আলেসান্দ্রো ভোল্টা (Alessandro Volta)

আলেসান্দ্রো ভোল্টা (১৭৪৫-১৮২৭)







--“আপনি কখনও বিদ্যুতের ‘স্বাদ’ নিজ চোখে দেখেছেন? আমি কিন্তু দেখেছি,-- আমি আমার জিহ্বার অগ্রেভাগে একটুকরো টিন দ্বারা ঢেকে রাখি। এরপর একটা রূপোর চামচের মোটা কিনারা দিয়ে জিহ্বার আরো ভিতরে স্পর্শ করি এবং টিনের উপর চামচের হাতল স্থাপন করি।” প্যাভিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক আলেসান্দ্রো ভোল্টা এভাবে তাঁর একটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয় বিবৃত করেন। তিনি আশা করেছিলেন যে, তাঁর জিহ্বা কম্পিত হয়ে হেঁচকা েএকটা টান পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তাঁর পরিবর্তে তিনি একটা টক-টক স্বাদ পেলেন। 

ইতালির কোমোতে ১৭৪৫ সালের ১৮ই ফেব্রূয়ারী ভোল্টা জন্মগ্রহণ করেন। ইতালীর আলপসের পাদদেশে প্রখ্যাত ও রূপময়ী কোমো হ্রদের তীরে কোমো একটি বড় শহর। কোমো হ্রদটি বিত্তশালীদের এখনো বসতিস্থাপনে আকৃষ্ট করেছে। এই হ্রদ বরাবরই পর্যটকদের জনপ্রিয় স্থান বলে পরিচিত। 

আলেসান্দ্রো ভোল্টার পরিবার অবশ্য বিত্তবান সমাজের অন্তর্ভূক্ত নয়। তবে গির্জার ধর্মীয় সংগঠনের প্রভাশালী কিছু আত্মীয়ের মধ্যস্থতায় এই প্রতিভাবান বালক ভল্টা একদিন শিক্ষা লাভের সুযোগ পান। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোসং সমাপ্ত করার পও তিনি কোমোর হাইস্কুলে শিক্ষকের চাকুরী লাভ করেন। ১৭৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে শিক্ষকতা করেন। এই সময় তাঁর বয়স ছিলো ৩৪ বছর। এরপর তিনি ‘প্যাভিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের’ নিয়োগপত্র লাভ করেন  এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ খোলার জন্য তাঁকে পুরো দায়িত্ব দেওয়া হয়।  এর ফলে তিনি স্বাধীনভাবে গবেষণারও সুযোগ ভাল করেন। 

কোমোতে শিক্ষকতাকালেই তিনি  ‘তড়িৎফোরাস’ আবিষ্কার করেন। ইংল্যান্ডের যোসেফ প্রিষ্টলির নিকট লিখিত এক পত্রে তিনি তাঁর আবিষ্কারের বিষয় বর্ণনা করেন। তড়িৎফোরাসের বাস্তব কোন মূল্য নেই। কিন্তু স্থির তড়িৎ ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের জন্য বর্তামান কালের বিজ্ঞানের ক্লাসে এর ব্যবহারিক প্রয়োজন আছে।

তড়িৎ ফোরাসের উপর ভিত্তি করে ভোল্টা অনেকগুলো সূত্র আবিষ্কার করেন। যে গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক উপাদানটা বর্তমানে “ক্যাপাসিটর” বা “কন্ডেন্সর” (জার্মনী) নামে পরিচিত, িএই সূত্রগুলো তারই কাজকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিজ্ঞানী ভোল্টা এর নাম দেন ‘কন্ডেন্সেটর’। কিন্তু লন্ডনের ‘রয়্যাল সোসাইটি’ - অনুবাদকগণ নামটা একটু সংক্ষেপ করে ‘কন্ডেন্সর’ করেন। বৈদ্যুতিক চার্জের প্রতিক্রিয়াকে  বড়ো করে দেখানোর জন্য তিনি নিজে এক ধরণের যন্ত্র উদ্বাবন করেন। তদানীন্তন সময়ে বিদ্যুতের পরিমাপ গ্রহনের জন্যে তড়িৎবীক্ষণ ও তড়িৎমাপক যন্ত্র ব্যবহার করা হতো। কিন্তু অতি সংবেদনশীল যন্ত্র এসব তিনি  কখনও ব্যবহার করেননি। তিনি  একটা তড়িৎফোরাসে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করে পাতগুলো পৃথক করে নেন। এর ফলে পাতসমূহের মধ্যে ভোল্টের বৃদ্ধির প্রভাব তৈরী হয়। তিনি তাঁর যন্ত্রের নাম দেন ‘ক্ষুদ্র তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র’ (মাইক্রোইলেকট্রোস্কোপ)।

১৭৯১ সালে ‘বলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়’- এর প্রাণীবিজ্ঞান ও শারীরবৃত্তে অধ্যাপক লুইগি গ্যালভ্যনি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণারের ব্যাঙের ব্যবচ্ছেদ সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি পিতলের একটি সূক্ষ্মাগ্র শালকা ব্যাঙের মেরুদন্ডের মজ্জা দিয়ে ঢুকিয়ে দেন। একজন সহযোগী একটা লোহার ছুরি দিয়ে ব্যাঙের পায়ের মাংসপেশী স্পর্শ করেন। লোহার ছুরির অগ্রভাগ পিলের শলকা স্পর্শ করা মাত্রই ব্যাঙের মাংসপেশী ভীষণ ভাবে কম্পিত হতে থাকে। গ্যালভনি এভাবে বারবার পরীক্ষা চালান; কিন্তু প্রতিবারে একই প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো। - ব্যাঙের মাংসপেশীর ভীষণভাবে কম্পন।

গ্যালভানি তাঁর পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে, প্রাণীর মধ্যে সৃষ্ট বৈদ্যুতিকপ্রবাহের ফলে এই প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ভোল্টা তাঁর গবেষণার বিবরণ পাঠ করেন, কিন্তু এতে তাঁর সন্দেহ হয়। তিনি নিজেই ব্যাপারটা পরীক্ষা করে দেখেন। পরীক্ষার ফলাফল দেখে তিনি বলেন, - “বস্তুতঃ অলৌকিক কর্মটা আমি নিজেই সম্পন্ন করলাম এবং অবিশ্বসী থেকে উৎসাহী বিশ্বাসীতে পরিণত হলাম।”

এটা ‘প্রাণী-তড়িৎ’ এই তত্ত্বে কিন্তু ভোল্টা বিশ্বাস স্থাপন করেননি। তাই তিনি গবেষণা অব্যাহত রাখেন। ১৮০০ সালের ২০ শে মার্চ তারিখে তিনি লন্ডনের ‘রয়্যাল সোসাইটির’ নিকট একটা বিখ্যাত পত্র লেখেন। এই পত্রে তিনি ‘ভল্টায়িক স্তুপের’ পাইল বর্ণনা প্রদান করেন। আনি নিজেও এটার পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। বিজ্ঞানী ভোল্টা- সিলভার, জিঙ্ক ও কার্ডবোর্ডের কতোগুলো শুষ্ক পরিষ্কার পাত্র নেন। তিনি এগুলোকে স্তুপীকৃত করে পর্যায়ক্রমিকি এভাবে সাজান, - রৌপ, কার্ডবোর্ড, জিঙ্ক, রৌপ, কার্ডবোর্ড, জিঙ্ক ব্লক ইত্যাদি।

স্তুপের শেষ মাথা থেকে ক্রমাগত বিদ্যুৎ প্রবাহের ব্যবস্থা ছিলো। বিজ্ঞানী ভোল্টা সর্বপ্রথম ‘তড়িৎকোষ’ বা সেল তৈরি করেন। এই সেলই বর্তমান স্থানান্তর এবং বহনযোগ্য বেতারযন্ত্রের ড্রাইসেল ‘ব্যাটারির’ অগ্রদূত। বিজ্ঞাপনের ইতিহাসে তিনিই সর্বপ্রথম বিদ্যুতের ক্রমাগত প্রবাহের উৎস সৃষ্টি করেন। যখন তিনি রূপোর চামচ ও টিন মুখে দেন, তখনো তড়িৎকোষ উৎপন্ন হয়েছিলো। এক্ষেত্রে তিনি দুটো ভিন্ন-ভিন্ন ধরণেল ধাতব পদার্থ ব্যবহার করেছিলেন।

তাঁর আবিষ্কার বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক গবেষণায় সম্পূর্ণ এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে। স্বল্পকালের মধ্যেই ‘ভল্টায়িক স্তুপে’র ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা পানিকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে বিভাজন করতে সক্ষম হন। ড্যাভি সোডিয়াম ও পটাশিয়াম আবিষ্কার করেন। এরই ফলে বিদ্যুৎ ও চুম্বক ধর্মের গবেষণা কর্ম দ্রুত গতিতে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়। অতঃপর ভোল্টা প্রচুর সম্মান পেয়ে থাকেন।

সম্রাট নেপোলিয়ান তাঁকে ‘প্যারি ইন্সটিটিউট’-  এ ভাষণ প্রদানের জন্য আমন্ত্রণ জানান। তাঁর সম্মানে একটা স্বর্ণপদক চালু করা হয়। বার্ধক্যের দরুণ তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করতে চান; কিন্তু তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো কিছুদিন থেকে যেতে রাজি করানো হয়। বছরে তাঁকে মাত্র একটি ভাষণ দিতে অনুরোধ করা হয় এবং এজন্য তাঁকে পুরো বছরের পূর্ণ বেতন প্রদানের ব্যবস্থাও করা হয়।

লোম্বার্ডি থেকে তিনি সিনেটের সদস্য নির্বাচিত হন। অস্ট্রিয়ার সম্রাট তাঁকে পদুয়ার ‘ফিলোফিক ফ্যাকাল্টি’র ডিরেক্টর নিযুক্ত করেন। ১৮১৯ সালে ৭৪ বছর বয়সে ভোল্টা কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে তাঁর নিজ শহর কোমোতে অবসর জীবনযাপনের জন্য ফিরে যান। ১৮২৭ সালের এপ্রিল মাসের ঝলমলে এক সকালে তিনি সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর কৃতিত্ত্বের স্বরণে কোমোতে একটা আকর্ষণীয় আবক্ষ মূর্তি তৈরী করা হয়। অবশ্য তাঁর স্বরণে অধিকতর বিশ্বজনীন সম্মান হলো তাঁর নামটি, বিদ্যুতের প্রসঙ্গ এলেই তাঁর নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়। ১৯৯৩ সালে ‘ইলেকট্রিশিয়ান্স কংগ্রেসে’ বিদ্যুৎ প্রবাহক শক্তিকে ‘ভোল্ট’ নামে অভিহিত করা হয় তাঁর প্রতি সম্মান দেখিয়ে। ভোল্টার ‘পাইল’ বা স্তুপই মানুষকে বিদ্যুৎ - যুগের সুবর্ণ দ্বারপ্রান্তে উপনীত করে। 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আমার গ্রন্থাগারের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url