এ জন্মের পাওনা - গজেন্দ্র কুমার মিত্র
এ জন্মের পাওনা
ব্যাপারটা ঠিক কি ঘটল - জয়ন্ত ঘোষাল প্রথমটা বুঝতেই পারেনি। সামান্য জ্বর - গায়ে হাতে ব্যাথা, ইনফ্লুয়েঞ্জাই। শুধু বুকের ব্যাথাটার জন্যেই ডাক্তার ডাকতে হয়েছিল। ডাঃ সেনগুপ্ত বাড় ডাক্তার - ইনফ্লুয়েঞ্জায় তাঁকে কেউ ডাকে না। কিন্তু জয়ন্ত ঘোষালও তো নেহাত কেউকেটা কেউ নন, তাঁর জীবনের দাম আছে। তিনি সেনগুপ্তকেই ডেকেছিলেন। ডাক্তার এসে - ছিলেন হাসতে হাসতে - মশা মারতে কামান - দাগা নিয়ে রসিকতাও করেছিলেন দু-েএকটা - কিন্তু বুকে চোঙা বসাবার পর একটু গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন। মিনিট পাঁচেক ধরে পরীক্ষা করে বলেছিলেন -‘বুকে একটি প্যাচ বসেছে দেখছি। সামান্যিই অবশ্য, তবু পেনিসিলিন দেওয়াই ভাল। পেনিসিলিন নিয়েছিলেন কখনও এর আগে? রিয়্যাকশন হয় না তো?’
‘কিছু না, কিছু না। বহুবার নিয়েছি।’ জবাব দিয়েছিলেন জয়ন্ত ঘোষাল।
‘তাহলে আমি দিয়েই যাই, ব্যাগে আছে। কাল আর একটা দিলেই হবে। আনিয়ে রাখবেন।’
তারপর ধীরে সুস্থে সিরিঞ্জ খুলে ইনজেকশনের তোড়জোড় করছিলেন। জয়ন্ত ঘোষাল আদৌ সেদিকে তাকান নি। তিনি তখন তাঁর সেক্রেটারী সুরেশকে কতগুলি চিঠির উত্তর বলে দিচ্ছিলেন। চিঠিগুলো না লিখলেই নয় - তাছাড়া একটা চেক সই করতে হবে; আগামী কাল বা পরশু যেসব এনগেজমেন্ট করা আছে, সেগুলো চিঠি লিখেই হোক আর ফোন করেই হো - নাকচ করতে হবে; হয়ত তার পরের দিন সুস্থ হয়ে উঠবেন, না ওঠেন তো সে অন্য ব্যবস্থা; কর্পোরেশনে একটা জরুরী দরকার আছে, সেখানে সুরেশের নিজের যাওয়া দরকার - এমনি সব খুচরো নির্দেশ দিচ্ছিলেন তাকে। এর্ মধ্যে ডাক্তার হাতটা টেনে য়্যালকোহলে-ভিজে তুলো দিয়ে মুছতে শুরু করেছিলেন, সেটা ঐ সুরাসরের ঠান্ডা স্পর্শে টের পেয়েছিলেন তিনি। তবুও তাকান নি। তারপর ছুঁচটা বিঁধল, ছুঁচটা টেনে নিয়ে ডাক্তার সেই জায়গাটা একটু ডলে দিলেন তুলো দিয়েই - সেই সময়টা শুধু একবার ডাক্তারের মুখের দিকে চেয়েছিলেন। নিশ্চিত, প্রসন্ন দৃষ্টি। একটু বা ধন্যবাদজ্ঞাপকও হয়ত।
তারপরই সব যেন গোলমাল হয়ে গেল।
আকস্মাৎ বুকটায় যেন একটা তীব্র ব্যাথা অনুভব করলেন - না, ডান কি বাঁ তা বুঝতে পারেন নি অত - সঙ্গে সঙ্গে সারা শরীরেই কেমন একটা অজানা যন্ত্রণা - মনে হল পৃথিবীতে বাতাস বড় কম - যেন নিঃশ্বাস নিতে পারছেন ান। কী একটা বলতে গেলেন - দেখলেন ওর মুখের দিকে চেয়ে ডাক্তারের মুখও বিবর্ণ হয়ে উঠেছে, পাগলের মতো হাতড়াচ্ছেন নিজের ব্যাগটায় - তারপর হঠাৎ বড় শান্তি। সব যেন মিলিয়ে গেল চোখের সামনে থেকে - বোধ করি ঘুমিয়েই পড়লেন। তাতেও বিস্ময়ের কিছু নেই। অমন হয়। আর একবার তাঁর পেটে কলিক পেন ধরেছিল - অনেক্ষণ পরে যখন ব্যাথাটা ছাড়ল - বেশ মনে আছে - এক মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তিনি।
না, এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। এ কান্ডটা শুরু হয়েছে এই এখন , ঘুমের ভাবটা, তন্দ্রাটা কেটে যাবার পর।
এই কান্ডকারখানাটাই ঠিক বুঝতে পারছেন না।
একটা বিরাট গোলমাল হয়েছে কোথায়। কিন্তু সে কি তাঁর মাথাতেই? না কি সবটাই স্বপ্ন দেখছেন তিনি? স্বপ্নে এসব সম্ভব - কিন্তু এত পরিষ্কার কি স্বপ্ন হয়?
তিনি দেখছেন - অথচ তাঁরই দেহটা সামনে পড়ে। স্ত্রী আছড়ে পড়ে কাঁদছেন খাটের পাশে। বড় ছেলে বিজয় উদভ্রান্তের মতো বসে ব্যাকুলভাবে চেয়ে আছে তাঁর মুখের দিকে - অর্থাৎ তাঁর ঐ আর - একটা - দেহের মুখের দিকে - ঐ যে দেহটা খাটে শুয়ে আছে তাঁর। বিজয় এলই বা কেন এখন! সে তো অফিস গিয়েছিল - আলিপুরে। ছটার আগে তো আসবার কথা নয় ওর। সবচেয়ে ডাঃ সেনগুপ্তের এ কী হল! চিন্তিত বিবর্ণ মুখে বসে, এত হাওয়াতেও মুখখানা ঘামে ভেসে যাচ্ছে, দামী কড়া-স্ত্রী করা কলার ভিজে ন্যাতা হয়ে উঠেছে। ওর এমন চেহারা তো কখনও দেখা যায় নি। এযন বড্ড ভয় পেয়ে গেছেন। এ কী-আরও তিন-চারজন ডাক্তার এল যেন। এদের তো তিনি চেনেনও না। কে এরা? আরে - ওরা যে ঐ দেহটাইকেই দেখছে। নানারকমে পরীক্ষা করছে। ওদের মুখ বড় গম্ভীর যে! শুকনো মুখে ঘাড় নাড়ছে। কী সব বলাবলি করছে ডাক্তার সেনগুপ্তের সঙ্গে কাডিয়াক য়্যারেষ্ট”, “ইনস্ট্যান্টেনিয়াস ডেথ”। ‘করোনারী য়্যাটাক হয়েছিল নাকি এর আগে কখনও? একজন প্রশ্ন করলেন বিজয়কে।এরই মধ্যে কে একজন বলে উঠলেন, ‘না না - পেনিসিলিন শক। এ রকম হয়।’
ওহো-
এবার হঠাৎ একটা কুটিল সংশয় দেখা দিল জয়ন্ত ঘোষালের মনে।
তবে কি - তবে কি এটা স্বপ্ন নয়? এটা কি তিনি জেগেই দেখছেন?
নিজের চোখেই দেখছেন - নিজেকেই?
মানে - মানে তিনি কি মরে গিয়েছেন?-
চিৎকার করে প্রশ্ন করতে চাইলেন, জানতে চাইলেন। আকুলভাবে বিজয়কে ডাকতে গেলেন।
কিন্তু না তিনি বুঝি আর কোনদিনই তাঁর কন্ঠস্বর কাউকে শোনাতে পারবেন না।
মনে হচ্ছে তিনি মরেই গিয়েছেন। নইলে এমন কেন হবে! নইলে ওর দিকে ওরা ফিরেও তাকাচ্ছে না কেন? ঐ দেহটা নিয়েই সবাই ব্যস্ত।
এ ‘শকটাও বড় কম নয়, এই অনুভূতি ও উপলব্ধির শকটা। পেনিসিলিন শকের চেয়েও অনেক বেশী। আর একবার মরা সম্ভব হলে তিনি মরেই যেতেন। কিন্তু হৃৎপিন্ডটা তাঁর দেহেই পড়ে আছে - শক-এ যেটার ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর এ অশরীরী দেহে বায়ুভূতো-নিরালম্ব অবস্থায় হৃৎপিন্ড থাকা বা তার কাজ বন্ধ হওয়া সম্ভব নয়।
উপলব্ধির প্রথম আঘাতটা কাটতেই সমস্ত অন্তর ওর হায় হায় করে উঠল।
যে সব কাজ হল না, পড়ে রইল; যে সব নির্দেশ দেওয়া হল না বিষয় - সম্পত্তির, যে সব ব্যবস্থা করে আসা হল না - সেই সবের জন্যই তাঁর এই আকুলতা, এই হাহাকার।
জয়ন্ত ঘোষাল বিখ্যাত ব্যবহারজীবী, বিখ্যাত দেশকর্মী, বিখ্যাত জননেতা। জেল খাটেনি বটে কখনও - তবে চিরকালই কংগ্রেসের দিকে ছিলেন। দু’মাস জেল খেতে আর কতটুকু করতে পারতেন, তার চেয়ে ঢের বেশী করেছেন টাকা দিয়ে বুদ্ধি নিয়ে পরামর্শ দিয়ে - সরকারী মহলের সঙ্গে যোগসুত্র বজায় রেখে। উনিশ শ’ বিয়াল্লিশের হাঙ্গামার সময় মুঠো মুঠো টাকা খরচ করেছেন নেতাদের পরিবারের জন্য। জেলে থাকলে কি করতে পারতেন? নেতাজীর পালাবার সময়ও তিনি আর সুরেশ বাবুই তো সব টাকাটা যোগাড় করে দিয়েছিলেন।
তা কংগ্রেস যে বিশ্বস্ততার নিমক রেখেছে। আজ তিনি বিধানসভার সভ্য, বহু সরকারী কমিটির সঙ্গে যুক্ত - মন্ত্রিত্বও একটা ইচ্ছা করলেই নিতে পারতেন - শুধু সে মাইনেতে তাঁর সংসার চলবে না বলেই নেন নি।
মন্ত্রিত্ব আর ওকালতি তো একসঙ্গে করা যাবে না। সেই কারণেই তাঁর পার্লিমেন্টেও যাওয়া হয় নি।
তা না হোক। তার জন্যে তিনি দুঃখিত নন। দেশ ও দশের সেবা করা মানুষ মাত্রেরই কর্তব্য, যে যেভাবে পারে। এ যে সেই সেবারই নানান কাজ চাপা পড়ে রইল - তার সঙ্গে নিজেরও অবশ্য - সেইটেই বড় দুঃখ। উইলটা করা উচিত ছিল, করি-করি করেও হয়ে ওঠে নি। বর্তমান আইনে মেয়েরাও সম্পত্তির অধিকারী। এই বাড়িটা তাঁর চার মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে ভাগ হয় - তা তিনি চান না। বিশেষ করে মেজ মেয়ে রেখার শ্বশুরটা মহা বদমােইশ ও জাঁহাবাজ লো। মেয়েরা যাতে বসতবাড়িটার ভাগ না পায় - এইচে করে যাবেন বারবারই মনে ছিল। কিন্তু-
কিছুই হল না।
আসলে ঘটে উঠল না। এমন যে হবে - এমন আকস্মাৎ সেইটেই তো ভাবতে পারেনি একবারও। সময়াভাব অবশ্য যথেষ্টই ছিল কিন্তু সে তো তাঁর সঙ্গের সাথী। ওরই মধ্যে সময় করে যখন সবই করেছেন তখন এটাও করা চলত। হয়ে উঠল না - সেটা নিতান্তই ওর দূরদৃষ্ট আর দূরদৃষ্টির অভাব।
তবে - জয়ন্ত ঘোষালের অনেক গুণ, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় গুণ হল তাঁর অসাধারণ সহজ ও সাধারণ বুদ্ধি - তিনি তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমান - তাই একটু পরেই হাহাকার ও আকুলতার প্রাথমিক তীব্রতাটা কাটিয়ে উঠলেন। মনকে বোঝালেন যে, যতদিনই তিনি বাঁচতেন না কেন, আরও পঁচিশ বছর বাঁচলেও - হাতের কাজ তাঁর কমত না’ কখনই তিনি সব কাজ সেরে, সব গুছিয়ে যেতে পারতেন ন। মিছিমিছি তার জন্যে মন খারাপ করে কোন লাভ নেই। আর বিষয়-সম্পত্তি - তিনিই যখন রইলেন না, তখন যে খুশি নিক - তাঁর কি? তাছাড়া তাঁর মনে পড়ল - বসত বাড়িটা ঠিক তিনি উইল করতে পারতেনও না, কারণ ওর জমিটা কেনা হয়েছিল তাঁর স্ত্রীর নামে।
সুতরাং - যাগগে।
জয়ন্ত ঘোষাল কথঞ্চিৎ সুস্থ হয়ে তাঁর দিকে অর্থৎ ঐ প্রাণহীন দেহটার দিকে মন দিলেন।
এ ব্যাটারটা মন্দ নয় কিন্তু। মরে তিনি সবাইকে দেখছেন, তাঁকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না। এটা তাঁর অনেক দিনের শখ, তিনি গত জ্যৈষ্ঠ মাসেও পুরীতে গিয়ে জগন্নাথকে জানিয়ে এসেছেন - কে যেন তাঁকে বলেছিল জগন্নাথ খুব জাগ্রত ঠাকুর, স্থানে দাঁড়িয়ে মনোবাঞ্ছা জানালে তা পূরণ হয়ই - যে, মরবার পর যদি আত্মা থাকে তো সে আত্মার যেন এই মনটাও থাকে। এই মন নিয়ে যেন তিনি জগৎটাকে দেখতে পারেন, সকলের আসল চেহারাটা দেখতে পান।
আশ্চর্য তো - আজ ভাবতে খুব অবাক লাগছে, - এত জিনিস তাকতে এমন বেয়াড়া প্রার্থনাই বা তিনি জানতে গেলেন কেন! মরবার কথাটাই বা তাঁর মাথাতে গেল কি’করে। ষাট বছর বয়স হয়েছিল বটে কিন্তু যে রকম সুস্থ সবল ছিলেন - মৃত্যুর কথা চিন্তা করাটা খুব স্বাভাবিক ছিল না সেদিন। তবে কি একেই লোকে intuition বলে, ষষ্ঠ অনুভূতি?
অবশ্য এটা তিনি অনেকদিন, অনেকবার ভেবেছেন। এই যে এতো লোক তাঁকে সমীহ করে চলে, তোষামোদ করে - স্নেহ-প্রেম-প্রীতি দেখায় - এ কী তাদের মনের কথা? এ কী সত্য?
সেইটেই জানতে চেয়েছেন শুধু।
কিন্তু কোনদিন ভাবতে পারেন নি যে, সত্যি সত্যিই এ সুযোগ আসবে। মৃত্যুর পরও তাঁর এই পার্থিব অনুভূতি থাকবে।
ঈশ্বর যে সে সুযোগ দিয়েছেন - এর জন্যে তিনি ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ।
আঃ, বিজয়টা অমন ছেলেমানুষের মতো কান্ড করছে কেন? তুই বড় ছেলে, পঁয়ত্রিশ বছর বয়স হতে চলল - তুই কোথায় বাকী সকলকে দেখবি, তা নয় তুই-ই এমন মেয়েছেলের মতো ডুকরে-ডুকরে কাঁদতে শুরু করলি! এসব এখন করবে কে তাহলে!
এই যে তাঁর বড় মেয়ে নন্দাও এসে গেছে। চোখ-মুখ বসে গেছে বেচারার। কী চেহারা হয়েছে। এই তো আজ সকালেও দেখেছিলেন ওকে। কই তখন তো এমন দেখেন নি। আর রেখাটা - এতে ওর শরীর খারাপ, তার ওপর যদি এমন করে মেঝেতে মাথা ঠোকে তো বাঁচবে কি করে। এতগুলো লোক রয়েছে, কেউ কি থামাতে পারছে না! কী বিপদ! এটাও কি এখন তাঁকে বলে দিতে হবে। বলবার যে উপায়ও নেই ছাই! আর বুলুটার কান্ড দেখেছ! তাঁর - মানে তাঁর দেহটার পায়ে মুখ ঘষছে কী করে! ওর কপালের সিঁদুরের ফোঁটায় আর চোখের জলে তাঁর পা লাল হয়ে গেল যে!
দেখতে দেখতে তার মনটা টনটন করে উঠল। ওদের ব্যাথায় তো বটেই - সেই সঙ্গে নিজেরও ব্যাথায়। এমন স্নেহের সংসার তাঁকে ছেড়ে চলে আসতে হল - এ কি কম আপসোস!
কিন্তু দুঃখ বা ব্যাথা যতই হোক - একটা অনির্বচনীয় তৃপ্তিও বোধ করছেন তিনি - তাতে কোন সন্দেহ নেই। কী ভয়ই ছিল মনে মনে! বহু বই পড়েছেন - এই ধরণের বহু কাহিনী। কিছু কিছু নিজের জীবনেও দেখেছেন বৈকি - এত ব্যস্ত জীবনে কম লোকের সংস্পর্শে আসেন নি তো! দেখেছেন যে সমস্ত সম্পর্কই একটা বিরাট স্বার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত। জীবিতকালে কত মিষ্টি কথাই বলে আত্মীয়-স্বজনরা, কত আত্মীয়তা দেখায়। কিন্তু মরার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মুখোশ খুলে যায়। এই তো, তাঁর ছোট মামাশ্বশুরের কাণ্ডটা তো চোখেই দেখা। বুড়ো দাদাশ্বশুরের মরবার সময় ভীমরতি হয়েছিল - যত রাজ্যের শেয়ার আর কোম্পানির কাগজ বেচে সব টাকা এনে রেখেছিলেন লোহার সিন্দুকে। ছোট ছেলে শেষের দিকে প্রাণ দিয়ে বাপের সেবা করেছিল - সবাই ধন্যি ধন্যি, কিন্তু মরবার সময় কোন ছেলের জল পেলেন না বুড়ো মানুষ। শ্বাস উঠতেই বাবার কষ্ট হচ্ছে এই অছিলায় সবাইকে বার করে দিয়ে দোর দিলে ছোটমামা। কিন্তু সে বাপের সেবা করার জন্য নয়। কারণ দোর খুলে সবাইকে যখন ডাকল সে - তার অনেক আগেই বুড়ো চোখ বুজেছে। গঙ্গাজল তখনও ঠাকুরঘরে। অন্য ছেলেরা এবং স্ত্রী ঘরে ঢুকেই আগে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন চাবির জন্য। সে চাবি কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। তাই নিয়ে কী গোলমাল, অশান্তি এবং নোংরামি! পরস্পরের প্রতি দোষারোপ এবং কটুকাটব্য। পরের দিন চাবিটা বেরোল ঠাকুরঘর থেকে। তখন লোহার সিন্দুক খুলে দেখা গেল তেত্রিশটি টাকা মাত্র পড়ে আছে তাতে। সবাই জানত মাথার বালিশেল নিচে সিন্দুকের চাবি না থাকলে বুড়োর ঘুম হত না। সেদিন সকালেও দিদিমা দেখেছেন সে চাবি। ঠাকুরঘরে এলই বা কোথা থেকে, আর টাকাগুলোই বা গেল কোথায়?
প্রকাশ্য অভিযোগের অভাব হল না। কালি উজোড় হয়ে পড়ল ছোটমামার ঘাড়ে। অপরাধটাও স্পষ্ট। কিন্তু প্রমাণ হল না কিছুতেই। ফলে ছোটমামার অবস্থাই সবচেয়ে শাঁসালো। বড় ও মেজমামা ফ্যা ফ্যা করে বেড়াচ্ছেন।
অতদূর যাবারই বা দরকার কি। পদ্মলোচন সরকাল ক্রোড়পতি - এ কে না জানে আর কে না জানতো! মেয়ে - জামাই থাকতেও ভদ্রলোক ভাগ্নেটিকে বুকে করে মানুষ করেছিলেন - ব্যবসা-বাণিজ্য, শেয়ার মার্কেটের কাজ, বলতে গেলে হাতে ধরে সব শিখিয়েছিলেন। ইদানীং নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল সে। বার বার বলতেন পদ্মলোচন - ‘মেয়েজামাই নিজেদের টাকা যেভাবে রাখত তার চেয়ে অনেক ভালভাবে রাখবে আর খাটাবে আমার প্রমথ!’ সেই প্রমথ কী বেইমানিটাই না করল! মরবার পর দেখা গেল পদ্মলোচনের কিছু নেই - সব টাকাই প্রমথ মজুমদারের নামে। জীবনের শেষ আট মাস প্রমথই মামার ঘরে শুত - সারাদিন পাশে বসে থাকত। সবাই ধন্য ধন্য করেছিল তখন। আসলে পদ্মলোচনের মাথার যন্ত্রণা কমাবার জন্যে সাংঘাতিক ওষুধ দেওয়া হত - তারই নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকতেন পদ্মলোচন। সেই সুযোগে ইচ্ছামতো কাগজপত্রে, দলিলে, শেয়ারস্ক্রিপ্টে সই করিয়ে নিয়েছে প্রমথ। পদ্মলোচনের জামাই বুড়ো বয়সে একটা স্যানিটারী ওয়ারস্ এর দোকান দিয়েছে বৌবাজারে - স্রেফ পেটের দায়ে।
জয়ন্ত ঘোষাল অত কিছুই করেনি ছেলেমেয়ের জন্য। করবার সময়ও ছিল না তাঁর। সাধারণভাবেই মানুষ হয়েছে তারা। তবে হ্যাঁ, অর্থব্যায়, তা তাঁর যতটুকু সাধ্য করেছেন - এটা ঠিক। মাস্টার ছিল সকলের জন্যেই। নিয়মিত কাপড়-জামা-জুতো সরকার মশাই কিনে দিয়েছেন-আমোদ-প্রমোদ খেলাধুলোর জন্যেও যখন যা দরকার যোগাতে কথনও আপত্তি করেন নি তিনি। কিন্তু নিজে কোন কিছুই দেখতে পারতেন না। পারলে কি আর বুলুটা ঐ কাণ্ড করে বসে! শেষকালে কিনা ঐ একটা লোফার গানের মাষ্টারকে বিয়ে করল! অবশ্য তিনি বাধা দেন নি। কেলেঙ্কারীর ভয়েই কতকটা। এ ধরণের কেচ্ছা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পক্ষে পড় মারাত্মক। তার চেয়ে যেটা সোজা সেইটেই করেছেন - তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে একটা চলনসই চাকরিতে বসিয়ে দিয়েছেন। বুলুর নামে ছোট্ট একটা বাড়িও করে দিযেছেন শহরতলীতে। তারপর তার ভাগ্য।
তা হোক। তবু ওদের এতটা শোক তিনি আশা করেন নি। বিশেষতঃ স্ত্রীর কাছ থেকে। অবশ্য তার মাছ খাওয়া এবং গয়না পরা ঘুচল বটে কিন্তু তার জন্যে কি এতটা শোক হয়? মুহর্মুহুঃ ফিট হচ্ছে বেচারীর। এখন তো ওকে নিয়েই ডাক্তাররা বিব্রত। কতদিন যে তাঁর সঙ্গে দুটো কথাও কইতে পায় নি! ইদানীং দেখাই হত কালে-ভাদ্রে। বহু রাত অবধি বাইরের ঘরে বসে কাজ করতে হয় বলে বাইরের ঘরের সঙ্গে লাগোয়া একটা শোবার ঘর ব্যবস্থা করে নিয়েছিলেন। রাত দুটো-তিনটেয় উঠে গিয়ে সেখানে পড়তেন - সকালে সেইখানে চাকর চা দিয়ে আসত। জলখাবার চা সব পৌছত সেখানে। দুপুরে বা রাত্রে বেশির ভাগ দিনই বাইরে বাইরে খেতে হত - দৈবাৎ যেদিন বাড়িতে থেতেন, সেদিনও এত অসময়ে খেতে আসতেন যে, স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়াই সম্ভব ছিল না। ওর নিজস্ব চাকর জগনই তদারক করত, গরম জলে বসিয়ে রাখা টিফিন ক্যারিয়ার খুলে থালা-বাটিতে সাজিয়ে দিত। রাত্রের খাবার নিচের ঘরে সাজানো চাপা দেওয়া থাকত প্রত্যহ, খেতেন তো খেতেন, নইলে পরের দিন সকালে চাকরবাকররা খেয়ে নিত। সুতরাং স্ত্রীর সঙ্গে দেখা সাক্ষাতের সুযোগই ঘটত না। তবুও যে, সে তাঁকে এত ভালবাসত, এত ভালবাসা যে সম্ভব কোন উপেক্ষিতা প্রায় - বিস্মৃতা স্ত্রীর পক্ষে - তা তিনি কখও কল্পনাও করেন নি।
আজ বড় অনুতাপ হচ্ছে, বড়ই দুঃখ বোধ করছেন ওর জন্যে। সময় থাকতে যদি একটু মনযোগ দিতেন! যদি একটু ফিরে তাকাতেন!-
জোর করে অন্যদিকে মনটা সরিয়ে আনলেন জয়ন্ত ঘোষাল। ব্যাথায় টনটন করে উঠছে বুকটা অন্তরটা। এখন তো তাঁর বুক বলে কিছু নেই, দেহই নেই তার বুক - এখন সবটাই এই মন। এই মনটাই আত্মা নাকি? কে জানে!-
বিস্তর ফুল এসে পৌছেছে। রাশি রাশি ফুল। সংবাদটা এতক্ষণে ছড়িয়ে পড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী, এমন কি স্বয়ং লাটসাহেবরাও রাদ পাঠিয়েছেন। কোন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বা ক্লাব বাদ যায় নি। ব্যক্তিগতভাবেও বিস্তর মালা, বাঞ্চ, তোড়া এসে পৌঁচচ্ছে। ওধারের ঘরটা ভরে গেছে ফুলে ফুলে। কলকাতার বাজারে বোধহয় ফুল আর রইল না।
নিরতিশয় তৃপ্তির সঙ্গে মনে মনে হিসেব করে দেখলেন জয়ন্ত ঘোষাল - অন্ততঃ পাঁচশ টাকার ফুল তাঁর উদ্দেশ্যে কেনা হয়েছে, এই গত দু ঘন্টায়।
বহু লোকও আসছে। বড় রাস্তায় গাড়ি রাখার জায়গা নেই। তাঁর বাড়ির সামনেকার এই অপেক্ষাকৃত অপরিসর পথটা তো লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে। আহা, তাঁর খুড়শাশুড়ী বুড়ো মানুষ - আসতেই পারছেন না ভিড় ঠেলে। পাড়ার ছেলেগুলো যথাসাধ্য ভলান্টিয়ারী করছে বটে কিন্তু এ ভিড়ে তারা কী করবে?
কে যেন - হ্যাঁ তাঁরই তো ভগ্নীপতি রমেশবাবু - একখানা বোম্বাই খাট কিনে নিয়ে এলেন। বেশ দামী খাট বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু দামটা দিলে কে? কই, বিজয়ের কাছে থেকে তো কেউ চায় নি। রমেশবাবু নিজেই দিলেন নাকি? না জামাইরা কেউ? যে-ই দিয়ে থাক, বিবেচনা আছে মানতেই হবে। শোকার্ত স্ত্রী-পুত্রের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যে নবাবী করেনি, এর জন্যে তিনি মনে মনে সাধুবাদ দিচ্ছেন তাকে।
কিন্তু আর না। এখনই যে দৃশ্যের অবতারণা হবে তা জয়ন্ত খুব জানেন। ঐ দেহটা তাঁর পালঙ্কের শয্যা থেকে তুলে বোম্বাই খাটে নিয়ে যাবার সময় আরও আছাড়ি-পিছাড়ি করবে তাঁর ছেলেমেয়েরা, তাঁর স্ত্রী। এমনিতেই ওদের যা অবস্থা, দাঁড়িয়ে দেখা যায় না। রেখার কপালটা ঢিপি হয়ে ফুলে উঠেছে, এবার হয়ত রক্তারক্তি হবে। সে দিক দিয়ে বুলুর অবস্থায় ভাল। এসেই যে চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে. এখনও জ্ঞানই হয় নি। কেউ কেউ মাথায় জল দিয়ে বাতাস করছে অবশ্য, কিন্তু কী লাভ? অজ্ঞান হয়ে থাকাই ভাল। বুলুর বেশী লাগবে তা তিনি জানেন। ইতিমধ্যেই রোমান্সের রস মরে এসেছে ওর মনে। স্বামীর অপদার্থতা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। তিনি যে ওদের জন্যে কতখানি করেছেন তাও বুঝছে। তিনি বেঁচে থাকলে তবু কতকটা ভরসা ছিল। সেটুকুও গেল।
জয়ন্ত ঘোষালের বিদেহী সত্তা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে। নিজের অফিস ঘরে ঢুকে অতি প্রিয় ও অতি পরিচিত চেয়ারখানিতে আশ্রয় নেয়। এখানে ওরা আসবে না। হাহাকারের শব্দটাও অত স্পষ্ট আঘাত করবে না। কতকটা নিশ্চিন্ত।
অবশ্য শেষ পর্যন্ত দেহের সঙ্গে শ্মশান অবধি না গিয়ে পারেন নি জয়ন্ত ঘোষাল। কৌতুহল - হ্যাঁ, কৌতুহল তো বটেই সেই সঙ্গে দেহের প্রতি একটা সহজাত আকর্ষণও তাঁকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। আর সেই সহজ মমতাতেই আগুনটা জলবার সময় কষ্টও পেয়েছেন খুব। দেহের অনুভূতি নেই, স্নায়ুর তো বালাই-ই নেই, তবু যেন মনে হয়েছিল ঐ সুবিপুল ও সুবিস্তৃত সুগন্ধি বহ্নিশিখার (চন্দকাঠ ধুপধুনো কিছুরই অভাব ঘটে নি - বলা বাহুল্য) দহজজ্বালা তিনি সেই দেহের প্রতিটি স্নায়ু দিয়ে অনুভব করেছেন। একেই বোধহয় মায়া বলে। মহামায়ার মায়া দেহান্তের পরও রেহাই দেয় না মানুষকে, যতক্ষণ মন ততক্ষণ মায়া থাকে।
তবে সেই কষ্টটা কমে আসবার সঙ্গে সঙ্গে - অর্থাৎ চিতায় জল দেওয়ার পর থেকেই আবার সেই তৃপ্তির ভাবটা ফিরে এসেছে। To make the best of it - ইংরেজী মহাকাব্যের অনুসরণে মন্দের ভালটুকু বেছে নিয়েছেন তিনি। তাঁর আর বিশেষ ক্ষোভ নেই। মরার ফলে অনেক হারিয়েছেন তিনি এটা ঠিক, কিন্তু পেলেনও তো বড় কম নয়। জীবিত থাকতে এত শ্রদ্ধা প্রীতি-ভালবাসা কল্পনাই করতে পারেন নি - এমন কি যেটুকু দেখেছেন সেটুকুও বাহ্যিক মূল্যে গ্রহণ করতে পারেন নি। একটু সন্দেহ একটু ব্যঙ্গের ভাব বরাবরই ছিল। তিনি বুদ্ধিমান, বুদ্ধিজীবী, মানুষ চরিয়ে খান-সুতরাং এসব সম্বন্ধে কোন ভ্রান্ত ধারণাও যেমন নেই - মোহও নেই। মানুষের সবটাই মৌখিক, স্বার্থের সম্পর্ক, এটা মেনেই নিয়েছিলেন। আজ মৃত্যুর পর এদের যে পরিচয় তিনি পেলেন তা একেবারেই অপ্রত্যাশিত, অভাবনীয়। আর অপ্রত্যাশিত বলেই এত মধুর, অভাবনীয় বলেই এত উত্তেজক। -
শ্রাদ্ধশান্তি পর্যন্ত এই মাধুর্যের আবেশে ডুবে রইলেন জয়ন্ত ঘোষাল। না, কোথাও কোন ছন্দপতন হয় নি, লাগে নি কোন রূঢ আঘাত। কারুর আচরণে কোথাও এতটুকু ত্রুটি ঘটে নি। ছেলে-মেয়ে-স্ত্রী-পুত্রবধু- সকলের শোকই আন্তরিক, সকলের আঘাতই মর্মান্তিক। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সামাজিক ক্ষেতে যাদের সঙ্গে কাজ করেছেন - এমন কি যাদের সঙ্গে মধ্যে মধ্যে বেশ একটু মতবিরোধও ঘটেছে, তারাও সত্যকার গভীর দুঃখ প্রকাশ করচে তাঁর জন্যে। খবরের কাগজে বেশ ফলাও করে শোকবার্তা সাজানো হয়েছে। অধিকাংশ কাগজেই তিন কলাম হেডলাই ছিল - অন্ততঃ দুই কলামের কম কেউ দেয় নি। শোক সংবাদ আর তার সঙ্গে ডাক্তার এবং এন্টিবায়োটিক চিকিৎসার ওপর তীব্র আক্রমণ। বড় ডাক্তার বলে সেনগুপ্ত অব্যাহতি পেলেন না। অধিকাংশ কাগজেই পরোক্ষে এই মৃত্যুর জন্য ডাঃ সেনগুপ্তকে দায়ী করা হল। কেউ কেউ চিঠি দিলেন - কেন একে হত্যাকান্ড বলা হবে না প্রশ্ন করে। লোকসভায়, বিধান পরিষদে প্রশ্ন উঠল। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য - মন্ত্রী পেনিসিলিনের খালি য়্যাম্পুলটি পরীক্ষা কারার আদেশ দিলেন। যে ডাক্তারখানা থেকে ওটি কেনা - তাদের পর্যন্ত দিনকতক থানা-পুলিশের হামলা সইতে হল। এক কথায় তাঁর মৃত্যু নিয়ে চাঞ্চল্য ও আলোড়নের শেষ রইল না - সমস্ত জাতি যে তাঁর এই আকস্মিক তিরোধানে শুধু ক্ষুব্ধই নয় - ক্রদ্ধও হয়ে উঠেছে, তার প্রমাণ প্রত্যহই সংবাদপত্রে রাশি রাশি প্রকাশিত হতে লাগল।
এদিকে শ্রাদ্ধশান্তিও যতদূর সম্ভব ঘটা করেই হল। মেয়েরা প্রত্যেকে তাদের চতুর্থী শ্রাদ্ধে একটি করে ষোড়শ দিল। ছেলেরা বৃষোৎসর্গের আয়োজন করল। এটা এমন কি তাঁরও বাড়াবাড়ি বলে মনে হল। সোজাসুজি ষোড়শ দান দিলেই হত। তোদের কি এমন অবস্থা যে তোরা এতটা করতে গেলি। আসলে চারিদিকে এত হৈ চৈ পড়তে দেখে ওদের মনেও তাঁর আসন একটু উঁচুতে চলে গেলে, দাম বেড়ে গেছে। এখন ওদেরও মনে হচ্ছে যে তাদের বাবা একজন অসাধারণ ব্যক্তি ছিলেন, আর অসাধারণ পিতার শ্রাদ্ধ বেশ একটু সমারোহের সঙ্গেই করা দরকার, নইলে সম্মান রক্ষা হয় না।
ওদের নির্বুদ্ধিতায় হাসি পেল জয়ন্ত ঘেষালের। তবু তিনি খুশীও না হয়ে পারলেন না।
এখন তাঁর মনে হচ্ছে যে তাঁর মূল্য একমাত্র তিনিই বোধ হয় বরাবর একটু কম করে ধরেছেন। আসলে যতটা তিনি করছেন বলে ধরণা করেছিলেন, তার চেয়ে ঢের বেশী করেছেন দেশ ও দশের জন্যে। বিনয় থাকা ভাল, তবে সত্যের থেকে কমিয়ে ধরাও কিছু নয়। ঠিক মূল্যটির ধারণা থাকলে জীবিতকালেও প্রতিষ্ঠাটা উপভোগ করতে পারতেন।
শোকসভা হল অনেকগুলি। একটা তো স্বয়ং শেরিফই ডেকে বসলেন। ছোটখাটো সভা প্রায় পাড়াতেই হতে লাগল। একই সময় একাধিক সভা হওয়ার ফলে সবগুলোতে তিনি যেতেও পারলেন না। তা না পারুন, মোটামুটি তিনি বুঝে নিয়েছেন কে কী বলবে আর শোক-প্রস্তাবে কি লেখা হবে। বড় সভাতে তাঁর স্মৃতিরক্ষার জন্যে যে কমিটি হয়েছে তাতে ইতিমধ্যেই নাকি হাজার টাকার ওপর চাঁদা উঠেছে। এখন তাঁর ভয় হচ্ছে- বিজয়টা যা বোাক - হয়ত সেও একটা মোটা টাকা দিয়ে বসবে। এসব কমিটি তিনি অনেক দেখেছেন, তা আঁচালে বিশ্বাস নেই। স্মৃতিরক্ষা কমিটির পুরো হিসেব পাওয়া এদেশে প্রায় অবিশ্বাস্য ঘটনা। স্মৃতিরক্ষাটাও হয়ে ওঠে না অনেক সময়।
সে যা হোক, মন ভরে গেছে তার। তিনি তৃপ্ত।
আর কি চায় মানুষ? মানুষ যে পাওনা ইহজন্মে কল্পনাও করতে পারে না, তিনি সে জীবনের সীমানা পেরিয়ে এসেও দু হাত ভরে পেয়েছেন তাই।
না, তাঁর আর কোন ক্ষোভ নেই, দুঃখ নেই। মৃত্যুর জন্যেও কোন আপসোস নেই। ছোটখাটো অসুবিধা একটু-আধটু তো হবেই - কিন্তু সে ক্ষতির চেয়ে লাভের দিকটা তাঁর অনেক ভারী হয়ে গেছে। জগন্নাথ যে স্থানে-থেকে-কানে-শুনেছেন - এই অপরূপ অভিজ্ঞতা যে উপলব্ধি করার সুযোগ দিয়েছেন - এর জন্যে তিনি প্রত্যহই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জগন্নাথের কাছে।
কিন্তু শাদ্ধশান্তির নিয়মভঙ্গ ইত্যাদি চুকে যাবার পর প্রথম একটু বেসুরো লাগল, এই একটানা তৃপ্তির সংগীতে। দিনরাত যে রেশটায় তিনি মশগুল হয়ে ছিলেন তা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে হতে এক সময় মনের দিগন্তে মিলিয়ে যাবার উপক্রম হল।
মেয়েরা যে যার শ্বশুরবাড়ি ফিরে গেছে। যাবার আগে প্রকাশ্য ভাগ-বাটোয়ারার কথা কেউই তোলে নি - শোকার্ত মর সামনে সে কথা তোলা শোভন হবে না সবাই জানে - শুধু আকারে ইঙ্গিতে দাদাকে প্রস্তুত থাকবার কথা জানিয়ে গেছে। তারা দাবি করুক - তাদের শ্বশুরবাড়ি ছাড়বে কেন?
অবশ্য এতে দোষের কথা কিছুই নেই। যা স্বাভাবিক যা সঙ্গত তাই তারা করেছে। বরং করেছে অনেক সন্তর্পনে। বিষয়ের কথা নিয়ে জয়ন্ত ঘোষাল অত ব্যস্ত নন। এর চেয়ে ঢের বেশী কুৎসিত চেহারা তিনি দেখেছেন সংসারের নগ্ন স্বার্থের। তাঁর ছেলেমেয়েরা সে তুলনায় সোনার চাঁদ।
কিন্তু মেয়েরা চলে যাবার পরই সংসারটা কেমন যেন নিস্তরঙ্গ হয়ে উঠল, উত্তেজনাহীন - সেইটেই খারাপ লাগল জয়ন্ত ঘোষালের। ইহলোকের সমস্ত রকম সম্ভোগ তাঁর উঠে গেছে চিরকালের মতো - তাঁর খাদ্য পানীয় তাঁর প্রাণ-ধারনের উপায় বলতে শুধু একটু উত্তেজনা। তা তাই যদি না থাকে তো তিনি বাঁচেন কী করে? মানে তাঁর এই অনুভূতিময় সত্তা বাঁচে কি করে?
না, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাভক্তি বিশ্বস্ততার কোন অভাব নেই। তাঁর অফিসঘর আর তার পাশের বাড়তি শোবার ঘরটি - ঘরের অত্যন্ত অকুলান স্বত্ত্বেও বিজয় কাউকে দখল দেয় নি, কোন রকম ভিন্ন ব্যবস্থা হতে দেয় নি, ঠিক তেমনিই সাজিয়ে রেখেছে, তাঁর জীবিতকালে যেমন থাকত। তাঁর নিজস্ব চাকর জগন যেমন প্রত্যহ সকাল বিকেল ঝাড়ামোছা করত আগেও - তেমনিই করে যায় দু বেলা। হঠাৎ দেখলে মনে হবে বুঝি তিনি এখনও বেঁচে আছেন এবং এখনই এসে বসবেন সেখানে।
এ ছাড়াও - তাঁর যে সব দানধ্যান মাসিক সাহায্য ইত্যাদি ছিল তাও - অন্ততঃ এ মাসে বজায় রেখেছে বিজয় ঠিক ঠিক মতো। এর চেয়ে বেশী আর সে কিই বা করতে পারে? তাকেও রোজগার করে খেতে হবে- শোকে ডুবে থাকার বিলাস তার সাজে না। সেই এখন বাড়ির কর্তা, চার চালের ভার তার মাথায়। তাছাড়া তারও স্ত্রী পুত্র আছে। -
তবু যতই বোঝান মনকে, আর মন ছাড়া কিই বা আছে তাঁর এখন, মন যেন কেমন একটা অব্যক্ত অবয়বহীন ক্ষোভ অনুভব করে। ছেলে দিন দিনই তার কাজ কর্তব্য - তার সংসারে ডুবে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে একদিন বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সিনেমাতেও গিয়েছিল - কী একটা হাসির ছবি দেখতে। ফিরে এসে বৌমাকে বলছিল, তাই মুনতে পেলেন জয়ন্ত ঘোষাল। বলছিল, ‘ওরা টানাটানি করলে, মনটাও খারাপ - তাই চলে গেলাম। মন্দ নয় ছবিটা, আর কিছু না হোক - অনেকদিন পরে খুব খানিকটা হাসা গেল!’
বৌমা বললেন, ‘বেশ তো স্বার্থপর লোক তুমি! এই এক মাস দেড়মাস আমাদের ওপর দিয়ে কী ঝড়টা গেল বলো দিকি! আমদের বুঝি আর হাসতে ইচ্ছে করে না!
অপ্রতিভ বিজয় বলে, ‘হবে হবে। দু - একটা দিন যাক না - মা’র কথাটা ভেবেই আরও আমি তোমাকে কোথাও নিয়ে যাচ্ছি না।’
‘যাও যাও! মা’র কথা ভেবে নিজের আটকায় না! যত ভাবনা আমাদের বেলা!’
সেখান থেকে আস্তে আস্তে সরে আসে জয়ন্ত ঘোষালের বিদেহী সত্তা। অস্বাভাবিক নয়, অসঙ্গত নয়। এমন একটা কিছু হৃদয়হীনতার পরিচয়ও দেয় নি বিজয়। তবু -
ছোট ছেলে সঞ্জয় গত সপ্তাহ থেকেই সিনেমা ও ফুটবলের মাঠে যেতে শুরু করেছে, কিন্তু তাতে তাঁর অতটা ক্ষোভ হয় নি। ছেলেমানুষ, কলেজে পড়ছে - সবে ফাস্ট ইয়ার, ওর কাছ থেকে এর চেয়ে বেশী কিছু বা অন্যরকম কিছু আশা করেনি। কিন্তু বিজয়ের সম্বন্ধে আর একটু -। মানে হয়ত সেটা অন্যায়, তবে বিজয়ই তার ব্যবহারে অতটা বেশী আশা জাগিয়েছে তাঁর মনে।
সেখান থেকে সরে জয়ন্ত ঘোষাল স্ত্রীর শয়নঘরে, তাঁদের শয়নঘরে গিয়ে দাঁড়ান।]
শীর্ণ মলিন হয়ে গিয়েছে বেচারী। কেমন যেন শ্রীহীন। তবু তো মেয়েরা একেবারেই থান পরতে দেয় নি। চুঙ্গপাড় ধুতি আর হাতেও একগাছা করে চুড়ির ব্যবস্থা বজায় রেখেছে।
কাছে গিয়ে দাড়ালেন জয়ন্ত ঘোষাল।
শুয়ে শুয়ে বই পড়ছেন স্ত্রী। কী একখানা মোটা বই। না কোন ধর্মপুস্তক নয়, বিজয় এনে দিয়েছে একটা ভ্রমণ-কাহিনী। বেশ মনোযোগ দিয়েই পড়ছেন বইখানা। অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি পাশে। হয়ত আশা করেছিলেন - মনের কোন সদুর প্রত্যন্ত দেশে যে - বইতে বেশীক্ষণ মন বসবে না, হয়ত এখনই ওখানা ঠেলে সরিয়ে রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন, কিংবা বইখানা মুড়ে রেখে অন্যমনস্কভাবে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে থাকবেন অথবা দুই চোখের প্রান্ত বেয়ে নামবে দু ফোঁটা অশ্রু - এতদিন যা ক্ষণে ক্ষণেই অজস্রধারে পড়েছে।
এসব কিছুই হল না। নিবিষ্টচিত্তেই পড়ে যেতে লাগলেন - যতক্ষণ না প্রায় রাত এগারোটা নাগাদ, বামুন-মেয়ে এসে গলাখাঁকারি দিয়ে দোরের কাছে দাঁড়ালেন, ততক্ষণে একবারও মুখ তুললেন না উনি।
এখন তাড়াতাড়ি বইটা মুড়ে উঠে বসে বললেন, ‘কী গো বামুন-মেয়ে?’
‘এবার তাহলে আপনার খাবার আনি মা!?’
‘ওদের সব খাওয়া হয়ে গেছে? ছেলেদের? বিজু বৌমা - ওরা?’
‘সব। ওসব পাট চুকিয়ে উনুন পেড়ে তবে তো এখন আপনার খাবার তৈরী করলুম।’
‘তবে দাও।’
গৃহিণীই এতকাল দাঁড়িয়ে থেকে তদ্বির করতেন সকলের খাওয়ার সময়। এখন আর তিনি নামেন না। বিজয়ই নামতে দেয় না। অবকাশ দিয়েছে তাঁকে।
ঝি এসে আসন পেতে ঠাঁই করে দিয়ে গেল। বামুন ঠাকরুন খাবরের থালা নিয়ে এলেন। খান আষ্টেক লুচি, দু-তিন রকম ভাজা, আলুছেঁচ্ কি, কী একটা মিষ্টি - এক বাটি ঘন দুধ।
গৃহিণী দুধ দেখিয়ে আপত্তি করলেন আজও।
‘আমায় কোন দুধ দাও বামুন-মেয়ে! আমি কি কচি খুকী?’
‘কিছুই তো পড়ছে না পেটে, মাছ না মাংস না। একটু দুধ না খেলে বাঁচবেন কী করে মা?’
‘আরও কি আমার বাঁচার দরকার আচে বামুন-মেয়ে? আর কেন? কী সুখভোগের জন্য বাঁচব?’
বলতে বলতে কন্ঠস্বর গাঢ় হয়ে আসে গৃহিনীর।
‘বালাই ষাট। ছেলেমেয়েগুলো আছে, তাদের মুখ চেয়েই যে বাঁচতে হবে মা। বিজু আমায় বার বার বলে দিয়েছে - মাছটাছ যখন থেতেন তখন একরম ছিল - এখন যেন দুধ না বাদ যায় কোনদিন। আর কারুর দুধ হোক না হোক - মা’র দুধ ঠিক করে রাখবে!’
বিষাদে বিকৃত মুখ সগর্ব হাসিতে বিস্ফরিত হয়ে উঠল; সস্নেহ স্নিগ্ধ কন্ঠে গৃহিণী বললেন, ‘ও একটা আস্ত পাগল বামুন-মেয়ে। ওর কথা শুনতে গেলে সংসার চলে না। ও ভেবেছে চিরকাল ওর মাকে ও বাঁচিয়ে রাখবে!’
বললেন কিন্তু দুধের বাটি ঠেলেও রাখলেন না। বরং লুচির পালা শেষ করে বেশ তৃপ্তির সঙ্গেই সেই ক্ষীরের মত ঘন দুধটি খেয়ে উঠলেন।
জয়ন্ত ঘোষাল সেখানেও আর দাঁড়াতে পারলেন না। স্ত্রী তাঁর জন্যে আজও শোকার্ত, তাঁর অভাবে জীবনের কোন অর্থই আর নেই ওর - একথা যতই বার বার বোঝাতে চেষ্টা করলেন স্ত্রীর প্রথম কথাটার সূত্র ধরে, ততই মনে মনে একটা আশাভঙ্গের বেদনা অনুভব করতে লাগলেন তিনি। তাবে কি স্ত্রী ঐ দুধটা ঠেলে রেখে, লুচগুলোও না খেয়ে অভুক্ত উঠে পড়লে খুশী হতেন জয়ন্ত ঘোষাল?
না, না - সে নিতান্ত স্বার্থপরের মত কথা হল! অত স্বার্থপর তিনি নন। তবু -
তবু যে ঠিক কি চান তিনি, কী ঘটলে খুশী হতেন, তাও নিজের মনকে ভাল বোঝাতে পারেন না।
আরও মাসখানেক অনেক পরিবর্তন লক্ষ করলেন জয়ন্ত বাবু।
বিজয় ভগ্নীপতিদের ডেকে, মামা ও শ্বশুরকে মধ্যস্থ করে, একটা আপস করে ফেলেছে। তাদের কিছু কিছু নগদ টাকা দিয়ে এই বাড়ি এবং ভাড়াটে বাড়িখানা, দুটোই বাঁচিয়েছে। অন্য অন্য বিষয়কর্মেরও সুব্যবস্থাই করেছে। যতটা ছেলেমানুষ এবং কাঁচা ভাবতেন ওকে, ততটা যে সে আদৌ নয় - তা নিঃসংশভাবে প্রমাণ করে দিয়েছে সে।
তারপর?
তারপর সংসার পূর্ববৎই চলছে। দুটো ঝি চাকর কমানো হয়েছে শুধু। আর কিছুই করতে হয় নি। বিজয় যা মাইনে পায় আর ওবাড়ির ভাড়া- তাতেই চলে যাচ্ছে সংসার। কিছু টাকা এখনও আছে হাতে - ওর মা’র নামে লিখে - দেওয়া একটা মোটা টাকার লাইফ ইনসিওরেন্স ছিল, বিজয় প্রস্তাব করেছে যে, সেই টাকায় মা’র নামে একটা বাড়ি কিনে দিবে, মা’র যাতে নিজের খরচের জন্যে কোনদিন ছেলেদের মুখাপেক্ষী না হতে হয়। এ প্রস্তাবে সকলেই খুশী হয়েছে, ধন্য ধন্য করেছে বিজয়কে। বিজয়ের মা’ও খুশী হয়েছেন। হয়ত একটু নিশ্চিন্তও হয়েছেন।
কিন্তু যত এদিকে সুবন্দোবস্ত হচ্ছে তত যেন মনের মধ্যে একটা অসন্তোষ ও বিক্ষোভ অনুভব করছেন জয়ন্ত ঘোষাল। তবে কি তিনি এদের দুর্দশাই চেয়েছিলেন? মাঝে মাঝে এ আত্মজিজ্ঞাসাও করেন - বৈকি জয়ন্ত। না, না - ছিঃ! নিজেই শিউরে ওঠেন আবার এ কথাটা ভেবে।
তবু-।
তবু - সংসার বেশ চলছে তাঁকে বাদ দিয়েও। দাসী চাকর সরকার মশাই, যথানির্দিষ্ট নিয়মে কাজ করে যাচ্ছে। স্ত্রী, দুই পূত্র, পূত্রবধু, নাতি-নাতনী, কন্যারা - করুরই কিছু আটকাচ্ছে না। অভাবও নেই তেমন - তাই হাহাকার বা দুঃখও আর নেই। যথানিয়মেই নেই। তাই বলে কি তাঁর স্মৃতির প্রতি বিন্দুমাত্র অবিচার করেছে ওরা? তাও তো নয়। আজও নিচের ঘর দুটি তেমনি সাজানো আছে, তেমনি প্রত্যহ চাবি খুলে জগন ঝাড়ামোছা করে। রবিবার রবিবার বিজয় নিজে এসে দাঁড়ায় সে সময়ে। কেবল স্ত্রীই আসেন না কোনদিন, কিন্তু সে তো পুরাতন স্মৃতি জাগ্রত হয়ে দুঃ”খের কারণ হবে বলেই আসেন না।
স্ত্রী তীর্থে যাবেন ঠিক হয়েছে। বড় বোনের সঙ্গে যাবেন। স্ত্রীর নিজের হাতেই বেশ কিছু টাকা আছে, সেই ভরসাতেই যাচ্ছেন। ছেলেদের দিতে হবে না এক পয়সাও। তাই কারও কোন আপত্তিই নেই। বিজয় একটু ক্ষীণ আপত্তি তুলেছিল, বৌমা সেটুকু তুলতে দেয়নি। বুঝিয়ে বলেছে, ‘তুমি বুঝছ না। দিনকতক ঘুরে এলে ভালই হবে, মনে শান্তিই পাবেন। সেই থেকে এই কটা দেওয়ালের মধ্যে আটকে আছেন, সেই সব স্মৃতি চারদিকে - তার থেকে দুদিন বাইরে গেলে উপকারই হবে!’
এমনিতেও স্ত্রী বেশ সামলে নিয়েছেন। আগের মতোই সকালে ভাড়ারে এসে বসেন। কুটানো কুটে দেন মাঝে মধ্য্ েনাতিনাতনীদের স্নানাহারের তদ্বির করেন। ছেলেদের খাওয়ান সামনে বসিয়ে। এক কথায় পুরাতন নিয়ম ও অভ্যাসে ফিরে এসেছেন অনেকখানিই।
না - কারুরই কিছু আটকে নেই।
বন্ধুবান্ধব - যাঁদের তাঁকে না হলে, তাঁর পরামর্শ উপদেশ না হলে একদম চলত না - তাঁরাও তাঁকে বাদ দিয়েই বেশ মানিয়ে নিয়েছেন নিজেদের জীবন ও কর্মক্ষেত্র। যে রাজনৈতিক দলের তিনি ছিলেন স্তম্ভবিশেষ - সেখানেও তাঁর স্থান পূর্ণ হয়ে গেছে। এখন কথা প্রসঙ্গে কখনও কখনও নামটা ওঠে, এক-আধবার হয়তো দুঃখ প্রকাশও করেন কেউ কেউ - ঐ পর্যন্তই। আর হয়ত সেই সময়ই তাঁর স্মৃতিরক্ষার কথাটাও ওঠে, চাঁদা তোলার জন্যে আর একটু সক্রিয় হওয়া দরকার - এ বিষয়ে প্রায় সকলেই একমত হন। কিন্তু সেখানেই সেই পালা শেষ। আবার যথারীতি জুড়িয়ে যায় কথাটা। শোক - সভাতে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বার বার যাদের কন্ঠ আবেগরুদ্ধ হয়ে এসেছিল - তাদেরও মুখে তাঁর নামটা আর শোনা যায় না।
এক কথায় তাঁর ঋণ সংসার শোধ করে দিয়েছে, আর তাঁর কোন পাওনা নেই - ওদের সঙ্গে তাই তাঁর কোন সম্পর্কও নেই।
এইবার ধীরে ধীরে চরম অনুভূতিটার মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন জয়ন্ত ঘোষাল।
মৃত্যুর পরেও দৈহিক অস্তিত্বের অনুভুতিটা থাকা খুব কৌতুকজনক অবস্থা নয়, আরামদায়ক তো নয়ই। এ জন্মের সম্পর্ক এ জন্মেই চুকিয়ে দেওয়া ভাল। পরজন্মে তার জের টানার কোন অর্থই হয় না।
এতদিন তিনি ছিলেন নিজের বিপুল প্রতাপে, সংসারের মধ্যে মানুষের মধ্যে, দেশ ও দশের মাঝে একটা বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে - সেইভাবেই নিজের মূল্য নিজের মনের মধ্যে নির্ধরিত ছিল এতকাল - কিন্তু আজ দেখছেন সেই স্তান তেমনিই আছে, তাঁকে কেউ বিন্দুমাত্র খাটো করে নি। তবু তাঁর আর কোন প্রয়োজন নেই, সেই বিশেষ স্থানটিই মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। তাঁকে বাদ দিয়েও জগৎসংসার বেশ চলছে - আর হয়ত চলেই যাবে। একদিন সম্পূর্ণ বিস্মৃতির মধ্যেই পড়ে যাবেন তিনি।
আর পড়েই তো আছেন।
তীর্থযাত্রার আগে স্ত্রী যখন তাঁর পোর্টম্যান্টো গোছাচ্ছিলেন তখন অনেক আশা করেই পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন জয়ন্ত। তাঁর এনলার্জ - করা বড় ছবিটা না হোক, তাঁদের বিবাহের বিবর্ণ হয়ে যাওয়া ছবিটা না হোক (বড় অয়েল-পেন্টিংটার কথা তিনি ধরছেনই না, সে যে অসম্ভব তা তিনি জানেন) - অন্তত ছোট্ট যে বাঁধানো ছবিখানা স্ত্রীর বিছানার পাশেই থাকে - সেখানা তিনি অবশ্যই বক্সের মধ্যে নিয়ে নেবেন। কিন্তু একে একে সব জিনিসই তাতে উঠল - খুঁটিনাটি অনেক কিছু, প্রাত্যহিক অভ্যাসের অজস্র উপকরণ, পূজার সমস্ত সরঞ্জাম - কেবল সে ছবিখানারই স্থান হল না। সম্ভবত মনেরও পড়ল না।
যাত্রার দিন সিঁড়ি দিয়ে নামাবার মুখে দালানের ওপাশে টাঙানো বড় অয়েল - পেন্টিংটায় চোখ পড়তে একবার থমকে দাঁড়িয়ে যখন মুহুর্তের জন্যে চেয়ে দেখলেন, একবার সকলের অজ্ঞাতসারে হাতটা নমস্কারের ভঙ্গীতে কপালে উঠল - তখনও একটু ক্ষীণ আশা দেখা দিয়েছিল জয়ন্ত ঘোষালেন মনে - এইবার হয়ত ছোট ছবিখানা সঙ্গে নেবার কথা পড়বে গৃহিনীর। কিন্তু তাও পড়ল না। বাইরে গাড়ি হর্ন দিচ্ছে। তারই মধ্যে বধূকে নাতি - নাতনী সম্বন্ধে বিবিধ উপদেশ দিয়ে, দাসী চাকরদের উপর একটু নজর রাখতে বলে, তাদেরও নিজেদের কর্তব্য সম্বন্ধে হুঁশিয়ার করে দিয়ে, ছোট ছেলের চিবুক স্পর্শ করে চুমো খেয়ে - ব্যস্তভাবে গিয়ে গাড়িতে উঠলেন।
না, জয়ন্ত ঘোষাল সত্যিই মরে গিয়েছেন। তাতে আর কোন সন্দেহ নেই।
মরার পরে সাধারণ মানুষ যা পায় তা হয়ত এখনও পাবেন তিনি।
ঘটা করে সপিণ্ডকরণ হবে। বার্ষিক শ্রাদ্ধও হবে।
বিজয় হয়ত গয়াতে গিয়ে শেষকৃত্য শেষ করে পাওনা চুকিয়ে দিয়ে আসবে একেবারে। তখন হয়ত সবাই আর একবার দু-এক ফোঁটা করে চোখের জল ফেলবে, তারপর আবার তিনি হারিয়ে যাবেন ওদের স্মৃতির মধ্যে। সংসার চলবে তার নিদৃষ্ট পথে। জীবিতদের নিয়েই তার চিন্তার শেষ নেই - এর মধ্যে মৃতের কথা বৃথা ভাবতে বসবে কে? -
কখনও কখনও কোন শুভকর্ম উপলক্ষে আভ্যুদয়িক সময় হয়ত একবার মাত্র তাঁকে স্মরণ করবে তাঁর বংশধররা। তারপর দু-এক পুরুষ পরে তাঁর নামটাও আর মনে পড়বে ন। ‘যথানামো’ করে সারবে।
মনে মনে হাঁফিয়ে ওঠেন, ছটফট করতে থাকেন জয়ন্ত ঘোষাল। বাড়ি ছেড়ে দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোথাও যেতে পারেন না। কোথাও যে যাওয়া যায় তাও বোঝেন না। যাদের নিয়ে ইহলোক তাঁর - যাদের মধ্যে নিজের জগৎকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছিলেন - তাদের বাইরে আর কোথাও তাঁর স্থান নেই। বাড়িতে, পাড়ায়, বার লাইব্রেরীতে, সংগ্রেস অফিসে, য়্যাসেম্বলীতে, খবরের কাগজের অফিসে - কোথাও আর কেউ তাঁকে মনে করে রাখে নি। তাঁর জন্যে কেউ শোক করছে না, আপসোস করছে না। কোথাও একটুকু কাজ আটকে নেই কারুর।
এর চেয়ে যদি কখনই এত শোক কেউ না করত, যদি মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সকলের বেইমানিটা চোখে পড়তো এত দুঃখ বোধ হয় হত না। আনন্দ - উত্তেজনার উগ্র সুরা ক্রমাগত পান করার পর আজ তাঁর সব কিছু মাদক - উপকরণ ঘুচে গেছে। আজ তাঁর মতো হতভাগ্য কে! কী নিয়ে থাকবেন তিনি - এই বাড়িঘর, এই সমাজ, এই দেশের মধ্যে বিস্মৃত অবহেলিত এমনি ঘুরে বেড়াবেন?
নিজের নির্বুদ্ধিতায় নিজের অস্তিত্বহীন দেহের গালে-মুখে চড়াতে ইচ্ছে করে তাঁর। কেন এ দুর্বুদ্ধি হয়েছিল তাঁর - এ জন্মের জের পরজন্ম পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার। এমন দুর্বুদ্ধি যেন আর কখনও কারুর না হয়। হে ঈশ্বর, হে জগন্নাথ, এবার ক্ষমা করে ওকে - জয়ন্ত ঘোষালকে! এবার রেহাই দাও। এ জন্মের এই অদৃশ্য বন্ধন থেকে মুক্তি দাও!
অতদূর যাবারই বা দরকার কি। পদ্মলোচন সরকাল ক্রোড়পতি - এ কে না জানে আর কে না জানতো! মেয়ে - জামাই থাকতেও ভদ্রলোক ভাগ্নেটিকে বুকে করে মানুষ করেছিলেন - ব্যবসা-বাণিজ্য, শেয়ার মার্কেটের কাজ, বলতে গেলে হাতে ধরে সব শিখিয়েছিলেন। ইদানীং নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল সে। বার বার বলতেন পদ্মলোচন - ‘মেয়েজামাই নিজেদের টাকা যেভাবে রাখত তার চেয়ে অনেক ভালভাবে রাখবে আর খাটাবে আমার প্রমথ!’ সেই প্রমথ কী বেইমানিটাই না করল! মরবার পর দেখা গেল পদ্মলোচনের কিছু নেই - সব টাকাই প্রমথ মজুমদারের নামে। জীবনের শেষ আট মাস প্রমথই মামার ঘরে শুত - সারাদিন পাশে বসে থাকত। সবাই ধন্য ধন্য করেছিল তখন। আসলে পদ্মলোচনের মাথার যন্ত্রণা কমাবার জন্যে সাংঘাতিক ওষুধ দেওয়া হত - তারই নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকতেন পদ্মলোচন। সেই সুযোগে ইচ্ছামতো কাগজপত্রে, দলিলে, শেয়ারস্ক্রিপ্টে সই করিয়ে নিয়েছে প্রমথ। পদ্মলোচনের জামাই বুড়ো বয়সে একটা স্যানিটারী ওয়ারস্ এর দোকান দিয়েছে বৌবাজারে - স্রেফ পেটের দায়ে।
জয়ন্ত ঘোষাল অত কিছুই করেনি ছেলেমেয়ের জন্য। করবার সময়ও ছিল না তাঁর। সাধারণভাবেই মানুষ হয়েছে তারা। তবে হ্যাঁ, অর্থব্যায়, তা তাঁর যতটুকু সাধ্য করেছেন - এটা ঠিক। মাস্টার ছিল সকলের জন্যেই। নিয়মিত কাপড়-জামা-জুতো সরকার মশাই কিনে দিয়েছেন-আমোদ-প্রমোদ খেলাধুলোর জন্যেও যখন যা দরকার যোগাতে কথনও আপত্তি করেন নি তিনি। কিন্তু নিজে কোন কিছুই দেখতে পারতেন না। পারলে কি আর বুলুটা ঐ কাণ্ড করে বসে! শেষকালে কিনা ঐ একটা লোফার গানের মাষ্টারকে বিয়ে করল! অবশ্য তিনি বাধা দেন নি। কেলেঙ্কারীর ভয়েই কতকটা। এ ধরণের কেচ্ছা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পক্ষে পড় মারাত্মক। তার চেয়ে যেটা সোজা সেইটেই করেছেন - তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে একটা চলনসই চাকরিতে বসিয়ে দিয়েছেন। বুলুর নামে ছোট্ট একটা বাড়িও করে দিযেছেন শহরতলীতে। তারপর তার ভাগ্য।
তা হোক। তবু ওদের এতটা শোক তিনি আশা করেন নি। বিশেষতঃ স্ত্রীর কাছ থেকে। অবশ্য তার মাছ খাওয়া এবং গয়না পরা ঘুচল বটে কিন্তু তার জন্যে কি এতটা শোক হয়? মুহর্মুহুঃ ফিট হচ্ছে বেচারীর। এখন তো ওকে নিয়েই ডাক্তাররা বিব্রত। কতদিন যে তাঁর সঙ্গে দুটো কথাও কইতে পায় নি! ইদানীং দেখাই হত কালে-ভাদ্রে। বহু রাত অবধি বাইরের ঘরে বসে কাজ করতে হয় বলে বাইরের ঘরের সঙ্গে লাগোয়া একটা শোবার ঘর ব্যবস্থা করে নিয়েছিলেন। রাত দুটো-তিনটেয় উঠে গিয়ে সেখানে পড়তেন - সকালে সেইখানে চাকর চা দিয়ে আসত। জলখাবার চা সব পৌছত সেখানে। দুপুরে বা রাত্রে বেশির ভাগ দিনই বাইরে বাইরে খেতে হত - দৈবাৎ যেদিন বাড়িতে থেতেন, সেদিনও এত অসময়ে খেতে আসতেন যে, স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়াই সম্ভব ছিল না। ওর নিজস্ব চাকর জগনই তদারক করত, গরম জলে বসিয়ে রাখা টিফিন ক্যারিয়ার খুলে থালা-বাটিতে সাজিয়ে দিত। রাত্রের খাবার নিচের ঘরে সাজানো চাপা দেওয়া থাকত প্রত্যহ, খেতেন তো খেতেন, নইলে পরের দিন সকালে চাকরবাকররা খেয়ে নিত। সুতরাং স্ত্রীর সঙ্গে দেখা সাক্ষাতের সুযোগই ঘটত না। তবুও যে, সে তাঁকে এত ভালবাসত, এত ভালবাসা যে সম্ভব কোন উপেক্ষিতা প্রায় - বিস্মৃতা স্ত্রীর পক্ষে - তা তিনি কখও কল্পনাও করেন নি।
আজ বড় অনুতাপ হচ্ছে, বড়ই দুঃখ বোধ করছেন ওর জন্যে। সময় থাকতে যদি একটু মনযোগ দিতেন! যদি একটু ফিরে তাকাতেন!-
জোর করে অন্যদিকে মনটা সরিয়ে আনলেন জয়ন্ত ঘোষাল। ব্যাথায় টনটন করে উঠছে বুকটা অন্তরটা। এখন তো তাঁর বুক বলে কিছু নেই, দেহই নেই তার বুক - এখন সবটাই এই মন। এই মনটাই আত্মা নাকি? কে জানে!-
বিস্তর ফুল এসে পৌছেছে। রাশি রাশি ফুল। সংবাদটা এতক্ষণে ছড়িয়ে পড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী, এমন কি স্বয়ং লাটসাহেবরাও রাদ পাঠিয়েছেন। কোন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বা ক্লাব বাদ যায় নি। ব্যক্তিগতভাবেও বিস্তর মালা, বাঞ্চ, তোড়া এসে পৌঁচচ্ছে। ওধারের ঘরটা ভরে গেছে ফুলে ফুলে। কলকাতার বাজারে বোধহয় ফুল আর রইল না।
নিরতিশয় তৃপ্তির সঙ্গে মনে মনে হিসেব করে দেখলেন জয়ন্ত ঘোষাল - অন্ততঃ পাঁচশ টাকার ফুল তাঁর উদ্দেশ্যে কেনা হয়েছে, এই গত দু ঘন্টায়।
বহু লোকও আসছে। বড় রাস্তায় গাড়ি রাখার জায়গা নেই। তাঁর বাড়ির সামনেকার এই অপেক্ষাকৃত অপরিসর পথটা তো লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে। আহা, তাঁর খুড়শাশুড়ী বুড়ো মানুষ - আসতেই পারছেন না ভিড় ঠেলে। পাড়ার ছেলেগুলো যথাসাধ্য ভলান্টিয়ারী করছে বটে কিন্তু এ ভিড়ে তারা কী করবে?
কে যেন - হ্যাঁ তাঁরই তো ভগ্নীপতি রমেশবাবু - একখানা বোম্বাই খাট কিনে নিয়ে এলেন। বেশ দামী খাট বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু দামটা দিলে কে? কই, বিজয়ের কাছে থেকে তো কেউ চায় নি। রমেশবাবু নিজেই দিলেন নাকি? না জামাইরা কেউ? যে-ই দিয়ে থাক, বিবেচনা আছে মানতেই হবে। শোকার্ত স্ত্রী-পুত্রের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যে নবাবী করেনি, এর জন্যে তিনি মনে মনে সাধুবাদ দিচ্ছেন তাকে।
কিন্তু আর না। এখনই যে দৃশ্যের অবতারণা হবে তা জয়ন্ত খুব জানেন। ঐ দেহটা তাঁর পালঙ্কের শয্যা থেকে তুলে বোম্বাই খাটে নিয়ে যাবার সময় আরও আছাড়ি-পিছাড়ি করবে তাঁর ছেলেমেয়েরা, তাঁর স্ত্রী। এমনিতেই ওদের যা অবস্থা, দাঁড়িয়ে দেখা যায় না। রেখার কপালটা ঢিপি হয়ে ফুলে উঠেছে, এবার হয়ত রক্তারক্তি হবে। সে দিক দিয়ে বুলুর অবস্থায় ভাল। এসেই যে চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে. এখনও জ্ঞানই হয় নি। কেউ কেউ মাথায় জল দিয়ে বাতাস করছে অবশ্য, কিন্তু কী লাভ? অজ্ঞান হয়ে থাকাই ভাল। বুলুর বেশী লাগবে তা তিনি জানেন। ইতিমধ্যেই রোমান্সের রস মরে এসেছে ওর মনে। স্বামীর অপদার্থতা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। তিনি যে ওদের জন্যে কতখানি করেছেন তাও বুঝছে। তিনি বেঁচে থাকলে তবু কতকটা ভরসা ছিল। সেটুকুও গেল।
জয়ন্ত ঘোষালের বিদেহী সত্তা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে। নিজের অফিস ঘরে ঢুকে অতি প্রিয় ও অতি পরিচিত চেয়ারখানিতে আশ্রয় নেয়। এখানে ওরা আসবে না। হাহাকারের শব্দটাও অত স্পষ্ট আঘাত করবে না। কতকটা নিশ্চিন্ত।
অবশ্য শেষ পর্যন্ত দেহের সঙ্গে শ্মশান অবধি না গিয়ে পারেন নি জয়ন্ত ঘোষাল। কৌতুহল - হ্যাঁ, কৌতুহল তো বটেই সেই সঙ্গে দেহের প্রতি একটা সহজাত আকর্ষণও তাঁকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। আর সেই সহজ মমতাতেই আগুনটা জলবার সময় কষ্টও পেয়েছেন খুব। দেহের অনুভূতি নেই, স্নায়ুর তো বালাই-ই নেই, তবু যেন মনে হয়েছিল ঐ সুবিপুল ও সুবিস্তৃত সুগন্ধি বহ্নিশিখার (চন্দকাঠ ধুপধুনো কিছুরই অভাব ঘটে নি - বলা বাহুল্য) দহজজ্বালা তিনি সেই দেহের প্রতিটি স্নায়ু দিয়ে অনুভব করেছেন। একেই বোধহয় মায়া বলে। মহামায়ার মায়া দেহান্তের পরও রেহাই দেয় না মানুষকে, যতক্ষণ মন ততক্ষণ মায়া থাকে।
তবে সেই কষ্টটা কমে আসবার সঙ্গে সঙ্গে - অর্থাৎ চিতায় জল দেওয়ার পর থেকেই আবার সেই তৃপ্তির ভাবটা ফিরে এসেছে। To make the best of it - ইংরেজী মহাকাব্যের অনুসরণে মন্দের ভালটুকু বেছে নিয়েছেন তিনি। তাঁর আর বিশেষ ক্ষোভ নেই। মরার ফলে অনেক হারিয়েছেন তিনি এটা ঠিক, কিন্তু পেলেনও তো বড় কম নয়। জীবিত থাকতে এত শ্রদ্ধা প্রীতি-ভালবাসা কল্পনাই করতে পারেন নি - এমন কি যেটুকু দেখেছেন সেটুকুও বাহ্যিক মূল্যে গ্রহণ করতে পারেন নি। একটু সন্দেহ একটু ব্যঙ্গের ভাব বরাবরই ছিল। তিনি বুদ্ধিমান, বুদ্ধিজীবী, মানুষ চরিয়ে খান-সুতরাং এসব সম্বন্ধে কোন ভ্রান্ত ধারণাও যেমন নেই - মোহও নেই। মানুষের সবটাই মৌখিক, স্বার্থের সম্পর্ক, এটা মেনেই নিয়েছিলেন। আজ মৃত্যুর পর এদের যে পরিচয় তিনি পেলেন তা একেবারেই অপ্রত্যাশিত, অভাবনীয়। আর অপ্রত্যাশিত বলেই এত মধুর, অভাবনীয় বলেই এত উত্তেজক। -
শ্রাদ্ধশান্তি পর্যন্ত এই মাধুর্যের আবেশে ডুবে রইলেন জয়ন্ত ঘোষাল। না, কোথাও কোন ছন্দপতন হয় নি, লাগে নি কোন রূঢ আঘাত। কারুর আচরণে কোথাও এতটুকু ত্রুটি ঘটে নি। ছেলে-মেয়ে-স্ত্রী-পুত্রবধু- সকলের শোকই আন্তরিক, সকলের আঘাতই মর্মান্তিক। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সামাজিক ক্ষেতে যাদের সঙ্গে কাজ করেছেন - এমন কি যাদের সঙ্গে মধ্যে মধ্যে বেশ একটু মতবিরোধও ঘটেছে, তারাও সত্যকার গভীর দুঃখ প্রকাশ করচে তাঁর জন্যে। খবরের কাগজে বেশ ফলাও করে শোকবার্তা সাজানো হয়েছে। অধিকাংশ কাগজেই তিন কলাম হেডলাই ছিল - অন্ততঃ দুই কলামের কম কেউ দেয় নি। শোক সংবাদ আর তার সঙ্গে ডাক্তার এবং এন্টিবায়োটিক চিকিৎসার ওপর তীব্র আক্রমণ। বড় ডাক্তার বলে সেনগুপ্ত অব্যাহতি পেলেন না। অধিকাংশ কাগজেই পরোক্ষে এই মৃত্যুর জন্য ডাঃ সেনগুপ্তকে দায়ী করা হল। কেউ কেউ চিঠি দিলেন - কেন একে হত্যাকান্ড বলা হবে না প্রশ্ন করে। লোকসভায়, বিধান পরিষদে প্রশ্ন উঠল। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য - মন্ত্রী পেনিসিলিনের খালি য়্যাম্পুলটি পরীক্ষা কারার আদেশ দিলেন। যে ডাক্তারখানা থেকে ওটি কেনা - তাদের পর্যন্ত দিনকতক থানা-পুলিশের হামলা সইতে হল। এক কথায় তাঁর মৃত্যু নিয়ে চাঞ্চল্য ও আলোড়নের শেষ রইল না - সমস্ত জাতি যে তাঁর এই আকস্মিক তিরোধানে শুধু ক্ষুব্ধই নয় - ক্রদ্ধও হয়ে উঠেছে, তার প্রমাণ প্রত্যহই সংবাদপত্রে রাশি রাশি প্রকাশিত হতে লাগল।
এদিকে শ্রাদ্ধশান্তিও যতদূর সম্ভব ঘটা করেই হল। মেয়েরা প্রত্যেকে তাদের চতুর্থী শ্রাদ্ধে একটি করে ষোড়শ দিল। ছেলেরা বৃষোৎসর্গের আয়োজন করল। এটা এমন কি তাঁরও বাড়াবাড়ি বলে মনে হল। সোজাসুজি ষোড়শ দান দিলেই হত। তোদের কি এমন অবস্থা যে তোরা এতটা করতে গেলি। আসলে চারিদিকে এত হৈ চৈ পড়তে দেখে ওদের মনেও তাঁর আসন একটু উঁচুতে চলে গেলে, দাম বেড়ে গেছে। এখন ওদেরও মনে হচ্ছে যে তাদের বাবা একজন অসাধারণ ব্যক্তি ছিলেন, আর অসাধারণ পিতার শ্রাদ্ধ বেশ একটু সমারোহের সঙ্গেই করা দরকার, নইলে সম্মান রক্ষা হয় না।
ওদের নির্বুদ্ধিতায় হাসি পেল জয়ন্ত ঘেষালের। তবু তিনি খুশীও না হয়ে পারলেন না।
এখন তাঁর মনে হচ্ছে যে তাঁর মূল্য একমাত্র তিনিই বোধ হয় বরাবর একটু কম করে ধরেছেন। আসলে যতটা তিনি করছেন বলে ধরণা করেছিলেন, তার চেয়ে ঢের বেশী করেছেন দেশ ও দশের জন্যে। বিনয় থাকা ভাল, তবে সত্যের থেকে কমিয়ে ধরাও কিছু নয়। ঠিক মূল্যটির ধারণা থাকলে জীবিতকালেও প্রতিষ্ঠাটা উপভোগ করতে পারতেন।
শোকসভা হল অনেকগুলি। একটা তো স্বয়ং শেরিফই ডেকে বসলেন। ছোটখাটো সভা প্রায় পাড়াতেই হতে লাগল। একই সময় একাধিক সভা হওয়ার ফলে সবগুলোতে তিনি যেতেও পারলেন না। তা না পারুন, মোটামুটি তিনি বুঝে নিয়েছেন কে কী বলবে আর শোক-প্রস্তাবে কি লেখা হবে। বড় সভাতে তাঁর স্মৃতিরক্ষার জন্যে যে কমিটি হয়েছে তাতে ইতিমধ্যেই নাকি হাজার টাকার ওপর চাঁদা উঠেছে। এখন তাঁর ভয় হচ্ছে- বিজয়টা যা বোাক - হয়ত সেও একটা মোটা টাকা দিয়ে বসবে। এসব কমিটি তিনি অনেক দেখেছেন, তা আঁচালে বিশ্বাস নেই। স্মৃতিরক্ষা কমিটির পুরো হিসেব পাওয়া এদেশে প্রায় অবিশ্বাস্য ঘটনা। স্মৃতিরক্ষাটাও হয়ে ওঠে না অনেক সময়।
সে যা হোক, মন ভরে গেছে তার। তিনি তৃপ্ত।
আর কি চায় মানুষ? মানুষ যে পাওনা ইহজন্মে কল্পনাও করতে পারে না, তিনি সে জীবনের সীমানা পেরিয়ে এসেও দু হাত ভরে পেয়েছেন তাই।
না, তাঁর আর কোন ক্ষোভ নেই, দুঃখ নেই। মৃত্যুর জন্যেও কোন আপসোস নেই। ছোটখাটো অসুবিধা একটু-আধটু তো হবেই - কিন্তু সে ক্ষতির চেয়ে লাভের দিকটা তাঁর অনেক ভারী হয়ে গেছে। জগন্নাথ যে স্থানে-থেকে-কানে-শুনেছেন - এই অপরূপ অভিজ্ঞতা যে উপলব্ধি করার সুযোগ দিয়েছেন - এর জন্যে তিনি প্রত্যহই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জগন্নাথের কাছে।
কিন্তু শাদ্ধশান্তির নিয়মভঙ্গ ইত্যাদি চুকে যাবার পর প্রথম একটু বেসুরো লাগল, এই একটানা তৃপ্তির সংগীতে। দিনরাত যে রেশটায় তিনি মশগুল হয়ে ছিলেন তা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে হতে এক সময় মনের দিগন্তে মিলিয়ে যাবার উপক্রম হল।
মেয়েরা যে যার শ্বশুরবাড়ি ফিরে গেছে। যাবার আগে প্রকাশ্য ভাগ-বাটোয়ারার কথা কেউই তোলে নি - শোকার্ত মর সামনে সে কথা তোলা শোভন হবে না সবাই জানে - শুধু আকারে ইঙ্গিতে দাদাকে প্রস্তুত থাকবার কথা জানিয়ে গেছে। তারা দাবি করুক - তাদের শ্বশুরবাড়ি ছাড়বে কেন?
অবশ্য এতে দোষের কথা কিছুই নেই। যা স্বাভাবিক যা সঙ্গত তাই তারা করেছে। বরং করেছে অনেক সন্তর্পনে। বিষয়ের কথা নিয়ে জয়ন্ত ঘোষাল অত ব্যস্ত নন। এর চেয়ে ঢের বেশী কুৎসিত চেহারা তিনি দেখেছেন সংসারের নগ্ন স্বার্থের। তাঁর ছেলেমেয়েরা সে তুলনায় সোনার চাঁদ।
কিন্তু মেয়েরা চলে যাবার পরই সংসারটা কেমন যেন নিস্তরঙ্গ হয়ে উঠল, উত্তেজনাহীন - সেইটেই খারাপ লাগল জয়ন্ত ঘোষালের। ইহলোকের সমস্ত রকম সম্ভোগ তাঁর উঠে গেছে চিরকালের মতো - তাঁর খাদ্য পানীয় তাঁর প্রাণ-ধারনের উপায় বলতে শুধু একটু উত্তেজনা। তা তাই যদি না থাকে তো তিনি বাঁচেন কী করে? মানে তাঁর এই অনুভূতিময় সত্তা বাঁচে কি করে?
না, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাভক্তি বিশ্বস্ততার কোন অভাব নেই। তাঁর অফিসঘর আর তার পাশের বাড়তি শোবার ঘরটি - ঘরের অত্যন্ত অকুলান স্বত্ত্বেও বিজয় কাউকে দখল দেয় নি, কোন রকম ভিন্ন ব্যবস্থা হতে দেয় নি, ঠিক তেমনিই সাজিয়ে রেখেছে, তাঁর জীবিতকালে যেমন থাকত। তাঁর নিজস্ব চাকর জগন যেমন প্রত্যহ সকাল বিকেল ঝাড়ামোছা করত আগেও - তেমনিই করে যায় দু বেলা। হঠাৎ দেখলে মনে হবে বুঝি তিনি এখনও বেঁচে আছেন এবং এখনই এসে বসবেন সেখানে।
এ ছাড়াও - তাঁর যে সব দানধ্যান মাসিক সাহায্য ইত্যাদি ছিল তাও - অন্ততঃ এ মাসে বজায় রেখেছে বিজয় ঠিক ঠিক মতো। এর চেয়ে বেশী আর সে কিই বা করতে পারে? তাকেও রোজগার করে খেতে হবে- শোকে ডুবে থাকার বিলাস তার সাজে না। সেই এখন বাড়ির কর্তা, চার চালের ভার তার মাথায়। তাছাড়া তারও স্ত্রী পুত্র আছে। -
তবু যতই বোঝান মনকে, আর মন ছাড়া কিই বা আছে তাঁর এখন, মন যেন কেমন একটা অব্যক্ত অবয়বহীন ক্ষোভ অনুভব করে। ছেলে দিন দিনই তার কাজ কর্তব্য - তার সংসারে ডুবে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে একদিন বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সিনেমাতেও গিয়েছিল - কী একটা হাসির ছবি দেখতে। ফিরে এসে বৌমাকে বলছিল, তাই মুনতে পেলেন জয়ন্ত ঘোষাল। বলছিল, ‘ওরা টানাটানি করলে, মনটাও খারাপ - তাই চলে গেলাম। মন্দ নয় ছবিটা, আর কিছু না হোক - অনেকদিন পরে খুব খানিকটা হাসা গেল!’
বৌমা বললেন, ‘বেশ তো স্বার্থপর লোক তুমি! এই এক মাস দেড়মাস আমাদের ওপর দিয়ে কী ঝড়টা গেল বলো দিকি! আমদের বুঝি আর হাসতে ইচ্ছে করে না!
অপ্রতিভ বিজয় বলে, ‘হবে হবে। দু - একটা দিন যাক না - মা’র কথাটা ভেবেই আরও আমি তোমাকে কোথাও নিয়ে যাচ্ছি না।’
‘যাও যাও! মা’র কথা ভেবে নিজের আটকায় না! যত ভাবনা আমাদের বেলা!’
সেখান থেকে আস্তে আস্তে সরে আসে জয়ন্ত ঘোষালের বিদেহী সত্তা। অস্বাভাবিক নয়, অসঙ্গত নয়। এমন একটা কিছু হৃদয়হীনতার পরিচয়ও দেয় নি বিজয়। তবু -
ছোট ছেলে সঞ্জয় গত সপ্তাহ থেকেই সিনেমা ও ফুটবলের মাঠে যেতে শুরু করেছে, কিন্তু তাতে তাঁর অতটা ক্ষোভ হয় নি। ছেলেমানুষ, কলেজে পড়ছে - সবে ফাস্ট ইয়ার, ওর কাছ থেকে এর চেয়ে বেশী কিছু বা অন্যরকম কিছু আশা করেনি। কিন্তু বিজয়ের সম্বন্ধে আর একটু -। মানে হয়ত সেটা অন্যায়, তবে বিজয়ই তার ব্যবহারে অতটা বেশী আশা জাগিয়েছে তাঁর মনে।
সেখান থেকে সরে জয়ন্ত ঘোষাল স্ত্রীর শয়নঘরে, তাঁদের শয়নঘরে গিয়ে দাঁড়ান।]
শীর্ণ মলিন হয়ে গিয়েছে বেচারী। কেমন যেন শ্রীহীন। তবু তো মেয়েরা একেবারেই থান পরতে দেয় নি। চুঙ্গপাড় ধুতি আর হাতেও একগাছা করে চুড়ির ব্যবস্থা বজায় রেখেছে।
কাছে গিয়ে দাড়ালেন জয়ন্ত ঘোষাল।
শুয়ে শুয়ে বই পড়ছেন স্ত্রী। কী একখানা মোটা বই। না কোন ধর্মপুস্তক নয়, বিজয় এনে দিয়েছে একটা ভ্রমণ-কাহিনী। বেশ মনোযোগ দিয়েই পড়ছেন বইখানা। অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি পাশে। হয়ত আশা করেছিলেন - মনের কোন সদুর প্রত্যন্ত দেশে যে - বইতে বেশীক্ষণ মন বসবে না, হয়ত এখনই ওখানা ঠেলে সরিয়ে রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন, কিংবা বইখানা মুড়ে রেখে অন্যমনস্কভাবে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে থাকবেন অথবা দুই চোখের প্রান্ত বেয়ে নামবে দু ফোঁটা অশ্রু - এতদিন যা ক্ষণে ক্ষণেই অজস্রধারে পড়েছে।
এসব কিছুই হল না। নিবিষ্টচিত্তেই পড়ে যেতে লাগলেন - যতক্ষণ না প্রায় রাত এগারোটা নাগাদ, বামুন-মেয়ে এসে গলাখাঁকারি দিয়ে দোরের কাছে দাঁড়ালেন, ততক্ষণে একবারও মুখ তুললেন না উনি।
এখন তাড়াতাড়ি বইটা মুড়ে উঠে বসে বললেন, ‘কী গো বামুন-মেয়ে?’
‘এবার তাহলে আপনার খাবার আনি মা!?’
‘ওদের সব খাওয়া হয়ে গেছে? ছেলেদের? বিজু বৌমা - ওরা?’
‘সব। ওসব পাট চুকিয়ে উনুন পেড়ে তবে তো এখন আপনার খাবার তৈরী করলুম।’
‘তবে দাও।’
গৃহিণীই এতকাল দাঁড়িয়ে থেকে তদ্বির করতেন সকলের খাওয়ার সময়। এখন আর তিনি নামেন না। বিজয়ই নামতে দেয় না। অবকাশ দিয়েছে তাঁকে।
ঝি এসে আসন পেতে ঠাঁই করে দিয়ে গেল। বামুন ঠাকরুন খাবরের থালা নিয়ে এলেন। খান আষ্টেক লুচি, দু-তিন রকম ভাজা, আলুছেঁচ্ কি, কী একটা মিষ্টি - এক বাটি ঘন দুধ।
গৃহিণী দুধ দেখিয়ে আপত্তি করলেন আজও।
‘আমায় কোন দুধ দাও বামুন-মেয়ে! আমি কি কচি খুকী?’
‘কিছুই তো পড়ছে না পেটে, মাছ না মাংস না। একটু দুধ না খেলে বাঁচবেন কী করে মা?’
‘আরও কি আমার বাঁচার দরকার আচে বামুন-মেয়ে? আর কেন? কী সুখভোগের জন্য বাঁচব?’
বলতে বলতে কন্ঠস্বর গাঢ় হয়ে আসে গৃহিনীর।
‘বালাই ষাট। ছেলেমেয়েগুলো আছে, তাদের মুখ চেয়েই যে বাঁচতে হবে মা। বিজু আমায় বার বার বলে দিয়েছে - মাছটাছ যখন থেতেন তখন একরম ছিল - এখন যেন দুধ না বাদ যায় কোনদিন। আর কারুর দুধ হোক না হোক - মা’র দুধ ঠিক করে রাখবে!’
বিষাদে বিকৃত মুখ সগর্ব হাসিতে বিস্ফরিত হয়ে উঠল; সস্নেহ স্নিগ্ধ কন্ঠে গৃহিণী বললেন, ‘ও একটা আস্ত পাগল বামুন-মেয়ে। ওর কথা শুনতে গেলে সংসার চলে না। ও ভেবেছে চিরকাল ওর মাকে ও বাঁচিয়ে রাখবে!’
বললেন কিন্তু দুধের বাটি ঠেলেও রাখলেন না। বরং লুচির পালা শেষ করে বেশ তৃপ্তির সঙ্গেই সেই ক্ষীরের মত ঘন দুধটি খেয়ে উঠলেন।
জয়ন্ত ঘোষাল সেখানেও আর দাঁড়াতে পারলেন না। স্ত্রী তাঁর জন্যে আজও শোকার্ত, তাঁর অভাবে জীবনের কোন অর্থই আর নেই ওর - একথা যতই বার বার বোঝাতে চেষ্টা করলেন স্ত্রীর প্রথম কথাটার সূত্র ধরে, ততই মনে মনে একটা আশাভঙ্গের বেদনা অনুভব করতে লাগলেন তিনি। তাবে কি স্ত্রী ঐ দুধটা ঠেলে রেখে, লুচগুলোও না খেয়ে অভুক্ত উঠে পড়লে খুশী হতেন জয়ন্ত ঘোষাল?
না, না - সে নিতান্ত স্বার্থপরের মত কথা হল! অত স্বার্থপর তিনি নন। তবু -
তবু যে ঠিক কি চান তিনি, কী ঘটলে খুশী হতেন, তাও নিজের মনকে ভাল বোঝাতে পারেন না।
আরও মাসখানেক অনেক পরিবর্তন লক্ষ করলেন জয়ন্ত বাবু।
বিজয় ভগ্নীপতিদের ডেকে, মামা ও শ্বশুরকে মধ্যস্থ করে, একটা আপস করে ফেলেছে। তাদের কিছু কিছু নগদ টাকা দিয়ে এই বাড়ি এবং ভাড়াটে বাড়িখানা, দুটোই বাঁচিয়েছে। অন্য অন্য বিষয়কর্মেরও সুব্যবস্থাই করেছে। যতটা ছেলেমানুষ এবং কাঁচা ভাবতেন ওকে, ততটা যে সে আদৌ নয় - তা নিঃসংশভাবে প্রমাণ করে দিয়েছে সে।
তারপর?
তারপর সংসার পূর্ববৎই চলছে। দুটো ঝি চাকর কমানো হয়েছে শুধু। আর কিছুই করতে হয় নি। বিজয় যা মাইনে পায় আর ওবাড়ির ভাড়া- তাতেই চলে যাচ্ছে সংসার। কিছু টাকা এখনও আছে হাতে - ওর মা’র নামে লিখে - দেওয়া একটা মোটা টাকার লাইফ ইনসিওরেন্স ছিল, বিজয় প্রস্তাব করেছে যে, সেই টাকায় মা’র নামে একটা বাড়ি কিনে দিবে, মা’র যাতে নিজের খরচের জন্যে কোনদিন ছেলেদের মুখাপেক্ষী না হতে হয়। এ প্রস্তাবে সকলেই খুশী হয়েছে, ধন্য ধন্য করেছে বিজয়কে। বিজয়ের মা’ও খুশী হয়েছেন। হয়ত একটু নিশ্চিন্তও হয়েছেন।
কিন্তু যত এদিকে সুবন্দোবস্ত হচ্ছে তত যেন মনের মধ্যে একটা অসন্তোষ ও বিক্ষোভ অনুভব করছেন জয়ন্ত ঘোষাল। তবে কি তিনি এদের দুর্দশাই চেয়েছিলেন? মাঝে মাঝে এ আত্মজিজ্ঞাসাও করেন - বৈকি জয়ন্ত। না, না - ছিঃ! নিজেই শিউরে ওঠেন আবার এ কথাটা ভেবে।
তবু-।
তবু - সংসার বেশ চলছে তাঁকে বাদ দিয়েও। দাসী চাকর সরকার মশাই, যথানির্দিষ্ট নিয়মে কাজ করে যাচ্ছে। স্ত্রী, দুই পূত্র, পূত্রবধু, নাতি-নাতনী, কন্যারা - করুরই কিছু আটকাচ্ছে না। অভাবও নেই তেমন - তাই হাহাকার বা দুঃখও আর নেই। যথানিয়মেই নেই। তাই বলে কি তাঁর স্মৃতির প্রতি বিন্দুমাত্র অবিচার করেছে ওরা? তাও তো নয়। আজও নিচের ঘর দুটি তেমনি সাজানো আছে, তেমনি প্রত্যহ চাবি খুলে জগন ঝাড়ামোছা করে। রবিবার রবিবার বিজয় নিজে এসে দাঁড়ায় সে সময়ে। কেবল স্ত্রীই আসেন না কোনদিন, কিন্তু সে তো পুরাতন স্মৃতি জাগ্রত হয়ে দুঃ”খের কারণ হবে বলেই আসেন না।
স্ত্রী তীর্থে যাবেন ঠিক হয়েছে। বড় বোনের সঙ্গে যাবেন। স্ত্রীর নিজের হাতেই বেশ কিছু টাকা আছে, সেই ভরসাতেই যাচ্ছেন। ছেলেদের দিতে হবে না এক পয়সাও। তাই কারও কোন আপত্তিই নেই। বিজয় একটু ক্ষীণ আপত্তি তুলেছিল, বৌমা সেটুকু তুলতে দেয়নি। বুঝিয়ে বলেছে, ‘তুমি বুঝছ না। দিনকতক ঘুরে এলে ভালই হবে, মনে শান্তিই পাবেন। সেই থেকে এই কটা দেওয়ালের মধ্যে আটকে আছেন, সেই সব স্মৃতি চারদিকে - তার থেকে দুদিন বাইরে গেলে উপকারই হবে!’
এমনিতেও স্ত্রী বেশ সামলে নিয়েছেন। আগের মতোই সকালে ভাড়ারে এসে বসেন। কুটানো কুটে দেন মাঝে মধ্য্ েনাতিনাতনীদের স্নানাহারের তদ্বির করেন। ছেলেদের খাওয়ান সামনে বসিয়ে। এক কথায় পুরাতন নিয়ম ও অভ্যাসে ফিরে এসেছেন অনেকখানিই।
না - কারুরই কিছু আটকে নেই।
বন্ধুবান্ধব - যাঁদের তাঁকে না হলে, তাঁর পরামর্শ উপদেশ না হলে একদম চলত না - তাঁরাও তাঁকে বাদ দিয়েই বেশ মানিয়ে নিয়েছেন নিজেদের জীবন ও কর্মক্ষেত্র। যে রাজনৈতিক দলের তিনি ছিলেন স্তম্ভবিশেষ - সেখানেও তাঁর স্থান পূর্ণ হয়ে গেছে। এখন কথা প্রসঙ্গে কখনও কখনও নামটা ওঠে, এক-আধবার হয়তো দুঃখ প্রকাশও করেন কেউ কেউ - ঐ পর্যন্তই। আর হয়ত সেই সময়ই তাঁর স্মৃতিরক্ষার কথাটাও ওঠে, চাঁদা তোলার জন্যে আর একটু সক্রিয় হওয়া দরকার - এ বিষয়ে প্রায় সকলেই একমত হন। কিন্তু সেখানেই সেই পালা শেষ। আবার যথারীতি জুড়িয়ে যায় কথাটা। শোক - সভাতে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বার বার যাদের কন্ঠ আবেগরুদ্ধ হয়ে এসেছিল - তাদেরও মুখে তাঁর নামটা আর শোনা যায় না।
এক কথায় তাঁর ঋণ সংসার শোধ করে দিয়েছে, আর তাঁর কোন পাওনা নেই - ওদের সঙ্গে তাই তাঁর কোন সম্পর্কও নেই।
এইবার ধীরে ধীরে চরম অনুভূতিটার মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন জয়ন্ত ঘোষাল।
মৃত্যুর পরেও দৈহিক অস্তিত্বের অনুভুতিটা থাকা খুব কৌতুকজনক অবস্থা নয়, আরামদায়ক তো নয়ই। এ জন্মের সম্পর্ক এ জন্মেই চুকিয়ে দেওয়া ভাল। পরজন্মে তার জের টানার কোন অর্থই হয় না।
এতদিন তিনি ছিলেন নিজের বিপুল প্রতাপে, সংসারের মধ্যে মানুষের মধ্যে, দেশ ও দশের মাঝে একটা বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে - সেইভাবেই নিজের মূল্য নিজের মনের মধ্যে নির্ধরিত ছিল এতকাল - কিন্তু আজ দেখছেন সেই স্তান তেমনিই আছে, তাঁকে কেউ বিন্দুমাত্র খাটো করে নি। তবু তাঁর আর কোন প্রয়োজন নেই, সেই বিশেষ স্থানটিই মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। তাঁকে বাদ দিয়েও জগৎসংসার বেশ চলছে - আর হয়ত চলেই যাবে। একদিন সম্পূর্ণ বিস্মৃতির মধ্যেই পড়ে যাবেন তিনি।
আর পড়েই তো আছেন।
তীর্থযাত্রার আগে স্ত্রী যখন তাঁর পোর্টম্যান্টো গোছাচ্ছিলেন তখন অনেক আশা করেই পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন জয়ন্ত। তাঁর এনলার্জ - করা বড় ছবিটা না হোক, তাঁদের বিবাহের বিবর্ণ হয়ে যাওয়া ছবিটা না হোক (বড় অয়েল-পেন্টিংটার কথা তিনি ধরছেনই না, সে যে অসম্ভব তা তিনি জানেন) - অন্তত ছোট্ট যে বাঁধানো ছবিখানা স্ত্রীর বিছানার পাশেই থাকে - সেখানা তিনি অবশ্যই বক্সের মধ্যে নিয়ে নেবেন। কিন্তু একে একে সব জিনিসই তাতে উঠল - খুঁটিনাটি অনেক কিছু, প্রাত্যহিক অভ্যাসের অজস্র উপকরণ, পূজার সমস্ত সরঞ্জাম - কেবল সে ছবিখানারই স্থান হল না। সম্ভবত মনেরও পড়ল না।
যাত্রার দিন সিঁড়ি দিয়ে নামাবার মুখে দালানের ওপাশে টাঙানো বড় অয়েল - পেন্টিংটায় চোখ পড়তে একবার থমকে দাঁড়িয়ে যখন মুহুর্তের জন্যে চেয়ে দেখলেন, একবার সকলের অজ্ঞাতসারে হাতটা নমস্কারের ভঙ্গীতে কপালে উঠল - তখনও একটু ক্ষীণ আশা দেখা দিয়েছিল জয়ন্ত ঘোষালেন মনে - এইবার হয়ত ছোট ছবিখানা সঙ্গে নেবার কথা পড়বে গৃহিনীর। কিন্তু তাও পড়ল না। বাইরে গাড়ি হর্ন দিচ্ছে। তারই মধ্যে বধূকে নাতি - নাতনী সম্বন্ধে বিবিধ উপদেশ দিয়ে, দাসী চাকরদের উপর একটু নজর রাখতে বলে, তাদেরও নিজেদের কর্তব্য সম্বন্ধে হুঁশিয়ার করে দিয়ে, ছোট ছেলের চিবুক স্পর্শ করে চুমো খেয়ে - ব্যস্তভাবে গিয়ে গাড়িতে উঠলেন।
না, জয়ন্ত ঘোষাল সত্যিই মরে গিয়েছেন। তাতে আর কোন সন্দেহ নেই।
মরার পরে সাধারণ মানুষ যা পায় তা হয়ত এখনও পাবেন তিনি।
ঘটা করে সপিণ্ডকরণ হবে। বার্ষিক শ্রাদ্ধও হবে।
বিজয় হয়ত গয়াতে গিয়ে শেষকৃত্য শেষ করে পাওনা চুকিয়ে দিয়ে আসবে একেবারে। তখন হয়ত সবাই আর একবার দু-এক ফোঁটা করে চোখের জল ফেলবে, তারপর আবার তিনি হারিয়ে যাবেন ওদের স্মৃতির মধ্যে। সংসার চলবে তার নিদৃষ্ট পথে। জীবিতদের নিয়েই তার চিন্তার শেষ নেই - এর মধ্যে মৃতের কথা বৃথা ভাবতে বসবে কে? -
কখনও কখনও কোন শুভকর্ম উপলক্ষে আভ্যুদয়িক সময় হয়ত একবার মাত্র তাঁকে স্মরণ করবে তাঁর বংশধররা। তারপর দু-এক পুরুষ পরে তাঁর নামটাও আর মনে পড়বে ন। ‘যথানামো’ করে সারবে।
মনে মনে হাঁফিয়ে ওঠেন, ছটফট করতে থাকেন জয়ন্ত ঘোষাল। বাড়ি ছেড়ে দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোথাও যেতে পারেন না। কোথাও যে যাওয়া যায় তাও বোঝেন না। যাদের নিয়ে ইহলোক তাঁর - যাদের মধ্যে নিজের জগৎকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছিলেন - তাদের বাইরে আর কোথাও তাঁর স্থান নেই। বাড়িতে, পাড়ায়, বার লাইব্রেরীতে, সংগ্রেস অফিসে, য়্যাসেম্বলীতে, খবরের কাগজের অফিসে - কোথাও আর কেউ তাঁকে মনে করে রাখে নি। তাঁর জন্যে কেউ শোক করছে না, আপসোস করছে না। কোথাও একটুকু কাজ আটকে নেই কারুর।
এর চেয়ে যদি কখনই এত শোক কেউ না করত, যদি মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সকলের বেইমানিটা চোখে পড়তো এত দুঃখ বোধ হয় হত না। আনন্দ - উত্তেজনার উগ্র সুরা ক্রমাগত পান করার পর আজ তাঁর সব কিছু মাদক - উপকরণ ঘুচে গেছে। আজ তাঁর মতো হতভাগ্য কে! কী নিয়ে থাকবেন তিনি - এই বাড়িঘর, এই সমাজ, এই দেশের মধ্যে বিস্মৃত অবহেলিত এমনি ঘুরে বেড়াবেন?
নিজের নির্বুদ্ধিতায় নিজের অস্তিত্বহীন দেহের গালে-মুখে চড়াতে ইচ্ছে করে তাঁর। কেন এ দুর্বুদ্ধি হয়েছিল তাঁর - এ জন্মের জের পরজন্ম পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার। এমন দুর্বুদ্ধি যেন আর কখনও কারুর না হয়। হে ঈশ্বর, হে জগন্নাথ, এবার ক্ষমা করে ওকে - জয়ন্ত ঘোষালকে! এবার রেহাই দাও। এ জন্মের এই অদৃশ্য বন্ধন থেকে মুক্তি দাও!

আমার গ্রন্থাগারের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url