স্যার আইজ্যাক নিউটন (Sir Isaac Newton) এর জীবনী
১৬৪২ সালের বড়োদিনে ইংল্যন্ডের ছোট গ্রামের একটি খামার বাড়িতে স্যার আইজ্যাক নিউটন জন্মগ্রহণ করেন। তাঁকে ‘বড়োদিনের ক্ষুদে উপহার’ বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিলো। তাঁর মাতা বলেন, “জন্মকালে জ্যাক অতিশয় ক্ষুদ্রাকৃতি ছিলো। এই ক্ষুদ্রাকৃতির কারণ, শিশুর জন্ম হয় অকালে, নির্ধারিত সময়ের পূর্বে। জন্মের পূর্বেই তাঁর মাতা বিধবা হয়েছিলেন। শিশু বাঁচবে বলে তখন আশাই করা হয়নি। কিন্তু এই শিশুই একদিন বড় হয়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানীরূপে প্রতিষ্ঠিত হলেন।
গণিত, মাধ্যাকর্ষণ, যন্ত্রবিজ্ঞান, আলোকবিজ্ঞান প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিউটরে কৃতিত্ব এত ব্যাপক এবং মৌলিক ছিলো যে, অন্যগুলোকে বাদ দিলেও এর যে কোন একটি তাঁর অবদানের ভিত্তিতে তিনি শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারতেন-বেঁঁচে থাকতেন পৃথিবীতে স্বরণীয় হয়ে।
নিউটনের দু-বছর বয়সে তাঁর মা পুনরায় বিয়ে করেন। মায়ের এই বিয়ের পর আইজ্যাককে তাঁর দাদীর নিকট পাঠানো হয়। শৈশবকালে তাঁর অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর বিশেষ কিছু দেখা যায় না। অবশ্য নিজ হাতে বিভিন্ন জিনিস তৈরীতে তাঁর ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা যায়। তিনি ‘হাওয়াকলের’ একটা মডেল তৈরি করেন। সত্যিই এই কল কাজ করেছিলো। তিনি জলঘড়ি এবং সূর্যঘড়ি তৈরি করেছিলেন। এটা এখনও লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে সযত্নে রক্ষিত আছে। তিনি বই পড়তে এবং চিত্রাদি নকল করতে ভালবাসতেন। ফুল এবং ঔষধি সংগ্রহ করাও তাঁর প্রিয় সখ ছিলো।
১৪ বছর বয়সে আইজ্যাককে তার মা তাঁর দাদীর কাছথেকে ফিরিয়ে আনেন। মায়ের দ্বিতীয় স্বামীর তখন মৃত্যু হয়েছে। মা তাঁর খামার পরিচালনার সাহায্যের জন্যেই কিশোর আইজ্যাককে ফিরিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু কিশোর নিউটন খামারের কাজে একেবারেই অযোগ্য প্রমাণিত হন। তিনি খামারের কাজে মনযোগী হওয়ার পরিবর্তে বই পড়তেন কিংবা দিবাস্বপ্ন দেখতেন, অথবা বসে-বসে কাঠের মডেল তৈরি করতেন। অবশেষে তাঁর মা তাকে কলেজে পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেনে। ১৮ বছর বয়সে তরুণ নিউটন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গমন করেন। ক্যামব্রিজে গিয়ে তিনি বিখ্যাত ‘ট্রিনিটি কলেজে’ ভর্তি হন।
নিউটন ক্যামিব্রিজে ৪ বছর অধ্যায়ন করেন এবং ১৬৬৫ সালে গ্রাজুয়েশান ডিগ্রি লাভ করেন। ক্যামব্রিজ অবস্থানকালে তিনি অধ্যাপক আইজ্যাক ব্যারোর সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি ছিলেন নিউটনের গণিতের অধ্যাপক। অধ্যাপক ব্যারো নিউটনের ব্যতিক্রমী কর্মকান্ড দেখে বুঝতে সমর্থ হন যে, সাধারণের অনেক বাইরে নিউটনের স্থান এবং তিনি নিউটনকে নিজ গাণিতিক প্রতিভা বিকাশে সর্বদা উৎসাহ প্রদান করেন।
সে সময় ইংল্যান্ডে মহামারী আকারে প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। এই মাহামারীতে জনসংখ্যার এক-দশমাংশের অকাল মৃত্যু হয়। ক্যামব্রিজ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং ছাত্ররা নিজ নিজ গৃহে ফিরে যান। প্রায় দেড় বছর পর বিশ্ববিদ্যালয় পুনরায় পুরো-পুরি না খোলা পর্যন্ত তিনি সেখানে কাটিয়ে ছিলেন। সেই সময় সম্ভবত বিজ্ঞানের ইতিহাসে নিউটনের জন্য সবচাইতে মূল্যবান ও ফলশ্রতিময় সময়।
নিউটন যন্ত্র - বিজ্ঞানের মূল সূত্রসমূহ আবিষ্কার করেন এবং মাধ্যাকর্ষণের মূল সূত্র আবিষ্কার করেন, পার্থক্য নির্ণায়ক ও অবিচ্ছেদ্য উচ্চতর গণনা প্রণালীর প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন এবং আলোক বিজ্ঞানের মহান আবিষ্কারসমূহের ভিত্তিও তিনিই উদ্ভাবন করেন। এই সব আবিষ্কারের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, সম্প্রসারণ ও প্রয়োগের মধ্যেই তাঁকে তাঁর বাকি বৈজ্ঞানিক জীবন অতিবাহিত করতে হয়। তাঁর সমস্ত সৃজনশীল কাজ সেই ১৮ মাসেই সম্পন্ন হয়। সেই সময় তাঁর বয়স ছিলো ২৩ কিংবা ২৪ বছর।
নিউটন তাঁর বিস্ময়কর আবিষ্কারসমূহের কথা তখনও প্রকাশ করেননি। এই গোপনীয়তার দরুন পরবর্তী সময়ে নিউটনকে কেন্দ্র করে প্রচুর বিতর্ক ও যুক্তি-তর্কের সৃষ্টি হয়েছিলো।
১৬৬৭ সালে ক্যামব্রিজ পুনরায় খোলা হলে, নিউটন সেখানে সহযোগী শিক্ষকতার পদ গ্রহণ করেন। শিক্ষা-জীবনে তিনি দ্রুত উন্নতি লাভ করেন এবং ২৬ বছর বয়সে তিনি গণিতের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। এই পদে তিনি একদিন তাঁর শিক্ষক ও উৎসাহদাতা আইজ্যাক ব্যারোর স্থালাভিষিক্ত হন। এই পদ লাভ বিজ্ঞানী নিউটনকে আরো বেশী উৎসাহিত করে।
আলোর গবেষণায় নিউটন ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। সেকালে আবিষ্কৃত দূরবীক্ষণ যন্ত্রের দূর্বলতা ও অস্পষ্টতায় তিনি খুবই বিরক্ত হন। এই সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টায় তিনি ত্রিভুজাকৃতি ‘ত্রিশিরা’ ত্রিকোণ বিশিষ্ট কাঁচ (Prism) ব্যবহার করেন। ত্রিশিরার উপর সূর্যালোকের আলো প্রতিবিম্বিত করে তিনি তাঁর মূল গবেষণা শুরু করেন। একটা অন্ধকার কক্ষে তিনি কাজ করেন। দরজার একটা ছিদ্র দিয়ে তিনি অন্ধকার কক্ষে সূর্যালোক ধারণ করেন। তিনি দেখেন যে, রংধনুর এক ফালির আকারে সাদা আলো ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি একে ‘বর্ণালী’ নামে অভিহিত করেন। ঐ বর্ণগুলো নিম্নলিখিত ধারায় অবস্থান করেছিলোঃ লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল, লালাভো ও বেগুনী।
নিউটন এরপর একটি ব্যতিত অন্য বর্ণগুলোর পথ বন্ধ করে দেন। মনে করি শুধু ‘সবুজ’ বর্ণেরই পথ বন্ধ করা হল না। সবুজ রং এর কিরণকে অন্য একটি ত্রিশিয়ার মাধ্যমে প্রবাহিত করা হলো। নিউটন লক্ষ্য করলেন যে, সবুজ রং টা একটু বাঁকা হল, কিন্তু রং পরিবর্তিত হল না। প্রতিটি রং নিয়েই তিনি পরীক্ষা - নিরীক্ষা চালালেন। এককভাবে কোন রং বা বর্ণই সাদা আলোর মত অন্য কোন বর্ণে পরিবর্তিত হল না। অবশ্য তিনি লক্ষ্য করলেন যে, দ্বিতীয় ত্রিশিয়ার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় প্রতিটি বর্ণ বিভিন্ন পরিমাণে বাঁকা হয়েছে। তখন নিউটন একটা সহজ কিন্তু চমকপ্রদ সিদ্ধান্তে পৌঁছেন, সূর্যের সাদা আলোক আসলে বর্ণালীর সব কয়টি বর্ণের সংমিশ্রণ! ত্রিশিরার কাঁচ প্রতিটি বর্ণকে বিভিন্ন পরিমাণে বাঁকা করেছে, অর্থাৎ বর্ণগুলোকে আলাদা করেছে।
এটা থেকে নিউটন সিদ্ধান্তে পৌছেন যে, - বর্ণের ছায়াপাত ব্যতিত পরকলা তৈরি সম্ভব নয়। পরকলার ব্যবহার বাদ দিয়ে নিউটন প্রতিফলিত দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার করেন। নক্ষত্রের আলো প্রতিবিম্বিত করার জন্য তিনি এত বাটির আকার বিশিষ্ট ধাতব আয়না ব্যবহার করেন। এই ধরণের দূরবীনের কাঁচের মধ্যে দিয়ে আলো অতিক্রম করতে পারে না। ফলে, আলোক রশ্মি অসমানভাবে বাঁকা হওয়া বা রঙের ছায়াপাতের কোন সম্ভাবনা নেই। এখানে এর উল্লেখযোগ্য কৌতুকজনক হয়ে আছে যে, - প্রায় আরো শতবর্ষ পরেই রঙের ছায়াপাত পরিহার করে “পরকলায়” তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। বিভিন্ন ধরণের কাঁচের সমন্বয় সাধন করেই এই ধরণের রং বর্ণহীন ‘পরকলা’ তৈরী করা হয়।
নিউটন তাঁর দূরবীনের যান্ত্রিক সমস্ত কাজকর্ম নিজেই সমাধা করেন। আয়নার ব্যাস ছিলো প্রায় এক ইঞ্চি। মাউন্ট প্যালোমারে অবস্থিত ‘ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজী ’ মানমন্দিরে ১৭ ফুট ব্যাসবিশিষ্ট প্রতিফলনযোগ্য আয়না রয়েছে।
তাঁর প্রথম প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক নিবন্ধের বিষয়বস্তু ছিলো- ‘আলোক বিজ্ঞান’। ‘আলোক বিজ্ঞান’ সম্পর্কিত তাঁর গবেষণায় সমালোচনা এবং সমর্থন দুটোই সৃষ্টি হয়। সমকালীন কৃতী বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান হইগ্যানস রবার্ট হুক এবং অন্যান্যদের পরাজিত করতে নিউটনকে তাঁর তত্ত্বসমূহ সমর্থন করতে হয়। এই বিতর্ককালে একদা তিনি বৈজ্ঞানিক পদ্দতির প্রধান ভিত্তি এভাবে বর্ণনা করেন, - ‘‘বৈজ্ঞানিক গবেষণার সর্বোত্তম এবং নিরাপদ পদ্ধতি হল, - প্রথমে অধ্যাবসায়ের সঙ্গে বস্তুর গুণাবী অনুসন্ধান এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এই সব গুণাবলীর সত্যতা নির্ধারণ। তারপর এগুলোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জন্য ধীরে-ধীরে তত্ত্বের দিকে অগ্রসর হওয়া।”
এই সময় নিউটনের বয়স ছিলো ৪৩ কিংবা ৪৪ বছর। এই বয়সে তিনি সার্থক গবেষকরূপে বৈজ্ঞানিক সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। সর্বদা সমালোচকদের জবাব দিতে গিয়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং নিজ আবিষ্কারের আর কোন তথ্য প্রকাশ না করার জন্য তিনি সংকল্পবন্ধ হন। অবশ্য তিনি তাঁর তত্ত্বাবলী সম্পর্কে গবেষণাকর্ম অব্যাহত রাখেন। এর মধ্যেও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে পার্লামেন্টে সদস্যরূপে কাজ করার নিজ যোগ্যতাবলে সুযোগ করে নেন।
প্রখ্যাত জ্যেতির্বিজ্ঞানী এডমন্ড হ্যালে ১৬৮৪ তে গ্রহের গতি সম্পর্কিত ‘কেপলারের তত্ত্ব’ আলোচনার উদ্দেশ্যে নিউটনের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এই আলোচনা থেকে হ্যালে সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেন যেম সকল নিয়মের সর্বাধিক মৌলিক সূত্র সম্পর্কে নিউটন সবিস্তার গবেষণা করেছেন। এই সূত্র হচ্ছে- বিশ্বজনীন মাধ্যাকার্ষণের নীতি। হ্যালে অবশ্য কোন প্রকারে নিউটনকে তাঁর এই সব গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বাবলী প্রকাশে সম্মত করান। হ্যালে খুব বিত্তশালী না হলেও মুদ্রণের ব্যয়ভার বহন করা এবং সম্ভাব্য প্রতিটি অসুবিধ থেকে নিউটনকে রক্ষা করার জন্য যত্নের সাথে সব কিছু দেখে দিতে সম্মত হন।
এর ফসলই তিন খন্ডে প্রকাশিত বিখ্যাত ‘ফিলোসোপিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেম্যাটিকা।’ সেই সময় ল্যাটিনই ছিলো বিজ্ঞানের ভাষা। তাই তিনি তাঁর সমগ্র গ্রন্থটি ল্যাটিন ভাষায় প্রকাশ করেন। ‘ম্যাথেমাটিক্যাল প্রিন্সিপলস অব সায়েন্স’ নামে মূল ল্যাটিন গ্রন্থের একটা অনুবাদ প্রকাশিত হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে ‘প্রিন্সিপিয়া’ অগ্রজপদক্ষেপের একটা স্বাক্ষর। ‘প্রিন্সিপিয়া’ বলে দেয় এবং নির্দেশ করে যে, - পৃথিবীরই হোক বা গ্রহ-নক্ষত্রের ক্ষেত্রেই হোক- সকল গতিই এক নিয়মে পরিচালিত হয়।
প্রিন্সিপিয়ায় নিউটনের গতির সূত্র বিশ্লেষণ করা হয় বিশদভাবে। প্রথম সূত্রটি হচ্ছে - ‘যে বস্তু স্থির থাকে, তা বল প্রয়োগে গতিমান না করা পর্যন্ত স্থিরই থাকে। গতিমান বস্তু একই গতিতে এবং একই দিকে অনবরত চলতেই থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত বলপ্রয়োগে গতি পরিবর্তন করা না হয়।” নিউটন উপলব্ধি করেন যে, বস্তুর মধ্যে গতি সঞ্চারের জন্য অবশ্যই একটা শক্তির উপস্থিতি থাকতে হবে। সে গাছ থেকে ফল পতনই হোক বা সমুদ্রের ঢেউয়ের উত্থানই হোক।
আমরা আজকে যে মোটরগাড়ী ব্যবহার করি, ভ্রমণ করি, সেই চলন্ত মোটর গাড়ি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে কি হয় - তা আন্দাজ করুন। আমরা সামনের দিকে গতিমান হয়ে পড়ি। অর্থাৎ আমাদের বলপ্রয়োগ থামিয়ে না দেয়া পর্যন্ত আমরা গতিমান থাকি। গাড়ির আসনের সামনে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আমাদের গতি থেমে যায়। এই চিন্তাধারাকে অবশ্য নিউটনের পূর্বেও চিন্তা করা হয়েছে, কিন্তু নিউটনই এই চিন্তাধারাকে প্রথম বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক নিয়মে ব্যাখ্যা করেন এবং স্থির সমাধান দেন।
গতির দ্বিতীয় সূত্রটি হচ্ছে, - “গতি পরিবর্তনের মাত্রার মধ্য দিয়ে শক্তির পরিমাণ পরিমাপ করা যায়। গতির পরিবর্তনের মাত্রাকে ‘ত্বরণ’ বলা হয় এবং বেগ হ্রাস ও বৃদ্ধির সঙ্গে এটা সংশ্লিষ্ট। উধাহরণস্বরূপ বলা যায় - ‘‘একটা মোটর গাড়িকে স্থির অবস্থা থেকে ৫ সেকেন্ডে ঘন্টায় ১৫ মাইল বেগবান করতে যে শক্তির প্রয়োজন হবে, একই সময়ে ঘন্টায় ২৫ মাইল বেগবান করতে তার চেয়ে অধিক শক্তির প্রয়োজন হবে।”
দ্বিতীয় সূত্র থেকে আমরা আরোও দেখতে পাই যে, - “ঘন্টায় ৬০ মাইল বেগে চলন্ত মোটর গড়িকে ১০ সেকেন্ডে থামাতে যে শক্তির প্রয়োজন হবে, ঘন্টায় ৩০ মাইল বেগে চলন্ত গাড়ীকে ৫ সেকেন্ডে থামাতেও একই পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হবে।”
গতির তৃতীয় সূত্রটি হচ্ছে- “ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং এই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সমানুপাতিক ও বিরুদ্ধমুখী।” এর বিবিধ প্রয়োগ সম্ভব। সর্বাধিক আকর্ষণীয় হচ্ছে বর্তমান রকেটের উড্ডয়ন। উঞ্চ বাষ্প যতোই পেছনের দিকে ধাবিত হতে থাকে, রকেট ততোই সামনের দিকে ধাবিত হতে থাকে। আপনার বাগানের পানি ছিটানোর যন্ত্রটার দিকে লক্ষ্য করুন। দেখবেন ছিটানীর অগ্রভাগটা দিয়ে পানি যতোই বের হতে থাকে অগ্রভাগটা ততোই পেছনের দিকে পাক খায়।
মাধ্যাকর্ষণের বিশ্বজনীন সূত্র অতি বিস্ময়কর। নিউটন বলেন যে, - “বস্তুর প্রতিটি কণা অপর প্রতিটি কণাকে আকর্ষণ করে। পৃথিবীই শুধু গাছের ফলকে আকর্ষণ করে না, ফলও পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। সকল গ্রহের ক্ষেত্রেই এই সূত্র প্রযোজ্য। সূর্য পৃথিবীকে টেনে রাখে, আবার চন্দ্রও পৃথিবকে আকর্ষণ করে।” তিনি আরো বলেন যে, - ‘-“বিভিন্ন বস্তুর মধ্যকার শক্তি, বস্তুর আকৃতির উপর এবং পরস্পরিক দূরত্বের উপর নির্ভরশীল।” এই শক্তির পরিমাণ কিভাবে হিসাব করতে হয়, তাও তিনি প্রদর্শন করেন।
‘প্রিন্সিপিয়ার দ্বিতীয় খন্ড প্রথম খন্ডরেই বিশ্লেষণ শুধু নয়। এতে গতির প্রতিবন্ধকতাসংক্রান্ত চিন্তাধারাও প্রকাশ করা হয়েছে। উধাহরণস্বরূপ বলা যায়, - কোন আকৃতির জাহাজ সমান্যতম প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হবে তাও তিনি আলোচনা করেন। দ্বিতীয় খন্ডে তরঙ্গের গতির গাণিতি আচরণের বর্ণনা দেন তিনি। তাঁর এই বর্ণনা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বলে প্রমাণিত হয়েছে।
প্রিন্সিপিয়ার তৃতীয় খন্ড মানব জাতির বুদ্ধিমত্তার অনন্য সাধারণ বিজয়রূপে স্বীকৃতি লাভ করেছে। পৃথিবীমুখী বস্তুসমূহ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিউটন গতি ও মাধ্যাকর্ষণের নীতিসমূহ উদ্ভাবন করেন এবং এই নীতিগুলোকে পৃথিবীসহ সূর্যের চতুর্দিকে অবস্থিত গ্রহসমূহের উপর প্রয়োগ করেন। তিনি সূর্য ও পৃথিবীর আকৃতি সম্পর্কে গবেষণা করেন। ‘পৃথিবীর মেরুদ্বয়ে চেপ্টা এবং নিরক্ষরেখা বরাবর স্ফীত’ - অংকের হিসাবে এটা কি করে রে করতে হবে, তাও তিনি দেখিয়ে দেন। পৃথিবী পরিভ্রমণে চন্দ্রের কক্ষপথের প্রধান টলনগুলো সম্পর্কে তিনি গবেষণা করেন এবং সূর্যপিন্ডের আকর্ষণেল দরুন কি করে টলন হয়, সেটাও সঠিকভাবে প্রদর্শন করেন। পৃথিবীর জলভাগের উপর চন্দ্র-সূর্যের আকর্ষণ তিনি বিশ্লেষণ করেন এবং জোয়ার-ভাটার ‘গাণিতিক তত্ত্ব’ আবিষ্কার করেন।
নিউটন পদার্থের মধ্যে আকর্ষণের তত্ত্ব প্রচার করলেও মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণ আলোচনায় বিরত থাকেন। তবে এই ব্যাপারে তিনি বলেন যে, - “মাধ্যাকর্ষণের সত্যি সত্যিই অস্তিত্ব রয়েছে এবং আমরা যেভাবে ব্যাখ্যা করেছি সেই সূত্র অনুযায়ী কাজ করে- এবং সমুদ্র ও নভোমন্ডলের বস্তুসমূহের সকল গতির ব্যাখ্যাদানের জন্য পর্যাপ্ত - এটাই মাধ্যাকার্ষণ সম্পর্কে যথেষ্ট।”
‘প্রিন্সিপিয়ার’ মাধ্যমেই নিউটন বিজ্ঞানীরূপে প্রসিদ্ধি অর্জন করেন। এরপরও তিনি অনেক বিজ্ঞানের নিবন্ধ রচনা করেন। এর অধিকাংশই ‘আলোক বিজ্ঞান’ সম্পর্কিত নিবন্ধ। উচ্চতর বর্ণনা পদ্ধতি তাঁর তথ্যাবলিও তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ করেন।
১৬৯৯ সালে তিনি টাকশালের মাষ্টার নিযুক্ত হন এবং মুদ্রাকে নকল প্রতিরোধক করে প্রস্তুতের জন্যে সংস্কার কাজ তত্ত্বাবধান করেন। ১৭০৩ সালে তিনি ‘রয়্যাল সোসাইটির’ সভাপতি পদে নির্বাচিত হন। মৃত্যু পূর্বকাল পর্যন্ত তিনি উক্ত পদে বহাল ছিলেন। ১৭০৫ সালে রাণী অ্যানে তাঁকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
১৭২৭ সালে ৮৫ বছর বয়সে স্যার আইজ্যাক নিউটন পরলোক গমন করেন। ‘ওয়েষ্টমিনিস্টার অ্যাবি’তে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তিনি সকল যুগের এক অনন্যসাধারণ বিজ্ঞানী। পূর্বসূরীদের অবদান তিনি স্বীকার করেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন, - “কৃতী বিজ্ঞানীদের কাঁধে ভর দিয়েই আমি আরো - আরো বেশি অগ্রসর হতে সমর্থ হয়েছি।”
নিউটন তাঁর দূরবীনের যান্ত্রিক সমস্ত কাজকর্ম নিজেই সমাধা করেন। আয়নার ব্যাস ছিলো প্রায় এক ইঞ্চি। মাউন্ট প্যালোমারে অবস্থিত ‘ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজী ’ মানমন্দিরে ১৭ ফুট ব্যাসবিশিষ্ট প্রতিফলনযোগ্য আয়না রয়েছে।
তাঁর প্রথম প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক নিবন্ধের বিষয়বস্তু ছিলো- ‘আলোক বিজ্ঞান’। ‘আলোক বিজ্ঞান’ সম্পর্কিত তাঁর গবেষণায় সমালোচনা এবং সমর্থন দুটোই সৃষ্টি হয়। সমকালীন কৃতী বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান হইগ্যানস রবার্ট হুক এবং অন্যান্যদের পরাজিত করতে নিউটনকে তাঁর তত্ত্বসমূহ সমর্থন করতে হয়। এই বিতর্ককালে একদা তিনি বৈজ্ঞানিক পদ্দতির প্রধান ভিত্তি এভাবে বর্ণনা করেন, - ‘‘বৈজ্ঞানিক গবেষণার সর্বোত্তম এবং নিরাপদ পদ্ধতি হল, - প্রথমে অধ্যাবসায়ের সঙ্গে বস্তুর গুণাবী অনুসন্ধান এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এই সব গুণাবলীর সত্যতা নির্ধারণ। তারপর এগুলোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জন্য ধীরে-ধীরে তত্ত্বের দিকে অগ্রসর হওয়া।”
এই সময় নিউটনের বয়স ছিলো ৪৩ কিংবা ৪৪ বছর। এই বয়সে তিনি সার্থক গবেষকরূপে বৈজ্ঞানিক সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। সর্বদা সমালোচকদের জবাব দিতে গিয়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং নিজ আবিষ্কারের আর কোন তথ্য প্রকাশ না করার জন্য তিনি সংকল্পবন্ধ হন। অবশ্য তিনি তাঁর তত্ত্বাবলী সম্পর্কে গবেষণাকর্ম অব্যাহত রাখেন। এর মধ্যেও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে পার্লামেন্টে সদস্যরূপে কাজ করার নিজ যোগ্যতাবলে সুযোগ করে নেন।
প্রখ্যাত জ্যেতির্বিজ্ঞানী এডমন্ড হ্যালে ১৬৮৪ তে গ্রহের গতি সম্পর্কিত ‘কেপলারের তত্ত্ব’ আলোচনার উদ্দেশ্যে নিউটনের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এই আলোচনা থেকে হ্যালে সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেন যেম সকল নিয়মের সর্বাধিক মৌলিক সূত্র সম্পর্কে নিউটন সবিস্তার গবেষণা করেছেন। এই সূত্র হচ্ছে- বিশ্বজনীন মাধ্যাকার্ষণের নীতি। হ্যালে অবশ্য কোন প্রকারে নিউটনকে তাঁর এই সব গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বাবলী প্রকাশে সম্মত করান। হ্যালে খুব বিত্তশালী না হলেও মুদ্রণের ব্যয়ভার বহন করা এবং সম্ভাব্য প্রতিটি অসুবিধ থেকে নিউটনকে রক্ষা করার জন্য যত্নের সাথে সব কিছু দেখে দিতে সম্মত হন।
এর ফসলই তিন খন্ডে প্রকাশিত বিখ্যাত ‘ফিলোসোপিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেম্যাটিকা।’ সেই সময় ল্যাটিনই ছিলো বিজ্ঞানের ভাষা। তাই তিনি তাঁর সমগ্র গ্রন্থটি ল্যাটিন ভাষায় প্রকাশ করেন। ‘ম্যাথেমাটিক্যাল প্রিন্সিপলস অব সায়েন্স’ নামে মূল ল্যাটিন গ্রন্থের একটা অনুবাদ প্রকাশিত হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে ‘প্রিন্সিপিয়া’ অগ্রজপদক্ষেপের একটা স্বাক্ষর। ‘প্রিন্সিপিয়া’ বলে দেয় এবং নির্দেশ করে যে, - পৃথিবীরই হোক বা গ্রহ-নক্ষত্রের ক্ষেত্রেই হোক- সকল গতিই এক নিয়মে পরিচালিত হয়।
প্রিন্সিপিয়ায় নিউটনের গতির সূত্র বিশ্লেষণ করা হয় বিশদভাবে। প্রথম সূত্রটি হচ্ছে - ‘যে বস্তু স্থির থাকে, তা বল প্রয়োগে গতিমান না করা পর্যন্ত স্থিরই থাকে। গতিমান বস্তু একই গতিতে এবং একই দিকে অনবরত চলতেই থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত বলপ্রয়োগে গতি পরিবর্তন করা না হয়।” নিউটন উপলব্ধি করেন যে, বস্তুর মধ্যে গতি সঞ্চারের জন্য অবশ্যই একটা শক্তির উপস্থিতি থাকতে হবে। সে গাছ থেকে ফল পতনই হোক বা সমুদ্রের ঢেউয়ের উত্থানই হোক।
আমরা আজকে যে মোটরগাড়ী ব্যবহার করি, ভ্রমণ করি, সেই চলন্ত মোটর গাড়ি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে কি হয় - তা আন্দাজ করুন। আমরা সামনের দিকে গতিমান হয়ে পড়ি। অর্থাৎ আমাদের বলপ্রয়োগ থামিয়ে না দেয়া পর্যন্ত আমরা গতিমান থাকি। গাড়ির আসনের সামনে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আমাদের গতি থেমে যায়। এই চিন্তাধারাকে অবশ্য নিউটনের পূর্বেও চিন্তা করা হয়েছে, কিন্তু নিউটনই এই চিন্তাধারাকে প্রথম বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক নিয়মে ব্যাখ্যা করেন এবং স্থির সমাধান দেন।
গতির দ্বিতীয় সূত্রটি হচ্ছে, - “গতি পরিবর্তনের মাত্রার মধ্য দিয়ে শক্তির পরিমাণ পরিমাপ করা যায়। গতির পরিবর্তনের মাত্রাকে ‘ত্বরণ’ বলা হয় এবং বেগ হ্রাস ও বৃদ্ধির সঙ্গে এটা সংশ্লিষ্ট। উধাহরণস্বরূপ বলা যায় - ‘‘একটা মোটর গাড়িকে স্থির অবস্থা থেকে ৫ সেকেন্ডে ঘন্টায় ১৫ মাইল বেগবান করতে যে শক্তির প্রয়োজন হবে, একই সময়ে ঘন্টায় ২৫ মাইল বেগবান করতে তার চেয়ে অধিক শক্তির প্রয়োজন হবে।”
দ্বিতীয় সূত্র থেকে আমরা আরোও দেখতে পাই যে, - “ঘন্টায় ৬০ মাইল বেগে চলন্ত মোটর গড়িকে ১০ সেকেন্ডে থামাতে যে শক্তির প্রয়োজন হবে, ঘন্টায় ৩০ মাইল বেগে চলন্ত গাড়ীকে ৫ সেকেন্ডে থামাতেও একই পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হবে।”
গতির তৃতীয় সূত্রটি হচ্ছে- “ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং এই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সমানুপাতিক ও বিরুদ্ধমুখী।” এর বিবিধ প্রয়োগ সম্ভব। সর্বাধিক আকর্ষণীয় হচ্ছে বর্তমান রকেটের উড্ডয়ন। উঞ্চ বাষ্প যতোই পেছনের দিকে ধাবিত হতে থাকে, রকেট ততোই সামনের দিকে ধাবিত হতে থাকে। আপনার বাগানের পানি ছিটানোর যন্ত্রটার দিকে লক্ষ্য করুন। দেখবেন ছিটানীর অগ্রভাগটা দিয়ে পানি যতোই বের হতে থাকে অগ্রভাগটা ততোই পেছনের দিকে পাক খায়।
মাধ্যাকর্ষণের বিশ্বজনীন সূত্র অতি বিস্ময়কর। নিউটন বলেন যে, - “বস্তুর প্রতিটি কণা অপর প্রতিটি কণাকে আকর্ষণ করে। পৃথিবীই শুধু গাছের ফলকে আকর্ষণ করে না, ফলও পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। সকল গ্রহের ক্ষেত্রেই এই সূত্র প্রযোজ্য। সূর্য পৃথিবীকে টেনে রাখে, আবার চন্দ্রও পৃথিবকে আকর্ষণ করে।” তিনি আরো বলেন যে, - ‘-“বিভিন্ন বস্তুর মধ্যকার শক্তি, বস্তুর আকৃতির উপর এবং পরস্পরিক দূরত্বের উপর নির্ভরশীল।” এই শক্তির পরিমাণ কিভাবে হিসাব করতে হয়, তাও তিনি প্রদর্শন করেন।
‘প্রিন্সিপিয়ার দ্বিতীয় খন্ড প্রথম খন্ডরেই বিশ্লেষণ শুধু নয়। এতে গতির প্রতিবন্ধকতাসংক্রান্ত চিন্তাধারাও প্রকাশ করা হয়েছে। উধাহরণস্বরূপ বলা যায়, - কোন আকৃতির জাহাজ সমান্যতম প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হবে তাও তিনি আলোচনা করেন। দ্বিতীয় খন্ডে তরঙ্গের গতির গাণিতি আচরণের বর্ণনা দেন তিনি। তাঁর এই বর্ণনা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বলে প্রমাণিত হয়েছে।
প্রিন্সিপিয়ার তৃতীয় খন্ড মানব জাতির বুদ্ধিমত্তার অনন্য সাধারণ বিজয়রূপে স্বীকৃতি লাভ করেছে। পৃথিবীমুখী বস্তুসমূহ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিউটন গতি ও মাধ্যাকর্ষণের নীতিসমূহ উদ্ভাবন করেন এবং এই নীতিগুলোকে পৃথিবীসহ সূর্যের চতুর্দিকে অবস্থিত গ্রহসমূহের উপর প্রয়োগ করেন। তিনি সূর্য ও পৃথিবীর আকৃতি সম্পর্কে গবেষণা করেন। ‘পৃথিবীর মেরুদ্বয়ে চেপ্টা এবং নিরক্ষরেখা বরাবর স্ফীত’ - অংকের হিসাবে এটা কি করে রে করতে হবে, তাও তিনি দেখিয়ে দেন। পৃথিবী পরিভ্রমণে চন্দ্রের কক্ষপথের প্রধান টলনগুলো সম্পর্কে তিনি গবেষণা করেন এবং সূর্যপিন্ডের আকর্ষণেল দরুন কি করে টলন হয়, সেটাও সঠিকভাবে প্রদর্শন করেন। পৃথিবীর জলভাগের উপর চন্দ্র-সূর্যের আকর্ষণ তিনি বিশ্লেষণ করেন এবং জোয়ার-ভাটার ‘গাণিতিক তত্ত্ব’ আবিষ্কার করেন।
নিউটন পদার্থের মধ্যে আকর্ষণের তত্ত্ব প্রচার করলেও মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণ আলোচনায় বিরত থাকেন। তবে এই ব্যাপারে তিনি বলেন যে, - “মাধ্যাকর্ষণের সত্যি সত্যিই অস্তিত্ব রয়েছে এবং আমরা যেভাবে ব্যাখ্যা করেছি সেই সূত্র অনুযায়ী কাজ করে- এবং সমুদ্র ও নভোমন্ডলের বস্তুসমূহের সকল গতির ব্যাখ্যাদানের জন্য পর্যাপ্ত - এটাই মাধ্যাকার্ষণ সম্পর্কে যথেষ্ট।”
‘প্রিন্সিপিয়ার’ মাধ্যমেই নিউটন বিজ্ঞানীরূপে প্রসিদ্ধি অর্জন করেন। এরপরও তিনি অনেক বিজ্ঞানের নিবন্ধ রচনা করেন। এর অধিকাংশই ‘আলোক বিজ্ঞান’ সম্পর্কিত নিবন্ধ। উচ্চতর বর্ণনা পদ্ধতি তাঁর তথ্যাবলিও তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ করেন।
১৬৯৯ সালে তিনি টাকশালের মাষ্টার নিযুক্ত হন এবং মুদ্রাকে নকল প্রতিরোধক করে প্রস্তুতের জন্যে সংস্কার কাজ তত্ত্বাবধান করেন। ১৭০৩ সালে তিনি ‘রয়্যাল সোসাইটির’ সভাপতি পদে নির্বাচিত হন। মৃত্যু পূর্বকাল পর্যন্ত তিনি উক্ত পদে বহাল ছিলেন। ১৭০৫ সালে রাণী অ্যানে তাঁকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
১৭২৭ সালে ৮৫ বছর বয়সে স্যার আইজ্যাক নিউটন পরলোক গমন করেন। ‘ওয়েষ্টমিনিস্টার অ্যাবি’তে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তিনি সকল যুগের এক অনন্যসাধারণ বিজ্ঞানী। পূর্বসূরীদের অবদান তিনি স্বীকার করেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন, - “কৃতী বিজ্ঞানীদের কাঁধে ভর দিয়েই আমি আরো - আরো বেশি অগ্রসর হতে সমর্থ হয়েছি।”

আমার গ্রন্থাগারের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url