লুভার জাদুঘরে ‘মোনালিসা’ চিত্রটি আজও হাজার হাজার শিল্পমনস্ক মানুষকে আনন্দ দান করে চলেছে।

রাফায়েল, মাইকেল এঞ্জেলো প্রমুখ সমকালীন অন্যান্য শ্রেষ্ঠ শিল্পীরা তখন ভ্যার্টিকান থেকে সিসটাইনের উপাসনালয়ের চিত্রাঙ্কনের ব্যস্ত ছিলেন। লিওনার্দোও তখন রোমে গেলেন। কিন্তু তিনি কোন কাজ পেলেন না। শরীর-ব্যবচ্ছেদ সম্পর্কিত চিত্র অঙ্কনের জন্য তিনি কিছুটা উপেক্ষিতও হলেন। ব্যর্থ মনোরথ হয়ে তিনি মাতৃভূমি ইতালী ত্যাগ করেন এবং চিরদিনের মতোই ত্যাগ করেন। তাঁর যাত্রা প্যারিসের দিকে। জীবনে বাকি ক’টি বছর তিনি প্যারিসের রাজ দরবারেই কাটিয়েছেন।

শিল্পী ও চিত্রকররূপে লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি বিশ্বে সুপরিচিত। তাঁর চিত্রসমূহ এখনো পর্যন্ত সম্মানের সাথে সুরক্ষিত  আছে। এসব চিত্র তাঁর আশ্চর্য প্রতিভার প্রতিফলন। কিন্তু বিজ্ঞানী ও আবিষ্কর্তা লিওনার্দোর পরিচয় পুরোপুরি দেওয়া কঠিন। সমকালীন যুগে তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন সম্ভব হয়নি। তাঁর যুগকে পিছনে ফেলে তিনি অনেক অনেক বেশী এগিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ধারণা এবং পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন সম্পূর্ণ সম্ভব ছিলো। কিন্তু বর্তমান থেকে তিনি এতো বেশি এগিয়ে গিয়েছিলেন যে, তাঁর পক্ষে অন্যদের থেকে খুব বেশি সমর্থন পাওয়া সম্ভব ছিলো না। তাঁর ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হচ্ছে- তিনি প্রচুর কাজের অর্ডার গ্রহণ করতেন, কিন্তু সময় এবং অস্থির চিত্ততার জন্যে ঠিক সময়ে সেগুলো শেষ করে দিতে পারতেন না।

তাঁর আবিষ্কৃত জিনিষ সমূহ বহুমূখী এবং চিত্তাকর্ষক। তাঁর আবিষ্কৃত মেশিনগানকে স্পেন-আমেরিকা যুদ্ধের সময় সময় ব্যবহৃত মার্কিন ‘গ্যাটলিং’ গানের আদিরূপ বলা হয়। লিওনার্দোর উদ্ভাবিত বন্দুক ছিলো একাধিক নল বিশিষ্ট এবং ত্রিমুখী কার্যের উপর আবিষ্কৃত। একটা নল দিয়ে গুলি বর্ষণের সময় দ্বিতীয়টার বারুদ ভরতি করা যেতো এবং তৃতীয়টাকে ঠান্ডা হাওয়ার সময় দেওয়া হতো। তাঁর তৈরী যুদ্ধ গাড়ির সঙ্গে একটা চলমান বেদী সংযুক্ত থাকতো এবং যে কোন দিকে গাড়িটি ঘোরানো যেতো। অবশ্য মানুষই গাড়ি হাতে টেনে চালিয়ে নিতো। কারণ, তখনো যন্ত্রচালিত গাড়ির উদ্ভাবন হয়নি।

ডুবুরির পোশাক এবং ডুবোজাহাজের কথা পূর্বেই বলা হয়েছে। এছাড়া তিনি দুই কাঠামো বিশিষ্ট এক ধরণের যুদ্ধ জাহাজের পরিকল্পনা করেছিলেন। এত বাহিরের খোলসটা গুলীতে ফুটো হয়ে গেলেও ভেতরে বিকল্প কাঠামো থাকায় জাহাজ নিরাপদ ও ভাসমান থাকবে।

আজকাল বিজ্ঞানের যুগে আমরা যাকে যান্ত্রিকীকরণ বলে আখ্যায়িত করে থাকি, সে সম্পর্কেও লিওনার্দো সমানভাবে সক্রিয় ছিলেন। বায়ুর গতি পরিমাপণের উদ্দেশ্যে তিনি ‘এনিমোমিটার’ যন্ত্রের নমুনা তৈরি করেন। যন্ত্রটির শীর্ষদেশে একটা বাতশকুন বা ভেন স্থাপিত ছিলো, যা বাতাসের গতিবেগের সঙ্গে সহজেই ঘুরতো এবং এর মাধ্যমেই বায়ুবেগের পরিমাণ গ্রহণ করা যেতো অতি অনায়াসে।

লিওনার্দোই সর্বপ্রথম ঘন্টা এবং মিনিট উভয়ের সমন্বয়ে ঘড়ি তৈরি করেন। তাঁর ঘড়ির গতি-নিয়ামক  এবং চাপের সাহায্যে চালিত হতো।

আজকের দিনের প্রতিটি মোটর গাড়িতে ‘অডোমিটার’ যুক্ত থাকে। গাড়ি কতোটুকু পথ অতিক্রম করলো তা অডোমিটার থেকে জেনে নেওয়া যায়। চাকা ঘোরার সঙ্গে সঙ্গেই অডোমিটার কাজ করে এবং মাইলের হিসাবটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায়। লিওনার্দোর যুগে মোটর গাড়ি ছিলো না। কিন্তু তাঁর সময়ে মানচিত্র অঙ্কনের জন্য দূরত্বের হিসেব মাপা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিলো। এ উদ্দেশ্যে তিনি নিজস্ব পদ্ধতিতে অডোমিটার তৈরি করেন। মানুষ চালিত গাড়ির চাকার সঙ্গে সেটা সংযুক্ত থাকতো। চাকা চলার সঙ্গে সঙ্গে খাঁজযুক্ত অডোমিটারে প্রতিক্রিয়া শুরু হতো এবং চিহ্নিত গোলক ডায়ালের উপর মাইলের সঠিক হিসেব বুঝে নেওয়া যেত।

লিওনার্দোর আবিষ্কৃত অনেকগুলো যন্ত্র আজকের দিনেও ব্যবহৃত হচ্ছে এবং ঠিক সাবেকী পদ্ধতিতেই। অবশ্য এটা সত্য যে, যন্ত্রগুলোকে আধুনিক রূপ দেওয়া হয়েছে। যেমন কাঠের পরিবর্তে আজকাল ইস্পাতের দ্বারা যন্ত্রগুলো তৈরি হচ্ছে। কিন্তু যন্ত্র নির্মানের সূত্রটা লিওনার্দোরই আছে। ভার উত্তোলনের জন্য তিনি ঠিক আধুনিক যান্ত্রিক বার উত্তোলনযন্ত্র জ্যাকের অনুরূপই একটা যন্ত্র তৈরি করেন। মোড় ঘোরার সময় গাড়ির এক এক চাকাকে এক এক ধরণের গতি প্রদানের উদ্দেশ্যে তিনি বিভিন্ন ব্যাসের খাঁজযু্ক্ত চাকার প্রচলন করেন। এর ফলে বাঁক ঘুরতে বা বক্র এক চাকা অন্য চাকার তুলনায় জোরে ঘোরনো যেতো। তাঁর এই পদ্ধতি আধুনিক মোটর গাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রেও গ্রহণ করা হয়েছে যা ডিফারেন্সিয়াল গিয়ার নামে পরিচিত।

আধুনিক যন্ত্রশিল্প পর্যালোচনা করলেও দেখা যায় যে, আজকের দিনের স্কু কাটিং  এবং ফাইল কাটিং মেশিন লিওনার্দো আবিষ্কৃত ঐ জাতীয় যন্ত্র থেকে খুব বেশি আলাদা কিছুই নয়।

জলপ্রবাহ সম্পর্কিত বিষয়াদিতে লিওনার্দো বিশেষভাবে উৎসাহ পোষণ করতেন। তিনি এক ধরণের পাম্প তৈরি করেন। অতি প্রয়োজনীয় পানি উত্তোলনের জন্য জলপ্রবাহের সাহায্যে এই পাম্প চালু হতো। পাম্পের একটা বিরাট চাকা স্রোতের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হত। স্রোতের টানে চাকাটা ঘোরার সাথে সাথে অপর দিকের একটি দাঁতযুক্ত চাকাও ঘুরতে থাকতো এবং পাম্পের চাপদন্ড চালু হয়ে পানি উপরে উঠে আসতে থাকতো। এই পাম্পের গোটা কাঠামোটি ৭০ ফুটেরও বেশি উঁচু। পানির অন্যান্য ধরণের ব্যবহার সম্পর্কেও তিনি গবেষণ করেছেন প্রচুর। মাছের আকৃতি সম্পর্কেও তিনি গবেষণা করেছেন। গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে তিনি জাহাজ নির্মানের জন্য এক ধরণের বিশেষ নকশা তৈরি করেন। পানি সেচ ও নৌ-চালনার সুবিধার জন্যে নদীর গতিপথ পরিবর্তন সম্পর্কেও তিনি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেন।

১৪৯০ সালে দিকে লিওনার্দো উড্ডয়নের জন্য এক ধরণের যন্ত্রের নক্শা তৈরী করেন। তাঁর পরিকল্পিত যন্ত্র সম্পূর্ণ মানুষের শক্তিতেই চালনার ব্যবস্থা ছিলো। অবশ্য এই যন্ত্র কখনও উড্ডয়ন সক্ষম হয়নি। তাঁর পরিকল্পনা ছিলো- বড় বড় দুটি পাখার সাহায্যে মানুষ উড়বে। এবং পা দুটোর সাহায্যে পাখা আন্দোলিত করবে। তাছাড়া এক ধরণের হেলিকপ্টারের নক্শাও তিনি তৈরী করেন। তাঁর কল্পিত হেলিকপ্টারে একটি বিরাট পেঁচালো স্ক্র ছিলো। তাঁর পরিকল্পনা ছিলো স্প্রি- এর সাহয্যে হেলিকাপ্টার চালনা করা। কিন্তু তাঁর এই পরিকল্পনা সফল হয়নি। এর জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি যোগান দেওয়া তখনকার সময়ে তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিনি পাতলা আস্তরণ দিয়ে পিরামিডের আকারে কাঠের প্যারাস্যূট তৈরী করেছিলেন এবং উঁচু একটা গীর্জা থেকে লাফ দিয়ে এই ঐতিহাসিক প্যারাস্যুট পরীক্ষা করে দেখানো হয়েছিলো। পতনের গতি হ্রাসের ক্ষেত্রে এই প্রচেষ্টা সফল হয়েছিলো বলে জানা যায়।

লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি একজন অসাধারণ উদ্ভিদতত্ত্ববিদরূপেও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাঁর চিত্র এবং রচনায় দেখা যায় যে, তিনি ‘অনুগ’ সূর্যমূখী ও ‘প্রতীপ’ সূর্যবিপরীতমূখী জ্যেতির্বিদ্যা সম্পর্কেও ওয়াকিফহাল ছিলেন। তিনি এটাও উল্লেখ করেছেন যে, গাছের কতোগুলো শিকড় মাটির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে, অাবার অন্য কতোকগুলোর মটির উপর বিস্তার লাভের প্রবনতাও রয়েছে। একই ‘অনুগ’ ও ‘প্রতীপ’ ভৌমগতি বলা হয়। বৃক্ষের বলয় সম্পর্কেও তিনি সমান সচেতন ছিলেন। বলয়ের সঙ্গে যে উদ্ভিদের বয়সের একটা সম্পর্ক রয়েছে, তাও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। তাঁর অঙ্কিত পুষ্পসমূহ দেখে তার থেকেই বোঝা যায় যে, তিনি পুরুষ ও স্ত্রী উদ্ভিদের ভিন্নতা সম্পর্কেও জ্ঞাত ছিলেন।

অভিজ্ঞ একদল চিকিৎসাবিদের সহযোগিতায় তিনি শরীর-ব্যবচ্ছেদ বিদ্যা অধ্যয়ন করেন প্রচুর। তাঁর অঙ্কিত চিত্রসমূহ থেকে বোঝা যায় যে, মানুষের শারীরিক গঠন প্রকৃতি ও কাঠামো সম্পর্কেও তিনি ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। তাঁর ‘মাথার খুলী’ মাধ্যম চিত্রেই সর্বপ্রথম কপাল ও চোয়ালের যে ফাটল আছে তা দেখানো হয়।

বিংশ শতাব্দীর চিকিৎসকরা এ দুটোকে ‘ললাটস্থি’ এবং ‘ম্যাক্সিলারী সাইনাস’ বলে অভিহিত করেন। ভিঞ্চি সর্বপ্রথম কন্টকের (Spine) দুইটি বক্রতা সম্বন্ধে দিক নির্দেশ করেন। সর্বপ্রথম মাতৃগর্ভে শিশুর সঠিক অবস্থানেরও চিত্র অঙ্কন করে দেখিয়ে দেন ভিঞ্চি। তাঁর হৃৎপিন্ড সংক্রান্ত বর্ণনা এবং চিত্রও অত্যন্ত সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। হৃৎপিন্ডের ‘প্রকোষ্ঠ দুয়ার’ এবং সামগ্রিক কাঠামো সঠিকভাবেই অঙ্কন করেছেন তিনি।

লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি’র অনেক চিত্রকেই প্রয়োজনীয় যান্ত্রিক মডেলরূপে গ্রহণ করা হয়েছে। সময় সময় এসব যন্ত্রপাতির প্রদর্শনীও হয়েছে। “ইন্টারন্যাশলান বিজনেস মেশিন কর্পোরেশন” লিওনার্দোর যন্ত্রপাতির একটা উল্লেকযোগ্য সংগ্রহের মালিক। এই কর্পোরেনের প্রতিষ্ঠাতা মিঃ টমাস জে, ওয়াটসন লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, “....আবিষ্কার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্প। বৃহত্তর অর্থে সকল শিল্পেই এর আওতায় পড়ে। চিত্রাঙ্কন, পর্যালোচনা, বৈজ্ঞানিক অন্বেষা এবং আবিষ্কার প্রভৃতির মধ্যে দিয়ে লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি’র যে পরিচয় ফুটে উঠেছে, তাতে আমরা এমন একজন মহান মানুষের পরিচয় লাভ করি, যে বিজ্ঞানী বৃহত্তর মানবগোষ্ঠীর কল্যাণ সাধনে চিন্তা, অনুভূতি এবং সৃজনে আমরণ নিজেকে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন নিরলসভাবে.........।”

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আমার গ্রন্থাগারের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url