এক রাত্রির অতিথি - গজেন্দ্র কুমার মিত্র
এক রাত্রির অতিথি
বুড়ো মাঝিটাকে তাড়া লাগানো বৃথা জেনেই অনিমেষ বহুক্ষণ আগে চুপ করে ছিল। তার ফলে মাঝি আরোহী দুজনেই হাল ছেড়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বসেছে। মাঝির বকাটাই রোগ - এমন কি ভাবভঙ্গী দেখে মনে হচ্ছিল ঐটেই পেশা। ওর বৌ কতদিন মেরেছে, ছেলের বিয়ে দিয়ে কী ভুল করেছে, জামাই কেন মেয়ে নেয় না - ছোট জামাইটা জুয়াড়ী, ছেলেটা নেশা করতে পেলে আর কিছু চায় না - খুব ছেলেবয়সে একবার ও কলকাতা গিয়েছিল কিন্তু অত হট্টগোলে মাথা ঠিক থাকে না বলে পালিয়ে আসতে পথ পায় নি - আবার একবার যাবে মা কালীকে দর্শন করতে, ইত্যাদি তথ্য পরিবেশন করবার ফাঁকে ফাঁকে কেবলমাত্র দম নেবার প্রয়োজনে যখন থামে তখনই শুধু দাঁড় বাইবার কথা মনে পড়ে ওর। সুতরাং শহরে যাবার বাস যে পাবে না তা অনিমেষ আগেই বুঝেছিল, কিন্তু এমন অবস্থায় যে পড়বে তা কল্পনা করেনি। বাস তো নেই-ই, আশেপাশে কোথাও মানব-বসতির চিহ্নও যেন চোখে পড়ে না।
নৌক এসে যেখানটায় ভেড়ে সেখানে বাঁশের মাচামতো একটা আছে, জাহাজঘাটা হলে অনায়াসে জেটি বলা যেত। সেই মাচাতে নেমে অসহায় ভাবে অনিমেষ একবার চারদিক তাকিয়ে দেখল। নিচে ময়ূরাক্ষীর কালো জল নিঃশব্দে বয়ে যাচ্ছে। তার স্রোত, এত নিস্তরঙ্গ - যে মনে হচ্ছে সমস্ত জলটা যেন জমাট বেঁধে স্তব্ধ হয়ে গেছে - আর তার সেই অতল কালো বুকে কত কী রহস্যময় জীব স্পন্দনহীন চোখে তার দিকে তাকিয়ে কৌতুকের হাসি হাসছে-
ওপারে ভগীরথপুর গ্রাম, বেশ সম্পন্ন গ্রাম তা সে জানে, বহু লোকের বাস, অনেক পাকা বাড়ি ইস্কুল ডাকঘর আছে কিন্তু এখান থেকে তার কিছুই দেখা যায় না। ঘাট থেকে উঠে যে রাস্তাটা গ্রামের দিকে গিয়েছে তার সাদা বালি আভাস নিবিড় বনের অন্ধাকরে মিশে গেছে একটুখানি গিয়েই। দু’দিকে বড় বড় গাছ - কী গাছ তা বোঝা যায় না, কিন্তু তারই অসংখ্য শাখাপল্লব সমস্ত গ্রামটাকে যেন চোখের আড়াল করে রেখেছে। একটা আলোর রেখা পর্যন্ত চোখে পড়ে না।
ওপারেই যদি এই হয় তো এপারের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। এপারে যেদিন সে এসছিল সেদিন দিনের বেলাও কোনও গ্রাম ওর চোখে পড়ে নি। বাসটা এসে একেবারে এই ঘাটের ধারে দাঁড়ায়, যাত্রীরা সবাই ভগীরথপুরে চলে যায়। সেদিন অন্তত এমন কেউ ছিল না যে এপারে কোথাও যাবে। আসার সময়ও দুদিকে আম গাছের ঘন বন কাটিয়ে এসছিল - বেশ মনে আছে। হয়ত ছিল কোথাও ঘরবাড়ি, কিন্তু তা ওর চোখে পড়ে নি।
পারাপারের জন্য একটা খেয়া নৌকা আছে, চওড়া ভেলার মতো প্রকান্ড বস্তু - কিন্তু শেষ বাস চলে যাবার পর আর ওপার থেকে কেউ আসার সম্ভাবনা নেই জেনে সে ইজারাদারও বাড়ি চলে গেছে নৌকোটা ওপারে বেঁধে রেখে।
‘বাবু ভাড়াটা?’ তাড়া লাগায় মাঝি।
বিহবলতা কাটে কিন্তু যেন আরও ব্যাকুল হয়ে ওঠে অনিমেষ।
‘ভাড়াটা কিরে! এই অন্ধকার রাত্রিতে আমি এখানে কোথায় থাকব। তুই তো এক ঘন্টার রাস্তা সাত ঘন্টায় এনে আমাকে এই বিপদে ফেললি। এখন নদীর ওপারে পৌঁছে দে। দেখি কোথাও একটু আশ্রয় পাই কিনা, এপারে এই জঙ্গলে শেষে কি বাঘের পেটে প্রাণ দেব। চল, ওপারে নিয়ে চল-’
‘উটি লারলম্ আজ্ঞা!’
‘সে কি! কেন রে? কী হয়েছে?’
তার উত্তরে মাঝি যা বলল তার অর্থ হচ্ছে যে, ওপারে অন্য নৌকো গেলে খেয়ার ইজারাদার বড্ড বকাবকি করে, পুলিসে ধরিয়ে দেয়। সুতরাং ওপারে যাওয়া ওর পক্ষে সম্ভব নয়।
অনিমেষ তাকে অনেক ক’রে বোঝাল। ওপারে তাকে ধরাবর জন্য ইজারাদার যদি বেস থাকত তো অনিমেষ তো তাকেই ডাকতো; শুধু ইজারাদার কেন, জনমানবের চিহ্ন থাকলেও সে মাঝিকে এ অনুরোধ করত না। কোন - মতে নামিয়ে দিয়ে সে চলে যাক - তাতে যদি কেউ তাকে ধরে তো অনিমেষ তার দায়ী - ইত্যাদি সব কথার উত্তরে তার সেই একই উত্তর, ‘উটি লারলম্ আজ্ঞা!’
অনিমেষ তখন রাগ করে বলল, ‘তবে তুইও থাক, আমি তোর নৌকাতেই রাত কাটাই।’
‘আজ্ঞা, উটিও লারলম্!’ শুধু তাই নয়, দাঁড়ের একটা ধাক্কা দিয়ে নৌকোটা খানিক দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল।
‘টাকাটা ছুঁড়ে দ্যান কেনে - বাড়ি চলে যাই!’
‘তবে টাকাও পাবি না যা!’ রাগ করে বলে অনিমেষ, কিন্তু যখন দেখে বুড়োটা সত্যি - সত্যিই একটা নিশ্বাস ফেলে ঘর-মুখো হচ্ছে তখন সে একখানা এক টাকার নোট দলা পাকিয়ে ছুঁড়েই দেয়।
‘যা বেটা যা। পথে ডুবে মরিস তো ঠিক হয়।’ মনে মনে বলে অনিমেষ।
ব্যস্! এরপর সব পরিষ্কার! ওপারে ঘন বনের বিড়ি তমিস্রা, সামনে অতল শান্ত জলে তারই রহস্য যেন জমাট বেঁধে - আর এপারে তার চারপাশ ঘিরেও দৈত্যের মতো কতকগুলি গাছপালা ভয়াবহ অন্ধকার বিস্তার করে সমস্ত স্তব্ধতার চিহ্ন, এমন কি আকাশকেও যেন আড়াল ক’রে রেখেছে। বাস এসে দাঁড়ায় এবং ঘোরে যেখানটায় সেখানে খানিকটা ফাঁকা জায়গা আছে বটে কিন্তু সে যেন আরো ভয়ঙ্কর।
স্যুটকেসটা মাচার উপর পেতে সেখানেই জেঁকে বসল অনিমেষ। বাঘ ভাল্লুক যদি সত্যিই আসে তো জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে - এখানেই খানিকটা তবু নিরাপদ।
খর খর ঝট পট শব্দ করে কী একটা পাখী উড়ে বসল মাথার ওপরে। ভয় পেয়ে চমকে উঠল অনিমেষ। কাছেই কোথায় শুকনো পাতার ওপর দিয়ে কী একটা সরীসৃপ চলে গেল বোধ হয়। সামান্য শব্দ, তবু বেশ স্পষ্ট। জলের মধ্যে হঠাৎ একটা মাছ ডিগবাজী খায়। ঐটুকু আওয়াজ - কিন্তু অনিমেষের মনে হল যেন বন্দুকের শব্দ উঠল কোথায়।
বিশ্রী লাগছে। নক্ষত্রের আলোতে যতদূর দৃষ্টি চলে বহুক্ষণ ধরে ধরে হাতঘড়িটা দেখল - মাত্র রাত ন-টা। কলকাতায় সবে সন্ধ্যা। কিন্তু এখানে মনে হচ্ছে নিষুতি রাত। এখনও দীর্ঘ সময় তাকে এখানে অপেক্ষা করতে হবে। কখন ভোর হবে, তারপর কখন ইজারাদারদের ঘুম ভাঙবে তবে সে একটু লোকালয়ের মুখ দেখতে পাবে। বাস একটা আসে এখানে সকাল আটটা নাগাদ - সন্ধ্যাতে যেটা এসেছে সেটা কাছাকাছি কোন গ্রামে থাকে, সাতটা নাগাদ এখানে এসে দাঁড়ায়। অর্থাৎ প্রায় বারো ঘন্টা এখনও-
আচ্ছা, হাঁটলে কেমন হয়? বাসের রাস্তাটা ধরে হাঁটতে থাকলে কি আর গ্রাম একটা পাওয়া যায় না কাছাকাছির মধ্যে?
কিন্তু সেখানে যদি তাকে আশ্রয় দিতে কেউ না চায়? ডাকাত বলে মনে করে? তাছাড়া দু’দিকে যা ঘন বন, যদি বাঘ আসে? মুর্শিদাবাদ জেলায় এসব অঞ্চলে প্রায়ই বাঘ বেরোয়।
দরকার নেই। দশ - এগারো ঘন্টা সময় - এক রকম করে কেটেই যাবে।
‘ও মশাই শুনছেন? বাস মিস করেছেন ুবঝি? কোথাও আশ্রয় পান নি?’
অস্ফুট একটা শব্দ ক’রে চমকে ওঠে অনিমেষ, বরং আঁৎকে ওঠে বলাই ঠিক। কখন নিঃশব্দে কে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে - কৈ একটুও তো টের পায় নি! সামান্য কুটো নড়ার শব্দের দিকেও তো সে কান পেতে ছিল।
কয়েক মুহূর্ত যেন ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে থকে, ঘাড় ফেরাতেও সাহস হয় না। কথাগুলো যে বলছে সে একেবারে ওর পিছনে এসেই দাঁড়িযেছে। অত্যন্ত দ্রুত, যেন একটা কথা শেষ হবার আগেই আর একটা শুরু হয়েছে - এই ভাবে পর পর তিনটি প্রশ্ন ক’রে আগন্তুকটিও চুপ ক’রে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে।
অবশেষে প্রায় মরীয়া হয়েই অনিমেষ ফিরে তাকায়।
রোগা কালো গোছের একটি মানুষ, খুব বেঁটে নয় - তাই বলে ট্যাঙাও বলা চলে না। উসকোখুসকো একমাথা চুল ও ঘন দাড়ি গোঁফ। ঘন দাড়ি কিন্তু আবক্ষ বিস্তৃত নয়। মধ্যে মধ্যে কামানো বা ছাঁটা হয় - এমনি দাড়ি , খোঁচা খোঁচা। একখানা খাটো আধময়লা কাপড় পরনে - কোঁচার খুঁট গায়ে জড়ানো। মোটা ভুরুর আড়ালে কোটরগত চক্ষুর তীক্ষ্ণদৃষ্টি নিঃশব্দে শুধুমাত্র চাউনির দ্বারাই যেন অনিমেষের সমস্ত ইতিহাস পূর্বাপর আয়ত্ত করবার চেষ্টা করছে।-
‘বলছিলুম যে আপনি বোধহয় কোথাও আশ্রয় পাচ্ছেন না - না? তা হ’লে বরং চলুন না হয় আমার কুটিরেই - কোনমত রাতটা কাটিয়ে দেবেন।’
হায় রে! আগলফলম্বিত-কুন্তলা বনমালা শোভিতা কপালকুন্ডলারা শুধু উপন্যসেই দেখা দেয়!
যাক যে, নবকুমারের অদৃষ্ট তার নয় তা তো বোঝাই যাচ্ছে। তাই বলে কি ওর চেয়ে ভদ্র চেহারার কেউ জুটতে নেই! এ লোকটাকে দেখেই যেন পাগল বলে মনে হয় - শেষ পর্যন্ত এর আশ্রয়ে গিয়ে কি আরও বিপদে পড়বে!
‘কী বলেন? যাবেন নাকি?’
‘আ-আপনি এখানে - মানে-’ আমতা আমতা করে অনিমেষ।
‘আমার এখানেই একটা ঘর আছে, এই যে।’
লোকটা আঙুল দিয়ে দেখায়।
সত্যিই তো, এই তো বলতে গেলে তার সামনেই পাড়ের ওপর একখানা খড়ের ঘর - ও অঞ্চলে যেমন হয় তেমনি। আশ্চর্য, এতক্ষণ তার চোখে কি হয়েছিল?
লোকটি বোধহয় তার মনের ভাব বুঝেই হেসে বললে, ‘ঘরে আলো ছিল না কিনা, তাই অন্ধকারে টের পান নি। আমিও বাড়ি ছিলুম না, নদীর ধার দিয়ে দিয়ে একটু বেড়াতে গিয়েছিলুম। অন্ধকারে একা একা বেড়াতে আমার বেশ লাগে।’
‘এখানে বাঘের ভয় নেই?’
‘আছে বৈকি। তবে আমার অত ভয় নেই। - মরবার ভয় করি না। ক’রে বা লাভই বা কি বলুন, মরতে তো একদিন হবেই।’
না, লোকটাকে ঠিক পাগল বলে তো মনে হয় না!
‘চলুন চলুন, ঘরে বসেই কথাবার্তা হবে’খন।’ লোকটা তাড়া লাগায়।
‘চলুন’ বলে স্যুটকেসটা তুলে নেয় অনিমেষ।
একখানা নয় - পাশাপাশি দুখানা ছোট ঘর, সামনে একফালি দাওয়া। ভেতর দিকে আরও কি আছে তা ওর নজরে পড়ল না। দাওয়া বেশ ঝক - ঝকে ক’রে গোছানো, পরিচ্ছন্ন। লোকটি আগে আগে পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে ‘দাঁড়ান আলো জালি’ বলে ওকে দাওয়াতেই দাঁড় করিয়ে রেখে দোর খুলে ভেতরে ঢুকল। তালাচাবির বালাই নেই, দোর শুধু ভেজানোই ছিল, ঠেলা দিতেই নিঃশব্দে খুলে গেল। ভেতরে ঢুকে আশ্চর্য রকম ক্ষিপ্রতার সঙ্গে একটা আলো জ্বেলে লোকটি বলল, ‘আসুন - ভেতরে আসুন।’
ঘরে আসবাপত্র বেশি ছিল না। একটি তক্তপোশের ওপর একটা মাদুর বিছানো, - শয্যা বলতে এই। একটা বলিশ পর্যন্ত নেই। একপাশে একটা দড়ি টাঙানো, তাতে খান দুই কাপড়, তার মধ্যে একটা লাল মেঝেতে জলের মেটে কলসী, একটা কাঁসার ঘটি এবং পিতলের পিলসুজে একটা মটির প্রদীপ। এ ছাড়া আর কোথাও কিছু নেই।
‘বসুন বসুন। ঐ চৌকিটার ওপরই বসুন।’
তারপর খানিকটা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে নিজের দুই হাত ঘষে কেমন এক রকমের বিচিত্র হাসি হেসে বলল, ‘ভাল বিছানা আমার নেই! ঐ স্যুট - কেসটা মাতায় দিয়েই শুতে হবে। - আর খাবারও তো কিছু দিতে পারব না। ঘরে আমার কিছুই নেই। - আপনি মদ খান?’
যেন একটা আকস্মিক উগ্রতা দেখা দেয় ওর প্রশ্ন করবার ভঙ্গীতে।
‘না-না। রক্ষে করুন। কিচ্ছু ব্যস্ত হবেন না আমার জন্য। আশ্রয় পেয়েছি এই ঢের।’
‘ঐ আশ্রয়টুকুই যা। বাঘ ভাল্লুকের হাত থেকে তো বাঁচলেন অন্তত। - তা আশ্রয় ভালই। ঘরখানা মন্দ নয়, কী বলেন?’
বলতে বলতে হেসে ওঠে সে। সাদা ঝকঝকে দাঁত কালো দাড়ির ফাঁকে চকচক করে।
অনিমেষের যেন ভালো লাগে না ওর ভাবভঙ্গী। আবারও সেই সন্দেহটা মনে জাগে - পাগলের পাল্লায় এসে পড়ল নাকি?
‘আপনি এখানে কি করেন?’
‘আপাতত কিছুই না। আচ্ছা বসুন। আমি আসি। মুখহাত ধোবেন নাকি?’
ধুতে পারলে ভালই হ’ত কিন্তু অনিমেষের তখন নড়তে ইচ্ছে করছে না। সে বলল, ‘না-দরকার নেই।’
লোকটি বেরিয়ে গেল। অনিমেষ স্তব্ধ হয়ে বসেই রইল। ভালো বোধ হচ্ছে না ওর। কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। কী করে লোকটা এখানে, এমন একাই বা থাকে কেন? ঘরে কোন রকম কিছু খাবার নেই তো ও নিজে খায় কি? চোর ডাকাত নয় তো? লোকজনকে ভুলিয়ে এনে শেষে-
ঈশ্বর বাঁচিয়েছেন - ব্যাগে ওর খানকতক পুরনো কাপড় জামা ছাড়া আর কিছুই নেই। পকেটেও মাত্র টাকা-ছয়েক আছে। কিন্তু, একটু পরেই সমস্ত দেহ হিম হয়ে ওর মনে পড়ে - এই সব উদ্দেশ্যে যারা নিয়ে আসে ভুলিয়ে, টাকা না পেলে আরও হিংস্র হয়ে ওঠে। তা ছাড়া মেরে ফেলে তো দেখবে কী আছে না আছে। ওদের দেশে একবার খুব ডাকাতের উপদ্রব হয়েছিল, তারা একটা লোককে খুন করার পর পেয়েছিল, মাত্র একটি আধলা।
কখন গৃহস্বামী আবার নিঃশ্বব্দে ওর কাছে এসে দাঁড়িয়েছে অনিমেষ টেরও পায় নি। যদিও খোলা দরজার দিকে চেয়েই বসেছিল সে। আশ্চর্য!
লোকটি বলল, ‘এখনই শুয়ে পড়বেন নাকি? যদি ঘুম পেয়ে থাকে তো স্বতন্ত্র কথা। নইলে একটু বসি। কতদিন লোকের সঙ্গে কথা কইতে পাই নি। বলেন তো দুটো কথা কয়ে বাঁচি। - এখানে তেমন লোকজন তো নেই, আসেও না কেউ-’
অনিমেষ আবার পূর্বের প্রশ্নের জের টানল, ‘তা এমন জায়গায় আপনি থাকেনই বা কেন?’
সেই হাসি গৃহস্বামীর মুখে। তেমনি নিঃশব্দ হাসি, দাড়ির ফাঁকে শুভ্র দন্তের সেই বিজলী প্রকাশ!
‘ভয় নেই। আমি চোর ডাকাতও নই। ঘরে কিছু নেই মানে আমার কিছুর দরকার নেই। থাকারও দরকার হয় না আমার। কেন জানেন?’
তারপর - যেন কতকটা অসংলগ্ন ভাবেই বলে ওঠে, ‘আমি সাধক। তান্ত্রিক সন্ন্যাসী।’
‘সন্ন্যাসী?’ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে চায় অনেমেষ।
অগ্রতিভিত হয়ে লোকটি বলে, ‘না - সন্ন্যাসী মানে ঠিক অভিষিক্ত সন্ন্যাসী নই - তবে সাধক বটে।’
উবু হয়ে ঘরের মেঝেতেই বসল লোকটা, কিছুক্ষণ মৌনভাবে থেকে বলল, ‘তাহলে আপনাকে বলেই ফেলি সেটা। কাউকে কখনও বলি নি, বলবার সুযোগও পাই নি বিশেষ। এই অঞ্চলেরই লোক আমি, বুঝলেন? ছেলে - বেলা থেকেই নানা বইয়ে তান্ত্রিক সন্ন্যাসীদের অদ্ভুত সব ক্ষমতার কথা পড়ে ঐ দিকে মনটা ঝোঁকে। মনে হ’ত আমিও ঐসব সাধনা ক’রে সিদ্ধ হবো, তার - পর প্রাণ ভরে পৃথিবীর সব ঐশ্বর্য ভোগ করব - আর আমাকে পায় কে! হায় রে, তখন কি আর জানতুম যে ভোগের উদ্দেশ্যে সাধনা করতে এলে সিদ্ধি তো দূরের কথা সমস্তই খোয়াতে হয় একে একে।’
এই পর্যন্ত বলে লোকটি চুপ করল। এতক্ষণ অনিমেষও অনেকটা সহজ হয়েছে। লোকটির ভাবভঙ্গী আর কথাবার্তায় সত্য কথা বলছে বলেই মনে হয়। দুশ্চিন্তা অনেকখানি কমে গেল ওর।
‘বাড়ি আমার এ অঞ্চলে নয়। বাড়ি সেই পাঁচথুপির কাছে। এখানে কেন এলুম? বলছি দাঁড়ান। - বলেছি আপনাকে ছেলেবেলা থেকেই ঐ দিকে ঝোঁক গিয়েছিল। ইস্কুলের পড়া হ’ল না, তার বদলে যত সব ঐ ধরণের বই পড়তে লাগলুম। পড়তে পড়তে বিশ্বাসটা খুব পাকা হয়ে গেল। কিন্তু গুরু কই? দু-একটা সন্ন্যাসী যা হাতের কাছে পেলুম দেখলুম সব বাজে - কেউ কিছু জানে না। অথচ পথ দেখাবে এমন লোক না পেলে এগোব কি ক’রে? - মনটা বড়ই চঞ্চল হয়ে উঠল। খাবার চিন্তা ছিল না। মাথার উপর বাবা, বড় ভাই ছিল - জমিজমা তারাই দেখাশুনো করত। অবশ্য আমি বকুনিও খেয়েছি ঢের, কাজকর্ম কিছু করি না বলে, কিন্তু সেসব গায়ে মাখি নি।
‘তবে যত দিন যেতে লাগল মনটা ততই ব্যাকুল হয়ে উঠল। শেষমেষ আমার তেইশ-চব্বিশ বছর বয়সের সময়ে বাড়ি থেকে সামান্য কিছু টাকা নিয়ে বেরিয়ে পড়লুম। বেশ বুঝেছিলুম ঘরে বসে আর কিছু হবে না। - এ তীর্থ ও তীর্থ ক’রে অনেক দেশেই ঘুরলুম। ভাল চাকরি বা ভাল বিয়ে করার অনেক সুযোগও পেয়েছিলুম; সংসার -বুঝলেন মশাই, মায়ার ফাঁদ পেতে রেখে দেয় সারা জগতে - যাই হোক সেদিকে মন ছিল না বেল কেউ বাঁধতে পারল না। কিন্তু আসল যা উদ্দেশ্য তাও কিছু হ’ল না। - এমনি ভাবে যখন ক্রমশ হতাশ হয়ে উঠেছি তখন একদিন - বাড়ি ফেরার পথে বলতে গেলে বাড়ির কাছে হঠাৎ একজনকে পেয়ে গেলুম। বক্রেশ্বরের শ্মশানে এক সাধু থাকেন শুনলুম, উলঙ্গ থাকেন শ্মশানে শুয়ে, কেউ খেতে দিলে খান নইলে এমনি থাকেন। কাঁচা মাংস, পাতা লতা এমন কি বিষ্ঠা খেতেও তাঁর আপত্তি নেই বোধ হয় - এমন নিস্পৃহ তিনি।
‘খোঁজ ক’রে ক’রে গেলুম। প্রথম তো দেখাই পাওয়া যায় না। শেষে তিন দিন ধন্না দিয়ে পড়ে থাকতে দর্শন পেলুম। বিপুল দেহ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, পাগলের মতো ভাবভঙ্গী - কিন্তু পাগল নন। একদিন আমার চোখের সামনই দু’দিক থেকে দু’দল ভক্ত তাঁকে দর্শন করতে আসছে দেখে, আমার চোখের সামনে শিয়ালের দেহ ধরে বনের মধ্যে গিয়ে সেঁধুলেন, কেউ আর খুঁজেই পেল না। বুঝলুম এতদিন ধরে যাকে খুঁজছিলুম এতদিন পরে তাকে পেয়েছি।’
অনিমেষের মনেও ততক্ষণে গল্প জমে উঠেছে। লোকটি থামতেই সে বললে, ‘তারপর?’
‘লোক তো পেলুম - তাকে ধরি কী করে? কিছুতেই ধরা দেয় না। কিছু বলতে গেলে শ্মশানের পোড়া কাঠ তুলে তেড়ে আসে। একদিন খুব কান্না - কাটি করতে সব শুনলে মন দিয়ে, কিন্তু তারপর যা বকুনিটা দিলে, বললে, “ভাল চাস তো এসব মতলব ছাড়। সাধনা করবি তুই, ঐ ছটাক কাঁপা নিয়ে? তোর কাজ নয় - বুঝলি, মরবি একেবারে। তা ছাড়া ভোগ করবার জন্যে এসব কাজ যে করতে আসে তার একুল ওকুল দুকুল যায়। রামকৃষ্ণ পরমংসের গল্প পড়িস নি? মাকে বলেছিল মা অষ্ট সিদ্ধাই দে - হৃদে বলছে চাইতে। মা বললেন, কাল সকালে এর উত্তর পাবি। পরের দিন সকালে দোর খুলতেই নজরে পড়ল একটি মেয়েছেলে ঐ দিকে ফিরে শৌচ করতে বসেছে -পরমহংস অপ্রস্তুত হয়ে ফিরে এসে ভাগ্নেকে এই মারে তো এই মারে। বুঝলি - এমনি তুচ্ছ শুধু নয়, ছোট জিনিস ওসব। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যা - বিয়ে থা কর। নিজে নিজেই ভগবানকে ডাক, নয়তো কুলগুরুর কাছে দীক্ষা নিস।” অনেক কাকুতি - মিনতি করলুম, বাবার আর দয়া হ’ল না। আমি কিন্তু মশাই ছাড়লুম না। আমার তখন জেদ চেপে গেছে কি না। - ঐ খানেই পড়ে রইলুম, বলতে গেলে না খেয়েদেয়ে - আর গোপনে ওর দিকে নজর রাখলুম। যদি আসল প্রক্রিয়ার কিছু হদিস পাই - বুঝলেন না? এতদিন কি আর বৃথাই এই লাইনে ঘুরেছি। আসল মানুষ না পাই, ওদের ভেতরের কথা কিছু কিছু জেনেছি বৈকি!
‘তারপর হ’ল কি মশাই, আরও দু- একজন সাধক আর রৈবী ওখানে এল বাবার সঙ্গে দেখা করতে। গোপনেই এল কিন্তু আমি তো ঐখানেই পড়ে থাকি, আমাকে এড়াবে কি ক’রে? - পরপর কদিন ওদের চক্র বসল। তাও দেখলুম। - মনে হ’ল যে, আর কি, সব শিখে গেছি - ওখান থেকে রওনা হয়ে আর বাড়ি ফিরলুম না, নির্জন স্থান অথচ শ্মশান, লোকালয়ের কাছে এই রকম খুঁজতে খুঁজতে এসে পড়লুম। পথে নলহাটীতে একজন তান্ত্রিকের কাছে দীক্ষাও নিয়ে নিলুম।
‘ও মশাই, এলুম তো এখানে। কিন্তু সাধনা আর হয় না। প্র্রথম দিন থেকে বিঘ্ন। উপকরণ জোটে তো দিন পাই না, দিন পাই তো উপকরণ নেই, - শেষে অনেক কৌশল ক’রে অনেক নিচে নেমে যদি বা সব যোগাড় করলুম, মঙ্গলবার অমাবস্যার রাত পেয়ে যেমন আসন করে বসেছি - কী বিঘ্ন! ধ্যানে মন দেব কি, কিছুতে মনই স্থির করতে পারি না - এখন এটা বাসের রাস্তা হয়ে শ্মশান এখান থেকে সরে গেছে, আগে এখানটাতেই শ্মশান ছিল, এখন যেখানে ঘর দেখছেন, এই যেখানে আমরা বসে আছি, এইখানেই সেদিন আসন ক’রে বসেছিলুম-’
নিজের অজান্তেই অনিমেষ যেন একটু সরে বসে। তারপর বলে, ‘আচ্ছ বিঘ্ন কি রকমের? ভয় পেলেন? শুনেছি তো এ রকম সাধনায় বসলে প্রথম প্রথম নানা রকমের ভয় দেখায় - কিন্তু সেটা শুধুই পরীক্ষা করার জন্যে। আপনিও তে াসে রকম শুনেছিলেন নিশ্চই, তবে ভয় পেলেন কেন?’
হাসল লোকটা আবারও। কাউকে ছেলেমানুষি করতে দেখলে বিজ্ঞ মানুষেরা যেমন হাসে কতকটা তেমনি হাসি। বললে, ‘জানে তো সবাই কিন্ত শোনা এক জিনিসি আর অভিজ্ঞতাটা আর এক। তেমন অভিজ্ঞতা হ’লে বুঝতেন! - শুনবেন কেমন? - মড়ার বুকের ওপর বসেছি আসন করে, মড়ার খুলিতে করে মদ খাচ্ছি - মনে ভয়ডর কিছুই নেই, এই বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই লোকেরই বুকের মধ্যে হিম হয়ে গেল সে সব শুনে। না না, তেমন ভয়ানক কিছু নয়, প্রথ শুরু হ’ল শুধু ফিস্ ফিস্ কথার শব্দ, খিল-খিল হাসি, চাপা হাসিই। ক্রমে সেইটাই বাড়তে লাগল। মনে হ’ল দশজন, বিশজন, একশজন - হাজার হাজার। আপনার চার পাশে যদি লক্ষ লোকের ফিস ফিস কথারই শব্দ হতে থাকে তো কেমন হয়? আর তার সঙ্গে চাপা এক ধরণের হাসি। তবু আমি স্থির হয়ে আসনেই বসে রইলুম - নড়লুম না। যদিও কাজে আর মন দিতে পারলুম না, এটাও ঠিক।
‘তার পর মশাই - স্পষ্ট দেখতে লাগলুম শ্মশানের মাটি ফুঁড়ে ফুঁড়ে যেন মড়াগুলো উঠছে। কতকাল থেকে মরেছে সব - কত হাজার হাজার বছর ধরে। এক এক জনের বীভৎস চেহারা, রোগে, যন্ত্রণায় বিকৃত মুখ। কেউ বা খুন হয়েছিল, কেউ বা ঠ্যাঙাড়ের হাতে প্রাণ দিয়েছে, কেউ বা গলায় দড়ির মড়া। ঠিক সেই অবস্থায় উঠেছে -তেমনি কন্দকাটা কিংবা হাড়গোড় ভাঙা অবস্থায়। সকলেরই মুখে রাগ, চোখের দৃষ্টিতে আগুন। তারা সবাই আমার দিকে আঙুল তুলে শাসাতে লাগল, পাপিষ্ট, তুই এখানে কেন? শ্মশান অপবিত্র করতে এসেছিস। চলে যা, দূর হয়ে যা। জানিস না এখানে আমরা পাহারা দিচ্ছি? মনে পাপ নিয়ে তুই এসছিস শ্মশান জাগাতে। চলে যা - তার মধ্যে েএকজনের আবার শুধু কঙ্কাল, বোধহয় তাকে পুঁতে রেখেছিল কোথাও মেরে - তারপর তাকে তুলে পোড়াতে হয়েছে। - সেটাই সবচেয়ে কাছাকছি এল, মুখে সেই এক শব্দ, “দুর হ! দূর হ!” ভয় পেলুম খুব, তবু এও জানি একবার ভয় পেলেই গেল - চিরকালের মতো। প্রাণপণে চেঁচিয়ে উঠলুম, যাবো না, যাবো না। উঠব না আমি। ব্যাস - আর যায় কোথা, সেই কঙ্কলটা আরও এগিয়ে এসে তার সেই হাড়ের আঙ্গুল কটা দিয়ে আমার গলাটা চেপে ধরলো। ওঃ সে কি চাপ, যেন মোট লোহার সাঁড়াশী। কত চেষ্টা করলুম মুক্ত হবার, কিন্তু সে বজ্রকঠিন মুষ্টি খোলে কার সাধ্যে। দম বন্ধ হয়ে গেল, বুকে সে এক অসহ্য যন্ত্রণা - মনে হল যেন দেহের প্রতিটি শিরা ফেটে যাচ্ছে। - আকুলি বিকুলি করতে লাগলুম এক ফোঁটা হাওয়র জন্যে - সে হাওয়া চারিদিকেই রয়েছে তবু এক বিন্দু বুকের মধ্যে নিতে পারলুম না। বরং আরও চেপে বসতে লাগলো সেই সাঁড়াশীর মতো আঙ্গুলগুলো।
‘তারপর?’ রুদ্ধ নিঃশ্বাসে প্রশ্ন করে অনিমেষ।
‘তারপর?’ আবার সেই হাসি, ‘তারপর আর কি, মুক্তি। সেই থেকে ঘুরে বেড়াচ্ছি এখানেই। কাজ নেই কামাইও নেই। জায়গাটার মায়া ছাড়তে পারি নে। - সব চেয়ে কষ্ট হয়, কথা কইবার লোক নেই বলেই-’
‘- কি- কিন্তু’ - কথা কইতে গিয়েও একটা অজ্ঞাত আতঙ্কে অনিমেষের যেন গলা কেঁপে যায়, ‘আপনি মুক্তি পেলেন কি করে?’
‘তা আমিও জানি না। এক সময় দেখলুম যে, আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি আমারই ভূতপূর্ব আশ্রয় অর্থাৎ কিনা সেই দেহটার পাশে। যারা এসেছিল তাদেরও তো কাজ শেষ, তারাও সব যে-যার মিলিয়ে গেছে। এক কথায় সব কিছুর শান্তি।’
তবু বুঝতে কয়েক মিনিট দেরি লাগে অনিমেষের, কথা কইতে গিয়েও গলার স্বার বিকৃত হয়ে যা, ‘তার - তার মনে কি? আপনি কি বলতে চান যে আপনি তখন মা - মারা গেলেন? আ - আপনি কি মড়া?
প্রশ্নের শেষ অংশটা আকস্মিক আর্তনাদের মতো চিৎকারে পরিসমাপ্ত হয়। কিন্তু প্রশ্ন সে করছে কাকে? কেউ তো নেই। শুধু সে একা বসে আছে ঘরে, বাকী জিনিসগুলো ঠিক আছে, পিদিমটা তেমনি জ্বলছে। শুধু উবু হয়ে বসে যে লোকটা কথা বলছিল সে আর নেই-
কোথা দিয়ে গেল লোকটা, কখন উঠে গেল তার চোখের সামনে দিয়ে?
বার বার এই ব্যাকুল প্রশ্ন ওর মনে উঠতে লাগল কিন্তু উত্তর দেবে কে!
খানিক পরে আসল প্রশ্নটা আবার প্রবল হয়ে উঠল, তাহলে কি লোকটা যা বলে গেল তাই সত্যি, ও লোকটা মানুষ নয় - অশরীরী, বিদেহী আত্মা!
খাবার কিছু লাগে না ওর - বলেছিল বটে। মরবার ভয় নেই।
গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে অনিমেষের কিন্তু সে শিক্ষিত ছেলে, বিজ্ঞান-পড়া ছেলে। এসব মিথ্যা - কল্পনা, আত্ম-সম্মোহন বলেই জানে। সে বিশ্বাস করবে না এ কথা যে, এই বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বসে সে ভূত দেখছে।
আচ্ছা, পিছনে ছাড়া পড়েছিল কি ওর? মনে করবার চেষ্টা করে অনিমেষ।
সত্যিই কি -? না লোকটা তার সঙ্গে তামাশা করছে? আগে যা ভেবেছিল তাই? ডাকাত বা ঠাঙাড়ে জাতীয় - ভয় দেখিয়ে গেল, এর পর কাজ হাসিল করা সোজা হবে ভেবে?
মনকে প্রবোধ দেয় সে, এইটেও হওয়াই সম্ভব। ভূত হলে আলোয় থাকবে কি করে? - বদমাইশ। আরও বেশী ভয় দেখাবার জন্য ম্যাজিকওয়ালাদের মতো চোখের নিমেষে সরে গেছে।
দোরটা বন্ধ করে দেবে নাকি?
দেওয়াই উচিত।
পালাবে?
কোথায় যাবে এই অন্ধকারে! আরও তো ওদের কবলে গিয়েই পড়তে হবে। সে দেখতে পাবে না ওদের, ওরা দেখবে। তার চেয়ে দোর বন্ধ করে বসে থাকা মন্দ নয় - যা হবার হবে, আলো তো থাকবে এখানে। লোক-গুলোকে চোখে দেখা যাবে।
অনিমেষ অতি কষ্টে উঠে দাড়ালো। হাতে পায়ে যেন জোর নেই। কোন মতে উঠে গিয়ে সন্তর্পনে দোরটা বন্ধ করে দিল। ভাগ্যিস ভেতরে খিল আছে। বেশ মজবুত খিল। দেখে শুনে ভাল করে বন্ধ করল। যাক, নিশ্চিন্ত।
কিন্তু এ কী?
হঠাৎ আলোটা নিভে গেল যে! মুহুর্তের মধ্যে, কোন রকম নেটিশ না দিয়েই - ঘরটা, তার চার পাশ নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ভরে গেল। তেল ছিল না? কিন্তু তাহলে তো একটু একটু করে ম্লান হয়ে আসবে-
তবে - ভয়ে ওর গা-টা হিম হয়ে গেল - তবে কি ঘরের মধ্যে কেউ ছিল?
এখন ফু দিয়ে নিভিযে দিলে? সেই লোকটাই কি? হয়তো তক্তপোশের নিচে ঢুকে গিয়েছিল তখন, সেইখানেই লুকিয়ে ছিল, তাই সে ওর চলে যাওয়াটা লক্ষ্য করনি। নিশ্চয়ই তাই।
কী সর্বনাশ। এ যে হিতে বিপরীত হল। ওদের হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে একেবারে ওদের মুঠোর মধ্যেই এসে পড়ল। পকেটেতো দেশরাই পর্যন্ত নেই্ যতদূর মনে পড়ে ব্যাগেও নেই্ ব্যাগটাই বা কোথায়? চৌকিটা যে ঠিক কোনদিকে তাও তো মনে পড়ছে না!
উঃ কী বদমাইশ লোকটা!
ক্রদ্ধস্বরে, হয়ত বা একটু ভীত কন্ঠেই অনিমেষ বলে উঠল, ‘কে? কে ওখানে? আলো জ্বালো বলছি শীগগির, নইলে ভালো হবে না, দেখিয়ে দেব মজা। কি? জ্বাললে না?’
নিস্তব্ধ চারিদিকে। কোথাও একটা জনপ্রাণী আছে বলে মনে পড়ে না। রহস্যময় সুগভীর স্তব্ধতা।
ঘরে কি জানালা ছিল? তাও তো মনে পড়ছে না ছাই।
জানালা খুলে দিলে তবুও একটু নক্ষত্রের আলো আসে।
অনেক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকেও জানালা কোন দিকে মনে পড়লো না। আচ্ছা এগিয়ে গেলেই তো দেওয়াল, হাতড়ে দেখতে দোষ কি!
পরক্ষণেই আবার মনে পড়ল, আরে! আচ্ছা বোকা তো সে! দোরটাই তো রয়েছে, খুলে বেরিয়ে পড়লেই তো হয়। ঘরের অন্ধকারের চেয়ে বরং বাইরের অন্ধকার ভাল, তারার আলো আছে। ব্যাগটা? থাকগে, প্রাণ তো বাঁচুক।
যেদিকে দোর দিয়েছে এইমাত্র, সেই দিকেই হাত বাড়াল। কই সে দরজা? অথচ - তো সবে বন্ধ ক’রে এপাশ ফিরছে আর আলো নিভেছে।
তবে কি ও দিক ভূল করেছে? এদিকে দরজা ছিল না?
আন্দাজে আন্দাজে এগিয়ে যায় সে। এইটুকু তো ঘর, দেওয়াল পেলে, দেওয়াল হাতড়ে হাতড়ে ঘুরলেই দরজা পাবে। শুধু ভয় হচ্ছে, ও লোকটা না এই সুযোগে পেছন থেকে মেরে বসে! কিন্তু উপায়ই বা কি? এদের কবলে যখন এসে পড়েইছে-
মরীয়া হয়েই এগোয় অনিমেষ। এক পা এক পা ক’রে যতটা সম্ভব নিঃশব্দে এগোয়। - এক দুই - এ কি, এ যে কুড়ি পা হয়ে গেল। ঘরটা যত -দূর আন্দাজ হয় দশ বারো ফুটের বেশি হবে না লম্বায়। নেহাতই ছোট্ট ঘর। অথচ কুড়ি পা মানে অন্তত পনেরো ফুট।
আরও দু পা - আরও দশ - আরও কুড়ি।
এ কি সে মাঠে চলছে নাকি?
কী রকম হ’ল! চল্লিশ পা চলার মতো ঘর তো নয়। কোণাকুণি হাঁটছে? তাতেই বা এতদূর হবে কেমন ক’রে? তবু আরও কয়েক পা যায় সে। হয়ত চলতে চলতে কখন গতি বেঁকে গিয়েছে। সোজা হয়ে হাঁটে আরও খানিকটা।
না, তবু দেওয়াল নেই। রহস্যময়, অন্ধকার, অনন্ত শূন্যতা। বাইরের মুক্ত শূন্যতা নয়, চার দেওয়াল চাপা - তবু তা অনন্ত।
এইবার কপালে ঘাম দেখা দেয় অনিমেষের। এতক্ষণ ডাকাতের ভয়ে যা হয় নি এবার তাই হ’ল, পা দুটো কাঁপতে লাগল থর্ থর্ করে। - একেবারে যেন ভেঙে এল। অসহায় ভাবে সেইখানেই বসে পড়ল।
তার কী হ’ল। কী চক্রান্তে জড়িয় পড়ল সে?
তবে কি সে লোকটা অশরীরী - সত্যি-সত্যিই? সে কি তাহলে কোন প্রেতযোনির মায়াতে এসে পড়েছে?
বিহবল হয়ে ভাবে অনিমেষ কি করবে কিন্তু কোন পথ দেখতে পায় না। ঐ যে কারা আসছে না? হ্যাঁ, ঐ তো কত লোকের পায়ের আওয়াজ। অন্তত আট-দশজনের কম নয়। কিংবা আরও বেশি। এই বাড়ির কাছেই আসছে, ঐ তো দাওয়ায় উঠল।
‘ও মশাই শুনছেন? ও মশাই-’
গলা দিয়ে স্বর বেরোল না। টাকরা শুকিয়ে গিয়েছে! গলা কাঠ।
কিন্তু ওরাই যদি সেই ডাকাতের দল হয়? তা হোক, তবু তো তারা মানুষ। ভরসা হল একটু অনিমেষের। তাহ’লে অন্তত এটা প্রেতের মায়া নয়। অঃ- বাঁচা গেল।
হ্যাঁ - ডাকাতই।
নইলে ওরা অমন ফিসফিস করে কথা কইবে কেন? বহু লোক যেন পরস্পরের সঙ্গে ফিসফিস করে কথা কইছে। আরও লোক বাড়ছে। আরও বহু পায়ের শব্দ, অসংখ্য, অগণিত ফিসফিস করে কথা বলার আওয়াজ-
এ কি- ওরা কি ঘরে ঢুকছে নাকি?
কেমন ক’রে ঢুকল?
ওর যে চারিদিকে শব্দগুলো এগিয়ে আসছে। ওরই চার পাশে, খুব কাছে। খিলখিল ক’রে চাপা হাসির শব্দ - অনেকে হাসছে তবু শব্দটা খুব জোর নয়।
মাথা থেকে পা পর্যন্ত বরফ নেমে যায় যেন দেহের মধ্যে। হাত-পায়ে আর কোন সাড় থাকে না। আতঙ্ক যে এমন জিনিস তা আগে অনিমেষ কল্পনাও করে নি। মস্তিষ্কসুদ্ধ যেন নিষ্ক্রিয় হয়ে আসছে-
চিৎকার করবে? সাধ্য নেই। পালাবে? পথ কই?
কিন্তু কিছু তো একটা করা উচিত।
লোকগুলো যেন ওকে ঘিরে ধরেছে। তাদের নিঃশ্বাস, দূষিত তীব্র, উষ্ণ, নিঃশ্বাস ওর সর্বাঙ্গে-
মনে পড়ে গেল লোকটার বর্ণনা। সেও তো এমনি ফিসফিস শব্দ শুনে ছিল, এমন হাসি। তারপর? তারপর? সেই মৃতের পুনরুত্থান, সেই কঙ্কালের অভিযান।
তারও অদৃষ্টে কি তাই হবে? সে তো কোন দোষ করেনি। সে তো সাধনা করতে আসে নি শবের বুকের ওপর চড়ে?
অকস্মাৎ কে একজন হাঃ হাঃ ক’রে হেসে উঠল তারই আশেপাশে কোথাও। তীক্ষ্ণ চড়া গলার হাসি মনে হল যেন তার চার পাশের অন্ধকারকে বিদার্ণ করে ছড়িয়ে পড়তে চাইছে, আবার চারদিকের দেওয়ালে ধাক্কা থেয়ে ফিরে আসছে তারই চারদিকে। বহুক্ষণ ধরে যেন সেই এক হাসির শব্দ ধ্বনিত আর প্রতিধ্বনিত হতে লাগল তাকে ঘিরে। বিশ্রী, তীক্ষ্ণ একটা উপহাসের হাসি - সে হাসির জাল যেন তাকে চারদিক থেকে বেড়ে ধরেছে, আর নিস্তার নেই-
প্রাণপন চেষ্টায় মরীয়ার মতো চিৎকার ক’রে উঠল একবার অনিমেষ, ‘হে ভগবান, এ কী করলে!’
সত্যিই তো! ভগবানের কথা তার মনে ছিল না। তাঁকে তো সে ডাকে নি।
‘হে ভগবান, হে হরি, বাঁচাও - হে রামচন্দ্র!’ আর কিছু মনে এল না তার। গায়ত্রী মনে আছে কি? হ্যাঁ আছে। পৈতেটা কোথায়?-
সুগভীর ক্লান্তি আর অসহ তন্দ্রায় সমস্ত চৈতন্য শিথিল হয়ে আসে তার।
ঘুম যখন ভাঙল অনিমেষের, তখনও সকাল হয় নি কিন্তু ফরসা হয়েছে একটু। খানিকটা সময় লাগল তার সবটা মনে করতে, তারপর ধড়মড়িয়ে উঠে বসে ভাল করে চেয়ে দেখল যে, সে বাস দাঁড়াবারই ফাঁকা জায়গাটায় পড়ে ঘুমিয়েছে কখন - সুটকেসটা খানিকটা দূরে একটা গাছতলায় পড়ে আছে। - আরে - সে ঘর? সে ঘরটা কোথায় গেল? যতদূর দৃষ্টি যায় কোথাও কোন ঘরের চিহ্নমাত্রও তো নেই। সে কি বাস থেকে নেমে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিল? তাই হবে হয়ত। হয়ত সবটাই ওর স্বপ্ন।-
সে উঠে নদীতে গেল মুখ-হাত ধুতে।
‘না-না। রক্ষে করুন। কিচ্ছু ব্যস্ত হবেন না আমার জন্য। আশ্রয় পেয়েছি এই ঢের।’
‘ঐ আশ্রয়টুকুই যা। বাঘ ভাল্লুকের হাত থেকে তো বাঁচলেন অন্তত। - তা আশ্রয় ভালই। ঘরখানা মন্দ নয়, কী বলেন?’
বলতে বলতে হেসে ওঠে সে। সাদা ঝকঝকে দাঁত কালো দাড়ির ফাঁকে চকচক করে।
অনিমেষের যেন ভালো লাগে না ওর ভাবভঙ্গী। আবারও সেই সন্দেহটা মনে জাগে - পাগলের পাল্লায় এসে পড়ল নাকি?
‘আপনি এখানে কি করেন?’
‘আপাতত কিছুই না। আচ্ছা বসুন। আমি আসি। মুখহাত ধোবেন নাকি?’
ধুতে পারলে ভালই হ’ত কিন্তু অনিমেষের তখন নড়তে ইচ্ছে করছে না। সে বলল, ‘না-দরকার নেই।’
লোকটি বেরিয়ে গেল। অনিমেষ স্তব্ধ হয়ে বসেই রইল। ভালো বোধ হচ্ছে না ওর। কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। কী করে লোকটা এখানে, এমন একাই বা থাকে কেন? ঘরে কোন রকম কিছু খাবার নেই তো ও নিজে খায় কি? চোর ডাকাত নয় তো? লোকজনকে ভুলিয়ে এনে শেষে-
ঈশ্বর বাঁচিয়েছেন - ব্যাগে ওর খানকতক পুরনো কাপড় জামা ছাড়া আর কিছুই নেই। পকেটেও মাত্র টাকা-ছয়েক আছে। কিন্তু, একটু পরেই সমস্ত দেহ হিম হয়ে ওর মনে পড়ে - এই সব উদ্দেশ্যে যারা নিয়ে আসে ভুলিয়ে, টাকা না পেলে আরও হিংস্র হয়ে ওঠে। তা ছাড়া মেরে ফেলে তো দেখবে কী আছে না আছে। ওদের দেশে একবার খুব ডাকাতের উপদ্রব হয়েছিল, তারা একটা লোককে খুন করার পর পেয়েছিল, মাত্র একটি আধলা।
কখন গৃহস্বামী আবার নিঃশ্বব্দে ওর কাছে এসে দাঁড়িয়েছে অনিমেষ টেরও পায় নি। যদিও খোলা দরজার দিকে চেয়েই বসেছিল সে। আশ্চর্য!
লোকটি বলল, ‘এখনই শুয়ে পড়বেন নাকি? যদি ঘুম পেয়ে থাকে তো স্বতন্ত্র কথা। নইলে একটু বসি। কতদিন লোকের সঙ্গে কথা কইতে পাই নি। বলেন তো দুটো কথা কয়ে বাঁচি। - এখানে তেমন লোকজন তো নেই, আসেও না কেউ-’
অনিমেষ আবার পূর্বের প্রশ্নের জের টানল, ‘তা এমন জায়গায় আপনি থাকেনই বা কেন?’
সেই হাসি গৃহস্বামীর মুখে। তেমনি নিঃশব্দ হাসি, দাড়ির ফাঁকে শুভ্র দন্তের সেই বিজলী প্রকাশ!
‘ভয় নেই। আমি চোর ডাকাতও নই। ঘরে কিছু নেই মানে আমার কিছুর দরকার নেই। থাকারও দরকার হয় না আমার। কেন জানেন?’
তারপর - যেন কতকটা অসংলগ্ন ভাবেই বলে ওঠে, ‘আমি সাধক। তান্ত্রিক সন্ন্যাসী।’
‘সন্ন্যাসী?’ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে চায় অনেমেষ।
অগ্রতিভিত হয়ে লোকটি বলে, ‘না - সন্ন্যাসী মানে ঠিক অভিষিক্ত সন্ন্যাসী নই - তবে সাধক বটে।’
উবু হয়ে ঘরের মেঝেতেই বসল লোকটা, কিছুক্ষণ মৌনভাবে থেকে বলল, ‘তাহলে আপনাকে বলেই ফেলি সেটা। কাউকে কখনও বলি নি, বলবার সুযোগও পাই নি বিশেষ। এই অঞ্চলেরই লোক আমি, বুঝলেন? ছেলে - বেলা থেকেই নানা বইয়ে তান্ত্রিক সন্ন্যাসীদের অদ্ভুত সব ক্ষমতার কথা পড়ে ঐ দিকে মনটা ঝোঁকে। মনে হ’ত আমিও ঐসব সাধনা ক’রে সিদ্ধ হবো, তার - পর প্রাণ ভরে পৃথিবীর সব ঐশ্বর্য ভোগ করব - আর আমাকে পায় কে! হায় রে, তখন কি আর জানতুম যে ভোগের উদ্দেশ্যে সাধনা করতে এলে সিদ্ধি তো দূরের কথা সমস্তই খোয়াতে হয় একে একে।’
এই পর্যন্ত বলে লোকটি চুপ করল। এতক্ষণ অনিমেষও অনেকটা সহজ হয়েছে। লোকটির ভাবভঙ্গী আর কথাবার্তায় সত্য কথা বলছে বলেই মনে হয়। দুশ্চিন্তা অনেকখানি কমে গেল ওর।
‘বাড়ি আমার এ অঞ্চলে নয়। বাড়ি সেই পাঁচথুপির কাছে। এখানে কেন এলুম? বলছি দাঁড়ান। - বলেছি আপনাকে ছেলেবেলা থেকেই ঐ দিকে ঝোঁক গিয়েছিল। ইস্কুলের পড়া হ’ল না, তার বদলে যত সব ঐ ধরণের বই পড়তে লাগলুম। পড়তে পড়তে বিশ্বাসটা খুব পাকা হয়ে গেল। কিন্তু গুরু কই? দু-একটা সন্ন্যাসী যা হাতের কাছে পেলুম দেখলুম সব বাজে - কেউ কিছু জানে না। অথচ পথ দেখাবে এমন লোক না পেলে এগোব কি ক’রে? - মনটা বড়ই চঞ্চল হয়ে উঠল। খাবার চিন্তা ছিল না। মাথার উপর বাবা, বড় ভাই ছিল - জমিজমা তারাই দেখাশুনো করত। অবশ্য আমি বকুনিও খেয়েছি ঢের, কাজকর্ম কিছু করি না বলে, কিন্তু সেসব গায়ে মাখি নি।
‘তবে যত দিন যেতে লাগল মনটা ততই ব্যাকুল হয়ে উঠল। শেষমেষ আমার তেইশ-চব্বিশ বছর বয়সের সময়ে বাড়ি থেকে সামান্য কিছু টাকা নিয়ে বেরিয়ে পড়লুম। বেশ বুঝেছিলুম ঘরে বসে আর কিছু হবে না। - এ তীর্থ ও তীর্থ ক’রে অনেক দেশেই ঘুরলুম। ভাল চাকরি বা ভাল বিয়ে করার অনেক সুযোগও পেয়েছিলুম; সংসার -বুঝলেন মশাই, মায়ার ফাঁদ পেতে রেখে দেয় সারা জগতে - যাই হোক সেদিকে মন ছিল না বেল কেউ বাঁধতে পারল না। কিন্তু আসল যা উদ্দেশ্য তাও কিছু হ’ল না। - এমনি ভাবে যখন ক্রমশ হতাশ হয়ে উঠেছি তখন একদিন - বাড়ি ফেরার পথে বলতে গেলে বাড়ির কাছে হঠাৎ একজনকে পেয়ে গেলুম। বক্রেশ্বরের শ্মশানে এক সাধু থাকেন শুনলুম, উলঙ্গ থাকেন শ্মশানে শুয়ে, কেউ খেতে দিলে খান নইলে এমনি থাকেন। কাঁচা মাংস, পাতা লতা এমন কি বিষ্ঠা খেতেও তাঁর আপত্তি নেই বোধ হয় - এমন নিস্পৃহ তিনি।
‘খোঁজ ক’রে ক’রে গেলুম। প্রথম তো দেখাই পাওয়া যায় না। শেষে তিন দিন ধন্না দিয়ে পড়ে থাকতে দর্শন পেলুম। বিপুল দেহ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, পাগলের মতো ভাবভঙ্গী - কিন্তু পাগল নন। একদিন আমার চোখের সামনই দু’দিক থেকে দু’দল ভক্ত তাঁকে দর্শন করতে আসছে দেখে, আমার চোখের সামনে শিয়ালের দেহ ধরে বনের মধ্যে গিয়ে সেঁধুলেন, কেউ আর খুঁজেই পেল না। বুঝলুম এতদিন ধরে যাকে খুঁজছিলুম এতদিন পরে তাকে পেয়েছি।’
অনিমেষের মনেও ততক্ষণে গল্প জমে উঠেছে। লোকটি থামতেই সে বললে, ‘তারপর?’
‘লোক তো পেলুম - তাকে ধরি কী করে? কিছুতেই ধরা দেয় না। কিছু বলতে গেলে শ্মশানের পোড়া কাঠ তুলে তেড়ে আসে। একদিন খুব কান্না - কাটি করতে সব শুনলে মন দিয়ে, কিন্তু তারপর যা বকুনিটা দিলে, বললে, “ভাল চাস তো এসব মতলব ছাড়। সাধনা করবি তুই, ঐ ছটাক কাঁপা নিয়ে? তোর কাজ নয় - বুঝলি, মরবি একেবারে। তা ছাড়া ভোগ করবার জন্যে এসব কাজ যে করতে আসে তার একুল ওকুল দুকুল যায়। রামকৃষ্ণ পরমংসের গল্প পড়িস নি? মাকে বলেছিল মা অষ্ট সিদ্ধাই দে - হৃদে বলছে চাইতে। মা বললেন, কাল সকালে এর উত্তর পাবি। পরের দিন সকালে দোর খুলতেই নজরে পড়ল একটি মেয়েছেলে ঐ দিকে ফিরে শৌচ করতে বসেছে -পরমহংস অপ্রস্তুত হয়ে ফিরে এসে ভাগ্নেকে এই মারে তো এই মারে। বুঝলি - এমনি তুচ্ছ শুধু নয়, ছোট জিনিস ওসব। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যা - বিয়ে থা কর। নিজে নিজেই ভগবানকে ডাক, নয়তো কুলগুরুর কাছে দীক্ষা নিস।” অনেক কাকুতি - মিনতি করলুম, বাবার আর দয়া হ’ল না। আমি কিন্তু মশাই ছাড়লুম না। আমার তখন জেদ চেপে গেছে কি না। - ঐ খানেই পড়ে রইলুম, বলতে গেলে না খেয়েদেয়ে - আর গোপনে ওর দিকে নজর রাখলুম। যদি আসল প্রক্রিয়ার কিছু হদিস পাই - বুঝলেন না? এতদিন কি আর বৃথাই এই লাইনে ঘুরেছি। আসল মানুষ না পাই, ওদের ভেতরের কথা কিছু কিছু জেনেছি বৈকি!
‘তারপর হ’ল কি মশাই, আরও দু- একজন সাধক আর রৈবী ওখানে এল বাবার সঙ্গে দেখা করতে। গোপনেই এল কিন্তু আমি তো ঐখানেই পড়ে থাকি, আমাকে এড়াবে কি ক’রে? - পরপর কদিন ওদের চক্র বসল। তাও দেখলুম। - মনে হ’ল যে, আর কি, সব শিখে গেছি - ওখান থেকে রওনা হয়ে আর বাড়ি ফিরলুম না, নির্জন স্থান অথচ শ্মশান, লোকালয়ের কাছে এই রকম খুঁজতে খুঁজতে এসে পড়লুম। পথে নলহাটীতে একজন তান্ত্রিকের কাছে দীক্ষাও নিয়ে নিলুম।
‘ও মশাই, এলুম তো এখানে। কিন্তু সাধনা আর হয় না। প্র্রথম দিন থেকে বিঘ্ন। উপকরণ জোটে তো দিন পাই না, দিন পাই তো উপকরণ নেই, - শেষে অনেক কৌশল ক’রে অনেক নিচে নেমে যদি বা সব যোগাড় করলুম, মঙ্গলবার অমাবস্যার রাত পেয়ে যেমন আসন করে বসেছি - কী বিঘ্ন! ধ্যানে মন দেব কি, কিছুতে মনই স্থির করতে পারি না - এখন এটা বাসের রাস্তা হয়ে শ্মশান এখান থেকে সরে গেছে, আগে এখানটাতেই শ্মশান ছিল, এখন যেখানে ঘর দেখছেন, এই যেখানে আমরা বসে আছি, এইখানেই সেদিন আসন ক’রে বসেছিলুম-’
নিজের অজান্তেই অনিমেষ যেন একটু সরে বসে। তারপর বলে, ‘আচ্ছ বিঘ্ন কি রকমের? ভয় পেলেন? শুনেছি তো এ রকম সাধনায় বসলে প্রথম প্রথম নানা রকমের ভয় দেখায় - কিন্তু সেটা শুধুই পরীক্ষা করার জন্যে। আপনিও তে াসে রকম শুনেছিলেন নিশ্চই, তবে ভয় পেলেন কেন?’
হাসল লোকটা আবারও। কাউকে ছেলেমানুষি করতে দেখলে বিজ্ঞ মানুষেরা যেমন হাসে কতকটা তেমনি হাসি। বললে, ‘জানে তো সবাই কিন্ত শোনা এক জিনিসি আর অভিজ্ঞতাটা আর এক। তেমন অভিজ্ঞতা হ’লে বুঝতেন! - শুনবেন কেমন? - মড়ার বুকের ওপর বসেছি আসন করে, মড়ার খুলিতে করে মদ খাচ্ছি - মনে ভয়ডর কিছুই নেই, এই বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই লোকেরই বুকের মধ্যে হিম হয়ে গেল সে সব শুনে। না না, তেমন ভয়ানক কিছু নয়, প্রথ শুরু হ’ল শুধু ফিস্ ফিস্ কথার শব্দ, খিল-খিল হাসি, চাপা হাসিই। ক্রমে সেইটাই বাড়তে লাগল। মনে হ’ল দশজন, বিশজন, একশজন - হাজার হাজার। আপনার চার পাশে যদি লক্ষ লোকের ফিস ফিস কথারই শব্দ হতে থাকে তো কেমন হয়? আর তার সঙ্গে চাপা এক ধরণের হাসি। তবু আমি স্থির হয়ে আসনেই বসে রইলুম - নড়লুম না। যদিও কাজে আর মন দিতে পারলুম না, এটাও ঠিক।
‘তার পর মশাই - স্পষ্ট দেখতে লাগলুম শ্মশানের মাটি ফুঁড়ে ফুঁড়ে যেন মড়াগুলো উঠছে। কতকাল থেকে মরেছে সব - কত হাজার হাজার বছর ধরে। এক এক জনের বীভৎস চেহারা, রোগে, যন্ত্রণায় বিকৃত মুখ। কেউ বা খুন হয়েছিল, কেউ বা ঠ্যাঙাড়ের হাতে প্রাণ দিয়েছে, কেউ বা গলায় দড়ির মড়া। ঠিক সেই অবস্থায় উঠেছে -তেমনি কন্দকাটা কিংবা হাড়গোড় ভাঙা অবস্থায়। সকলেরই মুখে রাগ, চোখের দৃষ্টিতে আগুন। তারা সবাই আমার দিকে আঙুল তুলে শাসাতে লাগল, পাপিষ্ট, তুই এখানে কেন? শ্মশান অপবিত্র করতে এসেছিস। চলে যা, দূর হয়ে যা। জানিস না এখানে আমরা পাহারা দিচ্ছি? মনে পাপ নিয়ে তুই এসছিস শ্মশান জাগাতে। চলে যা - তার মধ্যে েএকজনের আবার শুধু কঙ্কাল, বোধহয় তাকে পুঁতে রেখেছিল কোথাও মেরে - তারপর তাকে তুলে পোড়াতে হয়েছে। - সেটাই সবচেয়ে কাছাকছি এল, মুখে সেই এক শব্দ, “দুর হ! দূর হ!” ভয় পেলুম খুব, তবু এও জানি একবার ভয় পেলেই গেল - চিরকালের মতো। প্রাণপণে চেঁচিয়ে উঠলুম, যাবো না, যাবো না। উঠব না আমি। ব্যাস - আর যায় কোথা, সেই কঙ্কলটা আরও এগিয়ে এসে তার সেই হাড়ের আঙ্গুল কটা দিয়ে আমার গলাটা চেপে ধরলো। ওঃ সে কি চাপ, যেন মোট লোহার সাঁড়াশী। কত চেষ্টা করলুম মুক্ত হবার, কিন্তু সে বজ্রকঠিন মুষ্টি খোলে কার সাধ্যে। দম বন্ধ হয়ে গেল, বুকে সে এক অসহ্য যন্ত্রণা - মনে হল যেন দেহের প্রতিটি শিরা ফেটে যাচ্ছে। - আকুলি বিকুলি করতে লাগলুম এক ফোঁটা হাওয়র জন্যে - সে হাওয়া চারিদিকেই রয়েছে তবু এক বিন্দু বুকের মধ্যে নিতে পারলুম না। বরং আরও চেপে বসতে লাগলো সেই সাঁড়াশীর মতো আঙ্গুলগুলো।
‘তারপর?’ রুদ্ধ নিঃশ্বাসে প্রশ্ন করে অনিমেষ।
‘তারপর?’ আবার সেই হাসি, ‘তারপর আর কি, মুক্তি। সেই থেকে ঘুরে বেড়াচ্ছি এখানেই। কাজ নেই কামাইও নেই। জায়গাটার মায়া ছাড়তে পারি নে। - সব চেয়ে কষ্ট হয়, কথা কইবার লোক নেই বলেই-’
‘- কি- কিন্তু’ - কথা কইতে গিয়েও একটা অজ্ঞাত আতঙ্কে অনিমেষের যেন গলা কেঁপে যায়, ‘আপনি মুক্তি পেলেন কি করে?’
‘তা আমিও জানি না। এক সময় দেখলুম যে, আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি আমারই ভূতপূর্ব আশ্রয় অর্থাৎ কিনা সেই দেহটার পাশে। যারা এসেছিল তাদেরও তো কাজ শেষ, তারাও সব যে-যার মিলিয়ে গেছে। এক কথায় সব কিছুর শান্তি।’
তবু বুঝতে কয়েক মিনিট দেরি লাগে অনিমেষের, কথা কইতে গিয়েও গলার স্বার বিকৃত হয়ে যা, ‘তার - তার মনে কি? আপনি কি বলতে চান যে আপনি তখন মা - মারা গেলেন? আ - আপনি কি মড়া?
প্রশ্নের শেষ অংশটা আকস্মিক আর্তনাদের মতো চিৎকারে পরিসমাপ্ত হয়। কিন্তু প্রশ্ন সে করছে কাকে? কেউ তো নেই। শুধু সে একা বসে আছে ঘরে, বাকী জিনিসগুলো ঠিক আছে, পিদিমটা তেমনি জ্বলছে। শুধু উবু হয়ে বসে যে লোকটা কথা বলছিল সে আর নেই-
কোথা দিয়ে গেল লোকটা, কখন উঠে গেল তার চোখের সামনে দিয়ে?
বার বার এই ব্যাকুল প্রশ্ন ওর মনে উঠতে লাগল কিন্তু উত্তর দেবে কে!
খানিক পরে আসল প্রশ্নটা আবার প্রবল হয়ে উঠল, তাহলে কি লোকটা যা বলে গেল তাই সত্যি, ও লোকটা মানুষ নয় - অশরীরী, বিদেহী আত্মা!
খাবার কিছু লাগে না ওর - বলেছিল বটে। মরবার ভয় নেই।
গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে অনিমেষের কিন্তু সে শিক্ষিত ছেলে, বিজ্ঞান-পড়া ছেলে। এসব মিথ্যা - কল্পনা, আত্ম-সম্মোহন বলেই জানে। সে বিশ্বাস করবে না এ কথা যে, এই বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বসে সে ভূত দেখছে।
আচ্ছা, পিছনে ছাড়া পড়েছিল কি ওর? মনে করবার চেষ্টা করে অনিমেষ।
সত্যিই কি -? না লোকটা তার সঙ্গে তামাশা করছে? আগে যা ভেবেছিল তাই? ডাকাত বা ঠাঙাড়ে জাতীয় - ভয় দেখিয়ে গেল, এর পর কাজ হাসিল করা সোজা হবে ভেবে?
মনকে প্রবোধ দেয় সে, এইটেও হওয়াই সম্ভব। ভূত হলে আলোয় থাকবে কি করে? - বদমাইশ। আরও বেশী ভয় দেখাবার জন্য ম্যাজিকওয়ালাদের মতো চোখের নিমেষে সরে গেছে।
দোরটা বন্ধ করে দেবে নাকি?
দেওয়াই উচিত।
পালাবে?
কোথায় যাবে এই অন্ধকারে! আরও তো ওদের কবলে গিয়েই পড়তে হবে। সে দেখতে পাবে না ওদের, ওরা দেখবে। তার চেয়ে দোর বন্ধ করে বসে থাকা মন্দ নয় - যা হবার হবে, আলো তো থাকবে এখানে। লোক-গুলোকে চোখে দেখা যাবে।
অনিমেষ অতি কষ্টে উঠে দাড়ালো। হাতে পায়ে যেন জোর নেই। কোন মতে উঠে গিয়ে সন্তর্পনে দোরটা বন্ধ করে দিল। ভাগ্যিস ভেতরে খিল আছে। বেশ মজবুত খিল। দেখে শুনে ভাল করে বন্ধ করল। যাক, নিশ্চিন্ত।
কিন্তু এ কী?
হঠাৎ আলোটা নিভে গেল যে! মুহুর্তের মধ্যে, কোন রকম নেটিশ না দিয়েই - ঘরটা, তার চার পাশ নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ভরে গেল। তেল ছিল না? কিন্তু তাহলে তো একটু একটু করে ম্লান হয়ে আসবে-
তবে - ভয়ে ওর গা-টা হিম হয়ে গেল - তবে কি ঘরের মধ্যে কেউ ছিল?
এখন ফু দিয়ে নিভিযে দিলে? সেই লোকটাই কি? হয়তো তক্তপোশের নিচে ঢুকে গিয়েছিল তখন, সেইখানেই লুকিয়ে ছিল, তাই সে ওর চলে যাওয়াটা লক্ষ্য করনি। নিশ্চয়ই তাই।
কী সর্বনাশ। এ যে হিতে বিপরীত হল। ওদের হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে একেবারে ওদের মুঠোর মধ্যেই এসে পড়ল। পকেটেতো দেশরাই পর্যন্ত নেই্ যতদূর মনে পড়ে ব্যাগেও নেই্ ব্যাগটাই বা কোথায়? চৌকিটা যে ঠিক কোনদিকে তাও তো মনে পড়ছে না!
উঃ কী বদমাইশ লোকটা!
ক্রদ্ধস্বরে, হয়ত বা একটু ভীত কন্ঠেই অনিমেষ বলে উঠল, ‘কে? কে ওখানে? আলো জ্বালো বলছি শীগগির, নইলে ভালো হবে না, দেখিয়ে দেব মজা। কি? জ্বাললে না?’
নিস্তব্ধ চারিদিকে। কোথাও একটা জনপ্রাণী আছে বলে মনে পড়ে না। রহস্যময় সুগভীর স্তব্ধতা।
ঘরে কি জানালা ছিল? তাও তো মনে পড়ছে না ছাই।
জানালা খুলে দিলে তবুও একটু নক্ষত্রের আলো আসে।
অনেক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকেও জানালা কোন দিকে মনে পড়লো না। আচ্ছা এগিয়ে গেলেই তো দেওয়াল, হাতড়ে দেখতে দোষ কি!
পরক্ষণেই আবার মনে পড়ল, আরে! আচ্ছা বোকা তো সে! দোরটাই তো রয়েছে, খুলে বেরিয়ে পড়লেই তো হয়। ঘরের অন্ধকারের চেয়ে বরং বাইরের অন্ধকার ভাল, তারার আলো আছে। ব্যাগটা? থাকগে, প্রাণ তো বাঁচুক।
যেদিকে দোর দিয়েছে এইমাত্র, সেই দিকেই হাত বাড়াল। কই সে দরজা? অথচ - তো সবে বন্ধ ক’রে এপাশ ফিরছে আর আলো নিভেছে।
তবে কি ও দিক ভূল করেছে? এদিকে দরজা ছিল না?
আন্দাজে আন্দাজে এগিয়ে যায় সে। এইটুকু তো ঘর, দেওয়াল পেলে, দেওয়াল হাতড়ে হাতড়ে ঘুরলেই দরজা পাবে। শুধু ভয় হচ্ছে, ও লোকটা না এই সুযোগে পেছন থেকে মেরে বসে! কিন্তু উপায়ই বা কি? এদের কবলে যখন এসে পড়েইছে-
মরীয়া হয়েই এগোয় অনিমেষ। এক পা এক পা ক’রে যতটা সম্ভব নিঃশব্দে এগোয়। - এক দুই - এ কি, এ যে কুড়ি পা হয়ে গেল। ঘরটা যত -দূর আন্দাজ হয় দশ বারো ফুটের বেশি হবে না লম্বায়। নেহাতই ছোট্ট ঘর। অথচ কুড়ি পা মানে অন্তত পনেরো ফুট।
আরও দু পা - আরও দশ - আরও কুড়ি।
এ কি সে মাঠে চলছে নাকি?
কী রকম হ’ল! চল্লিশ পা চলার মতো ঘর তো নয়। কোণাকুণি হাঁটছে? তাতেই বা এতদূর হবে কেমন ক’রে? তবু আরও কয়েক পা যায় সে। হয়ত চলতে চলতে কখন গতি বেঁকে গিয়েছে। সোজা হয়ে হাঁটে আরও খানিকটা।
না, তবু দেওয়াল নেই। রহস্যময়, অন্ধকার, অনন্ত শূন্যতা। বাইরের মুক্ত শূন্যতা নয়, চার দেওয়াল চাপা - তবু তা অনন্ত।
এইবার কপালে ঘাম দেখা দেয় অনিমেষের। এতক্ষণ ডাকাতের ভয়ে যা হয় নি এবার তাই হ’ল, পা দুটো কাঁপতে লাগল থর্ থর্ করে। - একেবারে যেন ভেঙে এল। অসহায় ভাবে সেইখানেই বসে পড়ল।
তার কী হ’ল। কী চক্রান্তে জড়িয় পড়ল সে?
তবে কি সে লোকটা অশরীরী - সত্যি-সত্যিই? সে কি তাহলে কোন প্রেতযোনির মায়াতে এসে পড়েছে?
বিহবল হয়ে ভাবে অনিমেষ কি করবে কিন্তু কোন পথ দেখতে পায় না। ঐ যে কারা আসছে না? হ্যাঁ, ঐ তো কত লোকের পায়ের আওয়াজ। অন্তত আট-দশজনের কম নয়। কিংবা আরও বেশি। এই বাড়ির কাছেই আসছে, ঐ তো দাওয়ায় উঠল।
‘ও মশাই শুনছেন? ও মশাই-’
গলা দিয়ে স্বর বেরোল না। টাকরা শুকিয়ে গিয়েছে! গলা কাঠ।
কিন্তু ওরাই যদি সেই ডাকাতের দল হয়? তা হোক, তবু তো তারা মানুষ। ভরসা হল একটু অনিমেষের। তাহ’লে অন্তত এটা প্রেতের মায়া নয়। অঃ- বাঁচা গেল।
হ্যাঁ - ডাকাতই।
নইলে ওরা অমন ফিসফিস করে কথা কইবে কেন? বহু লোক যেন পরস্পরের সঙ্গে ফিসফিস করে কথা কইছে। আরও লোক বাড়ছে। আরও বহু পায়ের শব্দ, অসংখ্য, অগণিত ফিসফিস করে কথা বলার আওয়াজ-
এ কি- ওরা কি ঘরে ঢুকছে নাকি?
কেমন ক’রে ঢুকল?
ওর যে চারিদিকে শব্দগুলো এগিয়ে আসছে। ওরই চার পাশে, খুব কাছে। খিলখিল ক’রে চাপা হাসির শব্দ - অনেকে হাসছে তবু শব্দটা খুব জোর নয়।
মাথা থেকে পা পর্যন্ত বরফ নেমে যায় যেন দেহের মধ্যে। হাত-পায়ে আর কোন সাড় থাকে না। আতঙ্ক যে এমন জিনিস তা আগে অনিমেষ কল্পনাও করে নি। মস্তিষ্কসুদ্ধ যেন নিষ্ক্রিয় হয়ে আসছে-
চিৎকার করবে? সাধ্য নেই। পালাবে? পথ কই?
কিন্তু কিছু তো একটা করা উচিত।
লোকগুলো যেন ওকে ঘিরে ধরেছে। তাদের নিঃশ্বাস, দূষিত তীব্র, উষ্ণ, নিঃশ্বাস ওর সর্বাঙ্গে-
মনে পড়ে গেল লোকটার বর্ণনা। সেও তো এমনি ফিসফিস শব্দ শুনে ছিল, এমন হাসি। তারপর? তারপর? সেই মৃতের পুনরুত্থান, সেই কঙ্কালের অভিযান।
তারও অদৃষ্টে কি তাই হবে? সে তো কোন দোষ করেনি। সে তো সাধনা করতে আসে নি শবের বুকের ওপর চড়ে?
অকস্মাৎ কে একজন হাঃ হাঃ ক’রে হেসে উঠল তারই আশেপাশে কোথাও। তীক্ষ্ণ চড়া গলার হাসি মনে হল যেন তার চার পাশের অন্ধকারকে বিদার্ণ করে ছড়িয়ে পড়তে চাইছে, আবার চারদিকের দেওয়ালে ধাক্কা থেয়ে ফিরে আসছে তারই চারদিকে। বহুক্ষণ ধরে যেন সেই এক হাসির শব্দ ধ্বনিত আর প্রতিধ্বনিত হতে লাগল তাকে ঘিরে। বিশ্রী, তীক্ষ্ণ একটা উপহাসের হাসি - সে হাসির জাল যেন তাকে চারদিক থেকে বেড়ে ধরেছে, আর নিস্তার নেই-
প্রাণপন চেষ্টায় মরীয়ার মতো চিৎকার ক’রে উঠল একবার অনিমেষ, ‘হে ভগবান, এ কী করলে!’
সত্যিই তো! ভগবানের কথা তার মনে ছিল না। তাঁকে তো সে ডাকে নি।
‘হে ভগবান, হে হরি, বাঁচাও - হে রামচন্দ্র!’ আর কিছু মনে এল না তার। গায়ত্রী মনে আছে কি? হ্যাঁ আছে। পৈতেটা কোথায়?-
সুগভীর ক্লান্তি আর অসহ তন্দ্রায় সমস্ত চৈতন্য শিথিল হয়ে আসে তার।
ঘুম যখন ভাঙল অনিমেষের, তখনও সকাল হয় নি কিন্তু ফরসা হয়েছে একটু। খানিকটা সময় লাগল তার সবটা মনে করতে, তারপর ধড়মড়িয়ে উঠে বসে ভাল করে চেয়ে দেখল যে, সে বাস দাঁড়াবারই ফাঁকা জায়গাটায় পড়ে ঘুমিয়েছে কখন - সুটকেসটা খানিকটা দূরে একটা গাছতলায় পড়ে আছে। - আরে - সে ঘর? সে ঘরটা কোথায় গেল? যতদূর দৃষ্টি যায় কোথাও কোন ঘরের চিহ্নমাত্রও তো নেই। সে কি বাস থেকে নেমে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিল? তাই হবে হয়ত। হয়ত সবটাই ওর স্বপ্ন।-
সে উঠে নদীতে গেল মুখ-হাত ধুতে।

আমার গ্রন্থাগারের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url