আলবার্ট আইনষ্টাইন (জন্মঃ ১৪ ই মার্চ) ১৮৭৯, মৃত্যুুঃ ১৮ ই এপ্রিল ১৯৫৫)
বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আলাবার্ট আইনষ্টাইন লিখেছিলেন,-
“মাননীয় প্রেসিডেন্ট মহোদয়,
ই. ফারমী এবং এস. জিলার্ভ- এর সাম্প্রতিক গবেষণর কিছু অংশ পান্ড ুলিপির আকারে আমার নিকট প্রেরণ করা হয়েছে। এ থেকে আমি এই একটি বিশ্বাসে পৌছেছি যে, অদূর ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম পদার্থটিকে শক্তির একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত করার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ধরণের একটি মাত্র বোমা কোন বন্দরে বিস্ফোরিত করা হলে তা সমগ্র বন্দর এবং সাথে সাথে এর আশেপাশের এলাকা সমানে ধ্বংস করে দিতে পারে।”
ইংরেজী ১৯৩৯ সালের শীতকালের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টকে লেখা হয়েছিলো এই পত্রটি। এর আরো ছয় বছর পরে ১৯৪৫ সালের ৬ই আগষ্ট তারিখে এই ধরণের একটি মাত্র বোমা ফেলা হয়েছিলো জাপানের হিরোশিমা শহরে। এত ষাট হাজার লোক নিহত হয়, এক লক্ষ লোক আহত হয় এবং দু’লক্ষ লোক গৃহহীন হয়। পারমাণবিক বোমা শহরের ছয়শত ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত করে দেয়। কয়েকদিন পরে নাগাশাকি শহরের উপর ঐরূপ আরো একটি বোমা ফেলা হয়। জাপান সরকার বাধ্য হয়ে আত্মসমর্পণ করেন। দুটি বোমা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটায়।
আইনষ্টাইনের ১৯০৫ সালের এক সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে পারমাণবিক বোমা প্রস্তুত করা হয়। সে সিদ্ধান্ত হচ্ছে এই পদার্থকে শক্তিকে রূপান্তরিত করা যায় এবং শক্তিকে পদার্থে পরিবর্তিত করা যায়। পূর্ববর্তী বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুসারে দেখা যায়, পদার্থকে সৃষ্টি বা ধ্বংস কোনটাই করা সম্ভব ছিলো না। আইনষ্টাইনের গবেষণা তাঁকে বীজগণিতের নিম্নলিখিত সহজ-সরল সমীকরণের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়- সমীকরণটি হল,
E=MC²
এর অর্থ হল, শক্তি = ভর ⤫ আলোকের গতি । আলোকের গতি প্রচুর - প্রতি সেকেন্ডে ১,৮৬০০০ মাইল কিংবা প্রতি মিনিটে ৬০,০০০,০০০,০০০ ফুট। কাজেই সামান্য পরিমাণ পদার্থ থেকে যে শক্তি লাভ করা যায় তার পরিমাণও বিপুল। প্রকৃতপক্ষে এক পাউন্ড কয়লার মতো পদার্থ যদি সম্পূর্ণরূপে শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায় তাহলে তার ফলে এক হাজার কোটি কিলোওয়াট ঘন্টার বেশি শক্তি পাওয়া যাবে। এ ভাবে দেখা যায় দশ পাউন্ড পদার্থ সারা বিশ্বকে পুরো একমাস বিদ্যুৎ সরবরাহ করে চালিয়ে নিতে পারে।
আলবার্ট আইনস্টাইন ১৮৭৯ সালের ১৪ই মার্চ তারিখে জার্মানীর আলম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের এক বছর পরে তাঁর পুরো পরিবার সেখানকার বাস উঠিয়ে মিউনিখের শহরতলীতে নতুন বসত করেন। আলবার্টের পিতা একটি ছোট ইলেক্ট্রো-কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ট্রেনিংপ্রাপ্ত। তিনি এই কাজে সর্বদা সাহায্য করতেন এবং আইনস্টাইন পরিবারের সঙ্গে বাস করতেন। আইনস্টাইনের মাতা সঙ্গীতের দারুণ ভক্ত ছিলেন এবং তিনি বিশেষ করে বিটোফেন পছন্দ করতেন।
সঙ্গীতের প্রতি তার এই অনুরাগের ফলে তাঁর ছয় বছর বয়ষ্ক পুত্র আইস্টাইনের জন্যেও বেহালা বাজানো শেখানোর পাঠ শুরু হয়। প্রথম প্রথম তিনি এই বাদ্যটাকে ভালবাসতেন না। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি এতে মনোযোগী হন এবং দক্ষতা অর্জন শুরু করেন আর বিশেষ করে মোজার্টের রাগপ্রধান সঙ্গীতের ভীষণ অনুরাগী হয়ে ওঠেন। শৈশবের এই সঙ্গীত শিক্ষা তিনি সারা জীবন কাজে লাগিয়েছেন। এবং জানা যায় এ থেকে ঘন্টার পর ঘন্টা বিশ্রাম ও আনন্দ উপভোগ করেছেন।
অসাধারণ প্রতিভাবান ছেলে বলতে যা বোঝায় আইনস্টাইন তার ধারে কাছেও ছিলেন না। তখন তিনি নিরেট বোকাই ছিলেন। ছেলেবেলায় তাঁর কথা ফুটতে এতো দেরি হয়েছিলো যে, পিতামাতার ভয় হয়েছিলো ছেলেটা হয়তো বোবাই হবে। ছেলেবেলা হতেই তিনি সমবয়সী ছেলেদের থেকে নিজেকে আলাদা করে রাখতেন এবং আলসেমি করে ও দিবাস্বপ্নের মধ্যে দিন কাটাতেন। তিনি বিশেষ করে কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের কাজ এড়িয়ে চলতেন, পরিশ্রমসাপেক্ষ খেলা থেকে বিরত থাকতেন এবং সৈনিক চাকুরিকে বিশেষ ঘৃণা করতেন। মিউনিখের রাস্তায় প্রায়শঃই জার্মান সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজের দৃশ্য দেখা যেত। অধিকাংশ ছেলেমেয়ের জন্যই এই দৃশ্য ছিলো রোমাঞ্চকর। কিন্তু আলবার্ট কুচকাওয়াজ দেখে অস্বস্তি বোধ করতেন। যন্ত্রের মতো মানুষের চলাফেরাকে তিনি ঘৃনা করতেন- সব যেন তাঁর কাছে কলের পুতুল বলে মনে হত।
মিউনিখে কোন সরকারী শিক্ষা ব্যবস্থা ছিলো না । প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দ্বারা পরিচালিত হত। আইনস্টাইনের পিতা মাতা ছিলেন ইহুদী। কিন্তু ধর্মের প্রতি কোন আগ্রহ তাদের ছিলো না। পুত্র আলবার্টকে তারা নিকটতম বিদ্যালয়ে প্রেরণ করেন। এটা ছিলো একটা রোমান কাথলিক পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়। দশ বছর বয়সে ‘জিমন্যাসিয়াম’ নামে পরিচিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তাঁকে ভর্তি করা হয়। এই বিদ্যালয়ের ছাত্রদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির উপযুক্ত করে দেওয়া হত। স্কুলে তিনি সুখি ছিলেন না। কোন রকম সাফল্যও তিনি লাভ করেননি। ছাত্রদেরকে কেবল তোতা পাখির মত পাঠ মুখস্ত করানো হত। এটা তাঁর পছন্দ হতো না। যে ধরনের ঘরোয়া আলোচনার মাধ্যমে পাঠ্যবিষয় সম্পর্কে গভীর ধারণা জন্মে, বিদ্যালয়ে তাঁর কোন ব্যবস্থা ছিলো না।
জিমন্যাসিয়ামে থাকতে আইনস্টাইন ইহুদী ধর্ম সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করেন। ক্যাথলিক মতবাদ সম্পর্কে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই শিক্ষা লাভ করেছিলেন। ফলে ধর্মের নৈতিক মূল্যবোধ সম্পর্কে তাঁর মনে একটি স্থায়ী শ্রদ্ধার আসন গড়ে ওঠে। কিন্তু তিনি মনে করতেন যে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান মাত্রই কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং মানুষকে স্বাধীন চিন্তা থেকে বিরত রাখাই এর প্রধান উদ্দেশ্য। জিমন্যাসিয়াম থেকে উত্তীর্ণ হবার পর তিনি তাঁর ধর্মীয় সংঘের সদস্যপদ ত্যাগ করেন। কিন্তু হিটলার-নাৎসী শাসন আমলে জার্মানরা যখন ব্যপকভাবে ইহুদীদেরকে অভিযুক্ত ও হত্যা করতে থাকে তখন তিনি পুনরায় ইহুদী সমাজে ফিরে আসেন। আইনস্টাইনের পিতৃব্য অর্থাৎ সেই ইঞ্জিনিয়ার গণিতশাস্ত্রের প্রতি আইনস্টাইনের আগ্রহ বাড়িয়ে দেন। অঙ্কের কোন সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে যে পরিমাণ পরিশ্রমের দরকার বীজগণিতের সাহায্য নিয়ে কিভাবে তা কমিয়ে করা যেতে পারে বালক আলবার্টকে তাই তিনি শিখিয়ে দেন। বালকের সরল মনের প্রতি আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন-“এটা একটা মজার বিজ্ঞান। ধর একটা পশু আমরা শিকার করতে চাই, কিন্তু কিছুতেই তাকে আমরা ধরতে পারছি না। এই পশুটার নাম আপাতত আমরা ‘ক’ দিলাম। এখন যতক্ষণ পর্যন্ত এটাকে আমরা ধরতে পারবো না ততক্ষণ একে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবো।” জ্যামিতির পাঠ কিশোর আইনস্টাইনের মনে গভীর রেখাপাত করে এবং রোমাঞ্চিত করে তোলে। এর সংক্ষিপ্ত স্পষ্ট ভাষা, উপপাদ্যের প্রমাণ, প্রমাণের যুক্তি এবং সম্পাদ্যের সমাধানকে যুক্তির দ্বারা বিশ্লেষণের সুযোগ তাঁর মনে আনন্দের শিহরণ নিয়ে আসে। আইনস্টাই বলেছেন-“তাঁর শৈশবের দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার একটি হচ্ছে,- পাঁচ বছর বয়সে তাঁকে একটি চুম্বক দিকনির্ণয় যন্ত্র উপহার এবং অপরটি অপরটি হচ্ছে বারো বছর বয়সে তাঁর ইউক্লিডের জ্যামিতি অধ্যায়ন।” তিনি আরো বলেছেন,-“শৈশবের এই বই যে ছেলের মনে আনন্দের দোলা দেয় না, তাত্তিক অনুসন্ধানী হওয়া সে ছেলের কাজ নয়।”
আইনস্টাইনের বয়স যখন ১৫ বছর তখন তাঁর পিতার আর্থিক অবস্থার জন্য মিউনিখের বৈদ্যুতিক ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য তিনি ইতালীর মিলানে গমন করেন। আলবার্ট তখনো জিমন্যাসিয়ামে পড়ছিলেন। কাজেই ডিপ্লোমা নেওয়ার জন্য তাঁর মিউনিখেই থাকার ব্যবস্থা করা হয়। আইনস্টাইনের কাছে বিদ্যালয় ক্রমেই বিরক্তিকর হয়ে উঠেছিলো। তিনি গণিতশাস্ত্রে বহুদূর এগিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু অন্য যেসব বিষয়ে কঠোর নিয়ম রক্ষা করে শিক্ষাদান করা হয়েছিলো তাতে তিনি অত্যন্ত খারাপ করেছিলেন। এই বিদ্যালয়ে ছাত্রদেরকে শিক্ষকদের প্রতি অন্ধভক্তি দেখিয়ে চলতে হতো। কিন্তু ইইনস্টাইন তা না করায় তাঁকে জিমন্যাসিয়াম থেকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি বাধ্য হয়ে ইতালীতে পিতার নিকটে ফিরে যান।
ইতালীতে কিছুকাল কাটানোর পর তিনি নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তা করার সুযোগ পেলেন। তিনি গণিত সংশ্লিষ্ট পদার্থবিদ্যা অধ্যায়নে আত্মনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিলেন। এবং তদনুসারে তিনি সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অবস্থিত বিখ্যাত ‘সুইস ফেডারেল পলিটেকনিক স্কুলে’ ভর্তির পরীক্ষা দিলেন, কিন্তু তিনি ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেন না। অঙ্কশাস্ত্রে তাঁর জ্ঞান ছিলো অসাধারণ। কিন্তু ভাষা-সাহিত্য এবং জীববিজ্ঞানে তিনি অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন। পলিটেকনিকের ডিরেক্টর অঙ্কশাস্ত্রে তাঁর দখল দেখে বিস্মিত হলেন এবং সুইজারল্যান্ডে তাঁর ভর্তি হওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। এখানে বিদ্যালয়গুলোকে মিউনিখের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদাভাবে পরিচালিত হতে দেখে আইনস্টাইন অত্যান্ত খুশি হলেন। এখানে কঠোর নিয়ম কানুন পালনের কোন বাধ্যবাধকতা ছিলো না। ছাত্ররা নিজেদের মতো দেখেশুনে চলবে বলে আশা করা হত। শিক্ষকরাও ছাত্রদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে আগ্রহী ছিলেন। জীবনে সর্বপ্রথম আইস্টাইন বিদ্যালয়কে উপভোগ্য স্থান বলে মনে করলেন। পাঠ্যক্রম সমাপ্তির পর তাঁকে জুরিখের ‘সুইচ ফেভারেল পলিটেকনিক স্কুলে; ভর্তি করা হল।
জুরিখে অবস্থানকালে তিনি পদার্থ বিদ্যার শিক্ষক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেনে এবং এই লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ শুরু করেন। অর্থিক দিক থেকে জুরিখে তাঁর অবস্থান সচ্ছল ছিলো না। ব্যবসায়ে লোকসান হওয়ার দরুণ তাঁর পিতাও তাঁকে তখন সাহায্য করতে পারেননি। সৌভাগ্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানকালে জনৈক্য অবস্থাপন্ন আত্মীয় তাঁকে সাহায্য করতে সম্মত হন।
আইষ্টাইন বিশেষ প্রতিভাবান ছাত্র ছিলেন এবং অধ্যাপকদের নিকট থেকেও তিনি বহু প্রসংশা ও সুপারিশ পত্র পেয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও শিক্ষকতার চাকুরিলাভে তিনি সক্ষম হলেন না। জীবিকার তাগিদে তিনি বার্নে অবঞ্চিত ‘সুইসপেটেন্ট’ অফিসে পরীক্ষকের চাকুরি গ্রহণ করেন।
১৯০৫ সালে পেটেন্ট অফিসে চাকুরিরত থাকাকালেই আইনস্টাইন বিশেষ ‘আপেক্ষিকতত্ত্ব’ আবিষ্কার করেন। যা পরিশানে আজকের পারমাণবিক বোমায় সম্পূর্ণরূপ লাভ করে। সে সময় পর্যন্ত পদার্থবিদ্যার ভিত্তি ছিলো নিউটনের গতিতত্ত্ব। প্রায় দুইশত বছর পূর্বে এই তত্ত্ব আবিষ্কৃত হয় এবং পদার্থবিদ্যা সংক্রান্ত সমস্যাবলীর অধিকাংশের জবাব পাওয়া যেতো এই তত্ত্বের মাধ্যমে। - কিন্তু এতে কিছুটা সমস্যা দেখা দিতে থাকে। উধাহরণ দেওয়া যায়, চলন্ত বিমান থেকে যদি সম্মুখের দিকে রকেট নিক্ষেপ করা হয় তাহলে সে রকেটের গতি হবে তার নিজস্ব গতি ও বিমানের গতির সমান। আলোক সম্পর্কে নিউটনের তত্ত্ব প্রয়োগ করা হলে দেখা যাবে, আলোর উৎস যদি পর্যবেক্ষকের দিতে ধাবিত হয় তাহলে তার গতি কমে যাবে। যাহোক, আমেরিকান বৈজ্ঞানিক এবং মার্কিন নেভাল একাডেমীর অন্যতম শিক্ষক এ. এ. মাইকেলসনের কয়েকটি পরীক্ষায় দেখা যায় যে, আলোর গতি নিউটনের উদ্ভাবিত পূর্ব নিয়ম মেনে চলে না।
মাইকেলসনের এই তত্ত্বের ভিত্তিতে চিন্তা করে আইনস্টাইন যে তত্ত্ব আবিষ্কার করলেন তা অনেকটা নিম্নরূপ-
উৎসের গতি যাই হোক না কেনো, যে কোন বেগে ধাবনাম পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে একই গতিতে আলোর বিকিরণ ঘটতে থাকে। এই তত্ত্বে বলা হয়-“আলোর গতির অপরিবর্তনীয়তার নীতি।”
এই তত্ত্বকে খুব বেশি অস্বাভাবিক কিছু মনে নাও হতে পারে। কিন্তু আইনস্টাইনের প্রতিভার পরিচয় এখানেই যে, এই তত্বকে ভিত্তি করে তিনি যে সূত্রগুলো গড়ে তুলেছিলেন সেগুলো সত্যি হলেও অত্যাশ্চর্য এবং অবিশ্বাস্য। এগুলোর একটি হচ্ছে এই যে, ভ্রাম্যমান ঘড়ি স্থিতিশীল ঘড়ির চেয়ে ধীরে ধীরে চলে। ঘড়ির যন্ত্রপাতির সঙ্গে এই গতির কোন সম্পর্ক বা মিল নেই। এই তত্ত্ব পরীক্ষায় সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। পারমাণবিক মহাশূন্যযানযোগে আস্তঃগ্রহ ভ্রমণের সমস্যার সমাধান হল কেউ যদি সেই মহাশূন্যযানের ঘড়ির সময় হিসাবে িএক মাসের কোন সফর থেকে ফিরে আসেন, তাহলে তিনি দেখতে পাবেন তাঁর বাড়িতে রেখে যাওয়া শিশু পুত্রটির বয়স তাঁর পিতার চেয়ে বিশ বছর বেশি হয়ে গেছে।
আলোর গতির অপরিবর্তনীয়তার এই সূত্র থেকেই আইনস্টাইন পদার্থের শক্তিতে রূপান্তর সম্পর্কিত তাঁর বিখ্যাত তত্ত্ব উদ্ভাবন করতে সক্ষম হন। পারমাণবিক বোমা প্রসঙ্গে পূর্বেই এই বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ তত্ত্বেই সর্বপ্রথম সূর্যের শক্তি-উৎস ব্যাখ্যা করা হয়। সূর্য যদি তার জ্বালানি পুড়িয়েই জ্বলতে থাকতো-তাহলে অনেক আগেই তা ঠান্ডা হয়ে ফুরিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আসলে তা নয়। আইনস্টাইন তাঁর বিখ্যাত E=MC² সূত্রে যেমন দেখিয়েছেন, সূর্য় তেমনি পদার্থকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে। এভাবেই সে বহুকাল ধরে আলোক বিকিরণ করে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও কোটি কোটি বছর ধরে তা করতে থাকবে বলে বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস আলবার্ট এর হিসেবের প্রতি।
সঙ্গীতের প্রতি তার এই অনুরাগের ফলে তাঁর ছয় বছর বয়ষ্ক পুত্র আইস্টাইনের জন্যেও বেহালা বাজানো শেখানোর পাঠ শুরু হয়। প্রথম প্রথম তিনি এই বাদ্যটাকে ভালবাসতেন না। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি এতে মনোযোগী হন এবং দক্ষতা অর্জন শুরু করেন আর বিশেষ করে মোজার্টের রাগপ্রধান সঙ্গীতের ভীষণ অনুরাগী হয়ে ওঠেন। শৈশবের এই সঙ্গীত শিক্ষা তিনি সারা জীবন কাজে লাগিয়েছেন। এবং জানা যায় এ থেকে ঘন্টার পর ঘন্টা বিশ্রাম ও আনন্দ উপভোগ করেছেন।
অসাধারণ প্রতিভাবান ছেলে বলতে যা বোঝায় আইনস্টাইন তার ধারে কাছেও ছিলেন না। তখন তিনি নিরেট বোকাই ছিলেন। ছেলেবেলায় তাঁর কথা ফুটতে এতো দেরি হয়েছিলো যে, পিতামাতার ভয় হয়েছিলো ছেলেটা হয়তো বোবাই হবে। ছেলেবেলা হতেই তিনি সমবয়সী ছেলেদের থেকে নিজেকে আলাদা করে রাখতেন এবং আলসেমি করে ও দিবাস্বপ্নের মধ্যে দিন কাটাতেন। তিনি বিশেষ করে কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের কাজ এড়িয়ে চলতেন, পরিশ্রমসাপেক্ষ খেলা থেকে বিরত থাকতেন এবং সৈনিক চাকুরিকে বিশেষ ঘৃণা করতেন। মিউনিখের রাস্তায় প্রায়শঃই জার্মান সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজের দৃশ্য দেখা যেত। অধিকাংশ ছেলেমেয়ের জন্যই এই দৃশ্য ছিলো রোমাঞ্চকর। কিন্তু আলবার্ট কুচকাওয়াজ দেখে অস্বস্তি বোধ করতেন। যন্ত্রের মতো মানুষের চলাফেরাকে তিনি ঘৃনা করতেন- সব যেন তাঁর কাছে কলের পুতুল বলে মনে হত।
মিউনিখে কোন সরকারী শিক্ষা ব্যবস্থা ছিলো না । প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দ্বারা পরিচালিত হত। আইনস্টাইনের পিতা মাতা ছিলেন ইহুদী। কিন্তু ধর্মের প্রতি কোন আগ্রহ তাদের ছিলো না। পুত্র আলবার্টকে তারা নিকটতম বিদ্যালয়ে প্রেরণ করেন। এটা ছিলো একটা রোমান কাথলিক পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়। দশ বছর বয়সে ‘জিমন্যাসিয়াম’ নামে পরিচিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তাঁকে ভর্তি করা হয়। এই বিদ্যালয়ের ছাত্রদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির উপযুক্ত করে দেওয়া হত। স্কুলে তিনি সুখি ছিলেন না। কোন রকম সাফল্যও তিনি লাভ করেননি। ছাত্রদেরকে কেবল তোতা পাখির মত পাঠ মুখস্ত করানো হত। এটা তাঁর পছন্দ হতো না। যে ধরনের ঘরোয়া আলোচনার মাধ্যমে পাঠ্যবিষয় সম্পর্কে গভীর ধারণা জন্মে, বিদ্যালয়ে তাঁর কোন ব্যবস্থা ছিলো না।
জিমন্যাসিয়ামে থাকতে আইনস্টাইন ইহুদী ধর্ম সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করেন। ক্যাথলিক মতবাদ সম্পর্কে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই শিক্ষা লাভ করেছিলেন। ফলে ধর্মের নৈতিক মূল্যবোধ সম্পর্কে তাঁর মনে একটি স্থায়ী শ্রদ্ধার আসন গড়ে ওঠে। কিন্তু তিনি মনে করতেন যে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান মাত্রই কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং মানুষকে স্বাধীন চিন্তা থেকে বিরত রাখাই এর প্রধান উদ্দেশ্য। জিমন্যাসিয়াম থেকে উত্তীর্ণ হবার পর তিনি তাঁর ধর্মীয় সংঘের সদস্যপদ ত্যাগ করেন। কিন্তু হিটলার-নাৎসী শাসন আমলে জার্মানরা যখন ব্যপকভাবে ইহুদীদেরকে অভিযুক্ত ও হত্যা করতে থাকে তখন তিনি পুনরায় ইহুদী সমাজে ফিরে আসেন। আইনস্টাইনের পিতৃব্য অর্থাৎ সেই ইঞ্জিনিয়ার গণিতশাস্ত্রের প্রতি আইনস্টাইনের আগ্রহ বাড়িয়ে দেন। অঙ্কের কোন সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে যে পরিমাণ পরিশ্রমের দরকার বীজগণিতের সাহায্য নিয়ে কিভাবে তা কমিয়ে করা যেতে পারে বালক আলবার্টকে তাই তিনি শিখিয়ে দেন। বালকের সরল মনের প্রতি আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন-“এটা একটা মজার বিজ্ঞান। ধর একটা পশু আমরা শিকার করতে চাই, কিন্তু কিছুতেই তাকে আমরা ধরতে পারছি না। এই পশুটার নাম আপাতত আমরা ‘ক’ দিলাম। এখন যতক্ষণ পর্যন্ত এটাকে আমরা ধরতে পারবো না ততক্ষণ একে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবো।” জ্যামিতির পাঠ কিশোর আইনস্টাইনের মনে গভীর রেখাপাত করে এবং রোমাঞ্চিত করে তোলে। এর সংক্ষিপ্ত স্পষ্ট ভাষা, উপপাদ্যের প্রমাণ, প্রমাণের যুক্তি এবং সম্পাদ্যের সমাধানকে যুক্তির দ্বারা বিশ্লেষণের সুযোগ তাঁর মনে আনন্দের শিহরণ নিয়ে আসে। আইনস্টাই বলেছেন-“তাঁর শৈশবের দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার একটি হচ্ছে,- পাঁচ বছর বয়সে তাঁকে একটি চুম্বক দিকনির্ণয় যন্ত্র উপহার এবং অপরটি অপরটি হচ্ছে বারো বছর বয়সে তাঁর ইউক্লিডের জ্যামিতি অধ্যায়ন।” তিনি আরো বলেছেন,-“শৈশবের এই বই যে ছেলের মনে আনন্দের দোলা দেয় না, তাত্তিক অনুসন্ধানী হওয়া সে ছেলের কাজ নয়।”
আইনস্টাইনের বয়স যখন ১৫ বছর তখন তাঁর পিতার আর্থিক অবস্থার জন্য মিউনিখের বৈদ্যুতিক ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য তিনি ইতালীর মিলানে গমন করেন। আলবার্ট তখনো জিমন্যাসিয়ামে পড়ছিলেন। কাজেই ডিপ্লোমা নেওয়ার জন্য তাঁর মিউনিখেই থাকার ব্যবস্থা করা হয়। আইনস্টাইনের কাছে বিদ্যালয় ক্রমেই বিরক্তিকর হয়ে উঠেছিলো। তিনি গণিতশাস্ত্রে বহুদূর এগিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু অন্য যেসব বিষয়ে কঠোর নিয়ম রক্ষা করে শিক্ষাদান করা হয়েছিলো তাতে তিনি অত্যন্ত খারাপ করেছিলেন। এই বিদ্যালয়ে ছাত্রদেরকে শিক্ষকদের প্রতি অন্ধভক্তি দেখিয়ে চলতে হতো। কিন্তু ইইনস্টাইন তা না করায় তাঁকে জিমন্যাসিয়াম থেকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি বাধ্য হয়ে ইতালীতে পিতার নিকটে ফিরে যান।
ইতালীতে কিছুকাল কাটানোর পর তিনি নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তা করার সুযোগ পেলেন। তিনি গণিত সংশ্লিষ্ট পদার্থবিদ্যা অধ্যায়নে আত্মনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিলেন। এবং তদনুসারে তিনি সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অবস্থিত বিখ্যাত ‘সুইস ফেডারেল পলিটেকনিক স্কুলে’ ভর্তির পরীক্ষা দিলেন, কিন্তু তিনি ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেন না। অঙ্কশাস্ত্রে তাঁর জ্ঞান ছিলো অসাধারণ। কিন্তু ভাষা-সাহিত্য এবং জীববিজ্ঞানে তিনি অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন। পলিটেকনিকের ডিরেক্টর অঙ্কশাস্ত্রে তাঁর দখল দেখে বিস্মিত হলেন এবং সুইজারল্যান্ডে তাঁর ভর্তি হওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। এখানে বিদ্যালয়গুলোকে মিউনিখের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদাভাবে পরিচালিত হতে দেখে আইনস্টাইন অত্যান্ত খুশি হলেন। এখানে কঠোর নিয়ম কানুন পালনের কোন বাধ্যবাধকতা ছিলো না। ছাত্ররা নিজেদের মতো দেখেশুনে চলবে বলে আশা করা হত। শিক্ষকরাও ছাত্রদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে আগ্রহী ছিলেন। জীবনে সর্বপ্রথম আইস্টাইন বিদ্যালয়কে উপভোগ্য স্থান বলে মনে করলেন। পাঠ্যক্রম সমাপ্তির পর তাঁকে জুরিখের ‘সুইচ ফেভারেল পলিটেকনিক স্কুলে; ভর্তি করা হল।
জুরিখে অবস্থানকালে তিনি পদার্থ বিদ্যার শিক্ষক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেনে এবং এই লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ শুরু করেন। অর্থিক দিক থেকে জুরিখে তাঁর অবস্থান সচ্ছল ছিলো না। ব্যবসায়ে লোকসান হওয়ার দরুণ তাঁর পিতাও তাঁকে তখন সাহায্য করতে পারেননি। সৌভাগ্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানকালে জনৈক্য অবস্থাপন্ন আত্মীয় তাঁকে সাহায্য করতে সম্মত হন।
আইষ্টাইন বিশেষ প্রতিভাবান ছাত্র ছিলেন এবং অধ্যাপকদের নিকট থেকেও তিনি বহু প্রসংশা ও সুপারিশ পত্র পেয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও শিক্ষকতার চাকুরিলাভে তিনি সক্ষম হলেন না। জীবিকার তাগিদে তিনি বার্নে অবঞ্চিত ‘সুইসপেটেন্ট’ অফিসে পরীক্ষকের চাকুরি গ্রহণ করেন।
১৯০৫ সালে পেটেন্ট অফিসে চাকুরিরত থাকাকালেই আইনস্টাইন বিশেষ ‘আপেক্ষিকতত্ত্ব’ আবিষ্কার করেন। যা পরিশানে আজকের পারমাণবিক বোমায় সম্পূর্ণরূপ লাভ করে। সে সময় পর্যন্ত পদার্থবিদ্যার ভিত্তি ছিলো নিউটনের গতিতত্ত্ব। প্রায় দুইশত বছর পূর্বে এই তত্ত্ব আবিষ্কৃত হয় এবং পদার্থবিদ্যা সংক্রান্ত সমস্যাবলীর অধিকাংশের জবাব পাওয়া যেতো এই তত্ত্বের মাধ্যমে। - কিন্তু এতে কিছুটা সমস্যা দেখা দিতে থাকে। উধাহরণ দেওয়া যায়, চলন্ত বিমান থেকে যদি সম্মুখের দিকে রকেট নিক্ষেপ করা হয় তাহলে সে রকেটের গতি হবে তার নিজস্ব গতি ও বিমানের গতির সমান। আলোক সম্পর্কে নিউটনের তত্ত্ব প্রয়োগ করা হলে দেখা যাবে, আলোর উৎস যদি পর্যবেক্ষকের দিতে ধাবিত হয় তাহলে তার গতি কমে যাবে। যাহোক, আমেরিকান বৈজ্ঞানিক এবং মার্কিন নেভাল একাডেমীর অন্যতম শিক্ষক এ. এ. মাইকেলসনের কয়েকটি পরীক্ষায় দেখা যায় যে, আলোর গতি নিউটনের উদ্ভাবিত পূর্ব নিয়ম মেনে চলে না।
মাইকেলসনের এই তত্ত্বের ভিত্তিতে চিন্তা করে আইনস্টাইন যে তত্ত্ব আবিষ্কার করলেন তা অনেকটা নিম্নরূপ-
উৎসের গতি যাই হোক না কেনো, যে কোন বেগে ধাবনাম পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে একই গতিতে আলোর বিকিরণ ঘটতে থাকে। এই তত্ত্বে বলা হয়-“আলোর গতির অপরিবর্তনীয়তার নীতি।”
এই তত্ত্বকে খুব বেশি অস্বাভাবিক কিছু মনে নাও হতে পারে। কিন্তু আইনস্টাইনের প্রতিভার পরিচয় এখানেই যে, এই তত্বকে ভিত্তি করে তিনি যে সূত্রগুলো গড়ে তুলেছিলেন সেগুলো সত্যি হলেও অত্যাশ্চর্য এবং অবিশ্বাস্য। এগুলোর একটি হচ্ছে এই যে, ভ্রাম্যমান ঘড়ি স্থিতিশীল ঘড়ির চেয়ে ধীরে ধীরে চলে। ঘড়ির যন্ত্রপাতির সঙ্গে এই গতির কোন সম্পর্ক বা মিল নেই। এই তত্ত্ব পরীক্ষায় সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। পারমাণবিক মহাশূন্যযানযোগে আস্তঃগ্রহ ভ্রমণের সমস্যার সমাধান হল কেউ যদি সেই মহাশূন্যযানের ঘড়ির সময় হিসাবে িএক মাসের কোন সফর থেকে ফিরে আসেন, তাহলে তিনি দেখতে পাবেন তাঁর বাড়িতে রেখে যাওয়া শিশু পুত্রটির বয়স তাঁর পিতার চেয়ে বিশ বছর বেশি হয়ে গেছে।
আলোর গতির অপরিবর্তনীয়তার এই সূত্র থেকেই আইনস্টাইন পদার্থের শক্তিতে রূপান্তর সম্পর্কিত তাঁর বিখ্যাত তত্ত্ব উদ্ভাবন করতে সক্ষম হন। পারমাণবিক বোমা প্রসঙ্গে পূর্বেই এই বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ তত্ত্বেই সর্বপ্রথম সূর্যের শক্তি-উৎস ব্যাখ্যা করা হয়। সূর্য যদি তার জ্বালানি পুড়িয়েই জ্বলতে থাকতো-তাহলে অনেক আগেই তা ঠান্ডা হয়ে ফুরিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আসলে তা নয়। আইনস্টাইন তাঁর বিখ্যাত E=MC² সূত্রে যেমন দেখিয়েছেন, সূর্য় তেমনি পদার্থকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে। এভাবেই সে বহুকাল ধরে আলোক বিকিরণ করে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও কোটি কোটি বছর ধরে তা করতে থাকবে বলে বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস আলবার্ট এর হিসেবের প্রতি।
আইনস্টাইনের তত্ত্বগুলো প্রকাশিত হওয়ায় এবং বিশ্বের গবেষণাগার-পর্যবেক্ষণাগারগুলো থেকে তাঁর সমর্থনে প্রমাণপত্র আসতে থাকার কিছুদিন পরেই আইনস্টাইনের প্রতিভা স্বীকৃতি লাভ করে।
১৯০৯ সালে জুরখ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছিলেন ‘প্রফেরস এক্সটা অর্ডিনারী।’ সেখান থেকে তিনি প্রাগ এর ‘জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ে’ গমন করেন। সেখানে থেকে জুরিখে ফিরে পুনরায় তিনি বার্লিনের ‘কাইজার ইউলহেম ইনস্টিটিউট’- এ যোগদান করেন।
বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি অধ্যাপক হয়েছিলেন। ১৯৩৩ সালে নাৎসীরা যখন ক্ষমতাসীন হয় তখন সৌভাগ্যক্রমে তিনি ইংল্যান্ড ও মর্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বক্তব্য - সফরে ছিলেন। হিটলারের নাৎসী বর্বরগণ তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরী কেড়ে নেয় এবং জার্মান প্রজাতন্ত্র তাঁকে যে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করেছিলো তা থেকে তাঁকে বঞ্চিত করা হয়।
নিউজার্সীর অন্তর্গত প্রিন্সটনে অবস্থিত ‘ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি’ এর ‘স্কুল অব ম্যাথামেটিকস’- এর ডিরেক্টর হয়ে তিনি মর্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। তিনি ইসরাইল রাষ্ট্রের একজন উৎসাহী সমর্থক এবং বিশ্ব - সরকারের প্রবক্তা হয়ে দাঁড়ান। কিন্তু তাঁকে যখন ইসরাইলে প্রেসিডেন্ট হতে আহবান করা হয় তখন তিনি অসম্মতি জানিয়ে বলেন, - “বৈজ্ঞানিক সমস্যাবলীর সাথে আমি সুপরিচিত। কিন্তু মানুষ নিয়ে কাজ করার স্বাভাবিক সামর্থ্য বা প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা কোনটিই আমার নেই - আমি দুঃখিত।”
ফোন্টম এবং কোয়ান্টাম তত্ত্ব সম্পর্কে গবেষণার জন্য আলবার্ট আইনস্টাইন নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন। ১৯৫০ সালে তিনি তাঁর একীভূত ক্ষেত্রতত্ত্ব প্রকাশ করেন। তাঁর চব্বিশ পৃষ্ঠাপূর্ণ গণিতিক সমাধানের ভিতর দিয়ে তিনি মধ্যাকর্ষণ এবং বিদ্যুৎ - চুম্বকত্বের নিয়মের মিলন ঘটান।
পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারে আলবার্ট আইনস্টাইন দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি আশা করেছিলেন যে, জাপান সরকারের প্রতিনিধগণকে - এর ধ্বংস ক্ষমতা প্রদর্শন করা হবে, নিরীহ জাপানীদের উপর এই মারণাস্ত্র নিক্ষেপ করার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু তাঁর সেই আশা সফল হয়নি। পারমাণবিক শক্তিকে মানুষের কল্যাণে নিয়োগ করা হবে বলেই তিনি আশা করেছিলেন - তাঁর সমস্ত কল্যাণকর িইচ্ছেকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, হলো তার উল্টোটা।
১৯৫৫ সালের ১৮ই এপ্রিল জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত বিশ্বপ্রকৃতির নিয়মকে তিনি অঙ্কের সহজ সমাধানের ভেতর দিয়ে প্রকাশ করার চেষ্টা করে গিয়েছেন। তাঁর শেষ বাণী, - “ঈশ্বর কখনো পাশা খেলেন না।”

0 মন্তব্যসমূহ