ভিতু - স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

 ভিতু

ট্রেন থেকে নেমেই কেমন একটা লাগতে লাগল বাবির। এমন শুনশান কেন চারদিক। একটা জনপ্রাণী নেই। তার উপর কালো করে এসেছে আকাশ। মধ্যদুপুরেই মনে হচ্ছে যেন সন্ধে নেমে এসেছে। কুমুদপুর জায়গাটা যে এতটা অজ পাড়া-গাঁ, সেটা আগে বুঝতে পারেনি।

বাবি ঘড়ি দেখল। খুব ভুল হয়ে গিয়েছে ওর। যখন আসার কথা তার চারটে ট্রেন আগে এসে গিয়েছে। এতে অবশ্য ওর নিজেরই দোষ আছে। ভেবেছিল পাড়া-গাঁয়ে যাচ্ছে, কাছেই একটা সুন্দর নদী আছে সেখানে ঘুরে নেবে। কারণ, খেলা শেষ হয়ে গেল তো ফেরার তাড়া থাকবেই।

কিন্তু ভুল হয়েছে এই যে, এখানে যাদের আমন্ত্রণে এসেছে তাদের আগে আসার ব্যাপারটা জানানো হয়নি। একটা ফোন করে দিলেই হত। কিন্তু সেটা আর করা হয়নি। তবে তাতে অসুবিধে নেই। একা-একা কতদিন নদীর পাড়ে ঘোরা হয় না ববির। নাম ডাক হওয়ার পর থেকে তো কোথাও গেলে কেউ না-কেউ ঠিক চিনে ফেলে। 

কিন্তু এখানে নেমে যা দেখছে, তাতে বুঝতে পারছে যে এত তাড়াতাড়ি আসাটাও ঠিক হয়নি। এত শুনশান স্টেশন। কেমন গা ছমছম করছে ওর। তার উপর স্টেশনের বাইরেও একটা অটো বা রিকশা বলে কিছু নেই। তা হলে নদীর পারে যাবেই বা কী করে।

পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল বাবি। নাহ, বিমল বা কান্তিকে ফোন করেই দেবে। বলে দেবে যে তাড়াতাড়ি চলে এসেছে। ওরা যেন এসে নিয়ে যায়।

কিন্তু ফোনটা দেখে ও অবাক হয়ে গেল। আরে, টাওয়ার নেই। সে কী। আজকাল তো গ্রামে-গ্রামে পৌঁছে গিয়েছে সবকিছু। আর এখানে টাওয়ার নেই কেন? এখন কী হবে?  ইস, একা-একা একটু নদীর পারে কাটাবে বলে এই তাড়াতাড়ি আসার বোকামোটা না করলেই পারত। নাও এখন ভোগো।

মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে স্টেশনের বাইরে এসে দাঁড়াল বাবি.........

বাবি রায় কলকাতা ময়দানের নাম করা ফুটবলার। গত দু’বছর ছোট ক্লাবে এমন খেলেছে যে, এই বছর ময়দানের অন্যতম বড় ক্লাব সই করিয়েছে ওকে। আর তাতে পরিচিতিও হয়েছে। টাকা-পয়সাও পেয়েছে। তার সঙ্গে খেপ খেলার রেটটাও বেড়ে গিয়েছে।

যাঁরা ফুটবল খেলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই এমন খেপ খেলেন। খেপ খেলা মানে টাকার বিনিময়ে অন্য আর রেজিস্টার্ড দলের হয়ে কোনও টুর্নামেন্টে কয়েকটা ম্যাচ খেলে দেওয়া। এসব দল কিন্তু বড় দল নয়। এইসব আঞ্চলিক দল। সারা পশ্চিমবাংলা জুড়ে নানা ছোটখাট ফুটবল টুর্নামেন্ট হয়। তাতে সেই অঞ্চলের টিমরাই খেলে মূলত। আর সেই সব টিম কলকাতার নানা ক্লাব থেকে ফুটবলার ভাড়া করে আনে জেতার জন্য।

বাবি জানে যে, এইসব ছোটখাট টুর্নামেন্টে টাকা ওড়ে আর তার সঙ্গে নান পুরস্কার তো আছেই। প্লেয়ারদের জীবন এমনিতেই ছোট। তাই সময় থাকতে-থাকতে রোজগার করে নিতে হবে। আর একটা মরশুমে খেপ খেলে কয়েক লক্ষ টাকা রোজগার করা কোনও ব্যাপার নয়।

ওদের ক্লাবের কোচ বসন্তদা এসব পছন্দ করেন না। কেউ খেপ খেলতে যাবে শুনলেই খেপে যান। বলেন, “লোভী! সবক’টা লোভী আর নিরেট বোকা। আরে, ক’টা টাকার জন্য কেরিয়ারটা শেষ করে দিবি? কীসব মাঠে খেলা হয় ওই টুর্নামেন্টগুলো? এবড়োথেবড়ো মাঠ। গরু চরে। চাষ হয়। তার সঙ্গে বিপক্ষের আনাড়ি সব প্লেয়ার ট্যাকেলের বদলে এলোপাথাড়ি পা চালায়। লাথি মারে। কাঁচি মারে। হাঁটু খুলে হাতে নিয়ে বড়ি ফিরতে হয়। একটা গুরুতর চোট গেয়ে গেলে প্লেয়ার জীবন শেষ। এটাও বুঝিস না? ছোটবেলায় বাবা-মা যে শিখিয়েছেন, অতি লোভে তাঁতি নষ্ট, সেসব কি ভুলে গিয়েছিস? লোভ করতে নেই রে। কেরিয়ার হল সোনার ডিম পাড়া হাঁস। লোভ করে তার পেট কেটে সব ক’টা সোনার ডিম একবারে বের করার চেষ্টা করলে হাঁসটাই মারা পড়বে।”

হ্যাঁ, লোভ করতে নেই, বাবি জানে। কিন্তু তাও, টাকার তো দরকার। খুব গরিব বাড়ির ছেলে ও। এবার বড় টিমে চান্স পেয়ে সবে বাড়ির মাথায় পাকা ছাদ দিয়েছে। কিন্তু আরও অনেক টাকা রোজগার করতে হবে ওকে। ফলে বসন্তাদর থেকে লুকিয়েই এই কুদুমপুরে খেলতে এসেছে। ম্যাচপিচু দশ হাজার করে দেবে। একটা সেমিফাইনাল আর জিততে পারলে ফাইনাল। এক-একটা হাফ তিরিশ মিনিট করে। নাইন সাইড ম্যাচ। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই খেলা যাবে। আর ফাইনালে জিততে পারলে বোনাস পাঁচ হাজার। একদিনে দুটো ম্যাচ খেলে পঁচিশ হাজার টাকা। খারাপ কী? বসন্তদা এ পাড়া থেকে ও পাড়া পর্যন্ত লম্বা গাড়ি করে প্রাকটিসে আসেন। উনি কী বুঝবেন টাকাপয়সা নিয়ে কষ্ট কাকে বলে?

বিমল আর কান্তি যখন কুমুদপুর থেকে গিয়েছিল ওর কাছে, ও আর ‘না’ করেনি। শুনেছিল সোহাবালা স্মৃতি চ্যালেঞ্জ কাপ নাকি আবার শুরু হয়েছে। এর আগেও ১৯৭০ সালে প্রথমবার শুরু হয়েছিল টুর্নামেন্টটা। কিন্তু একটা দুর্ঘটনায় বন্ধ হয়ে যায়। এখন আবার শুরু হয়েছে। 

বিমল আর কান্তি ছেলেদুটো খুব ভাল। সেমিফাইনাল খেলার টাকাটা অগ্রিম বাড়িতেই দিয়েছিল ওকে। বলেছিল ফাইনালে উঠলে খেলা শুরুর আগে আরও দশ হাজার ওখানেই দেবে। 

বাবি তাতেই রাজি হয়ে গিয়েছিল। তারপর ওদের থেকে সব ডিটেল নিয়ে নিয়েছিল। বলেছিল অত দূর থেকে কাউকেই আসতে হবে না। ও নিজেই চলে যাবে ট্রেনে করে। রাস্তা খারাপ, তাই গাড়ি করে যেতে গেলে সময়ও বেশি লাগবে আর ক্লান্তও হয়ে যাবে। ট্রেনটােই তাই নিরাপদ। 

সেই মতো এখানে এসেছে বাবি। কিন্তু এখন কি করবে ও? এমন জনশূন্য জায়গায় ও কোনদিকে যাবে? আগে আসাটা সত্যি উচত হয়নি। 

“স্যার, এসে গিয়েছেন?”

পিছন থেকে ডাকটা শুনে একটু চমকে উঠেই ঘুরল বাবি। দেখল একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। বেঁটে, সামান্য কোল-কুঁজো। টুটব্রাশের মতো গোঁফ। আর গালে সাতদিনের না-কাটা দাড়ি। লোকটার গায়ে ময়লা বাংলা শার্ট আর পরনে ধুতি। পায়ে একটা প্লাস্টিকের চটি।

বাবি অবাক হয়ে তাকাল।

লোকটা হাসল, “আমি হারু কোটাল। আপনি এসে গিয়েছেন!”

“হ্যাঁ। আপনি....”বাবি কী বলবে বুঝতে পারল না। 

হারু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমি কেউ না। ম্যাচ খেলতে এসেছেন তো। কেন যে এলেন!”

“কিন্তু আপানি কে?”

“আমি টুর্নামেন্টের লোক। চলুন তবে।”

“ম্যাচ তো দেরি আছে!” বাবি বলল, “আমি তাড়াতাড়ি এলাম একটু নদীটা দেখব বলে!”

“অ! নদী দেখবেন! ঘোলাটে আঁকাবাঁকা জল! কচুরিপানা ভর্তি। তবে ইচ্ছে যখন, দেখুন।” হারু হাত নাড়ল, “চলুন আমিই দেখিয়ে আনি। সেখান থেকে মাঠে যাব! তবে এখানে রিকশা পাবেন না। ভ্যান আছে। তাতেই বসে যেতে হবে কিন্তু। অসুবিধে নেই তো?

ভ্যানে চড়ে যেতে একটুও অসুবিধে নেই। কিন্তু বাবির কেমন যেন লাগল। ও একজন স্টার প্লেয়ার। ওর নামে নাকি এখানে লিফলেট বিলি হয়েছে। পোস্টার পড়েছে। সেখানে এমন ভ্যানে বসে যাবে। 

“পগা, এদিকে আয়।” হারুর ডাকে সামনের বড় ঝোপের ওদিক থেকে একটা ভ্যান উদয় হল।

বাবি আর মোবাইলটা বের করে দেখল। নাহ, টাওয়ার নেই। ও আর কী করবে, উঠে বসল ভ্যানে। পিঠের ব্যাগটা পাশে রাখল।

হারু ওর পাশে বসে পা দোলাতে দোলাতে বলল, “পগা, নদীর পাড় ঘুরিয়ে নিয়ে তারপর মাঠে যাব কেমন?”

পগা ভ্যান চালিয়ে দিল।

পাড়াগাঁয়ের রাস্তা। ভ্যান নাচতে-নাচতে যাচ্ছে।

হারু বলল, “বেকার-বেকার এলেন। কী দরকার ছিল বিপদে পড়ার? এখনও টাইম আছে পালিয়ে যান। জিততে তো পারবেন না।

“মানে?” বাবি বিরক্ত হয়ে তাকাল, “আমি নিজেই এসেছি নাকি? আমায় আনা হয়েছে। জানেন না? আর হারের ভয়ে পালাব? পালাতে শিখিনি। আমি ভিতু নই।”

হারু হাসল, “তাই? জানেন, চৌধুরীদের এই টুর্নামেন্টটা খুব অপয়া। সেই সত্তর সালে যেবার প্রথম হয়েছিল, কলকাতা থেকে বাসে করে এসেছিল কয়েকটা প্লেয়ার। সেই বাস উল্টে কতজন যে মারা গেল। বন্ধই হয়ে গিয়েছিল টুর্নাামেন্ট। তার এত বছর পরে চৌধুরীবাবুর নাতি আবার চালু করেছেন। কী যে বিপদ। শুধুমুদু আপনি কেস খেলেন।

বাবির মাথাটা এবার গরম হয়ে গেল। ও বিরক্ত মুখে বলল, “আপনি চুপ করবেন? তখন থেকে ভ্যাজর-ভ্যাজর করে যাচ্ছেন। চেপে বসুন নাহলে নেমে যান। মাঠে গিয়ে আমি বিমল আর কান্তিকে বলছি। নেহাত মোবাইলে টাওয়ার পাওয়া যাচ্ছে না।”

হারু নির্বিকার মুখে বলল, “ভাল কথার যুগ নেই।”

“আচ্ছা মানুষ তো আপনি।” বাবি জোরে ধমক দিল, “চুপ একদম।”

হারু চুপ করে ঢুলতে লাগল। বাবি মনের মধ্যে আসা বিরক্তিটা চেপে রইল। নাহ, মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে, নাহলে খেলা বাজে হয়ে যাবে। সেমিফাইনালটা জিতলে তবেই ফাইনাল। তবেই বাড়তি টাকা। ও মন ঘোরাতে চারপাশের গাছপালা, মাঠঘাট দেখতে লাগল। কলকাতায় তো এমনটা দেখা যায় না। এখন মেঘ কেটেছে কিছুটা। হাওয়া দিচ্ছে। ভাল লাগছে ওর। 

বাবিকে নিয়ে ভ্যানটা দুলতে-দুলতে নদীর দিকে এগোল।

বাবি মাঠে যখন পৌঁছল, তখন খেলা প্রায় শুরু হবে। সেই ধমক খাওয়ার পরে হারুও চুপসে গিয়েছে। 

মাঠে বিমল বা কান্তিকে কোথও দেখতে পেল না বাবি। দেখল, খুব কিছু লোকও হয়নি। চারদিক বড্ড ম্যাড়ম্যাড়ে। কোথায় ওর নামের পোস্টার। লিফলেট। বিমলরা কি তবে ওকে রাজি করানোর জন্য মিথ্যে বলল।

ও যে টিমের হয়ে এসেছে তাদের জার্সিটাও কেমন যেন। সুতির কাপড় কিনে স্থানীয় দোকান থেকে বানানো। এখনকার দিনে এমন জার্সি কেউ পরে? যাই হোক তাই পরেই রেডি হল।

এবার দেখল বলটা। আরে, এরা পুরনো চামড়ার বলে খেলে। এখনকার সিন্থেটিক লেদারের বল নেই। সে কী। মান্ধাতার আমলে পড়ে আছে এই টুর্নামেন্ট। 

কেউ সেভাবে ওকে পাত্তা দিচ্ছে না। যেন রীতিমত অপমান লাগছে বাবির। ও স্টার প্লেয়ার আর ওকেই পাত্তা দিচ্ছে না। ও কয়েকজনকে বিমল আর কান্তির কথা জিজ্ঞেস করলেও তারা সঠিক বলতে পারল না কোথায় গিয়েছে দু’জন। বাবির মনে হল, ধুর, এখানে কেউ ওর সঙ্গে কথা বলছে না সেভাবে। যাই, চলেই যাই। এভাবে অবহেলা ভাল লাগে না। কিন্তু তারপরেই মনে হল, টাকা নিয়েছে। এভাবে চলে যাওয়া ঠিক হবে না। ঠিক আছে, সেমিফাইনালটা খেলে নিই। ততক্ষণে নিশ্চয়ই বিমলরা চলে আসবে। তখন ওদের বলা যাবে ।

এখন মেঘ কেটে গিয়েছে আরও। হাওয়ার জোর বেড়েছে। বাবি প্রস্তুত হয়ে দাঁড়াল। আর সঙ্গে-সঙ্গে রেফারিও বাঁশি বাজিয়ে শুরু করে দিল খেলা।

এভাবে হেরে গেল। বাবি ভাবতেও পারছে না। একদম চার-শূন্য গোলে। দুটো হাফে দুটো করে গোল খেল। ও নিজে স্ট্রাইকার পজিশনে খেলে। কিন্তু ও কিছুই করতে পারল না। স্রেফ দাঁড়িয়ে রইল। নীচের থেকে বল না সাপ্লাই পেলে স্ট্রাইকার আর কী করবে। তা ছাড়া সবাই কেমন যেন সাঁই-সাঁই করে দৌড়াচ্ছে। বাবি কূল পায়নি বল তাড়া করে।

বিমল আর কান্তি এখনও আসেনি। কোথায় কে জানে। আজ কুমুদপুরে আসার পর থেকেই কেমন যেন ভুলভাল হচ্ছে সব। 

ওদের জন্য আর অপেক্ষা না করে ফেরার ভ্যানে উঠে বসেছে বাবি। সঙ্গে সেই হারুও আছে। বাবিকে একটা মিষ্টির প্যাকেট দেওয়া হয়েছে। আর একটা স্মারক। সেমিফাইনালে উঠলেই নাকি এটা দেওয়া হয়।

মেঘ পুরো কেটে গিয়েছে এখন। আবহাওয়া মনোরম। বেশ ভালে লাগারই কথা। কিন্তু বাবির মেজাজটাই খারাপ হয়ে আছে। কোনও প্লেয়ার হারতে পছন্দ করে না। 

যাক গে, এখন ট্রেনে করে বাড়ি ফিরলে বাঁচে। পরে বিমলরা ফোন করলে যা ঝাড়বে না। এভাবে ডেকে নিয়ে এসে এমন ‘আপনাকে চিনি না’ টাইপের ব্যবহারে মানে কী  ভাই। 

হারু বলল, “তখনই বলেছিলাম না এলেই পারতেন। বেকার এসে কেস খেলেন।”

“মানে? কী প্রবলেম আপনার বলুন তো।” বাবি ঝাঁঝিয়ে উঠল।

হারু মিটিমিটি হাসল এবার। তারপর বলল, “জানতাম পারবেন না আপনি। নতুন-নতুন কেউ পারে না। এই সিস্টেম তো আপনার এখনও রপ্ত হয়নি।”

“মানে?” বাবি বিরক্ত হল।

হারু বলল, “কাদের সঙ্গে খেললেন আপনি? তারা কি আর যেমন তেমন। তারা সেই সত্তর সাল থেকে খেলে যাচ্ছে সামনে। চাট্টিখাানি কথা?”

“কী।” বাবি বুঝতে পারল না। 

হারু বলল, “মানে ওরা কি আর মানুষ। মানুষ অমন পারে না। ওরা যেন সবাই অশরীরী। ভূত!”

“কী? ভূ-ভূত!” বাবি হাঁ হয়ে গেল!

“আজ্ঞে হ্যাঁ,” হারুও লজ্জা পেল যেন, 

“সব্বাই ভূত। আপনার দলের লোকজন থেকে ওদের দলের। সব্বাই ওই যারা আপনাকে নাকানিচোবানি খাওয়াল, সবাই সেই সত্তর সালেবাস দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল। বুঝেছেন অমন বল-জার্সি কেন। কেউ আপনাকে চেনে না কেন? আসলে কুমুদপুরের এই টুর্নামেন্ট সত্তর সালে আটকে আছে।”

“ইয়ার্কি হচ্ছে। দিনের বেলায় ভুত” সত্তর সাল।” বাবি দাঁত কিড়মিড় করল।

হারু আরও বিনীত গলায় বলল, “আরে ভুতের দিন-রাত আছে নাকি! ও যারা গপ্পো লেখে তারা ভয় দেখানোর জন্য অমন মিছে কথা বলে ভূতেদের সম্বন্ধে ফেক নিউজ ছড়ায়। তবে সত্তর সালটা বাড়িয়ে বলছি না। আপনার স্মারকটা দেখুন। দেখুন কত সাল লেখা আছে।”

বাবি স্মারকটা বের করল। নড়বড়ে কাঠের উপর একটা পিতলের ফুটবল প্লেয়ার বল কিক করতে যাচ্ছে। তলায় লেখা ‘সোহাগবালা স্মৃতি চ্যালেঞ্জ কাপ, ১৯৭০’।

এসব কী। বাবি দেখল ভ্যানটা স্টেশনের কাছে চলে এসেছে প্রায়।

ও কী বলবে বুঝতে না-পেরে বলল, “এসব কী ইয়ার্কি হচ্ছে! আপনি কে? আপনি আমায় চেনেন কী করে?”

হারু বলল, “আমি? আমি হারু কোটাল। সেই সত্তর সালে ওই বাস দুর্ঘটনায় আমিও মারা গিয়েছিলাম। আমার যে দু’দিকেই যাতায়াত আছে। তাই আপনাকে চিনি। ফুটবলের টানেই আমি এক সময় থেকে অন্য সময়ে যাই। তবে ভূতেদের মেলা সমস্যা জানেন। দেখুন না, সত্তর সালের পরে কাচা হয়নি বলে শার্টটা একটু নোংরা হয়ে ‍গিয়েছে। ভূতরা যে ডিটারজেন্ট পায় না।”

নির্জন দুপুর। শুনশান রাস্তাঘাট। আর পাশে ভুত। বাবি যেন জমে গেল বরফের মতো। আর পরমুহূর্তেই ও ভয়ের চোটে লাফ দিয়ে চলন্ত ভ্যান থেকে নেমে পড়ল রাস্তায়।

শুনল হারু বলছেন, “আরে, আপনি ভয় পেলেন কেন? কী হল, আপনি বেকার এই টুর্নামেন্টটা খেলতে এলেন। আপনি বাড়ি থেকে না বেরলেই........”

বাবি দেখল ওর সামনে আস্তে-আস্তে ভ্যানসমেত হারু, পগা সবাই কেমন যেন আবছা হতে-হতে মিলিয়ে গেল হাওয়ায়। এসব কী হচ্ছে। এসব সত্যি নাকি। বাবির বুকের থেকে হৃৎপিণ্ড যেন বেরিয়ে আসবে। ও সব ভুলে প্রাণভয়ে দৌড় মারল স্টেশনের দিকে।

আরে স্টেশনে তো বেশ লোকজন এসেছে। ভিড়। যাক বাবা।

বাবি দৌড়ে প্ল্যাটফর্মে ঢুকল। দেখল স্টেশনে সাধারণ মানুষদের সঙ্গে ক্যামেরা-মাইক নিয়ে বেশ কিছু টিভি চ্যানেলের লোকজন রয়েছে। একটা ট্রেন এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

বাবি প্ল্যাটফর্মে উঠল। আর তখনই ভিড়ের মধ্যে দেখতে পেল বিমল আর কান্তিকে। ওর প্রাণে জল এল যেন।

ও দৌড়ে গেল সামনে, কিন্তু কাছে যাওয়ার আগেই দেখল, ট্রেনটা আসলে একটা রেক ভ্যান। আর সেখান থেকে সাদা কাপড়ে ঢাকা কয়েকটা মৃতদেহ নামানো হচ্ছে। আরে কোথাও অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে নাকি। 

বাবি চিৎকার করে ডাকল, “বিমল, এই বিমল। কান্তি।”

বিমল তাকাল না! কান্তিও না!

আশপাশের কেউই তাকাল না। বরং বাবি দেখল বিমল এগিয়ে গিয়ে একটা সাদা কাপড় ঢাকা একটা দেহের মুখের কাছের চাদরটা সরাল। আর সঙ্গে-সঙ্গে ভয়ে শিউরে উঠল বাবি। এটা কে!

বাবি দেখল স্ট্রেচারে শুয়ে আছে আর কেউ নয়, ও নিজে। শুনল আশপাশে কথা হচ্ছে, আজ দুপুরবেলার লোকাল ট্রেনের বিশাল দুর্ঘটনা ঘটেছে কুমুদপুরের আগে। চার-পাঁচজন মারা গিয়েছে। তার মধ্যে একজন নামী ফুটবলারও আছেন। মিডিয়া এসেছে তাই।

এসব কী হচ্ছে? দুঃস্বপ্ন নিশ্চিত। ট্রেনে আসতে-আসতে কি ঘুমিয়ে পড়েছে। চিমটি কেটে দেখবে। 

নিজের গায়ে হাত দিয়ে চিমটি কাটতে গেল বাবি। আর হাওয়ার মধ্যে দিয়ে হাত চলল যেন। এ কী, শরীর কই ওর। এ যে হাওয়া!

ও পাশের একটা একটা পোস্ট ধরতে গেল। আবার একই ভাবে হাওয়ায় হাত চলল। এসব কী। মানে....তা হলে কি এসব সত্যি? তার মানে ও কি....

বাবি আকাশের দিকে তাকাল। শেষ বিকেলে বেশ রোদে উঠে গিয়েছে। কিন্তু স্টেশনের মাটিতে অন্যদের ছায়া পড়লেও ওর ছায়া পড়ছে না।

আচমকা পাশের থেকে খিকখিক করে হাসির শব্দ শুনল বাবি। দেখল কোত্থেকে আবার উদয় হয়েছে হারু।

হারু বলল, “নিন এবার পালান কোথায় পালাবেন। উনি নাকি পালান না। জানবেন তেমন-তেমন অবস্থায় পড়লে চেঙ্গিস খানও ভিতু।”

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আমার গ্রন্থাগারের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url