চাওয়া ও পাওয়া - গজেন্দ্র কুমার মিত্র
চাওয়া ও পাওয়া
তারিখটা মনে আছে - ২৩শে জানুয়ারী, নেতাজীর জন্মদিন। মনে আছে আরও এই জন্যে যে, সেদিনটা আমার বন্ধ ইন্দুভূষণেরও জন্মদিন। চারদিনের ছুটিতে ঘাটশীলায় গিয়েছি, সমবয়সী িএতগুলি লোক, বন্ধু ও বন্ধুস্থানীয় - একটা হৈ-চৈ করতে হবে বৈকি। তাই আর কোন উপলক্ষ হাতের কছে না পেয়ে খেয়াল চাপল ইন্দুভূষণের জন্মদিনটােই ‘সেলিব্রেট’ করতে হবে।
বলা বাহুল্য ব্যবস্থাটায় বন্ধুবরের নিজের ঘোর আপত্তি ছিল। কিন্তু সে আপত্তিতে কান দিতে গেলে আমাদের চলে না। আমাদের কাছে ব্যক্তিটা তথ্য এবং তুচ্ছ, উপলক্ষটাই বড়। কারণ তার দ্বারা আমাদের যা আসল লক্ষ্য - হৈ-চৈ, উৎসব এবং একটা মনের মতো ভোজ - তাতে পৌঁছনো যাবে। সে আয়োজনটাও করা হয়েছে লাগসই। সকালের মেনু ছিল আমার হাতে, মাছের মুড়ো থেকে শুরু করে নতুন গুড়ের পায়েস পর্যন্ত সব হয়ে গেছে - সন্ধ্যার ব্যবস্থাটা সর্তদার - স্থির হয়েছে মুর্গীর কোর্মা ও ঢাকাই পরোটা, তার সঙ্গে আনুষাঙ্গিক দু’একটা ছোটখাটো ব্যঞ্জন - চাটনি, কপির ডালনা প্রভৃতি; আর লালডি থেকে দ্বিজেনদা ও তাঁর বৌদি এনেছেন কয়েক রকমের পিঠা। আয়োজনের কল্পনাতেই রসনা লালাসিক্ত হচ্ছে, নিহাৎ দুপুরের ভোজনটা তখনও হজম হয়নি বলেই একটু অপেক্ষা করতে হচ্ছে, নইলে এবেলা কম খেয়ে উঠতে হবে।
মাঘের ঘোর শীত, তার ওপর পাহাড়ে জায়গা। আরও - মনে হয় সে বছর শীতটা একটু বেশীই পড়েছিল, ঐ সময়ের তুলনাতেও। সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বেরোনোর কল্পনাতেই মুখ শুকিয়ে যায় - প্রকৃতিক কাজগুলোও সারতে না পারলেই ভাল হয়, এমনি মনোভাব আমাদের।
সুতরাং সবাই মিলে দোর জানলা বন্ধ করে ভোলাদার বাইরের ঘরে জমিয়ে বসেছি। চা কফি তামাক চলছে অবিরত - তার সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবেই গালগল্প। রাজা - উজীর বধ তো তুচ্ছ কথা, সাক্ষাৎ ভগবানও রেহাই পাচ্ছেন না আমাদের হাত থেকে। ধর্ম থেকে রাজনীতি সর্বত্রেই আমাদের সমান অধিকার, চর্চিল থেকে জহরলাল সকলের থেকেই আমরা বেশি বুঝি, সকলেরই ভুল ধরবার যোগ্যতা ধরি আমরা।
তবু এ সবেও ক্লান্তি আসে বৈকি একসময়ে।
জিতেনবাবুই কথাটা তুললেন, ‘মরুকগে - বৌদি একটা ভূতের গল্প বলুন দিকি, সময়টার সদ্ব্যবহার হোক!’
বৌদি বিধবা মানুষ আমাদের ভোজে থাকবেন না, তিনি তখন বাড়ি ফেরার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, বিষন্নমুখে বললেন, ‘কিন্তু আমাকে যে বাড়ি যেতে হবে ঠাকুরপো - এই রাত্রে এতটা পথ - আমায় আর এখন আটকাবেন না।’
আমরা সকলে চিৎকার করে প্রতিবাদ জানালুম, ‘আরে এরই মধ্যে এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন! এই তো সবে আটটা - কলকাতায় যার নাম সন্ধ্যে রাত্তির। বসুন বসুন, গল্পটা শুনিয়ে যান, প্লীজ!’
আসল কথা বৌদির ভূতের গল্পে বেশ নাম আছে। সত্যি মিথ্যে জানি না - এ ব্যাপারে তাঁর স্টকও খুব বড়-সড়। যখনই ধরেছি দু’একটা গল্প বেরিয়েছে তাঁর ঝুলি থেকে, আর গল্পগুলোও কোনটাই তুচ্ছ নয় - বেশ জমাট, রোমহর্ষক যাকে বলে। এখন এই অলস অবসরে ভালই জমবে আরও, সেটা আমরা সবাই জানি, কথাটা মনে করিয়ে দেবার জন্য সবাই জিতেনবাবুর কাছে কৃতজ্ঞ বোধ করছি মনে মনে। আর সব চেয়ে বড় কথা - আমাদের তো বেরোতে হচ্ছে না বাড়ি থেকে - বৌদিই যাবেন এই ঠাণ্ডায় মাইলখানেক রাস্তা - তাতে আমাদের কি?
অগত্যা বৌদিকে বসতে হ’ল আবার চেপেচুপে, গল্পও বলতে হল একটা।
সে গল্প যেমন শুনেছি, মানে বৌদি যেমন বলেছিলেন, বিনা অলঙ্কারে বা অতিরঞ্জনে হুবহু এখানে তুলে দিচ্ছি।
বৌদি বললেনঃ
আমার বড় জ্যাঠামশাইয়ের সাধু তান্ত্রিক ধরা একটা বাতিক ছিল। কোথাও কারও বাড়ি কোন সন্ন্যাসী এসেছেন খবর পেলেই তিনি দৌড়বেন, তা কে জানে দশ মাইল রাস্তা, কে জানে কুড়ি মাইল। কে কী রকম সাধু, আসল কি ভণ্ড, এসব তাঁর বিচার ছিল না। গেরুয়া বা লাল কাপড় দেখছেন কি বড় জ্যাঠা তাঁর পায়ে উপুড় হয়ে পড়বেন আর কাঁদতে থাকবেন, ‘বাবা আমার কিছুই হল না, আমাকে ভক্তি দিন, ভগবানকে পাবার উপায় করে দিন।’
এ নিয়ে আমরা সবাই হাসিঠাট্টা করতুম - আমরা করতুম মানে বড়দের দেখাদেখি, বাবা কাকারা করতেই তাই - আমরা আর কি বুঝি, কিন্তু জ্যাঠামশাই তাতে ভ্রুক্ষেপও করতেন না। বেশী কিছু বলার সাহসও কারও ছিল না। আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের তিনিই সর্বজ্যেষ্ঠ, তাঁর ওপর কথা বলবে এত বাড় বুকের পাটা কারও ছিল না সেদিন। তাছাড়া আমাদের ও অঞ্চলে - অঞ্চল বলি কেন সমগ্র বিক্রমপুর পরগণাতেই তিনি ছিলেন একজন নামকরা লোক, সবাই এক ডাকে তাঁকে চিনত, যথার্থ খাঁটি মানুষ বলে সম্মান করত।
শেষের দিকে কিন্তু তাঁর মাথাটা একটু খারাপ হয়েই গিয়েছিল বোধহয়। তাশায় ঢুকেছিল তিনি এই চর্মচক্ষুতেই মাকে দেখবেন। আমাদের শাক্তবংশ, যে কোন উৎসবে অনুষ্ঠানে কালীপূজো ছিল বাঁধা - অকারণেও মাঝে মাঝে হত। আর যখনই হোক দেখেছি জ্যাঠামশাই পূজোমণ্ডপে গিয়ে “মা” “মা” বলে ডাকছেন আর মাথা খুঁড়ছেন, ‘মা, একবার সামনে এসে দাঁড়া।’ প্রথম প্রথম ভাবতুম এটা কথার কথা, সাধারণ ভক্তির প্রবাণ্য কিন্তু শেষে দেখা গেল, ওটা একটা ফিক্সেশ্যন হয়ে গেছে তাঁর - মন ঐ চিন্তাতেই আবদ্ধ হয়ে গেছে। মাথা খারাপ বলছি এজন্য যে তিনি আমাদের সুদ্ধ ধরে তর্ক বাধাতে চাইতেন - যুক্তি - রামকৃষ্ণ পরমহংস যদি মার দেখা পেয়ে থাকেন, রানী ভবানীর ছেলে রাজা রামকৃষ্ণ, সাধককবি রামপ্রসাদ যদি মাকে চাক্ষুস দেখে থাকেন, তিনিই বা কেন পারবেন না। ডাকার মতো ডাকতে পারলে মা কি দেখা না দিয়ে থাকতে পারবেন? অবশ্যই নেমে আসতে হবে তাঁকে, ধরা দিতে হবে।
এই সময় খবর এল বজ্রযোগিনীর শ্মশানে কে এক পাগলা সাধু এসেছেন - তিনি নাকি মহা তান্ত্রিক, সিদ্ধ সাধক।
ব্যস, আর যায় কোথায়। কথাটা কানে শোনার ওয়াস্তা। জ্যাঠামশাই তৎক্ষণাত রওনা হয়ে গেলেন। বজ্রযোগিনী আমাদের গ্রাম থেকে সাত আট মাইলের পথ - জ্যাঠামশাইয়ের বয়সও তখন প্রায় সত্তরের কাছাকাছি - তবে এসব তুচ্ছ তথ্যে জ্যাঠামশাইয়ের সেখানে ছুটে যাওয়া আটকাবে তা সম্ভব নয়। তাঁকে সবাই এটুকু চিনত বলে কেউই বাধা দেবার চেষ্টা করল না, শুধু এতটা পথ বুড়ো মানুষ একা যাচ্ছেন দেখে আমার ছোট কাকা সঙ্গে গেলেন।
জ্যাঠামশাই বাড়ি থেকে রওনা হয়েছিল বেলা চারটে নাগাদ - উনি আর খালি পায়ে বেরিয়েছিলেন, সাধু দর্শনে নাকি জুতো পায়ে দিয়ে যাওয়া ভারী অপরাধের - ফলে মাঠ পার হয়ে পৌঁছতে পৌঁছতেই বেশ রাত হয়ে গেল। ছোট কারার মুখেই শুনেছি আমরা - শ্মশানে তখন একটা মড়া পুড়ছে, আর সেই সাধক আপন মনে কি বিড়বিড় করে বকতে বকতে সেই চিতাটা ক্রমাগত প্রদক্ষিণ করছেন। সবটা জড়িয়ে সে এক ভয়ানক দৃশ্য; প্রধানতঃ লাল কাপড়, তার ওপর নানা রঙের নানা বস্তুর - সিল্ক থেকে কম্বল ছেঁড়া পযন্ত তালি দেওয়া আলখাল্লার মতো পোশাক, ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া এক মাথা চুল, গলায় ফকিরদের মতো কতগুলো কি মালা, কাঁচকড়াও আছে রুদ্রাক্ষও আছে - অবিশ্যি সেটা ছোট কাকার অনুমান, তখন ওসব শ্মশানে কোন আলোর ব্যবস্থা থাকত না, যারা রাত্রে মড়া নিয়ে যেত তারা নিজেরাই আলোর বন্দোবস্ত করত, কেউ লন্ঠন কেউ বা মশাল তৈরি করে নিত - এ মড়া যারা নিয়ে এসেছিল তারা বোধহয় কাপালিকের ভয়েই শ্মশানের বাইরে বহুদূরে গিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে ছিল, লন্ঠন যা দু একটা সঙ্গে এনেছিল তাও সব সেইখানে, কাজেই চিতার আগুনেই যা দেখেছিলেন কাপালিক বা তান্ত্রিক, যাই বলুন - সেই সাধককে।
অনুমান যেটা নয় সেটা হছে দুর্গন্ধটা। মড়া পোড়ার গন্ধ আলাদা, ছোট কাকা বলেছিলেন, এ এক বিশ্রী দুর্গন্ধ, পচা মাংস তার সঙ্গে দেশি পচাই মদ মিশলে যেমন গন্ধ হয় তেমনি। সেটা তাঁর গা থেকে কি পোশাক থেকেই বেরুচ্ছে তা বোঝা গেল না - এমনিও, দেখে মনে হয়েছিল ওর, বোধহয় বছর তিনেক গায়ে জল পড়ে নি, অর্থাৎ স্নান করেন নি। চুলে জট পাকিয়ে গেছে নোংরায়, বোধহয় পোকা কিলবিল করছে - কারণ মাঝে মাঝেই হিলহিল করে চুলকোচ্ছিলেন - তাতেও খানিকটা দুর্গন্ধ হয়েছে নিশ্চয় - সবটা জড়িয়ে কাচে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বত্রিশ নাড়িতে পাক দিয়ে উঠেছিল ছো কাকার।
জ্যাঠামশাইয়ের অত ঘেন্নাটেন্নার বালাই ছিল না, অত লক্ষ্যও করেন নি বোধহয় - উনি ওর অভ্যাসমতো এগিয়ে গিয়ে সাধকের পায়ে পড়তে গেলেন। তিনি ভ্রুক্ষেপও করলেন না বরং পায়ে কোন লতাপাতা বাজে জঞ্জাল জড়িয়ে গেলে পা ঝাড়া দিয়ে যেমন সেটা ছাড়িয়ে নেয় মানুষ, সেই ভাবেই লাথি মেরে ওকে সরিয়ে পা-টা মুক্ত করে নিলেন। ছোট কাকার বিশ্বাস, সাধক তখন আধ-পোড়া নরমাংস সংগ্রহ করার জন্যেই ঘুরছিলেন, ঠিক কোনখান থেকে তুললে নরম মাংস পাবেন, বাগমতো তুলতে পারবেন সেইটেই লক্ষ্য করছিলেন কারণ হাতে একটা বড় গোছেল চিমটে ছিল সন্ন্যাসীটির, কিছু একটা খুঁটে তোলাবার মতো করেই বাগিয়ে ধরা। বোধহয় - এই ভাবেই মাংস সংগ্রহ করে ঐ আলখাল্লার কোন পকেটে রেখেও দেন, সময়মতো বার করে খাওয়ার জন্যে, তাতেই এই পচা মাংসের দুর্গন্ধ।
যাই হোক - সন্ন্যাসীর লাথি খেয়ে নিরস্ত হবেন জ্যাঠামশাই সে পাত্র নন, বরং তাঁর শ্রদ্ধা বেড়েই গেল আরও। তিনি আবারও ছুটে গিয়ে পায়ে পড়ে হাউহাউ করে কেঁদে উঠলেন, ‘বাবা দয়া করুন। অকৃতী অধম সন্তানকে নিজ্ গুণে (জ্যাঠামশাই অকারণে নিজ শব্দে হসন্ত ব্যবহার করতেন) কৃপা করুন!’
এবার সে সন্ন্যাসী - অবিশ্যি যদি তাঁকে সন্ন্যাসী বলা চলে -থমকে দাঁড়ালেন, কঠিন কন্ঠে বললেন, ‘এই ব্যাটা, এ আবার কি ঢঙ রে! ব্যাটা আার সঙ্গে - করতে এসেছ!’ মধ্যে খুব একটা নোংরা শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন, সেটা আর আপনাদের কাছে বলতে পারব না!-
তারপর এই চলল কিছুক্ষণ ধরে। জ্যাঠামশাই যত কাকুতিমিনতি করেন সে সন্ন্যাসীও তত গালিগালাজ মুখখারাপ করেন। একবার তো একটা আধ-জ্বলন্ত কাঠ নিয়ে তেড়ে এলেন, ‘মেরেই ফেলব শালাকে, পুড়িয়ে মারব। ঐ এক শবে তুলে দোব। ব্যাটা নেকু, ন্যাকমি করতে এসেছেন! ব্যাটা আকন্ঠ ভোগে ডুবে আছেন, পা থেকে মাথা পর্যন্ত বিষয়ের মদে চুরচুরে - ব্যাটা সাধু দেখে পায়ে পড়তে এসেছেন। নিজ কষ্টটষ্ট কিচু করতে পারব না, বাবা, তোমার কাঁধে চেপে ভবনদী পার হবো! তুমি এত কাণ্ড করে মেহনত করে যা কিছু করেছ আমাকে দিয়ে সরে পড়ো! - ব্যাটা, এক নম্বর বদমাইশ - হারামী, হারামীর বাচ্ছা!’
কিন্তু সে যতই যা বলুন, জ্যাঠামশাই অচল অটল। পোড়া কাঠ নিয়ে তেড়ে আসবার সময় ছোট কাকা পালিয়েছিলেন, বড় জ্যাঠা এক পাও নড়েন নি। বোধহয় এই ধৈর্যেরই জয় হল। বাবা নরম হলেন। বললেন, ‘কী, কী চাস ব্যাটা তুই, য়্যাঁ? বলি শালা তোর মতলবটা কি? খুলে বল দেখি!’
‘বাবা - দয়া করে একটিবার আমার বাড়িতে চলুন, শ্রীচরণের ধুলো দিন। আপনি রাজি হলে গরুর - গাড়ি পালকি যা বলবেন ব্যবস্থা করব - কিচ্ছু কষ্ট হবে না-’
‘ওর শালা, যে শ্মশানে থেকে মড়ার মাংস খায় - তাকে তুই কষ্টর কথা কি বলছিস রে শালা? য়্যাঁ!’
তারপর কে জানে কেন খুব জোরে হেসে উঠলেন হা-হা করে, অট্টহাস্য যাকে বলে। তারপর বললেন, ‘সব্বনাশের খুব শখ হয়েছে - না? তাই আমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে চাইছিস? শালা আমি গেরস্ত-বাড়ি যাব কি রে, য়্যাঁ? কখনও কোন মন্দিরে মসজিদে যাই না। শালা আমি যেখানে যাব সেই তো শ্মশান হয়ে যাবে। তোর বাড়ি শ্রীচরণের ধুলো দিলে তোদের বংশে বতি দিতে কেউ থাকবে না, সব শ্মশান হয়ে যাবে। দ্যাখ, ভেবে দ্যাখ - নিয়ে যেতে চাস?’
জীবনে এই প্রথম জ্যাঠামশাই যেন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। বোধহয় তাঁর একার সংসার হলে এতটুকুও ইতস্ততঃ করতেন না, এখানে সাত ভাইয়ের সংসার, একান্নটি লোক বাড়িতে। এতগুলো লোককে বিপদের মুখে ঠেলে দেবার তাঁর অধিকার নেই - এই কথাটাই বোধহয় মনে হল তাঁর।
ওঁকে চুপ করে যেতে দেখে আবারও হা-হা হেসে উঠলেন সাধক। তবে তার পরই গলার আওয়াজটা আশ্চর্য রকম ভাবে কোমল হয়ে এল, বললেন, ‘ওসব ছাড়। তোর আসল মতলবটা কি বল দিকি শালা। কি চাস তুই?’
‘বাবা - অপরাধ নেবেন না, মাকে একবার দেখতে চাই, বড্ড বাসনা প্রাণে। একবারটি দেখিয়ে দিন, আপনার কেনা গোলাম হয়ে থাকব!’
‘ওরে শালা! তুই তো দেখি মহা সাউকার! শালা এত লোক এত কষ্ট করে ঘুরে বেড়াচ্ছে যাকে দেখবার জন্য - তুই শালা বিনি মেহনতে বিনি কষ্টয় পায়ের ওপর পা দিয়ে ঘরে বসে রাজভোগ খেতে থেকে তাকে দেখবি! তোর আম্বা তো কম নয়। য়্যাঁ। বলিস কি রে ব্যাটা! য়্যাঁ। মহা ধড়িবাজ ফন্দিবাজ লোক দেখি! সেই জন্যে ব্যাটা এত কাকুতিমিনতি, এত পায়ে পড়া! এই জন্যে আমাকে বাড়ি নেবার এত ফন্দি! ওরে হারামীর বাচ্ছা! - আবার বলে কেনা গোলাম হয়ে থাকব। - সে বেটিকে দেখার পর কার কেনা গোলাম হবি রে শালা, তুই কোথায় থাকবি আর আমি কোথায় থাকব! - ভণ্ডামির জায়গা পাও নি শালা। জেনে শুনে ন্যাকামি!’
এমনি আরো অকথ্য কুকথ্য গালিগালাজ দিতে লাগলেন পাগল সন্ন্যাসী - অনেক্ষণ ধরে। কিন্তু যতই গালমন্দ দিন, গায়ে থুথু দিন - এর মধ্যে দু ধাবড়া থুথুও দিয়েছেন জ্যাঠার মুখে - বড় জ্যাঠার ধৈর্য আর অধ্যাবসায়ের কাছে তাঁকে হার মানতেই হল। একটু একটু করে নরম হয়ে এলন সন্ন্যাসী। আগের থেকে অনেক কোমল কন্ঠে বললেন, ‘দ্যাখ এসব পাগলামি করসি নি, এসব করতে নেই। মা আমার সর্বনাশিনী শ্মশানবাসিনী - গেরস্ত মানুষদের তাঁকে দেখতে চাইতে নেই। রামকৃষ্ণ রামপ্রসাদ এঁরা সন্ন্যাসী ছিলেন, রাজা রামকৃষ্ণও তাই - গুপ্তসন্ন্যাসী - তা ছাড়াও অতবড় রাজত্বর কিছুই তো রইল না দেখলি। - ঘর ছেড়ে আয়, তার পর তাঁকে দেখতে চাস - ছেলেপুলে নিয়ে বাস করিস এসব মতলব করিস নি।’
ভালই বলেছিলেন সন্ন্যাসী, পাগলের মতো নয় - বুদ্ধিমানের মতো জ্ঞানবানের মতোই যুক্তিপূর্ণ কথা বলেছিলেন। কিন্তু আসল পাগল হয়ে গিয়েছিলেন আমার জ্যাঠামশাইই, তিনি কোন সদযুক্তিতেই কর্ণপাত করলেন না। আসলে এতদিনের আশা তাঁর, মাথার মধ্যে একটা স্থির ধারণা হয়ে গেছে - যে আশা সবাই বলছে অবাস্তব, যা নিয়ে হাসিঠাট্টা করেছে, পাগল বলেছে তাঁকে - সেই আশা হয়ত ফলবতী হতে পারে এঁর কৃপায় - সেইটুকা আভাস মাত্রে তিনি যেন আরও ক্ষেপে উঠেছেন তখন, আরও হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছেন, কোন কথাই আর শুনতে প্রস্তুত নন। তিনি বরং আরও আড় হয়ে পড়লেন - সবলে পা জড়িয়ে ধরলেন সেই সন্ন্যাসীর, ‘বাবা, দোহাই আপনার, একাবারটি দেখান মাকে, বড় আশা আমার। তার পরমুহূর্তে মরে গেলেও কোন দুঃখ নেই। আপনি ইচ্ছে করলেই হয়!’
চিতাটা নিভে এসেছিল ততক্ষণে। ওঁরাও কথা কইতে কইতে দূরে সরে এসেছেন খানিকটা, সেই জন্যই হোক, আর দুজন সহজ সুস্থ মানুষ আসার জন্যেই হোক - ভরসা পেয়ে শবযাত্রীরা এবার এগিয়ে এসে চিতা খুঁচিয়ে দিতে লেগে গেছে। সন্ন্যাসী সেদিকে চেয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন, একটু একটু করে তাঁর একটা দুর্জ্ঞেয় রহস্যময় হাসির আভা ফুটে উঠল যেন - তারপর হঠাৎ আমার জ্যাঠামশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যা ব্যাটা। দেখা পাবি মায়ের। তবে কী রূপে সে বেটি দেখা দেবে. তা আমি বলতে পারবো না। সামনের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর দিন - বেলা ঠিক আড়াইটের সময়, মা তোদের বড় পুকুরের জল থেকে উঠে দেখা দেবেন। ঐ সময় - পাঁজি দেখে নিস, ত্রয়োদশী ছাড়ছে, চতুর্দশী লাগছে, ঠিক সেই ক্ষণে। তবে সে এমনি হবে না - তোদের বাড়িতে একটি শ্যামবর্ণের ষোড়শী মেয়ে আছে কুমারী, তার বাঁ হাতের তর্জনীতে একটা লাল তিল আছে দেখে নিস, সেই মেয়ে যেন উপবাস করে থেকে বেলা দুটোর সময় ঐ পুকুরেই স্নান করে হাতে একশ আটটি দূর্বা নিয়ে ভিজে কাপড়ে এলোচুলে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তবেই মা দেখা দেবেন, নইলে নয়। তবে এখনও বলছি, এসব মতলব ছাড়, এতে ভাল হবে না তোর। সূর্যেই আমাদের সকলের জীব তবু সেই সূর্যের দিকে চাইলে চোখ অন্ধ হয়ে যায়। মা সকলেরই - কিন্তু মাকে দেখারও যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।’
ছোট কাকা কাছেই ছিলেন, সব কথা স্পষ্ট শুনেছেন। এবার তাঁরও একটু আস্থা হল। কারণ যে মেয়েটার কথা কাপালিক বলেছেন সে মেয়েটি তারেই, আমার খুড়তুতো দিদি, তার নামও শ্যামা, সবে মাস দুই আগে সে ষোল বছরে পা দিয়েছে। শ্যামবর্ণ বটে কিন্তু ভারী সুন্দর দেখতে ছিল, এক ঢাল চুল - খুলে দিলে সারা পিঠ পাছা পর্যন্ত ঢেকে যেত। তার বাঁ হাতের তর্জনীতে একটা লাল তিলও আছে - আমরা সবাই লক্ষ্য করেছি। লাল বলেই বোধহয় লক্ষ্যে পড়েছে সকলের, কালো মেয়ের আঙ্গুলে লাল তিল বলেই। ঠিক দেখলে মনে হত এক ফোঁটা লাল কালি পড়েছে কী করে। এই মেয়েটিই যে তালে মায়ের চিহ্নিতা সেবিকা হিসেবে নির্বাচিত হল - মনে করে ছোট কাকার বেশ একটু গর্বও বোধ হয়ে থাকবে হয়ত।
ওঁরা ফিরে আসার পর মহা তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল বাড়িতে। কথাটা আর কাউকে বলা হল না, এত কস্টে অর্জিত সৌভাগ্য বিনা আয়েসে অপরে ভাগ বসাবে সেটা কারুরই মনঃপুত নয়। তবু - আত্মীয়-মহলে একটু জানাজানি হয়েই গেল কী করে, সকলেই, যাকে বলে রুদ্ধ-নিঃশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগলেন সেই মহ-প্রতীক্ষিত দিনটির।
অবশ্য তার বিশেষ দেরিও ছিল না। জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে যেদিন সন্ন্যাসীর কথা হয় সেদিন ছিল অষ্টমী, মধ্যে আর পাঁচটি দিন মাত্র। এদিকেও যেমন তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল ওদিকেও তেমনি আমার সেই দিদি শ্যামার মাহ খাতির বেড়ে গেল বাড়িতে। সকলে যেন দিনরাত তাকে আগলে আগলে নিয়ে বেড়াতে লাগল, সকলেরই চোখে একটা সম্ভ্রম আর বিস্ময়ের দৃষ্টি। জেঠিমা কাকীমার দল তো উঠে পড়ে লাগলেন সাধ-খাওয়ানোর মতো ওকে ভালমন্দ এটা ওটা রেঁধে খাওয়াতে।
অবশেষে ত্রয়োদশীর দিনটি এসে গেল। মা ভোরে উঠে স্নান সেরে এসে ভোগ রাঁধতে শুরু করলেন। জ্যাঠামশাই আগের দিন থেকে উপবাসী আছেন -তিনিই পূজা করবেন স্থির ছিল। সেই মতোই ফুল দুর্বা ইত্যাদি তুলে বেছে প্রস্তুত করতে লাগলেন। মেয়েরা ও পুরুষরা সকলেই উপবাসী রইলেন সকাল থেকে, কেবল আমার এক পিসীমা বাচ্ছাদের খাইয়ে একসময় নিজে স্নান করে এলেন। বেলা একটা কে পুকুরপাড়ের অনেকটা জায়গা নিয়ে পূজোর জিনিস সাজানো হল, মা এসে ভোগ ও নৈবেদ্য সাজিয়ে বড় বড় কলার পাতা দিয়ে ঢেকে রাখলেন, ঠিক সময়মত খুলে দেওয়া হবে।
দুটো বাজলেই শ্যামা স্নান করতে নামল। তার আগেই বড় জ্যাঠা তার হাতে একশো আটাটি দূর্বার আঁটি তৈরি করে ধরিয়ে দিয়েছিলেন, ঘিয়ে সিঁদুর গুলে কপারে টিপ দেওয়া হয়েছে - যাতে জলেও ধুয়ে না যা। স্নান করে ভিজে কাপড়ে ভিজে চুলের রাশ পিঠে এলিয়ে শ্যামা দু’হাত জোড় করে উত্তরাস্য হয়ে যখন দাঁড়াল, তখন সত্যি কথা বলতে কি আমাদেরেই বেশ ভক্তি হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল ওকে প্রণাম করে পায়ের ধুলো নেই।
তারপর এক সময় দুটো চৌত্রিশ মিনিট হল ঘড়িতে। ঘড়ি আগে থাকতেই সাবধানে মিলিয়ে রাখা ছিল। জ্যাঠা এক হাতে অর্ঘা আর এক হাতে ঘন্টা নিয়ে আসনের ওপর দাঁড়িয়ে উঠলেন। মেয়েদের হাতে হাতে শাঁখ। বাবা কাকারা সবাই মিলে কালীর স্তব করতে লাগলেন অনুচ্চ কন্ঠে। মহামায়া মা যে ঐ সময়টিতে পুকুরের জল থেকে উঠবেনই, যে বিষয়ে আমাদের মনে কোন সংশয় ছিল না, সুতরাং সেই ভাবেই আমারা প্রস্তুত ছিলাম।
উঠলেনও মা। ঠিক নির্ধারিত সময়টিতেই উঠলেন।
কিন্তু সে যে কী রূপ ধরে উঠলেন মা, কী যে দেখলাম - তা ঠাকুরপো আপনাদের ঠিক বোঝাতে পারব না। এই দেখুন, এতকাল পরেও, মনে হওয়ামাত্র আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে, গায়ে ডোল দিচ্ছে বারবার। -
কী দেখলাম সেটা বলার আগে আর একটা কথা বলে নেওয়া দরকার। আমাদের ঐ বড় পুকুরটার পশ্চিম দিকে সরু এক ফালি জমি ছিল, বড়জোর হাত কুড়ি চওড়া - তারই পরে বিল শুরু হয়েছে, প্রকাণ্ড বিল। ওর মধ্যে আমাদের ভাগ ছিল অর্ধেক, বাকী অন্য শরিকদের। এই বিলের সঙ্গে নাকি এককারে সমুদ্রের যোগ ছিলো - লোকমুখে শুনেছি, এখনও হয়ত অন্য নদীর সঙ্গে যোগ আছে, কারণ জোয়ারের সময় জল বাড়ে।
ঠিক দুটো বেজে চৌত্রিশ মিনিটে - পুকুরের মাঝখানে নয় - ঐ পশ্চিম দিক ঘেঁষে একটা আলোড়ন উঠল জলের মধ্যে, যেমন বড় ঘেটো রুই ঘাই মারলে হয়, কি শুশুক ডিগবাজি খেলে - তার পরই একটা ভয়ানক মূর্তি উঠল জল থেকে আস্তে আস্তে। সিংহের কেশরের মতো ঝাঁকড়া এক মাথা চুল; মুখখানা কুকুরে-মানুষে মিলানো কিম্ভুতকিমাকার ধরণের - তার মধ্যে গোল দুটো চোখ, লাল ভাঁটার মতো জ্বলছে যেন; কাঁ: পর্যন্ত উঠল মানুষের মতো, বাকিটা লোমশ জন্তুর দেহ; সামনের দুই পা থাবা, পেছনের পা দুটো অপেক্ষাকৃত ছোট - অনেকটা কুমীরের পায়ের মতো দেখতে কিন্তু হাঁসের পায়ের মতো জোড়া, তবে হাঁরেস চেয়ে অনেক বড়, শুনেছি ভোঁদড়েরও ঐ রকম পা হয় - দেখি নি কখনও; পুকুরের মধ্যে প্রবল যেন এক ঘূর্ণির সৃষ্টি করে জন্তুটা জল থেকে উঠে লাল আগুনের মতো সেই জ্বলন্ত দৃষ্টিতে একবার আমাদের দিকে চেয়েই ঐ ডাঙ্গাটা পেরিয়ে গিয়ে ঝপাং করে বিলের জলে পড়ল - আর তার কোন চিহ্ন দেখা গেল না। শুধু যেখানটায় পড়েছিল অনেক্ষণ ধরে বিলের সেইখানটাকে কেন্দ্র করে জলে কতকগুলো তরঙ্গবলয় উঠতে লাগলো!
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘটনাটা ঘটতে তিন চার মিনিটের বেশি সময় লাগে নি। কিন্তু সেইটুকুই যথেষ্ট। মেয়েদের হাতের শাঁখ হাতেই রয়ে গেল, নৈবদ্য ও ভোগের ঢাকা খোলার কথাও মনে রইল না কারো। জ্যাঠামশাই তো পাথর হয়ে গেছেন একেবারে - তাঁর এতদিনের আশাকে যে মা এই রকম নিষ্ঠুর ভাবে ব্যঙ্গ করে যাবেন তা বোধহয় তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নি। কাকাদের মুখের স্তোত্র থেমে গিয়েছিল অনেক্ষণই - সকলেই একটা অজানা বিমুঢ় ভয়ে স্তম্ভিত আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিলেন।
এমনই অবস্থা সকলকার যে সকলের আগে যার দিকে নজর দেওয়া উচিত ছিল, তার কথা এতক্ষণ কারও মনেও পড়ে নি। মুর্তিটা বিলের জলে ডুব দেওয়ার দু তিন মিনিট পরে যখন শ্যামাও অজ্ঞান হয়ে জলে পড়ে গেল তখন সকলের হুশ হল।
তাড়াতাড়ি জলে লাফিয়ে পড়ে ছোট কাকাই তুললেন তাকে। কিন্তু প্রাথমিক যা কিছু করার করা হলেও তার জ্ঞান এল না। যার যা জানা ছিল সব রকম টোটকা চিকিৎসা করেও না। তখন ডাক্তার ডাকা হল। ডাক্তার এসে কী সব ইনজেকশন দিলেন, জোর করে দাঁত ফাঁক করে ফোঁটা ফোঁটা ব্র্যাণ্ডি দিলেন - তাতে চোখ চাইল, একটু নড়ল -কিন্তু কাউকে চিনতেও পারল না, কোন কথাও কইল না।
এদিকে, শ্যামাকে নিয়ে সবাই ব্যস্ত বিব্রত, জ্যাঠামশাই তো সেই যে ঠাকুরঘরে গিয়ে পড়েছেন - উঠছেনও না, মুখে এক ফোঁটা জলও দিচ্ছেন না। সন্ধ্যা থেকে বাড়ির চারপাশে একটা অদ্ভুত ভয়াবহ কুকুরের কান্না উঠল। এমনিই কুকুর - কাঁদা বলে অলক্ষণ - তার ওপর এমন বীভৎস কান্না কেউ কখনও শোনে নি, যখনই কেঁদে ওঠে আমাদের সকলের গায়ের রক্ত হিম হয়ে যায় - ভয়ে বুকে ঢেঁকির পাড় পড়তে থাকে। পুরুষেরা বার বার লাঠি আর লন্ঠন নেয়ে দেখে আসতে লাগলেন, শেষ পর্যন্ত বেড়াজালের মতো করে বাগানটা ঘিরে খোঁজ করা হল কিন্তু সে কুকুরের চিহ্ন পর্যন্ত দেখা গেল না কোথাও। অথচ সকলে এসে বাড়িতে ঢুকলেই সেই কান্না ওঠে, বাড়ির খুব কাছে, জানালার ধারে।
আমাদের বাড়িটা ছিল ছড়ানো - ছেটানো - পাকা - দেওয়াল - মাথায় - খড়ের চাল বড় বড় দু’তিনখানা করে ঘর এক এক জায়গায় - সবগুলো ঘিরে, ঘিরে কেন সকলের মধ্যেও, বড় বড় উঠোন, তার পর পাঁচিল, পাঁচিলের বাইরে বাগান। কখনও মনে হয় উঠোনের মধ্যে, জানলার ঠিক চিনেই কাঁদছে দাঁড়িয়ে, কখনও মনে হয় পাঁচিলের বাইরে। বিশেষ লক্ষ্য যেন শ্যামার বা ছোট কাকার ঘরটাই। কিন্তু সেও যেমন সারারাত ধরে কাঁদল আমরাও প্রায় সারারাত ধরেই খুঁজলাম, সে কুকুর কোথাও দেখা গেল না। মনে হল অশরীরী কিছু কুকুরের ডাক অনুসকণ করে ডাকছে। আরও সঙ্গে সঙ্গে দুপুরে দেখা সেই মূর্তিটা মনে পড়তেই আমরা যেন আতঙ্কে জন্তু হয়ে গেছিলাম সেই রাত্রে, কারও কোন কাজে হাত পা উঠছিল না, কেউ ভাল করে পরস্পরের সঙ্গে কথাও কইতে পারছিলাম না। কেবলই মনে হচ্ছিল ভয়ানক একটা কিছু অমঙ্গল ঘটবে এ বাড়িতে, কাপালিক ঠিকই বলেছিল, জ্যাঠামশাইয়ের এ আগ্রহ না করলেই হত।
শ্যামা সারারাতই তেমনি অজ্ঞান অচৈতন্য হয়ে রইল। বাবা সাইকেলে করে গিয়ে আরও একজন ডাক্তার নিয়ে এলেন পাশের গ্রাম থেকে - কিন্তু কেউই কিছু করতে পারল না। একবার যেন মনে হল ঠোঁটা নড়ল শেষ রাত্রের দিকে - ছোট কাকা বললেন, ওঁর দীক্ষার বীজমন্ত্রটাই নিঃশব্দে উচ্চারণ করল মেয়ে, তবে সে সবটাই ওর অনুমান হতে পারে - কারণ আমরা কিছুই বুঝতে পারলুম না -তারপর রাত চারটে বাজার সঙ্গে সঙ্গে, পুব আকাশে ভোরের আভাস লাগতে না লাগতে সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। সেই সময়টা, মিনিট দশেক ধরে কুকুরটাও যা বাড়িয়েছিল কী বলব, অমন বীভৎস ভয়ঙ্কর স্বর বোধহয় কেউ কখনও শোনে নি, আমাদের বাড়ির পুরুষরা পর্যন্ত ভয়ে কাঠ হয়ে গেছিলেন, ডাক্তারবাবু বসে ছিলেন, তিনি ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলেন সেই চিৎকার শুনে। কিন্তু আশ্চর্য এই শ্যামা মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই কান্নাও থেমে গেল, আর একবারও শোনা গেল না! সেদিনও না, তার পরেও আর কোন দিন নয়।
জ্যাঠামশাইও আর বেশীদিন বাঁচেন নি। এই ব্যাপারের জন্যে স্বভাবতঃই তনি িনজেকে দায়ী বোধ করতে লাগলেন, লজ্জায় যেন কারও সামনে আর মাথা তুলতে পারতেন না, ছোট কাকার সামনে তো নয়ই। একদিন ছোট কাকার পায়ে ধরে মাপও চাইতেও গিয়েছিলেন - ছোট কাকা খুব বকাবকি কান্নাকাটি করায় তবে নিরস্ত হন। অমন যে অষ্টপ্রহর ‘মা’ ‘মা’ ডাক - এই ঘটনায় তাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। খাওয়াদাওয়া তো ছেড়েই দিয়েছিলেন বলতে গেলে। ঠিক মনে নেই, তবে বোধহয় শ্যামার মৃত্যুর ঠিক একুশ দিনের দিনই জ্যাঠামশাই মারা গিয়েছিলেন।

আমার গ্রন্থাগারের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url