শ্যাডো প্রাকটিস - প্রচেত গুপ্ত
শ্যাডো প্রাকটিস
আওয়াজটা শুনে মনে হল মোটরবাইক নয়তো স্কুটার। ঠিক ধরেছি। হেডলাইটের তীব্র আলো এসে বন্ধ জানলার উপর আছড়ে পড়ল।
যাক বাবা, আর ভয় নেই। গেস্ট হাউজে এখন আর আমি একা নই। ক’টা বাজে? মেরে-কেটে সাতটা। কলকাতায় সন্ধে সাতটা মানে কিছুই নয়, আর এখানে সাতটা মানে রাত। তার উপর যা ঠান্ডা পড়েছে, বাপ রে! বিকেল হতে না-হতে রাস্তা ফাঁকা। আমাদের এই গেষ্টহাউজটা আবার শহর থেকে খানিকটা সরে। স্টেশন থেকে অটো করে এসেছি। গেষ্টহাউজের সামনের রাস্তাটা টপকালে ধূ ধূ প্রান্তর। ফলে এদিকটায় রাত যেন আরও তাড়াতাড়ি নামছে।
কে এল?
যে-ই আসুক, নিশ্চিন্তির নিশ্বাস ফেললাম। নিশ্চিন্ত দুটো কারণে। এক, গা-শিরশিরে বিশ্রী ভয়টা কাটল, আর দু’নম্বর হল, আমার প্রেস্টিজ রক্ষা পেল। সবাই ফিরে এসে যদি দেখত, ভয়ে মুখ শুকিয়ে, ঘরে বসে ঠকঠক করে কাঁপছি, কেলেঙ্কারি হত। কলকাতায় ফিরে মুখ দেখাতে পারতাম না। স্কুলে জানাজানি হয়ে যেত। সবাই হাসত।
“আমাদের সাসাও তা হলে ভয় পায়? জানতাম, ঠিক একদিন ধরা পড়বে। ওর বীরত্ব যত কলকাতা শহরে, ফটফটে আলোয়। যাও, ওর সাসা নাম বাতিল করা হল।”
আমার নাম সাত্যকি রায়। স্কুলে আমার সাহস নিয়ে নামডাক আছে। বন্ধুরা তাই ডাকে ‘সাসা’। মানে হল, ‘সাহসী সাত্যকি’। ‘সাসা’ নাম যদি বাতিল হয় সেটা খুব লজ্জার হবে।
আবার আওয়াজ। এই শব্দটাও আমার চেনা। পায়ের শব্দ। গেট দিয়ে ঢোকার পর গেস্ট হাউজের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে একটা ছোট্ট বাগান পেরোতে হয়। বাগানটা সুন্দর। মাঝখান দিয়ে সুড়কির পথ। ওই পথে হাঁটলে এরকম শব্দ হয়।
রাতে কেয়ারটেকার প্রসাদদা বাইরের বড় লোহার গেটে তালা দিয়ে দেয়। চারপাশে উঁচু পাঁচিল। ফলে যতই নির্জন এলাকা হোক না কেন, কেউ যে হুট করে ঢুকে পড়বে, সে সুযোগ নেই। প্রসাদদা শুধু কেয়ারটেকার নয়, এই গেস্ট হাউজের রাঁধুনিও বটে। কাল থেকে আমাদের দেশি মুরগির ঝোল আর হাঁসের ডিমের কালিয়া রেঁধে খাওয়াচ্ছে। আহা, কী স্বাদ! আমরা ঠিক করেছি, যাওয়ার আগে প্রসাদদাকে একটা মেডেল দিয়ে যাব। মেডেলের নাম হবে, ‘ডিমের কালিয়া মেডেল’।
আমরা কলকাতা থেকে এখানে এসেছি ক্রিকেট ম্যাচ খেলতে। আমাদের স্কুলের ক্রিকেট টিমের যথেষ্ট খ্যাতি। আমি সেই টিমের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটসম্যান। আমাদের গেম টিচার মোহিতস্যারের খুব উৎসাহ। আমাদের টিমকে নিয়ে গর্বও করেন। শীতের সময় বিভিন্ন স্কুলের সঙ্গে আমাদের ক্রিকেট ম্যাচের ব্যবস্থা করেন। কলকাতার ভিতরে তো হয়ই, কলকাতার আশেপাশেও যাই। এবার একটু দূরে এসেছি। বিহারের এক ছিমছাম শহরে। কাল সকালে এসেছি। মেহিতস্যারের সঙ্গে আমরা মোট বারোজন ছেলে। আমাদের ইতিহাস স্যারেরও আসার কথা ছিল, শেষ মুহূর্তে আটকে গিয়েছেন। কাল ম্যাচ খেলে রাতের ট্রেনে ফিরে যাব।
ম্যাচ হবে এখানকার এক বোর্ডিং স্কুলের টিমের সঙ্গে। ওরাই আমাদের থাকার ব্যবস্থা করেছে। দারুণ ব্যবস্থা। এই গেস্ট হাউজটা দুটো বাড়িতে ভাগ করা। সামনে-পিছনে দুটো একতলা বাড়ি। মাঝখানে রান্নাঘর, খাওয়ার জায়গা। এই দুটো বাড়িতে আমরা ছড়িয়েছিটিয়ে রয়েছি। পাশেই মাঠ। কাল বিকেলে আর আজ সকালে সেখানে প্রাকটিস করেছি। তবে আজ প্রাকটিস করার সময় একটা মুশকিল হয়েছে। অর্ণবের করা একটা ‘হঠাৎ লাফিয়ে ওঠা’ বলকে আটকাতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গিয়েছি। বল আমার লেগ স্ট্যাম্পকে দিল উলটে। আমার স্টান্সটা ছিল ‘ব্যাক ফুট ডিফেন্স’। বুঝতে পারিনি, শেষ মুহূর্তে বলটা অমন লাফাবে। পড়ে গিয়ে বুঝতে পারলাম ভঙ্গিতে কোনও ভূল হয়েছে। আবার খেললাম। রানা একই রকম বল করল, একইভাবে পা পিছিয়ে নিয়ে বল ঠেকালাম, কিন্তু ক্যাচ উঠে গেল। না, ‘ব্যাক ফুট ডিফেন্স’ - এ বারবার গোলমাল করে ফেলছি। তারপর থেকে চিন্তাতেই রয়েছি।
মাঠে পড়ে যাওয়ার সময় বুঝিনি, দুপুরের পর ডান পায়ের হাঁটুতে ব্যাথা অনুভব করলাম। এদিকে আজ আমাদের রাতে খাওয়ার নেমন্তন্ন। যে বোডিং স্কুলের সঙ্গে ম্যাচ, তারাই নেমন্তন্ন করেছে। সাধারণত এটা ম্যাচের দিন রাতে হয়। কিন্তু কাল রাতেই তো আমরা কলকাতা ফেরার গড়ি ধরব, তাই আগাম আয়োজন। খাওয়ার আগে একটু গল্পগুজব, গানবাজনা হবে। একটু লাফালাফিও কি হবে না? আমি গেমটিচারের কাছে গেলাম।
“স্যার, আমি যাব না। কোনও কারণে যদি ব্যাথা পায়ে আবার লাগে, কাল ম্যাচের সময় মুশকিল হবে।”
স্যার একটু ভেবে বললেন, “কথাটা ঠিক। তা হলে বরং আমি তোমার সঙ্গে গেস্ট হাউজে থেকে যাই। ছেলেরা ঘুরে আসুক।”
আমি বললাম, “তা কী করে হয় স্যার? ওদের মাস্টারমশাইরাও থাকবেন। আপনি না গেলে কী করে হবে? আপনি যান।”
স্যার বললেন, “তুমি একা থাকবে?”
আমি হেসে বললাম, “একা থাকতে অসুবিধে কোথায়? ঘরে বসে গল্পের বই পড়ব।”
মোহিতস্যার চিন্তিত মুখে বললেন, “একা থাকতে ভয় করবে না তো?”
স্যারের পাশে ছিল ক্লাস টেনের বিল্ব। আমাদের উইকেটকিপার। সে বলল, “সাত্যকিকে নিয়ে একদম ভাববেন না স্যার। ওর মনে ভয় বলে কিছু নেই। ভূতের ভয়ও পায় না। ও বলে ভূত বলে নাকি কিছু নেই। ওদের ক্লাসের ছেলেরা ওকে ডাকে সাসা। সাহসী সাত্যকি। কী রে সাত্যকি তাই তো?”
মানে-মনে গর্ব হলেও মখে লজ্জা পাওয়া ধরনের হেসে বললাম, “ধুস্স। স্যার, নিশ্চিন্তে যান। তা ছাড়া প্রসাদদা তো রইলই।”
স্যার আমার পিঠে হাত রেখে হেসে বললেন, “ভয় না পাওয়া খুব ভাল। সাবধানে থাকবে। আমরা একটু আগে বেরিয়ে পড়ব। এখানে একটা পার্ক আর টিলা রয়েছে, সেগুলো দেখে নেমন্তন্নে যাব। তোমার খাবার নিয়ে ফিরব। বিল্ব, যাও সবাইকে রেডি হতে বলো।”
সত্যি, ছোটবেলা থেকে আমার ভয়ডর কম। ভূতের ভয় তো একেবারেই নেই। ভূত আমি বিশ্বাসই করি না। রাতে একা ছাদে যেতে আমার ভয় করে না। এটা বাড়িতে যেমন জানে, বন্ধুরাও জানে।
যাই হোক, স্যারকে বলেছিলাম, প্রসাদদা থাকবে, প্রসাদদা অবশ্য নেই। বিকেলে আমাকে একবাটি মুড়িমাখা দিয়ে বলল, কোথায় যেন ভোজপুরি গানের আসর বসবে, সেখানে যাচ্ছে। যেহেতু আজ সকালের নেমন্তন্ন এবং আমার খাবার আসবে, রান্নাবান্নারও ঝামেলা নেই।
আমি বললাম, “অবশ্যই যাও প্রসাদদা।”
প্রসাদদা বাংলা বলতে পারে। একসময় কলকাতায় কিছুদিন ছিল। বলল, “আমি গেলে তোমার কোনও অসুবিধে হবে না তো খোকাবাবু?”
আমি মোটেও ‘খোকাবাবু’ নই, ক্লাস নাইনে পড়ি। তবে প্রসাদদার মুখে ‘খোকাবাবু’ শুনতে মজা লাগল। অবাক হয়ে বললাম, “কীসের অসুবিধে?”
“একা থাকতে ভয় লাগবে না?”
আমি হেসে বললাম, “প্রসাদদা, ভয় জিনিসটা কী সেটাই আমার জানা নেই।”
প্রসাদদা চোখ বড় করে বলল, “আরে বা, বহুৎ আচ্ছা। তোমার বয়সে সবাই ডর পায়। ছোটবেলাটা তো ডর পাবারই বয়স।”
আমি বললাম, “কীসের ডর?”
প্রসাদদাও মাথা নেড়ে-নেড়ে বলল, “ডর পাওয়ার মতো জিনিসের কি অভাব রয়েছে খোকাবাবু? চোরের ডর, ডাকুর ডর, সবথেকে বড় ডর হল ভূতের ডর।”
প্রসাদদা আজ মুড়িটা দারুণ মেখেছিল। বাদাম, চানাচুর, আচার দিয়ে। আমি বড় করে একমুঠো নিয়ে মুখে পুরে চোখ বুজে একটুক্ষণ চিবোলাম। তারপর বললাম, “চোর, ডাকু এলে আমার ভয়ের কী? আমার কাছে তো নেওয়ার মতো কিছু নেই। বরং ওদেরই ভয়। ওই যে ঘরের কোনায় ক্রিকেট খেলার ব্যাট, উইকেট রাখা আছে, তাই নিয়ে এমন তাড়া দেব যে, পালানোর পথ পাবে না। আর ভূত? ওতে আমার বিশ্বাস নেই প্রসাদদা। ভূত বলে কুছ নেহি হ্যায়, তবে তোমর মুড়িমাখা বহুৎ আচ্ছা হ্যায়।”
আমার কথা শুনে প্রসাদদা খুব একচোট হাসল। বলল, “কাল তোমাদের খেলা দেখতে যাব। আমি এখানে এক বাঙালিবাবুকে চিনতাম, তিনি ভি বহুৎ আচ্ছা ব্যাট-বল খেলতেন। লম্বা-চওড়া চেহারা থা। সবাই তাকে সোপনদা বলে ডাকত। সব সময় খেলার মাঠে হাজির থাকত।”
আমি উৎসাহ নিয়ে বললাম, “তাই নাকি! সোপনদা এখন কোথায়?”
প্রসাদদা বলল, “মনেহয়, এই শহর ছেড়ে চলে গিয়েছে। বছরখানেক তো দেখি না। যাক, সাবধানে থেকো খোকাবাবু। আমি একটু ঘুরে আসি। ও ভাল কথা, কাল দেখলে তো এখানে কেমন মাঝে মধ্যেই কারেন্ট চলে যায়? তোমার ঘরে হ্যারিকেন আর দিয়াশলাই রেখে গেলাম। আলো চলে গেলে জ্বালিয়ে নিয়ো।”
আমি বললাম, “ওসব লাগবে না। ব্যাগে টর্চ রয়েছে। তুমি যাও।”
বিকেল থেকে আমি এত বড় গেস্ট হাউজে একা। সন্ধের আগে পর্যন্ত বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে বই পড়লাম। তবে পুরোটা মন দিতে পারলাম না। মাথার মধ্যে ‘ব্যাক ফুট ডিফেন্স’ খচখচ করছে। কোথায় গোলমাল হচ্ছে? সকলেই জানে বলের লেন্থ বুঝে ব্যাটসম্যানকে আগুপিছু হয়ে খেলতে হয়। পিছিয়ে গিয়ে ডিফেন্স খেলব না এগিয়ে গিয়ে পিটিয়ে খেলব ঠিক করে নিতে হয়। আমার কি সেই লেন্থ বুঝতে গোলমাল হচ্ছে? কাল ম্যাচের সময় গোলমাল হলে তো সর্বনাশ।
সন্ধে নামতে ঘরে ঢুকে পড়লাম। জব্বর ঠান্ডা পড়েছে। এসব জায়গায় শীতের সময় এরকমই হয়। আসার পর থেকেই দেখছি। দুপুর গড়ালে ঠান্ডাও গড়াতে-গড়াতে এসে হাজির। তবে ঠান্ডাটা ভারী মজারও। গায়ে ফুলহাতা সোয়েটারের উপরে কোট, মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ পরেও ঠান্ডা সামলোনো যায় না। আজ ঠান্ডা যেন বেশি। খাটের উপর উঠে বই খুলে বসেছি। আধঘন্টা যেতে না-যেতেই ফট করে আলোটা গেল নিভে। চারপাশ একেবারে ঘন অন্ধকার। কালও অন্ধকার হয়েছিল, তবে আজ বেশি লাগছে। কেউ নেই বলে? হতের কাছে রাখা টর্চটা জ্বালাতে গেলাম। যা বাবা! টর্চ জ্বলছে না তো! ব্যাটারি ফুরিয়েছে? কালেই তো জ্বলেছিল। কয়েকবার ধাক্কা আর ঝাঁকুনি দিলাম। কাজ হল না। ভূতে বিশ্বাস করি না বলে, অন্ধকারে নিজেই ভূত সেজে বসে থাকব নাকি? অসম্ভব। হ্যারিকেনটাই জ্বলাতে হবে। ততক্ষণে অন্ধকারটা একটু চোখসওয়া হয়ে গিয়েছে। বিছানা থেকে নেমে ঘরের একপাশে টেবিলে কাছে গেলাম। প্রসাদদা সব গুছিয়ে রেখেছে। হাতড়ে দেশলাই জ্বালালাম। চিমনি উঁচু করে হ্যারিকেনের সলতে আগুন দিতে গিয়ে দেখি, যাহ! সলতেটা ভিতরে পড়ে গিয়েছে। এই হ্যারিকেন জ্বালানো আমার কম্ম নয়। তা হলে? তাহলে আর কী, অন্ধকারেই থাকতে হবে।
এবার এক কান্ড হল! দুম করে খানিকটা ভয় আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি কিছু বোঝার আগে সেটা বেড়েও গেল। গলা শুকোচ্ছে। ঠান্ডা হাত পা আরও ঠান্ডা হয়ে গেল। হঠাৎ এত ভয় পেলাম কেন? ঘুটঘুটে অন্ধকারে এত বড় বাড়িতে একা থাকতে হবে ভেবে? কিছুতেই আলো জ্বালাতে পারব না জেনে? একটুক্ষণ পরে মনে হল, আমি একা নই, এই গেস্ট হাউজে আরও কেউ আছে। অদৃশ্য কেউ। সে আমাকে দেখছে। এত ঠান্ডায়ও ঘামতে শুরু করলাম। একেই কি ভূতের ভয় বলে? কম্বলমুড়ি দিয়ে বসলাম।
ঠিক এমন সময় মোটরবাইক না স্কুটারের আওয়াজ। তারপর সুড়কিপথে পায়ের শব্দ। মনে স্বস্তি ফিরে পেয়েছি। যাক, আর একা নই, কেউ একজন এসেছে। কম্বল সরিয়ে খাট থেকে নেমে জানলার পাল্লা একটু খুললাম। যে দৃশ্য দেখলাম, তাতে শীত, ভয় সব পালাল।
বাগানের ওপাশে সত্যি একটা স্কুটার দাঁড় করানো। একজন মাঝবয়সি লম্বা মানুষ হেঁটে আসছেন। হাতে বড় টর্চ। সেটা থেকে জোরালো আলো বেরচ্ছে। সেই আলোয় দেখলাম, মানুষটার গায়ে কলার তোলা জ্যাকেট, গলায় মাফলার, মাথায় ক্রিকেট খেলার টুপি। হাঁটার ভঙ্গিতেই বোঝা যাচ্ছে, উনি একজন স্পোর্টসম্যান। পায়ে কেড্সও পরেছেন। আরে! মানুষটা যে একেবারে আমার ঘরের বারান্দায় উঠে এসেছেন! গলা তুলে ডাক দিলেন, “সাত্যাকি, সাত্যাকি....সাত্যাকি, তুমি কি এই ঘরেই আছ?”
আমি অন্ধকারেই হাঁচড়পাঁচড় করে দরজা খুললাম। ভদ্রলোক যেভাবে টর্চটা ধরেছেন তাতে চারপাশটা আলোকিত লাগছে। দু’জনই দু’জনকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। বললাম, “আমিই সাত্যকি।”
ভদ্রলোক বললেন, “আমি বোডিং স্কুলের অনুষ্ঠান থেকে আসছি। তোমার মেহিতস্যারের সঙ্গে আলাপ হল। তোমার বন্ধুদের সঙ্গেও কথা হল। ওরা বলল, সকালে প্র্যাকটিসে গিয়ে তুমি নাকি পড়ে গিয়েছ। ‘ব্যাক ফুট ডিফেন্স’ করতে গিয়েছিলে। ব্যালেন্স হরিয়ে যায়। পরে আবার ওই একই ভঙ্গিতে খেলেতে গিয়ে আউটও হয়েছ। তাই তো?”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “হ্যাঁ স্যার, কিন্তু আপনাকে তো ঠিক চিনি না....”
মানুষটা এবার হেসে বললেন, “আমিও তোমার মতো ক্রিকেট ভালবাসি। কিছু ভুল হয়ে গেলে বিচ্ছিরি লাগে। আজকের অনুষ্ঠানে আমারও নেমন্তন্ন। তোমার ব্যাথা পাওয়ার কথা শুনে স্কুটার চালিয়ে দেখতে চলে এলাম। এখন ব্যাথা কেমন?”
আমি খুশি হয়ে, হেসে বললাম, “ব্যাথা কমে গিয়েছে।”
ভদ্রলোক বললেন, “আমি আবার ফিরে গিয়ে তোমার বন্ধুদের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করব। তুমি কি আমার সঙ্গে স্কুটারে চেপে যাবে? ওখানে মেনু চমৎকার।”
আমি বললাম, “না স্যার, আজ পা-টাকে একটু রেষ্ট দিচ্ছি। কাল তো ম্যাচ। ওরা খাবার আনবে।”
ভদ্রলোক একটু ভেবে বললেন, “তাই ভাল। একটা কাজ করো, তোমার ঘরে নিশ্চয়ই ব্যাট রয়েছে, যাও নিয়ে এসো। আমার মনে হচ্ছে, তোমার ওই স্টান্সে কিছু সমস্যা হচ্ছে। এসো, এই বারান্দাতেই তোমাকে একটু দেখিয়ে দিই। শ্যাডো প্রাকটিস করি। একসময় আমি এই শহরে কিছুদিন ক্রিকেট কোচিং করেছি। চিন্তা করো না সাত্যকি, সাবধানে করব, তোমার পায়ে চাপ পড়বে না।”
আমার তো ইচ্ছে করল আনন্দে লাফ দিই। অচেনা মানুষটার গলায় যেমন জোর দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে, আমার ভূলটা উনি ঠিক করে দিতে পারবেন। আমি ঘরে গেলাম ব্যাট আনতে।
এর পরের ঘটনা একেবারে নাটকের মতো। নাকি সিনেমার মতো? সিনেমা বলাই উচিত। আলো-ছায়ার ব্যাপার রয়েছে। স্পোর্টসম্যান ভদ্রলোক একটুক্ষণেই আমার বন্ধু হয়ে গেলেন। টর্চ জ্বালিয়ে শুরু হল আমাদের ‘শ্যাডো প্রাকটিস’। বারান্দার দেওয়ালে আমাদের বড়-বড় ছায়া পড়তে লাগল। লম্বা মানুষটা আমাকে একবারে হাতে ধরে শেখাতে লাগলেন।
“নাও এইভাবে ব্যাট ধরো,েউিইকেট গার্ড নাও। মনে রাখাবে, শর্ট লেন্থের বল যখন উপরে উঠে আসবে তখনই ব্যাক ফুটে খেলবে। ব্যাট দিয়ে গার্ড দাও অফ স্ট্যাম্প। এবার বলটাকে দেখো। বল দেখাটা খুব জরুরি, বলটা কেমন হবে বুঝতে হবে.....বল আসতে দেখে ব্যাট তোলো....প্রথমে ডান পা পিছনে নাও, এরপর বাঁ পা...না-না, এইভাবে নয়, এইবাবে...বাঁ পাটাকে সোজা রাখতে হবে, তবেই লেগ স্ট্যাম্পকে গার্ড দিতে পারবে। বল ছুটে এলে উপরে ব্যাট তোলো.....ব্যাটের সামনের অংশটাকে রাখো নীচের দিকে মুখ করে....আরও নীচের দিকে.....মারার পর বল যেন নীচে পড়ে নইলে ক্যাচ উঠে যাবে.....
বোশ কয়েকবার প্রাকটিস করতেই আমা গা গরমম হয়ে গেল। খুব ঝরঝরে লাগছে। খেলোয়াড় মানুষটা হেসে বললেন, “আর নয়। আমাদের শ্যাডো প্রাকটিস শেষ। বাংলায় একে কী বলবে সাসাবাবু? ছায়া অনুশীলন? দেখছ, তোমর সাসা নামটাও তোমর বন্ধুরা আমার কাছে ফাঁস করে দিয়েছে। তোমার কাছে আসার এটাও একটা কারণ। দেখি কেমন সাহসী, ” কথাটা বলে ‘হা হা’ করে হাসলেন ভদ্রলোক। তারপর বললেন, “সাত্যকি, চললাম। ওখানে নিশ্চয়ই এতক্ষণে খাবার রেডি। দেরি করলে ঠান্ডা হয়ে যাবে। তুমিও ঘরে ঢুকে পড়ো। বাইরে বড্ড ঠান্ডা। আমার শিখিয়ে দেওয়া কায়দাগুলো মনে রেখো। কাল মাঠে দেখা হবে।”
আমি বললাম, “স্যার, আপনার নামটা জানতে পারি?”
মানুষটা হাত বাড়িয়ে আমার হাত ধরলেন। ওর হাতটা গরম। হাত ঝাঁকিয়ে দিয়ে বললেন, “আমাকে এখানে সবাই স্বপন পাইন বলে চেনে। তুমি আমাকে স্বপনদা বলে ডাকতে পারো। বছরখানেক কাজের জন্য বাইরে ছিলাম, ভুবনেশ্বর। আজ সকালেই ফিরেছি। টা, টা, দেখা হবে।”
বারান্দা থেকে নেমে ভদ্রলোক গটগট করে হেঁটে চলে গেলেন বাগানের পথ ধরে। বাগানের ওপাশে রাখা স্কুটারে উঠে স্টার্ট দিলেন। স্কুটার বেরিয়ে যাওয়ার পরই গেস্ট হাউজের সব আলো জ্বলে উঠল। কারেন্ট চলে এসেছে। আমিও ব্যাট হতে আরও দু’বার শ্যাডো প্রাকটিস সেরে খুশি মনে ঘরে ঢুকলাম।
এর পরে তিনটি ঘটনা ঘটেছে। এক নম্বর ঘটনা হল, খানিক পরেই প্রসাদদা গান শুনে ফিলে এল। বলল, “কোনও অসুবিধে হয়নি তো খোকাবাবু?”
আমি বলতে যাচ্ছিলাম, ‘তোমার সেই সোপনদা ফিরে এসেছেন। স্কুটার নিয়ে সোজা এখানে এসেছিলেন। আমাকে খেলা শিখিয়ে দিয়ে গেলেন,’ কিন্তু সেকথা বলবার আগেই প্রসাদদা একগাল হেসে বলল, “তোমাকে না বলে বাইরের গেটে চাবি-তালা দিয়ে গিয়েছিলাম খোকাবাবু। যাতে কেউ গেস্ট হাউজে ঢুকতে না পারে। এখন চাবি খুলে ঢুকলাম। ভাল করেছিলাম না?”
আমি চুপ করে রইলাম।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটল আর একটু পরে, সবাই ফিরলে। মোহিতস্যার খবর দিলেন, এই শহরে স্বপন পাইন নামে একজন ক্রিকেটপাগল মানুষ ছিলেন। এক বছর আগে কর্মসূত্রে ভূবনেশ্বর চলে যান। আজ বিকেলে খবর এসেছে, ভদ্রলোক নাকি সেখানে স্কুটার অ্যাক্সিডেন্টে মারা গিয়েছেন। কালকের ম্যাচটার নাম তাই হয়েছে ‘স্বপন পাইন স্মৃতি ম্যাচ’।
এবারও আমি চুপ করে রইলাম। না থেকে উপায় কী?
আর তিন নম্বর ঘটনাটা ঘটল পরদিন। ম্যাচের সময়। আপোনেন্ট টিমের এক দুর্ধর্ষ বোলারের মারাত্মক বলে আমাদের চার-চারটে ভাল উইকেট কুপোকাত হয়ে গেল। আমি কিন্তু নিখুঁত ‘ব্যাক ফুট ডিফেন্স’ ভঙ্গিতে খেলে তাকে আটকে দিলাম। বেচারি কিছুতেই আমাকে আউট করতে পারল না। ম্যাচটা জিতেও গেলাম।
আর-একটা গোপন কথা বলি?
খেলার সময় আমি সাইড লাইনের ধারে ‘স্বপনদা’ কে দেখেছি। ‘শ্যাডো প্রাকটিস’ - এর মতো করেই উনি আমাকে বারবার দেখিয়ে দিচ্ছিলেন, ছুটে আসা, লাফিয়ে ওঠা বল কীভাবে সামলাতে হবে।

আমার গ্রন্থাগারের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url