বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস (Archimedes)
বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস (খ্রীষ্টপূর্বঃ ২৮৭- খ্রীষ্টপূর্ব ৩১৫)
একদা আর্কিমিডিস স্নান করে ফিরে আসেন। ফিরে আসেন শুধু দেহ পরিষ্কার করেই নয়, এক গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব নিয়ে। এই তত্ত্বই আজকের দিনে ‘আপেক্ষিক তত্ত্ব’ নামে সুপরিচিত।
খ্রীষ্টপূর্ব ২৮৭ সালে সিসিলির সিরাকুজ নামক স্থানে আর্কিমিডিসের জন্ম। তিনি ফিডিয়াস নামক জনৈক গ্রীক জ্যোতির্বিজ্ঞানীর পুত্র। গ্রীক সাম্রাজ্যের তদানীন্তন প্রধান জ্ঞানকেন্দ্র আলেকজান্দ্রিয়ার প্রখ্যাত িএক গণিত বিদ্যালয়ে আর্কিমিডিস অধ্যায়ন করেন। তিনি সেমসের ‘কেনন’- এর ছাত্র ছিলেন। বিজ্ঞানী কেনন ছিলেন তৎকালের একজন খ্যাতিমান গণিতজ্ঞ এবং বিশ্ববিখ্যাত ইউক্লিডের ছাত্র।
দর্শনশাস্ত্র এবং বিজ্ঞান অধ্যায়নেই আর্কিমিডিস জীবনপাত করেন। তাঁর সমকালীন গ্রীকরা কায়িক পরিশ্রমকে অপমানজনক বলে মনে করতেন এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপারেও তারা ছিলেন বিমুখ। অনেক পণ্ডিত ব্যক্তিই মনে করতেন যে, গণিত সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছার পূর্বে তিনি নিশ্চিতরূপেই ব্যক্তিগতভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। আর্কিমিডিস অবশ্য নিজে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কে কিছুই লিখে রেখে যাননি। তিনি শুধু তাঁর উদ্ভাবিত সিদ্ধান্তসমূহ লিপিবদ্ধ করেছেন মাত্র, যেনো সেগুলো শুধু মানসিক চিন্তা-ভাবনা থেকেই রূপ নিয়েছে। অবশ্য তাঁর সম্বন্ধে অন্যান্য বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, তিনি তাঁর লব্ধ তথ্যাবলীর বাস্তব প্রয়োগ করেছিলেন।
ইতিহাস আছে যে, স্নানাগরে গোসল করার সময় আর্কিমিডিস অপেক্ষিক গুরুত্ব সম্পর্কিত তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। এই তত্ত্ব এখনও ‘আর্কিমিডিস সূত্র’ নামে পরিচিত। ‘দ্বিতীয় হিয়ারো’ একটা নতুন রাজমুকুট তৈরীর নির্দেশ দেন। স্বর্ণকারকে তিনি মুকুট তৈরীর জন্য প্রয়োজনীয় স্বর্ণ দিলেন। স্বর্ণকার মুকুট তৈরি করে আনলে দেখা গেল যে, মুকুটের ওজন স্বর্ণের ওজনের সমানই রয়েছে। রাজার কিন্তু তবুও সন্দেহ হলঃ হয়তো অধিক মুনাফার জন্য স্বর্ণকার স্বর্ণের সঙ্গে কিছু পরিমাণে রূপা মিশ্রিত করে মুকুট তৈরি করেছে।
বিভিন্ন ধরণের ধাতব পদার্থের ওজন যে বিভিন্ন রকম - এ কথা সে কালেও জানা ছিলো। সমপরিমাণ স্বর্ণের ওজন রূপার ওজনের চেয়ে বেশি। সমস্যাটার সাধারণ সমাধান হল, মুকুটটিকে গলিয়ে একটা পাত্রে রেখে ওজন করা এবং তারপর সমপরিমাণ গলানো স্বর্ণ উক্ত পাত্রে রেখে ওজন দিয়ে দেখা।যদি প্রথমবারের ওজন পরের বারের চেয়ে কম হয়, তাহলে মনে করতে হবে স্বর্ণকার মুকুটে রূপা মিশ্রিত করে রাজার স্বর্ণ চুরি করেছে। কিন্তু এ ধরণের সহজ সমাধানে রাজার মুকুট নষ্ট হয়ে যাবে। তাই মুকুটটি অক্ষত রেখে স্বর্ণের ওজন বের করা সমস্যা হয়ে দেখা দিলো। তখন বিষয়টি দু’কুল রক্ষা করে সঠিক সমাধান বের করার জন্য সম্রাট কতৃক আর্কিমিডিসের ডাক পড়লো।
এখান থেকেই স্নানাগারের কাহিনি শুরু। আর্কিমিডিস নিজেকে বাথটাবে নামানোর পর স্বাভাবিকভাবেই পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পায়। তাঁর দেহ যতো বেশি পরিমাণে ডুবতে লাগলো, পানির উচ্চতাও ক্রমে - ক্রমে ততোই বাড়তে লাগলো। এ থেকে আর্কিমিডিস উপলব্ধি করলেন যে, রাজমুকুটের ওজন নেওয়ার এটাই উত্তম পন্থা। তিনি একটা পাত্র পানিতে পূর্ণ করে সতর্কতার সঙ্গে মুকুটটি পানিতে ছেড়ে দিলেন। পূর্ণ পাত্রে মুকুট রাখার ফলে যে পরিমাণ পানি উপচে পড়লো, তা একটা নলের সাহায্যে অপর একটি পাত্রে রেখে দিলেন তিনি। আর্কিমিডিস ধারণা করলেন, যে পরিমাণ পানি বেরিয়ে এলো-পানির সমান আয়তনের স্বর্ণ নিয়ে মুকুটের সঙ্গে ওজন দিয়ে পরীক্ষা করার পরই ব্যাপারটা ধরা পড়ে গেল।
আর্কিমিডিসের এই পরীক্ষার ফলে লোভী স্বর্ণকার অপরাধী প্রমাণিত হল। রাজা তাঁকে ফাঁসির হুকুম দিলেন। কিন্তু বিষয়টির গুরুত্ব অন্যদিকে- বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়াররা এখনও পর্যন্ত সমান আয়তনের পানির সঙ্গে ধাতব পদার্থের ওজন পরীক্ষা করেন এবং এই পদ্ধতিই ‘আপেক্ষিক গুরুত্ব’ বা ‘আপেক্ষিক তত্ত্ব’ নামে পরিচিত।
স্বর্ণের আপেক্ষিক গুরুত্ব প্রায় ২০, অর্থাৎ এক পাইন্ট স্বর্ণের ওজন ২০ পাউন্ড। অপরদিকে এক পাইন্ট পানির ওজন প্রায় ১ পাউন্ডের মত, আর এক পাইন্ট রূপার ওজন মাত্র ১০ পাউন্ড।
স্বর্ণের পরিমাণ গ্রহণের সঙ্গে ভাসমান অবস্থার বিষয়টি ঘনিষ্টভাবে জড়িত। আর্কিমিডিস লক্ষ্য করেছেন যে, বাথটাবের পানি তাঁকে ভাসিয়ে রাখতে চায় এবং তিনি ইচ্ছে করলেই ভেসে থাকতে পারেন। অপরদিকে তিনি এটাও লক্ষ করেছেন যে,- কাঠ প্রভৃতি কতিপয় পদার্থ পানিতে ডোবে না। তাই ডুবে যাওয়া জিনিসকে ভাসিয়ে রাখার একটা প্রবণতা বা প্রভাব পানির মধ্যে রয়েছে কিনা- এটা তিনি আশ্চর্যের সঙ্গে ভেবেছিলেন। তিনি বিষয়টি নিয়ে গভীর পর্যালোচনা করেন এবং এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, “তরল পদার্থে ভাসমান বস্তু যে পরিমাণ তরল পদার্থ অপসারিত করে, ঠিক সে পরিমাণ পদার্থের সমান শক্তি তাকে উপরের দিকে ঠেলে রাখে।”
আর্কিমিডিসের এই তত্ত্বটা বিশ্লেষণ করা যাক। ধরা যাক ১৬ পাউন্ড ওজনের এক টুকরা লৌহখন্ড। এই লৌহখন্ডটা একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা নেবে। একটা পুকুরে লৌহখন্ডটি স্থাপন করলে কিছু পরিমাণ পানি অপসারিত করবে এবং এ ক্ষেত্রে দুই পাউন্ড ওজনের পানি অপসারিত হবে। তাই পানির মধ্যে লৌহখন্ডটির ওজন নিলে ওজন দাঁড়াবে ১৬ পাউন্ডের পরিবর্তে ১৪ পাউন্ড। এজন্যও লৌহখন্ডের সমান ওজনের পানি অপসারিত হলে তা ভাসতে থাকবে।
আমরা পানিতে ভাসতে পারি, সাঁতার কাটতে পারি। কারণ, আমাদের দেহের ওজনে আমরা যে পরিমাণ পানি অপসারিত করি তার ঠিক প্রায় সমান-সমান। পানিতে আমাদের সত্যিকার ওজন বলতে প্রকৃতপক্ষে কিছুিই থাকে না। তাই আমাদের দেহ সম্পূর্ণভাবে পানির উপর থাকলে ভেসে থাকতে তখন আমাদের খুবই সুবিধা; কিন্তু মাথা পানির উপরের দিকে তুলে রাখতে চাইলে ভেসে থাকতে অপেক্ষাকৃত অসুবিধা হয়। কাঠখন্ড বা নৌকার সম্পূর্ণ অংশ পানির উপরে থাকে না। কাঠ বা নৌকার সমান ওজনের পানি অপসারণের জন্য কিছু অংশ অবশ্যই ডুবে থাকতে হয়।
যেমন মালবাহী জাহাজ অপেক্সাকৃত অধিক পারিমাণ পানির নিচে থাকে। কারণ ঐ জাহাজকে ভাসিয়ে রাখার জন্য অধিক পরিমাণে পানির অপসারণ দরকার। এর থেকেই জাহাজের পানি অপসারণের কথাটার সৃষ্টি। আধুনিক একটি যাত্রীবাহী জাহাজ ৮০ হাজার টন পানি অপসারিত করতে পারে। এক কথায় এর ওজন ৮০ হাজার টন। আণবিক সাবমেরিনসহ যাবতীয় ডুবোজাহাজ আর্কিমিডিসের এই সূত্রের উপর নির্ভরশীল।
আর্কিমিডিস পানি উত্তোলনের একটা যন্ত্রও আবিষ্কার করেছিলেন। এই যন্ত্রকে এখনো ‘আর্কিমিডিও স্ক্র’ বলা হয়। এই পেঁচালো স্ক্র ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে পানি উপরের দিকে উঠে আসে। বিদেশে গম ভাঙার জন্যও এই একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় এবং স্ক্র ড্রাইভার স্বয়ংক্রিয়ভাবে গমের গা থেকে আটা ও খোসা পৃথক করে। এই একই নিয়মনীতি অনুসারে গৃহকর্ত্রীরা মাংস পেষক এর সাহায্যে আজকাল হাড্ডি থেকে মাংস আলাদা করেন।
আর্কিমিডিস “ঠেসকল” (Lever) ব্যবহারে গণিতের প্রভাব দেখিয়েছেন এবং এই পদ্ধতির উন্নতি সাধন করেছেন। এই সামান্য হাতিয়ারের সাহায্যে মানুষ নিজ বাহুবল বহুগুণ বৃদ্ধি করে বিপুল পরিমাণ বোঝা স্থানান্তরে সক্ষম হয়েছেন। এ কৌশলের গুরুত্ব কতটা তা অনুধাবনের জন্য আর্কিমিডিস ঘোষণা করেছেন, - “আমাকে দাঁড়াবার একটা জায়গা দিন, আমি পৃথিবীটাকেই স্থানান্তর করবো।”
এক প্রান্তের বোঝা উত্তোলনের জন্য ঠেসকলের অপর প্রান্তে কি পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন, তা ‘কি-লকে’র (Pivot) দূরত্বের উপর নির্ভরশীল। উধাহরণ স্বরূপ বলা যায়, - এক হাজার পাউন্ড পরিমাণ ওজন ১০০ পাউন্ডের সমান শক্তি দ্বারা উত্তোলন সম্ভব, যদি ঠেসকলের যে প্রান্তে বোঝা রাখা হয়েছে সে প্রান্ত থেকে কী-লকের যে দূরত্ব, তার চেয়ে কী-লক থেকে অপর প্রান্তের দূরত্ব দশগুণ পরিমাণ বেশি হয়।
পার্কের খেলান ‘সী-স’ এর কথা মনে করুন। ক্রসবার থেকে দূরবর্তী প্রান্তে বসা একটা ছোট্ট ছেলে ক্রসবারের নিকটবর্তী প্রান্তে বসা তার চাইতে অপেক্ষাকৃত বেশি ওজনের ছেলের সঙ্গে ওজনে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে।
বিশুদ্ধ গণিতের মতো ফলিত গণিতশাস্ত্রেও আর্কিমিডিসের অবদান কম নয়। বৃত্তকে সমকোনী চতুর্ভূজে পরিণত করার সমস্যা কখনো সমাধান হয়নি। মূলত এই সমস্যাটা হচ্ছে বৃত্তের সঠিক ক্ষেত্রফল নির্ণয়। গাণিতজ্ঞরা এ সম্পর্কে খুব কাছাকাছি ধারণা নিতে সমর্থ হয়েছেন কিন্তু একেবারে সঠিক আয়তন নির্ণয় সম্ভব হয়নি। গণিতবিদরা বলেন যে, বৃত্তের আয়তনের সমান ফর হচ্ছে πR²; এক্ষেত্রে π এর আনুমানিক মান হলঃ ৩.১৪১৬। আধুনিক ক্যালকুলেটর মেশিন দ্বারাও এই সংখ্যা সঠিকভাবে নিরূপণ সম্ভব হয়নি। কিন্তু আর্কিমিডিস π এর আয়তন নিরূপনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করেছেন। তিনি এর আয়তন নির্দেশ করেছেন ৩.১৪০৮ এবং ৩.১৪২৯ এর মধ্যে। বিশ্লেষণাত্বক জ্যামিতির ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান কম নয়। গণনা সম্পর্কে অধ্যায়নকালে এখনো ছাত্ররা আর্কিমিডিসের কুন্ডলী পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে।
বিশেষ করে কুন্ডলী ও নল সম্পর্কিত তথ্যের জন্যে আর্কিমিডিস নিজেই গর্ববোধ করতেন। নলের মধ্যে পেঁচালো পাত্র সঠিকভাবে স্থাপন সম্পর্কে যেমন তিনি সূত্র নির্ণয় করেছেন, তেমনি সমভূমি এবং গোল পদার্থের আয়তন নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও তিনি সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। আর্কিমিডিস প্রমাণ করেন যে, - গোলকই সর্বাধিক কার্যকরী ও যথার্থ আকৃতি। বড়ো বলের মতো যেসব গোলাকার পানির ট্যাংক দেখতে পাওয়া যায় এ ধরণের পাত্রেই অপেক্ষাকৃত অধিক পানি ধরে এবং এ গোলাকার ট্যাংক নির্মাণ খরচও খুবই কম পড়ে।
যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণেও তিনি তাঁর প্রতিভা দেখিয়েছিলেন। সভ্যতার ইতিহাসে বহু সংখ্যক বিজ্ঞানী এ কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন। তাঁর ঠেসকলের নীতি (প্রাচীনকালে ব্যবহৃত এক ধরণেল গুলতি) নির্মানে ব্যবহৃত হয়েছিলো।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, খ্রীষ্টপূর্ব্ ৩১৫ সালে সিরাকুজের লড়াইয়ে আর্কিমিডিসের ‘ক্যাটাপল্ট’ ব্যবহারেই যুদ্ধের মোড় গ্রীকদের সপক্ষে গিয়েছিলো, শক্র সৈন্যরা প্রচুর পরিমাণে আহত হয়ে পড়েছিলো।
ঐতিহাসিক পোলিবাস এ সম্পর্কে বলেন, “নির্দিষ্ট কাজের জন্য যথার্থ উপযোগী একজন মানুষ এবং তাঁর বুুদ্ধিবৃত্তিই যে এককভাবে একটা গোটা সেনাবাহিনীর কাজ করতে সক্ষম, তার সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। ” আজকের দিনেও এ কথার সত্যতা সমানভাবে প্রযোয্য। মাত্র গুটিকয়েক আণবিক বিজ্ঞানী ভয়াবহ পারমাণবিক মারণাস্ত উদ্ভাবন করেছেন।
বহু বছর পরে রোমান সেনাপতি মার্সিলাস সিরাকুজ দখন করেছিলেন। তিনি আর্কিমিডিসের জীবন ও সমপত্তির নিরাপত্ত বিধানের নির্দেশে দেন। তবে যুদ্ধেরে মধ্যে তিনি জনৈক্য রোমান সৈন্যের ভূলে নির্মমভাবে নিহত হন। কিন্তু তাহলেও রোমানরা যথাযথ সম্মানের সাথে এই বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞাীকে সমাহিত করেন িএবং তাঁর কবরের উপর তাঁর প্রিয় প্রতীক গোলক ও নলের ছাপ খোদাই করে দেন।
আর্কিমিডিস এক বিরাট প্রতিভা, একজন মহান ও অসাধারণ বিজ্ঞানী এবং গণিতজ্ঞ-“একজন মানুষ, আর তাঁর বুদ্ধিবৃত্তি এককভাবেই অপরিসীম।” এর সত্যতা?- হ্যাঁ, আর্কিমিডিসই তার উজ্জল প্রমাণ।
আমরা পানিতে ভাসতে পারি, সাঁতার কাটতে পারি। কারণ, আমাদের দেহের ওজনে আমরা যে পরিমাণ পানি অপসারিত করি তার ঠিক প্রায় সমান-সমান। পানিতে আমাদের সত্যিকার ওজন বলতে প্রকৃতপক্ষে কিছুিই থাকে না। তাই আমাদের দেহ সম্পূর্ণভাবে পানির উপর থাকলে ভেসে থাকতে তখন আমাদের খুবই সুবিধা; কিন্তু মাথা পানির উপরের দিকে তুলে রাখতে চাইলে ভেসে থাকতে অপেক্ষাকৃত অসুবিধা হয়। কাঠখন্ড বা নৌকার সম্পূর্ণ অংশ পানির উপরে থাকে না। কাঠ বা নৌকার সমান ওজনের পানি অপসারণের জন্য কিছু অংশ অবশ্যই ডুবে থাকতে হয়।
যেমন মালবাহী জাহাজ অপেক্সাকৃত অধিক পারিমাণ পানির নিচে থাকে। কারণ ঐ জাহাজকে ভাসিয়ে রাখার জন্য অধিক পরিমাণে পানির অপসারণ দরকার। এর থেকেই জাহাজের পানি অপসারণের কথাটার সৃষ্টি। আধুনিক একটি যাত্রীবাহী জাহাজ ৮০ হাজার টন পানি অপসারিত করতে পারে। এক কথায় এর ওজন ৮০ হাজার টন। আণবিক সাবমেরিনসহ যাবতীয় ডুবোজাহাজ আর্কিমিডিসের এই সূত্রের উপর নির্ভরশীল।
আর্কিমিডিস পানি উত্তোলনের একটা যন্ত্রও আবিষ্কার করেছিলেন। এই যন্ত্রকে এখনো ‘আর্কিমিডিও স্ক্র’ বলা হয়। এই পেঁচালো স্ক্র ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে পানি উপরের দিকে উঠে আসে। বিদেশে গম ভাঙার জন্যও এই একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় এবং স্ক্র ড্রাইভার স্বয়ংক্রিয়ভাবে গমের গা থেকে আটা ও খোসা পৃথক করে। এই একই নিয়মনীতি অনুসারে গৃহকর্ত্রীরা মাংস পেষক এর সাহায্যে আজকাল হাড্ডি থেকে মাংস আলাদা করেন।
আর্কিমিডিস “ঠেসকল” (Lever) ব্যবহারে গণিতের প্রভাব দেখিয়েছেন এবং এই পদ্ধতির উন্নতি সাধন করেছেন। এই সামান্য হাতিয়ারের সাহায্যে মানুষ নিজ বাহুবল বহুগুণ বৃদ্ধি করে বিপুল পরিমাণ বোঝা স্থানান্তরে সক্ষম হয়েছেন। এ কৌশলের গুরুত্ব কতটা তা অনুধাবনের জন্য আর্কিমিডিস ঘোষণা করেছেন, - “আমাকে দাঁড়াবার একটা জায়গা দিন, আমি পৃথিবীটাকেই স্থানান্তর করবো।”
এক প্রান্তের বোঝা উত্তোলনের জন্য ঠেসকলের অপর প্রান্তে কি পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন, তা ‘কি-লকে’র (Pivot) দূরত্বের উপর নির্ভরশীল। উধাহরণ স্বরূপ বলা যায়, - এক হাজার পাউন্ড পরিমাণ ওজন ১০০ পাউন্ডের সমান শক্তি দ্বারা উত্তোলন সম্ভব, যদি ঠেসকলের যে প্রান্তে বোঝা রাখা হয়েছে সে প্রান্ত থেকে কী-লকের যে দূরত্ব, তার চেয়ে কী-লক থেকে অপর প্রান্তের দূরত্ব দশগুণ পরিমাণ বেশি হয়।
পার্কের খেলান ‘সী-স’ এর কথা মনে করুন। ক্রসবার থেকে দূরবর্তী প্রান্তে বসা একটা ছোট্ট ছেলে ক্রসবারের নিকটবর্তী প্রান্তে বসা তার চাইতে অপেক্ষাকৃত বেশি ওজনের ছেলের সঙ্গে ওজনে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে।
বিশুদ্ধ গণিতের মতো ফলিত গণিতশাস্ত্রেও আর্কিমিডিসের অবদান কম নয়। বৃত্তকে সমকোনী চতুর্ভূজে পরিণত করার সমস্যা কখনো সমাধান হয়নি। মূলত এই সমস্যাটা হচ্ছে বৃত্তের সঠিক ক্ষেত্রফল নির্ণয়। গাণিতজ্ঞরা এ সম্পর্কে খুব কাছাকাছি ধারণা নিতে সমর্থ হয়েছেন কিন্তু একেবারে সঠিক আয়তন নির্ণয় সম্ভব হয়নি। গণিতবিদরা বলেন যে, বৃত্তের আয়তনের সমান ফর হচ্ছে πR²; এক্ষেত্রে π এর আনুমানিক মান হলঃ ৩.১৪১৬। আধুনিক ক্যালকুলেটর মেশিন দ্বারাও এই সংখ্যা সঠিকভাবে নিরূপণ সম্ভব হয়নি। কিন্তু আর্কিমিডিস π এর আয়তন নিরূপনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করেছেন। তিনি এর আয়তন নির্দেশ করেছেন ৩.১৪০৮ এবং ৩.১৪২৯ এর মধ্যে। বিশ্লেষণাত্বক জ্যামিতির ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান কম নয়। গণনা সম্পর্কে অধ্যায়নকালে এখনো ছাত্ররা আর্কিমিডিসের কুন্ডলী পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে।
বিশেষ করে কুন্ডলী ও নল সম্পর্কিত তথ্যের জন্যে আর্কিমিডিস নিজেই গর্ববোধ করতেন। নলের মধ্যে পেঁচালো পাত্র সঠিকভাবে স্থাপন সম্পর্কে যেমন তিনি সূত্র নির্ণয় করেছেন, তেমনি সমভূমি এবং গোল পদার্থের আয়তন নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও তিনি সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। আর্কিমিডিস প্রমাণ করেন যে, - গোলকই সর্বাধিক কার্যকরী ও যথার্থ আকৃতি। বড়ো বলের মতো যেসব গোলাকার পানির ট্যাংক দেখতে পাওয়া যায় এ ধরণের পাত্রেই অপেক্ষাকৃত অধিক পানি ধরে এবং এ গোলাকার ট্যাংক নির্মাণ খরচও খুবই কম পড়ে।
যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণেও তিনি তাঁর প্রতিভা দেখিয়েছিলেন। সভ্যতার ইতিহাসে বহু সংখ্যক বিজ্ঞানী এ কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন। তাঁর ঠেসকলের নীতি (প্রাচীনকালে ব্যবহৃত এক ধরণেল গুলতি) নির্মানে ব্যবহৃত হয়েছিলো।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, খ্রীষ্টপূর্ব্ ৩১৫ সালে সিরাকুজের লড়াইয়ে আর্কিমিডিসের ‘ক্যাটাপল্ট’ ব্যবহারেই যুদ্ধের মোড় গ্রীকদের সপক্ষে গিয়েছিলো, শক্র সৈন্যরা প্রচুর পরিমাণে আহত হয়ে পড়েছিলো।
ঐতিহাসিক পোলিবাস এ সম্পর্কে বলেন, “নির্দিষ্ট কাজের জন্য যথার্থ উপযোগী একজন মানুষ এবং তাঁর বুুদ্ধিবৃত্তিই যে এককভাবে একটা গোটা সেনাবাহিনীর কাজ করতে সক্ষম, তার সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। ” আজকের দিনেও এ কথার সত্যতা সমানভাবে প্রযোয্য। মাত্র গুটিকয়েক আণবিক বিজ্ঞানী ভয়াবহ পারমাণবিক মারণাস্ত উদ্ভাবন করেছেন।
বহু বছর পরে রোমান সেনাপতি মার্সিলাস সিরাকুজ দখন করেছিলেন। তিনি আর্কিমিডিসের জীবন ও সমপত্তির নিরাপত্ত বিধানের নির্দেশে দেন। তবে যুদ্ধেরে মধ্যে তিনি জনৈক্য রোমান সৈন্যের ভূলে নির্মমভাবে নিহত হন। কিন্তু তাহলেও রোমানরা যথাযথ সম্মানের সাথে এই বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞাীকে সমাহিত করেন িএবং তাঁর কবরের উপর তাঁর প্রিয় প্রতীক গোলক ও নলের ছাপ খোদাই করে দেন।
আর্কিমিডিস এক বিরাট প্রতিভা, একজন মহান ও অসাধারণ বিজ্ঞানী এবং গণিতজ্ঞ-“একজন মানুষ, আর তাঁর বুদ্ধিবৃত্তি এককভাবেই অপরিসীম।” এর সত্যতা?- হ্যাঁ, আর্কিমিডিসই তার উজ্জল প্রমাণ।

আমার গ্রন্থাগারের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url