বিজ্ঞানী রবার্ট হুক (Robert Hooke)
বিজ্ঞানী রবার্ট হুক (১৬৩৫-১৭০৩)
আপনি কি ‘বর্ণ বিভ্রাট’ খেলায় আগ্রহী? তাহলে এই রোমান হরফগুলো কি হতে পারে দেখুন তো? - CELLINOSSTTUV.
ই ংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলবর্তী ওয়াইট দ্বীপে ১৬৩৫ সালের ১৮ ই সেপ্টেম্বর রবার্ট হুক জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন স্থানীয় গির্জার সহকারী ধর্মযাজক। পদমর্যাদার তুলনায় তিনি আর্থিক দিক দয়ে যথেষ্ট স্বচ্ছল ছিলেন। তবে রবার্টের বয়স তখন মাত্র ১৩ বছর তখন তিনি হঠাৎ মারা যান। এর ফলে বালক হুক লন্ডনে চলে যে বাধ্য হন। রবার্ট সেখানে অন্যতম নেতৃস্থানীয় চিত্রকর ‘স্যারিলিলি’র অধীনে শিক্ষানবিস পেন্টার নিযুক্ত হন। রবার্টের প্রতিভার পরিচয় পাওয়া গেলেও, তিনি ছিলেন রোগা। কাজের অবলম্বন তৈল ও রঙের সংস্পর্শ তিনি সহ্য করতে পারলেন না। প্রতিশ্রুতি থাকলেও তিনি কাজটা তাই ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তবে চিত্রশিল্পে তাঁর এই শিক্ষা পরবর্তী জীবনে তাঁর অনেক কাজে আসে।
সৌভাগ্যক্রমে তাঁর পিতা তাঁর জন্য মৃত্যুকালে ১০০ পাউন্ড রেখে গিয়েছিলেন। সেকালের জন্য এই অর্থ যথেষ্ট ছিলো। এর ফলে তিনি ‘ওয়েষ্টমিনিস্টার স্কুলে’ যোগদানে সমর্থ হন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে হুক ‘অক্সফোর্ডে’ যোগদান করেন এবং স্কুল থেকে কলেজে উত্তীর্ণ হন। তিনি গির্জার গায়ক দলে গান করেন এবং খানসামার কাজসহ বহু প্রকার ছোট কাজ করেন। কাজেই বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাঁর দক্ষতা ছিলো। তিনি ভাল চারু-কারু ও অংকন শিল্পী ছিলেন, তিনি কাঠ ও ধাতব প্লেটের উপরেও কাজ করতে পারতেন। সর্বোপরি তিনি ছিলেন একজন মেধাবী ও কৃতী ছাত্র।
অক্সফোর্ডে রবার্ট হুক ক্রিস্টোফার ওরেন এবং বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েলকে শিক্ষক পদে পান। রবার্ট বয়েল কৃতী এবং বিত্তশালী বিজ্ঞানী। তিনি রবার্ট হুক থেকে ৮ বছরের বড় ছিলেন। তিনি তাঁর েএই আকর্ষণীয় ছাত্রকে গবেষণা ও গবেষণাগারের সহকারী করে নেন। ওরেন জ্যামিতিতে নিজস্ব গবেষণার জন্যে বিখ্যাত হয়েছিলেন এবং ১৬৬০ সাল থেকে ওরেন স্থপতিরূপে আত্মপ্রকাশ করেন। লন্ডনের ‘সেন্টপলস গির্জার’ নকশা বা স্থপতিকাররূপে আজ অবধি তিনি খ্যাতিমান। ক্রিস্টোফার ওরেনের গৃহ ছিলো তৎকালীন ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানীদের মিলনকেন্দ্র। এই গৃহ ছিলো ‘অদৃশ্য কলেজের’ সম্মিলন স্থান। এই অদৃশ্য কলেজটিই পরবর্তীকালে বিখ্যাত বৈজ্ঞানিকদের গুরুত্বপূর্ণ ‘রয়্যাল সোসাইটিতে’ পরিণত হয়।
অনেকেরই বিশ্বাস যে, গ্যাস সম্পর্কিত সূত্র সহ রবার্ট বয়েলের অবদানের অনেক কিছুই হুকের মেধাশক্তি এবং যান্ত্রিক দক্ষতারই পরিণতি। প্রকৃতপক্ষে হুক নিজেই এই কৃতিত্ব দাবি করেছেন। অবশ্য বয়েল সর্বদা ন্যায়পরায়ণ ছিলেন বলেই প্রতিয়মান হয়। তাঁর গবেষণাগরে ‘ভ্যাকুয়াম পাম্প’ আবিষ্কৃত হওয়ার পর তিনি প্রকাশ্যে হুককে তাঁর কৃতিত্ব প্রদান করেন, যদিও সে সময় পাম্পগুলো ‘বয়েল ইঞ্জিন’ নামেই পরিচিত ছিলো।
রয়্যাল সোসাইটিতে হুক একটি অবৈতনিক কাজও করতেন। অবশ্য কাজটা খুবই আকর্ষণীয় ছিলো। সোসাইটির প্রতিটি বৈঠকের পূর্বে ফেলো-প্রাপ্ত বিজ্ঞানী যিনি গবেষণা করতে ইচ্ছুক থাকতেন, তিনি তাঁর বিবরণ তৈরি করতেন। এর ফলে বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখা সম্পর্কেই তিনি অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন এবং এতে তাঁর গবেষণার মান উন্নীত হয়।
অণুজগতের চিত্তাকর্ষক তথ্যাদি বর্ণনা করে হুক রয়্যাল সোসাইটির নিকট পত্র লিখতেন। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শক্তিশালী একক ‘পরকলা’ দিয়ে হুক কাজ করতেন। তিনি বহু ‘পরকলা’ তৈরি করেছিলেন। কিন্তু তাঁর একটাও ছাড়তে সম্মত ছিলেন না। এই ব্যাপারে অনুসন্ধানের জন্য রয়্যাল সোসাইটি হুককে দায়ীত্ব প্রদান করেন। একটা কার্যকরী ‘যৌগিক অনুবীক্ষণ’ তৈরি করার জন্যেও তাঁকে অনুরোধ জানানো হয়। শিল্পীর নিপুন দক্ষতা নিয়ে তিনি অণুবীক্ষণ দর্শনের যোগ্য ৬০ টি বিভিন্ন ধরণের উল্লেখযোগ্য চিত্র অংকন করেন। এর মধ্যে ছিলো- মৌমাছির চোখ, ডাঁশ পোকার রূপান্তর, পালকের গঠনপ্রকৃতি, উকুন, মাছি ইত্যাদি। সব কিছুকে তিনি অতি যত্নের সঙ্গে নির্ভূলভাবে অনেক বড় করে অংকন করেন। ১৬৬৪ সালে তাঁর ‘মাইক্রোগ্র্যাফিয়া’ গ্রন্থে এই স্মরণীয় চিত্রগুলো প্রকাশিত হয়। কিভাবে অণুবীক্ষণ যন্ত্র নির্মাণ ও ব্যবহার করতে হবে তা সেই গ্রন্থে হুক দেখিয়ে দেন। তবে লেভ্যানহুকেই অনুবীক্ষণ যন্ত্রের জনকরূপে ধরা হয়।
১৬৬৬ সালে লন্ডনে এক প্রলয়ঙ্কারী অগ্নিকান্ড ঘটে। অগ্নি নির্বাপনের পূর্বেই নগরীর শতকরা ৮০ ভাগ ধ্বংস হয়ে যায়। ক্রিস্টোফার ওরেন তার স্থপতির অফিসে হুকের সাহায্য গ্রহণ করেন। লন্ডন নগরী পূনর্গঠনের সেই পরিকল্পনাটি ওরেনের বলে পরিচিত, আসলে তা হুক-এরই তৈরি। নগরী পুননির্মানের সুপারিশ করা হয়, - রাস্তাগুলো পরস্পরে সমকোণে অবস্থিত হবে। পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়, অবশ্য পরিকল্পনার কোন খুঁতের জন্যে নয়। অগ্নিকান্ডে রক্ষাপ্রাপ্ত ভবনসমূহের মালিকদের বিরোধিতার জন্যেই পরিকল্পনাটি বাতিল হয়। ফলে এখনও লন্ড নগরীতে বহু সংকীর্ণ আঁকা-বাঁকা অলি-গলি রয়েছে।
হুক ছিলেন েএকজন খাঁটি ও নিখুঁত ইঞ্জিনিয়ার। তিনি আলোক সম্পর্কিত নিজস্ব জ্ঞান জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিমাপের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি দূরবীক্ষণ দর্শনযন্ত্র এবং পরিবর্তযোগ্য স্ক্রর সাহায্যে একটি ‘কোয়াড্রান্ট’ তৈরি করেন। নৌচলনাকালে জরিকার্য পরিচালনার উপযোগী বিভিন্ন যন্ত্রপাতিও তিনি আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁর বাতাস পরিমাপক গজ, ব্যারোমিটার, বৃষ্টি মাপার গজ এবং আদ্রতা পরিমাপক যন্ত্র আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছিলো। রয়্যাল সোসাইটির উদ্যোগে তিনি আবহাওয়া সংক্রান্ত একটি গ্রন্থ প্রকাশনার ব্যবস্থা করেন। তাই হুককে আবাহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদান যন্ত্রের জনক বলা হয়। আবহাওয়া নির্ধারণে সূর্যের বিকিরণ এবং পৃথিবীর আবর্তনের য সত্যিকার কর্ম তিনিই প্রথম অনুধাবন করেছিলেন।
নিউটনের ‘প্রিন্সিপিয়া’ প্রকাশের পাঁচ বছর পূর্বে হুক রয়্যাল সোসাইটিতে একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। এই ভাষণ থেকে বিশ্বজনীন মাধ্যাকর্ষণ সূত্র সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি আন্দাজ করা যায়। তিনি বলেন - “নভোমন্ডলের সকল বস্তুরই আকৃতি গোলক ধরণের এবং তাদের অনেকগুলোই নিজ-নিজ অক্ষরেখায় অবর্তিত হয়। তাদের মাধ্যাকর্ষণশক্তির অস্তিত্ব না থাকলে তাদের সকল আলাগা অংশই (Extrapolation) গুলতির পাথরের মত ছিটকে বেড়িয়ে যেত।
নিউটন তাঁর মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব ১০ বছর পূর্বেই রচনা করেছিলেন, কিন্তু তখনো পর্যন্ত সেটা প্রকাশ করেননি। তিনি যখন শেষ পর্যন্ত ‘প্রিন্সিপিয়া’ রচনা করেন, তখন হুক ভেঙে পড়েন। কারণ তিনি অনুভব করেছিলেন যে, নিউটন তাঁর কিছুসংখ্যক গবেষণাকর্মকে স্বীকৃতি ব্যতিরেখেই ব্যবহার করেছেন। এই ঘটনা উভয়ের মধ্যে যথেষ্ট তিক্ততার সৃষ্টি করে এবং এই বিরাট বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নিয়ে ঝগড়া বিবাদেরও সৃষ্টি হয়।
কাহিনীর শুরুতে যে ‘বর্ণ-বিভ্রাট’ দেওয়া হয়েছে, তা কি সমাধান করতে পেরেছেন কেউ? সঠিক সমাধান হবে-“উট্ টেনসিও, সিক ভিস” (Ut Tensio, Sic Vis)। এটা হচ্ছে হুকের স্থিতিস্থাপক সূত্রের ল্যাটিন রূপ। ১৬৭৬ সালে হুক েএই বর্ণ-বিভ্রাটকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আকারে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করেন। এইভাবে তিনি প্রমাণ করেন যে, তিনিই এই চিন্তাধারাটা বিকাশে অগ্রজ, যদিও সকল তথ্য সম্পর্কে তিনি নিজেও সন্দেহমুক্ত ছিলেন না। ল্যাটিন বাক্যটির অনুবাদ হলঃ “ব্যাপ্তি ও শক্তির আনুপাতিক”। হুকের সূত্রকে অবিশ্বাস্য রকমের সহজ প্রতীয়মান হয়। যদি েএক পাউন্ড ওজন একটা স্প্রিংয়ে এক ইঞ্চি প্রসারণ ঘটে, তাহলে দুই পাউন্ড ওজনে দুই ইঞ্চি প্রসারণ ঘটবে এবং ১০ পাউন্ডে ১০ ইঞ্চি প্রসারণ ঘটবে। স্প্রিং এর শক্তির সীমার মধ্যে থেকেই এভাবে আনুপাতিক প্রসারণ বা বৃদ্ধি চলবে।
হুক এই নীতি স্প্রিং ভারসাম্য উদ্ভাবনে তক্ষুণি প্রয়োগ করেন। হুক স্প্রিং স্থিতিস্থাপক এবং একটা পরিচিত পিন্ডকে ‘সেন্ট পলের গির্জার উপরে নিয়ে যান এবং প্রমাণের চেষ্টা করেন যে, যতো উপরে যাওয়া যায় মাধ্যাকার্ষণের আকর্ষণ ততোই হ্রাস পায়। এই পরীক্ষার মূলে এই তত্ত্বই কাজ করেছিলো যে, পৃথিবীর কেন্দ্রের নিকটে মাধ্যাকর্ষণের টান অধিক এবং কেন্দ্র থেকে যতই দূরে যাওয়া যাবে আকর্ষণ ততোই হ্রাস পাবে।
স্প্রিং সম্পর্কে বিশদ বিশ্লেষণের ফলেই ঘড়ি আবিষ্কার সম্ভব হয়। তখন দোলকঘড়ির সাধারণ ব্যবহার প্রচলিত ছিলো। কিন্তু এই ঘড়িকে এক জায়গায় স্থির রাখতে হত। চলন্ড জাহাজে দোলকঘড়ির ব্যবহার কার্যকর ছিলো না। তদুপরি নিরক্ষরেখার মাধ্যাকর্ষণ শক্তির হ্রাসের ফলেই এটা হতো। হুক দোলকের পরিবর্তে ‘স্থিতিস্থাপক চাকা’ এবং ‘হেয়ার স্প্রিং’ ব্যবহার করেন। পরিকল্পনাটা হলো এই যে, হেয়ার স্প্রিং নিজ কেন্দ্রস্থলের এদিক থেকে ওদিক একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে অব্যাহতভাবে আন্দোলিত হতে থাকবে। এখানে হুকের স্বপ্ন পুনরায় বাতিল হয়ে যায়। ফ্রান্সের ক্রিশ্চিয়ান হইগ্যানস অনুরূপ পদ্ধতি ১৬৭৫ সালেই উদ্ভাবন করেন এবং তিনি তাঁর আবিষ্কারের পেটেন্ট করিয়ে নেন। তবুও হুক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে নিজ অগ্রাধিকার প্রমাণে সফল হন’ কিন্তু হইগ্যানস এর পেটেন্টই বহাল থাকে। এরপর হুক এই ব্যাপারে উৎসাহ হারিয়ে এক্ষেত্রে আর অগ্রসর হননি।
হুক রয়্যাল সোসাইটির সেক্রেটারীর পদেও কাজ করেন। ১৬৮২ সালে তিনি এই কাজ ছেড়ে দিলেও, বৈজ্ঞানিক তথ্য ভিত্তিক প্রবন্ধ রচা কর্ম তিনি অব্যাহত রাখেন।
হুক চিরকুমার ছিলেন। তাঁর এক সুন্দরী ভ্রাতুষ্পুত্রী তাঁর সঙ্গে থাকতেন এবং ঘরের কাজকর্ম দেখাশোনা করতেন। ১৬৮৭ সালে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর অকাল তিরোধানে হুক একেবারে মুষড়ে পড়েন। ১৭০৩ সালে হুকের মৃত্যুর পর তাঁর সমস্ত টিকা মন্তব্যসমূহ পুস্তককারে প্রকাশিত হয়। এতে প্রায় ৪ লক্ষ শব্দ স্থান পায়। এরপরই বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর আগ্রহ ও উৎসাহ কর্মের পূর্ণ বিবরণ বিশ্বজুড়ে উদঘাটিত হয়।
জাগতি খ্যাতি ও সাফল্য তাঁর মুঠোর মধ্যে আসেনি। কিন্তু মৌলিক মনন থেকে তিনি বহু তত্ত্ব ও আবিষ্কারের ধারণা পোষণ করেছিলেন। যখন তিনি স্ক্র ড্রাইভারের মাথা তাঁর গঢ়ির উপর রেখে কাঠের হাতল কানের কাছে লাগিয়ে নিজ ঘড়ির শব্দ শ্রবণ করেন, তখন তিন ‘স্ট্রেথোসকোপ’- এর আবিষ্কার সম্পর্কে কিছুটা ইঙ্গিত দেন। অবশ্য এর ১৫০ বছর পরে তা পুরোপুরি রূপ দেওয়া সম্ভব হয়। কর্কের গঠন কাঠামো বর্ণনা করার জন্যে তিনি ‘সেল’ বা কোষ শব্দটি ব্যবহার করেন। অণুবীক্ষণের মধ্যে তিনি এই কোষের সন্ধান পান এবং একে মৌমাছির চাকের সঙ্গে তুলনা করেন।
তাঁর যুগের অধিকাংশ বিজ্ঞানীর মতো তিনিও সমাজ-কল্যাণে উৎসাহী ছিলেন এবং মনুষের মন-মানসিকতা, আর্থিক অবস্থা উন্নততর করার জন্য গবেষণায় মনোযোগ দেন। বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সর্বদা খনি-শ্রমিক ও কৃষকদের সমস্যাবলী সমাধানের আগ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন।
রবার্ট হুক ছিলেন এক বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক প্রতিভা। তাঁর আবিষ্কারসমূহ নিউটন, হইপ্যানস এবং লেভ্যানহুকের মতোই মহান। তবে স্প্রিং সম্পর্কিত সূত্রের জন্য তিনি স্বরণীয় হয়ে রয়েছেন- যা ‘উট টেনসিও, সিক ভিস’ নামে পৃথিবী জুড়ে এই মহান বিজ্ঞানীকে আজো স্বরণীয় করে রেখেছে।
১৬৬৬ সালে লন্ডনে এক প্রলয়ঙ্কারী অগ্নিকান্ড ঘটে। অগ্নি নির্বাপনের পূর্বেই নগরীর শতকরা ৮০ ভাগ ধ্বংস হয়ে যায়। ক্রিস্টোফার ওরেন তার স্থপতির অফিসে হুকের সাহায্য গ্রহণ করেন। লন্ডন নগরী পূনর্গঠনের সেই পরিকল্পনাটি ওরেনের বলে পরিচিত, আসলে তা হুক-এরই তৈরি। নগরী পুননির্মানের সুপারিশ করা হয়, - রাস্তাগুলো পরস্পরে সমকোণে অবস্থিত হবে। পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়, অবশ্য পরিকল্পনার কোন খুঁতের জন্যে নয়। অগ্নিকান্ডে রক্ষাপ্রাপ্ত ভবনসমূহের মালিকদের বিরোধিতার জন্যেই পরিকল্পনাটি বাতিল হয়। ফলে এখনও লন্ড নগরীতে বহু সংকীর্ণ আঁকা-বাঁকা অলি-গলি রয়েছে।
হুক ছিলেন েএকজন খাঁটি ও নিখুঁত ইঞ্জিনিয়ার। তিনি আলোক সম্পর্কিত নিজস্ব জ্ঞান জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিমাপের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি দূরবীক্ষণ দর্শনযন্ত্র এবং পরিবর্তযোগ্য স্ক্রর সাহায্যে একটি ‘কোয়াড্রান্ট’ তৈরি করেন। নৌচলনাকালে জরিকার্য পরিচালনার উপযোগী বিভিন্ন যন্ত্রপাতিও তিনি আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁর বাতাস পরিমাপক গজ, ব্যারোমিটার, বৃষ্টি মাপার গজ এবং আদ্রতা পরিমাপক যন্ত্র আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছিলো। রয়্যাল সোসাইটির উদ্যোগে তিনি আবহাওয়া সংক্রান্ত একটি গ্রন্থ প্রকাশনার ব্যবস্থা করেন। তাই হুককে আবাহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদান যন্ত্রের জনক বলা হয়। আবহাওয়া নির্ধারণে সূর্যের বিকিরণ এবং পৃথিবীর আবর্তনের য সত্যিকার কর্ম তিনিই প্রথম অনুধাবন করেছিলেন।
নিউটনের ‘প্রিন্সিপিয়া’ প্রকাশের পাঁচ বছর পূর্বে হুক রয়্যাল সোসাইটিতে একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। এই ভাষণ থেকে বিশ্বজনীন মাধ্যাকর্ষণ সূত্র সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি আন্দাজ করা যায়। তিনি বলেন - “নভোমন্ডলের সকল বস্তুরই আকৃতি গোলক ধরণের এবং তাদের অনেকগুলোই নিজ-নিজ অক্ষরেখায় অবর্তিত হয়। তাদের মাধ্যাকর্ষণশক্তির অস্তিত্ব না থাকলে তাদের সকল আলাগা অংশই (Extrapolation) গুলতির পাথরের মত ছিটকে বেড়িয়ে যেত।
নিউটন তাঁর মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব ১০ বছর পূর্বেই রচনা করেছিলেন, কিন্তু তখনো পর্যন্ত সেটা প্রকাশ করেননি। তিনি যখন শেষ পর্যন্ত ‘প্রিন্সিপিয়া’ রচনা করেন, তখন হুক ভেঙে পড়েন। কারণ তিনি অনুভব করেছিলেন যে, নিউটন তাঁর কিছুসংখ্যক গবেষণাকর্মকে স্বীকৃতি ব্যতিরেখেই ব্যবহার করেছেন। এই ঘটনা উভয়ের মধ্যে যথেষ্ট তিক্ততার সৃষ্টি করে এবং এই বিরাট বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নিয়ে ঝগড়া বিবাদেরও সৃষ্টি হয়।
কাহিনীর শুরুতে যে ‘বর্ণ-বিভ্রাট’ দেওয়া হয়েছে, তা কি সমাধান করতে পেরেছেন কেউ? সঠিক সমাধান হবে-“উট্ টেনসিও, সিক ভিস” (Ut Tensio, Sic Vis)। এটা হচ্ছে হুকের স্থিতিস্থাপক সূত্রের ল্যাটিন রূপ। ১৬৭৬ সালে হুক েএই বর্ণ-বিভ্রাটকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আকারে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করেন। এইভাবে তিনি প্রমাণ করেন যে, তিনিই এই চিন্তাধারাটা বিকাশে অগ্রজ, যদিও সকল তথ্য সম্পর্কে তিনি নিজেও সন্দেহমুক্ত ছিলেন না। ল্যাটিন বাক্যটির অনুবাদ হলঃ “ব্যাপ্তি ও শক্তির আনুপাতিক”। হুকের সূত্রকে অবিশ্বাস্য রকমের সহজ প্রতীয়মান হয়। যদি েএক পাউন্ড ওজন একটা স্প্রিংয়ে এক ইঞ্চি প্রসারণ ঘটে, তাহলে দুই পাউন্ড ওজনে দুই ইঞ্চি প্রসারণ ঘটবে এবং ১০ পাউন্ডে ১০ ইঞ্চি প্রসারণ ঘটবে। স্প্রিং এর শক্তির সীমার মধ্যে থেকেই এভাবে আনুপাতিক প্রসারণ বা বৃদ্ধি চলবে।
হুক এই নীতি স্প্রিং ভারসাম্য উদ্ভাবনে তক্ষুণি প্রয়োগ করেন। হুক স্প্রিং স্থিতিস্থাপক এবং একটা পরিচিত পিন্ডকে ‘সেন্ট পলের গির্জার উপরে নিয়ে যান এবং প্রমাণের চেষ্টা করেন যে, যতো উপরে যাওয়া যায় মাধ্যাকার্ষণের আকর্ষণ ততোই হ্রাস পায়। এই পরীক্ষার মূলে এই তত্ত্বই কাজ করেছিলো যে, পৃথিবীর কেন্দ্রের নিকটে মাধ্যাকর্ষণের টান অধিক এবং কেন্দ্র থেকে যতই দূরে যাওয়া যাবে আকর্ষণ ততোই হ্রাস পাবে।
স্প্রিং সম্পর্কে বিশদ বিশ্লেষণের ফলেই ঘড়ি আবিষ্কার সম্ভব হয়। তখন দোলকঘড়ির সাধারণ ব্যবহার প্রচলিত ছিলো। কিন্তু এই ঘড়িকে এক জায়গায় স্থির রাখতে হত। চলন্ড জাহাজে দোলকঘড়ির ব্যবহার কার্যকর ছিলো না। তদুপরি নিরক্ষরেখার মাধ্যাকর্ষণ শক্তির হ্রাসের ফলেই এটা হতো। হুক দোলকের পরিবর্তে ‘স্থিতিস্থাপক চাকা’ এবং ‘হেয়ার স্প্রিং’ ব্যবহার করেন। পরিকল্পনাটা হলো এই যে, হেয়ার স্প্রিং নিজ কেন্দ্রস্থলের এদিক থেকে ওদিক একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে অব্যাহতভাবে আন্দোলিত হতে থাকবে। এখানে হুকের স্বপ্ন পুনরায় বাতিল হয়ে যায়। ফ্রান্সের ক্রিশ্চিয়ান হইগ্যানস অনুরূপ পদ্ধতি ১৬৭৫ সালেই উদ্ভাবন করেন এবং তিনি তাঁর আবিষ্কারের পেটেন্ট করিয়ে নেন। তবুও হুক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে নিজ অগ্রাধিকার প্রমাণে সফল হন’ কিন্তু হইগ্যানস এর পেটেন্টই বহাল থাকে। এরপর হুক এই ব্যাপারে উৎসাহ হারিয়ে এক্ষেত্রে আর অগ্রসর হননি।
হুক রয়্যাল সোসাইটির সেক্রেটারীর পদেও কাজ করেন। ১৬৮২ সালে তিনি এই কাজ ছেড়ে দিলেও, বৈজ্ঞানিক তথ্য ভিত্তিক প্রবন্ধ রচা কর্ম তিনি অব্যাহত রাখেন।
হুক চিরকুমার ছিলেন। তাঁর এক সুন্দরী ভ্রাতুষ্পুত্রী তাঁর সঙ্গে থাকতেন এবং ঘরের কাজকর্ম দেখাশোনা করতেন। ১৬৮৭ সালে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর অকাল তিরোধানে হুক একেবারে মুষড়ে পড়েন। ১৭০৩ সালে হুকের মৃত্যুর পর তাঁর সমস্ত টিকা মন্তব্যসমূহ পুস্তককারে প্রকাশিত হয়। এতে প্রায় ৪ লক্ষ শব্দ স্থান পায়। এরপরই বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর আগ্রহ ও উৎসাহ কর্মের পূর্ণ বিবরণ বিশ্বজুড়ে উদঘাটিত হয়।
জাগতি খ্যাতি ও সাফল্য তাঁর মুঠোর মধ্যে আসেনি। কিন্তু মৌলিক মনন থেকে তিনি বহু তত্ত্ব ও আবিষ্কারের ধারণা পোষণ করেছিলেন। যখন তিনি স্ক্র ড্রাইভারের মাথা তাঁর গঢ়ির উপর রেখে কাঠের হাতল কানের কাছে লাগিয়ে নিজ ঘড়ির শব্দ শ্রবণ করেন, তখন তিন ‘স্ট্রেথোসকোপ’- এর আবিষ্কার সম্পর্কে কিছুটা ইঙ্গিত দেন। অবশ্য এর ১৫০ বছর পরে তা পুরোপুরি রূপ দেওয়া সম্ভব হয়। কর্কের গঠন কাঠামো বর্ণনা করার জন্যে তিনি ‘সেল’ বা কোষ শব্দটি ব্যবহার করেন। অণুবীক্ষণের মধ্যে তিনি এই কোষের সন্ধান পান এবং একে মৌমাছির চাকের সঙ্গে তুলনা করেন।
তাঁর যুগের অধিকাংশ বিজ্ঞানীর মতো তিনিও সমাজ-কল্যাণে উৎসাহী ছিলেন এবং মনুষের মন-মানসিকতা, আর্থিক অবস্থা উন্নততর করার জন্য গবেষণায় মনোযোগ দেন। বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সর্বদা খনি-শ্রমিক ও কৃষকদের সমস্যাবলী সমাধানের আগ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন।
রবার্ট হুক ছিলেন এক বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক প্রতিভা। তাঁর আবিষ্কারসমূহ নিউটন, হইপ্যানস এবং লেভ্যানহুকের মতোই মহান। তবে স্প্রিং সম্পর্কিত সূত্রের জন্য তিনি স্বরণীয় হয়ে রয়েছেন- যা ‘উট টেনসিও, সিক ভিস’ নামে পৃথিবী জুড়ে এই মহান বিজ্ঞানীকে আজো স্বরণীয় করে রেখেছে।

আমার গ্রন্থাগারের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url