ইন্টারভিউ

 ইন্টারভিউ

রমেশ মিস্ত্রি লেনের ২৩এ বাড়িটা খুঁজে পেতে আমার বেশি সময় লাগেনি। পুরনো কলকাতার গলিঘুঁজি সম্বন্ধে কিছুটা ধারণা আছে। ছাত্রজীবনের অনেকটা সময় আমি এই অঞ্চলে কাটিয়েছি। তাই শ্যামাচরণ দে স্ট্রিটের কাঞ্জিলাল বুক ডিপোর কর্মচারীটির কাছ থেকে মালিকের বাড়ির ঠিকানা জেনে নিয়ে নিশ্চিন্ত মনেই হাঁটা দিয়েছিলাম রাস্তাটার দিকে। পুরনো ধাঁচের দোতলা বাড়ি। নতুন করে দেওয়ালে রং চড়ছে। চড়া সবুজ রংয়ের কাঠের দরজায় পুরনো নেমপ্লেটে গৃহকর্তার নাম ও বাড়ির নম্বর লেখা। বাড়ির প্রাচীনতার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে দরজার পাশে একটা ডোরবেলের সুইচ ছিল বটে, তবে সেটা অকেজো। বেশ কয়েকবার কড়া নাড়ার পর দরজা খুলে যিনি এসে আমার সামনে দাঁড়ালেন তাঁকে দেখে আমি ভূত দেখার মতোই চমকে উঠলাম। 

সেই একই রকম লম্বাটে মুখ, বাজপাখির ঠোঁটের মতো নাক, উঁচু হনু আর একজোড়া তীক্ষ্ন, অনুসন্ধানী চোখ। নতুন যেটুকু নজরে পড়ল, তা হল এই ভদ্রলোকের মাথাভর্তি ঘন কাঁচা-পাকা চুল, ব্যাকব্রাশ করা। আর চোখে মোটা সেলুলয়েড ফ্রেমের চশমা। বয়স আন্দাজ পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশ।

“কাকে চাইছেন?”

ব্যারিটোন স্বরে প্রশ্ন ধেয়ে এল আমার দিকে।

“অসময়ে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। এটা কি কাঞ্জিলালবাবু, মানে......”

“আমি কার্তিক কাঞ্জিলাল। নমস্কার।”

অসম্ভব ব্যক্তিত্ব লোকটার। আমি প্রতিনমস্কার করে সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে বললাম, “একটা বিশেষ ব্যাপারে আপনার কাছে এসেছি। দোকান থেকে ঠিকানাটা পেয়েছি।”

“ভিতরে আসুন।”

আধো অন্ধকার প্যাসেজ পেরিয়ে ডানদিকে কার্তিকবাবুর ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসলাম। পুরনো আমলের আসবাব। একদিকে রাইটিং ডেস্ক ও চেয়ার। সবচেয়ে নজরকাড়া যেটা চোখে পড়ল তা হল, ঘরের তিনদিকের দেওয়াল জুড়ে মস্ত-মস্ত বুজকেস, আর সেগুলোয় ঠাসাঠাসি করে নীচ থেকে উপর পর্যন্ত হরেক বিষয়ের বই।

“বইগুলো কি সব আপনারই সংগ্রহ?”

“কী জন্য দেখা করতে এসেছেন বলুন।”

বইয়ের বহর দেখে আমার মুখ ফসকে প্রশ্নটা বেরিয়ে গিয়েছিল। বুঝলাম ভদ্রলোক অপ্রয়োজনীয় কথা পছন্দ করেন না। তাই নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, “ইয়ে, মানে একজনের অনুরোধে আপনাকে একটা জিনিস দিতে এসেছি।”

কথা বলতে-বলতে আমি ব্যাগ থেকে কাগজে মোড়ানো ঘড়িটা বাড়িয়ে ধরি। ভদ্রলোক ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “কী এটা?”

“আপনি খুলে দেখুন চিনতে পারেন কিনা।”

ভদ্রলোক একটু ইতস্তত করে আমার হাত থেকে মোড়কটা নিয়ে খুললেন। হাতঘড়িটা দেখার পর ওঁর মুখ-চোখের ভাব একেবারেই বদলে গেল। অভিব্যাক্তি গোপন না করেই বললেন, “এটা আপনি কোথায় পেলেন?”

এই প্রশ্নের উত্তর আমি তৈরি করেই এসেছিলাম।

“কিছুদিন আগে গণেশবাবুর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল দার্জিলিংয়ে। কোনও হোটেলে জায়গা না পেয়ে একটা গেস্টহাউসে ডরমিটরি শেয়ার করতে হয়েছিল আমাদের দু’জনকে। উনি আমার একদিন আগে চেক আউট করেন। যাওয়ার সময় তাড়াহুড়োয় ঘড়িটা ফেলে গিয়েছিলেন। পরে মনে পড়ায় ম্যানেজারকে ফোন করে ঘড়িটার কথা জানান, আর অনুরোধ করেন আমি যেন ওটা সঙ্গে করে কলকাতায় নিয়ে এসে আপনার কাছে দিয়ে দিই। আপনি তো গণেশবাবুর দাদা, তাই ন?”

আমার কথা শুনে ভদ্রলোকের দুই ভুরুর মাঝে ভাঁজ পড়ল। অনেক কষ্টে ঠোঁটে একটা হালকা হাসির ভাব ফুটিয়ে বললেন, “আমি তাকে সহোদর বলে পরিচয় দিতে আজও লজ্জা বোধ করি। তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বহু আগেই ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। এতদিন পর ওর হঠাৎ এটা ফেরত দেওয়ার কথা মনে হল কেন, সেটাই আমার কাছে আশ্চর্য ঠেকছে। আচ্ছা, ঠিক কবে আপনার সঙ্গে ওর মোলাকাত হয়েছিল?”

মোক্ষম প্রশ্ন। এ প্রশ্নটাও যে আসতে পারে, সেটাও আমি আগে আন্দাজ করেছিলাম। তাই তৈরিই ছিলাম।

“তা হয়ে গেল প্রায় হপ্তাদুয়েক। জানুয়ারির সাত আর আট তারিখ উনি গেস্টহাউজে ছিলেন। ন’তারিখ সকালে চলে যান।”

“তার মানে দুর্ঘটনাটা ঘটার আগে ও দার্জিলিংয়ে ছিল। কোন মতলবে কে জানে।”

“কীসের দুর্ঘটনা?”

আমি কিছু না-জানার ভান করে প্রশ্ন করি। ভদ্রলোক আমার চোখে চোখ রেখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকেন। ভিতরে-ভিতরে অস্বস্তি বোধ করলেও চোখ সরাই না।

“গত সপ্তাহে একটা দুর্ঘটনায় গণেশ মারা গেছে।”

“সে কী! কবে? কোথায়?”

“মৃত্যুর সঠিক তারিখ ও সময় এখনও জানা যায়নি। গত এগারো তারিখ কালিম্পংয়ের কাছে একটা খাদ থেকে ওর মৃতদেহ পাওয়া যায়। সঙ্গে উদ্ধার হওয়া ব্যাগ থেকে বেশ কিছু টাকা আর একটা নোটবুক পাওয়া গিয়েছে। তারই সূত্র ধরে অনেক জায়গায় খোঁজখবর করে পুলিশ অবশেষে এই বাড়ির সন্ধান পেয়ে আমার কাছে আসে। তাদের অনুমান এটা নিছক দুর্ঘটনা না-ও-হতে পারে।”

“পুলিশ কি অন্য কোনও সম্ভাবনার কথা ভাবছে? ইয়ে, মানে খুনটুন?”

“হতেই পারে। যে পথে ও চলে গিয়েছিল, তাতে এমন পরিণতির কথা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে আমাদের পরিবারের কাছে যে বহুকাল আগেই মৃত, সে দুর্ঘটনায় মরল না খুন হল, তা নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যাথা নেই।”

“আপনি কি মৃতদেহ শনাক্ত করেছেন?” 

ভদ্রলোক আবার সেই একই রকম ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। বুঝলাম মনে-মনে বিরক্ত হয়েছেন।

কালিম্পং থানার পুলিশ কতগুলো ফোটো এনেছিল। সেগুলো দেখে যা বলার বলে দিয়েছি। অত দূরে গিয়ে পচাগলা লাশ দেখে শনাক্ত করার কোনও প্রশ্নই আসে না। তা ছাড়া পুলিশ যখন তার পরিচয় পেয়েই গিয়েছে, তখন খামোখা আত্মীয়স্বজনদের টানাটানি করার প্রয়োজন কী!”

“আজ্ঞে?”

“ডুয়ার্সের পুলিশের খাতায় গণেশের নাম অনেকদিন ধরেই লেখা হয়ে আছে, ওয়ান্টেড লিস্টে।”

⥮২⥮ 

আমার মনেহয় কাহিনিটা প্রথম থেকেই শুরু করা ভাল। তা হলে ঘটনাপরম্পরা মিলিয়ে পুরোটা বুঝে নিতে সুবিধে হয়। 

যে সময়ের কথা বলছি, সেটা আজ থেকে প্রায় তিরিশবছর আগের। তখন আমি সদ্য এম এ পাশ করে চাকরিবাকরির চেষ্টায় আছি। হোটেল ছেড়ে গাড়িয়ার কাছে একটা মেসে বাসা নিয়েছি। কয়েকটা টিউশন আর লেখালিখি করে নিজেরটা মোটামুটি চলে যায়। 

লেখার ঝোঁকটা স্কুলজীবন থেকেই ছিল। দু’-একটা প্রথম শ্রেণির পত্রিকায় লেখা ছাপা হয়ে একটু নামডাকও হয়েছে। গল্পের সংকলনও বেরিয়েছে একটা। তবে কলমবাজির পারিশ্রমিকে তো আর পেট চলে না। তাই টিউশন করতে হত। পাশাপাশি চাকরির চেষ্টা।

স্টেটসম্যান কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে দার্জিলিংয়ের একটা মিশনারি স্কুলে মাস্টারির চাকরির জন্য দরখাস্ত পাঠিয়েছিলাম। তারই উত্তরে ইন্টারভিউয়ের ডাক পেলাম একদিন।

ইউনিভার্সিটিতে আমার সিনিয়র বিপুল দত্ত বছরখানেক আগে দার্জিলিংয়ের সরকারি কলেজে পড়ানোর চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। নিয়মিত না হলেও আমার সঙ্গে মোটামুটি যোগাযোগ ছিল লিট্‌ল ম্যাগাজিনে লেখালিখির সূত্রে। ওকে ফোন করে ব্যাপারটা বলতে বেজায় খুশি হল। ওদের তখন শীতের ছুটি চলছিল। বলল, সরাসরি যেন ওর বাসাতেই গিয়ে উঠি। স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই আমাকে দার্জিলিং দেখানোর দায়িত্বটাও নিয়ে নিল। সেই সঙ্গে একটা শর্তও দিল। ওখানে বাঙালিদের একটা সাহিত্যবাসর তৈরি হয়েছিল মূলত ওরই উদ্যোগে। সেই সাহিত্যবাসরের বিশেষ অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আমাকে স্বরচিত গল্প পড়তে হবে এই কারণে ও আমার হোস্টের দায়িত্ব পালন করবে। মনে-মনে খুশিই হলাম। রথ দেখা, কলা বেচা দুটোই হবে। সেই সঙ্গে উপরি পাওনা দার্জিলিং বেড়ানো। মন্দ কী?

অনেক লোকজনই এসেছিল। তাদের কেউ-কেউ আবার অটোগ্রাফও নিয়ে গেল নতুন কেনা আমার গল্প সংকলনের পাতায়। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। কলকাতায় কেউ তেমন একটা পাত্তা দেয় না। ফুরফুরে মেজাজে গল্প শোনালাম সবাইকে।

সময় হতে রেখে দিনদুয়েকের জন্য মেদিনীপুর যেতে হল। বাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় পোশাক ও জিনিসপত্র নিতে হবে। প্রথমবার পাহাড়ে যাচ্ছি শুনে ডাক্তারকাকু, মানে বাবার বন্ধু ডাঃ অলক বেরা বেশ কিছু হেল্‌থ টিপ্‌স দিলেন। বললেন, ওখানে কেভেন্টার্সের হট চকোলেট আর গ্লেনারিজে অন্তত একটা ডিনার যেন অবশ্যই ট্রাই করি। কলকাতায় পার্কস্ট্রিট-চৌরঙ্গি অঞ্চল যেমন কলোনিয়াল কালচারের একটা দিক এখনও ধরে রেখেছে, দার্জিলিংয়েও তার আর-একরকম ফ্লেভার পাওয়া যায়।

এই অলককাকু সম্বন্ধে কিছু কথা এখানে বলে রাখা প্রয়োজন। উনি অফিশিয়ালি বাবার বন্ধু হলেও আসলে আমাদের পরিবারের সকলের বন্ধু, বিশেষ করে ছোটদের। ডাক্তারির চেয়ে বেশি ভালবাসেন আড্ডা দিতে আর দারুণ সব অভিজ্ঞতার গল্প শোনাতে। সাহিত্যে, সঙ্গীতে প্রবল অনুরাগ। দুর্দান্ত ফোটোগ্রাফির হাত। সেই সঙ্গে ব্রিজ আর ব্রু কফির নেশা। আমাদের ছোটবেলায় তিনিই ছিলেন সেই সান্তাক্লজ, যিনি অসুখেবিসুখে সাবু-বার্লির পথ্য তুলে দিয়ে পেট ভরে মাছ-ভাত খাওয়ার নিদান দিয়েছিলেন। অলককাকুর বাড়িতেই আমি প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ডে লালকমল-নীলকমল আর বুদ্ধু ভুতুম শুনেছিলাম। তিনিই আমাকে চিনিয়েছিলেন পরশুরাম আর মুজতবা আলিকে। কজেই তাঁর উপদেশগুলো মাথায় নিয়ে দার্জিলিং যাওয়ার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করলাম।

ইন্টারভিউয়ের তারিখ ছিল ১১ জানুয়ারি। সেই মতো ন’তারিখে কামরূপ এক্সপ্রেসে রওনা দিয়ে নিউ জলপাইগুড়ি হয়ে দার্জিলিং পৌঁছাতে পরদিন দুপুর গড়িয়ে গেল। বিপুলদা এসে ওর হ্যাপিভ্যালির বাসায় নিয়ে গেল। দুপুরের খাওয়া সেরে টানা ঘুম দিলাম সন্ধে পর্যন্ত। সেদিন আর কোথাও বেরোইনি। ঠান্ডাও ছিল জবরদস্ত।

পরদিন সকালে হিমালয়ের সূচফোটানো হাওয়ায় কাঁপতে-কাঁপতে ইন্টারভিউ দিতে গেলাম। সেটা সেটা একরকম হল বটে। ঝকঝকে স্মার্ট আর ঝরঝরে ইংরেজি-বলিয়ে প্রতিদ্বন্দীদের দেখে একটু দমেই গেলাম যেন। 

তবে সন্ধেবেলায় ভানুভক্ত হলে সাহিত্যবাসরের বিশেষ অনুষ্ঠান বেশ জমে গেল। বুঝলাম বিপুলদা চেষ্টার খামতি রাখেনি। অনেক লোকজনই এসেছিল। তাদের কেউ-কেউ আবার অটোগ্রাফও নিয়ে গেল নতুন কেনা আমার গল্প সংকলনের পাতায়। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। কলকাতায় কেউ তেমন একটা পাত্তা দেয় না। ফুরফুরে মেজাজে গল্প শোনালাম সবাইকে।

কিন্তু আমাকে হতাশ করল দার্জিলিংয়ের পরিবেশ। দীর্ঘ অশান্তির আগুনে পুড়ে পাহাড়ে তখন সবে শান্তি ফিরেছে। আর সেই কারণেই অসময়েও টুরিস্টদের ভিড়ে থিকথিক করছে শহর। এতো হাড়কাঁপানো শীত আর কুয়াশা। বেলা বারোটার আগে সূর্যের মুখ দেখা যায় না। তার উপরে জলের তীব্র হাহাকার। এর মাঝে বরফ দেখার হুজুগে মেতে গুচ্ছের টুুরিস্ট এসে জুটেছে। রাস্তাঘাটে গাড়ি, ডিজেল পোড়া ধোঁয়া, আবর্জনা আর ঘোড়ার মলমূত্রের গন্ধে দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। ম্যালে মেলার মতো ভিড়। খুবই বিরক্তিকর অবস্থা। ভাল লাগছিল না মোটেই। তাই আমার ভ্রমণসারণি সংক্ষিপ্ত করে কেভেন্টার্স, গ্লেনারিজ আর টাইগার হিলের মায়া কাটিয়ে ১৩ তারিখেই ফিরে আসব মনস্থ করলাম।

আমার কথা শুনে বিপুলদা হাঁইমাই করে উঠল। কিন্তু আমার জেদের কাছে ওকে কার মানতে হল। আবার কোনও এক সময় আসব কথা দিয়ে ১৩ তারিখ সকালে পাহাড় ছাড়লাম।

ফেরার রিজার্ভেশন ছিল না। বিপুলদাই শিলিগুড়িতে কোনও এক পরিচিত রেলকর্মীকে ফোন করে দার্জিলিং মেলে একটা ব্যবস্থা করে দিতে বলল। ব্যবস্থা যেটা হল, সেটা জেনারেল কম্পার্টমেন্টে একটা সিট। দালালকে কুড়ি টাকা দিতে হল তার জন্য। আমার অবশ্য তেমন কোনও অসুবিধে হবে বলে মনে হল না। একটা রাতের মামলা। তখন আমি ফিরতে পারলে বাঁচি।

⥮৩⥮

সেই রাতে কামরায় বেজায় ভিড়। বেশির ভাগই হিন্দুস্তানি দেহাতি লোকজন। পোঁটলাপুঁটলি নিয়ে কোথায় যেন চলেছে সব। এই অবস্থায় ঘুমটুম অসম্ভব ভেবে ব্যাগ থেকে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ঐতিহাসিক সমগ্র’ বের করে পড়তে ‍শুরু করলাম। কখন কিষাণগঞ্জ চলে এসেছে বুঝতে পারিনি। খেয়াল হল যাত্রীদের হুড়োহুড়ি করে নামার বহর দেখে। শুনলাম মকরসংক্রান্তি উপলক্ষে এরা সবাই দেশগাঁওয়ে ফিরছে। কিষাণগঞ্জ থেকে কাটিহার-ভাগলপুরের ট্রেন ধরবে। এবার একটু হাত-পা ছড়িয়ে বসার জায়গা পাওয়া গেল।

বইটা পড়তে পড়তে কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিল। ঘুম ভাঙতে দেখি ট্রেন মালদা টাউন স্টেশনে দাঁড়িয়ে। কামরা একেবারে খালি হয়ে গিয়েছে। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কেবল প্ল্যাটফর্মের দিকে ঘন কুয়াশার আস্তরণের মধ্যে দুটো ঝাপসা বাতি দেখা যাচ্ছে। কামরায় আশপাশে আর কেউ আছে কিনা বুঝলাম না। তবে দু’-একবার মনে হল যেন কাশি আর গলা ঝাড়ার আওয়াজ পেলাম।

ট্রেন আবার ঢিমে তালে গড়াতে শুরু করল। ঘড়িতে রাত প্রায় আড়াইটে। বেশ কিছুক্ষণ ঘুমিয়েছি বলে আর ঘুম আসছিল না। কামরার বেশির ভাগ বাতিই অকেজো। যে-ক’টা জ্বলছিল তাদের টিমটিমে আলোয় পড়তে বেশ অসুবিধে হচ্ছিল। ফাঁকা বেঞ্চে এই সুযোগে একটু গড়িয়ে নেওয়া যেতে পারে ভেবে ব্যাগ থেকে বেডশিট আর হাওয়া-বালিশ বের করে ফেললাম। ঘুম না হোক, শরীরটা তো বিশ্রাম পাক। এমন সময় হঠাৎ কে যেন বলে উঠল, “কোনও ভদ্রলোকের এখন আর দার্জিলিং যাওয়া উচিত নয়, বুঝেছেন।”

চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখি একটু দূরে বাঁদিকের জানালার ধারে আধো অন্ধকারে কেউ একজন বসে আছে। আগে তো চোখে পড়েনি! চেহারাটা স্পষ্ট করে বোঝা যাচ্ছে না। কাছাকাছি যেহেতু আর কেউ ছিল না, বুঝলাম কথাগুলো ওদিক থেকেই এসেছে। 

“আমায় কিছু বললেন?” প্রশ্নটা হাওয়ায় ছুড়ে দিয়ে চাদর বিছাতে শুরু করি।

“আলবাত আপনাকে বলেছি! আপনি ছাড়া এই কামরায় জীবিত ব্যক্তি আর কে আছে যে, তাকে বলব?”

অদ্ভুত বেয়াড়া কথাবার্তা তো! গলাটাও কেমন যেন ফ্যাঁসফেঁসে, ধরা-ধরা।

তবুু ভাল, বাকি রাতটার জন্য একজন সহযাত্রী অন্তত পাওয়া গেল।

কিন্তু লোকটা হঠাৎ দার্জিলিংয়ের কথা তুলল কেন? হতে পারে ট্রেনটা যেহেতু দার্জিলিং মেল, ও ধরেই নিয়েছে আমি দর্জিলিং থেকে ফিরছি। ও নিজেও হয়তো তাই।

“এইসব ভেবে নিজেকে আশ্বস্ত করে জানালার শাটারগুলো লক করলাম। এই সময় একটু চা পাওয়া গেলে ভাল হত। 

“এসব জায়গায় মোশাই, রাত্তিরে ট্রেনে চাওয়ালা ওঠে না। চা খেতে চাইলে সেই এক্কেবারে বোলপুর।”

আবার চমকে উঠলাম আমি। বলে কী লোকটা! আমার মনের কথাগুলো পড়ে নিয়েই যেন ও এসব বলছে। একটু ভয়-ভয় করতে লাগল। বুজরুকরা অনেক সময় সম্ভাব্য শিকারের উপর এইভাবে মানসিক চাপ তৈরি করে।

আর দু’-চারটে এলোমেলো কথাবার্তার পর ব্যাগ থেকে খবরের কাগজ বের করে পড়তে শুরু করেছি, লোকটা হঠাৎ ওর সিট ছেড়ে উঠে এসে আমার উলটোদিকে কোনাকুনি বসল। বেশ লম্বা চেহারা। পাঁচ এগারো হবে। ছিপছিপে গড়ন, বাজপাখির ঠোঁটের মতো নাক। হনু দুটো বেশ উঁচু, যার ফলে চোখের গর্ত গভীর, আর সেখান থেকে টুনিবালবের মতো একজোড়া চোখ উঁকি দিচ্ছে। পরনে সাধারণ উইন্ডচিটার আর ট্রাউজার্স। কানে-মাথায় মাফলার প্যাঁচানো। তার উপরে আবার একটা গোর্খা ক্যাপ।

কাগজটা আমার পড়া হয়ে গিয়েছিল আগেই। সেটা বুঝেই কিনা কে জানে, লোকটা একবার কাগজটা দেখার ইচ্ছে প্রকাশ করল। আপত্তি করার কোনও কারণ নেই, কাগজটা তাই ওর দিকে বাড়িয়ে দিলাম। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ওর হাত আমার হাত ছুঁয়ে গেল। হিমঠান্ডা সেই স্পর্শে আমার সারা শরীর যেন শিহরণ খেলে গেল। সাবলীল হওয়ার চেষ্টা করে বললাম, “হাতটা যে ঠান্ডায় একেবারে জমে গিয়েছে দেখছি।”

“স্বাভাবিক। পাশের জানালাটা খোলা রেখেছিলাম কিনা। আমার আবার একটু ইয়ে আছে, ওই যে কী বলে যেন, ক্লস্ট্রোফোবিয়া। মুক্ত বিহঙ্গ তো, তাই বদ্ধ জায়গায় দমবন্ধ হয়ে আসে। তা, দার্জিলিং কেমন দেখলেন?”

“কী করে বুঝলেন আমি দার্জিলিং গিয়েছিলাম?”

“আন্দাজ করেছি। আমার লাইনে অনেক কিছুই আন্দাজের উপর বাজি ধরতে হয়।”

“লাইনটা কী?”

“করি তো অনেক কিছুই। মানে করতাম।”

“এখন কি করেন না?”

“তা একরকম বলতে পারেন। অবসরে যেতে বাধ্য হলাম হঠাৎ। সে যাগ গে, দার্জিলিংয়ে কি বেড়াতে এসেছিলেন না অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল?”

নিঃসন্দেহে লোকটা বেশ গায়েপড়া আর প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কৌতূহলী। ভণিতা না করেই বললাম, “চাকরির ইন্টারভিউ ছিল। সেই সঙ্গে একটা সাহিত্যসভায় আমন্ত্রণ। দুটো কাজই হল।”

“সাহিত্যসভা! বড় ব্যাপার তো মশাই! আপনার কি সাহিত্যটাহিত্যও করা হয়?:

“তেমন কিছু নয়, একটু লেখালিখির শখ আছে।”

“কি লেখেন আপনি?”

“গল্প।”

“বাহ, বাহ! তা কীরকম গল্প? মানে কী বিষয়ে?”

“বিষয় তো অনেক রকম হতে পারে। আমি মূলত রহস্য-রোমাঞ্চ আর গোয়েন্দাকাহিনি লিখে থাকি।”

“চমৎকার! চমৎকার! স্বপন কুমার পড়েছেন? কালনাগিনী সিরিজ? আমি তো মোশাই, স্কুললাইফে ওই বইগুলোই বেশি পড়েছি। আর তাতেই মাথাটা বিগড়োল। বুদ্ধিসুদ্ধি খারাপ ছিল না। তবে দুর্বুদ্ধিই বেশি। সবসময় মাথার মধ্যে ঘুরঘুর করত নানা রকম ছক। দীপক চাটুজ্যের মতো দুঁদে গোয়েন্দার পক্ষেও সেসব ধরা সম্ভব ছিল না। ঠিক যেমন কালনাগিনী। ধরা পড়েও পড়ত না। আমাকেও ধরতে পারেনি। তবে কী জানেন মোশাই, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ভাল নয়। সেটাই আমার কাল হল। শেষমেশ নিজের লোকগুলোই কিনা....আসলে এসবই হচ্ছে নিয়তি। আগে থেকে সব লেখা হয়ে থাকে বুঝলেন।”

“না, ‍কিছুই বুঝলাম না।”

“সে অনেক কথা, সময় পেলে বলব’খন। আচ্ছা, আপনি ভূতের গপ্পো লেখেন না? ওই অশরীরী আত্মাটাত্মা নিয়ে?”

“অলৌকিক ব্যাপারে আমার তেমন একটা আগ্রহ নেই।”

“কেন? আপনি কি ওসবে বিশ্বাস করেন না?”

“বিশ্বাসের ব্যাপারটা নির্ভর করে যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যার উপর। অনেকেই এসবে বিশ্বাস করেন না, কিন্তু উপভোগ করেন। এই ব্যাপারটাকে সাহিত্যের ভাষায় বলা হয় ‘উইলিং সাসপেনশন অফ ডিসবিলিফ’। আমার গল্পগুলো রহস্যকাহিনি হলেও যুক্তিনির্ভর। বলেতে পারেন একরকমের মিস্ট্রি সল্‌ভিং। তা ছাড়াও আজ পর্যন্ত সেরকম কোনও আলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত ঘটনা সম্পর্কে আমার কোনও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও  হয়নি। হলে, অবশ্যই তার বিজ্ঞানসম্মত,  যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা খুঁজে বের করার চেষ্টা করতাম। তারপর লেখার কথা ভাবতাম।”

“বয়সটা কাঁচা তো, তাই অভিজ্ঞতাটাও কম। ধরুন, আমি যদি আপনাকে আমার কোনও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা বলি, আপনি লিখবেন আমার গপ্পো?”

হাবভাবে এবং কথাবার্তায় একটু বেখাপ্পা ধরনের হলেও লোকটা ইন্টারেস্টিং। একটু ছিটগ্রস্ত, অথবা কোনও ধুরন্ধর বদমাইশ। আমাকে এখন কোনওরকমে ঠেকা দিয়ে রাতটা কাটিয়ে দিতে হবে। যদি না তার আগে কোনও বড় বিপদ নেমে আসে। কাজেই ওর কথা শোনাই ভাল।

আমার সম্মতি পেয়ে লোকটা আমার খবরের কাগজটা একবিন্দুও না পড়ে আমাকে ফেরত দিয়ে কাঁপা-কাঁপা হতে নিজের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে একটা ট্যাবলয়েড মাপের কাগজ বের করে আনল। দেখলাম সেটা উত্তরবঙ্গের একটা খবরের কাগজের সান্ধ্য এডিশন। ১৩ তারিখের।

“এই যে, এইখানটায় দেখুন। একটা দুর্ঘটনার খবর বেরিয়েছে, পড়ৃুন।”

দেখলাম বাঁদিকের কলামের মাঝামাঝি ছোট হেডলাইন: পাহাড় থেকে পড়ে পর্যটকের মৃত্যু। খবরে যা লেখা ছিল তার মোদ্দা কথা, কালিম্পং থেকে কিছু দূরে চুইখিম নামে একটা নির্জন পাহাড়ি গ্রামে এক ব্যক্তির মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে। প্রায় পাঁচশো ফুট গভীর খাদ থেকে মৃতদেহটি উদ্ধার হয়। মৃত ব্যক্তির পরিচয় এখনও জানা যায়নি। অনুমান যে, তিনি ওই গ্রামে বেড়াতে এসেছিলেন এবং পাহাড় থেকে পড়েই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করছে। 

আমি কৌতূহলী চোখে লোকটার দিকে তাকালাম। এই খবরটার মধ্যে কী এমন রহস্য বা অলৌকিক বিষয় আছে যে আমাকে দেখাতে হবে? ও যেন আমার প্রশ্নটাই পড়ে নিয়েই বলে উঠল, “এটা খালি চোখে দুর্ঘটনা মনে হলেও আসলে তা নয়। এটা খুন।”

“সেটা আপনি বলছেন কীসের ভিত্তিতে, যেখানে পুলিশ এখনও তদন্ত শেষ করেনি?”

“পুলিশ তদন্ত করে কিছুই বের করতে পারবে না। কারণ, আততায়ীরা কোনও প্রমাণ রেখে যায়নি। আপনি বুদ্ধি খাটিয়ে রহস্যটা খুঁজে বের করে আপনার গপ্পো লিখুন। অপরাধী ধরা পড়ুক বা না পড়ুক, আপনার গপ্পো পড়ে কিছু মানুষ অন্তত বুঝবে, চোখের দেখা আর প্রকৃত সত্য সবসময় এক হয় না।”

“আমি কীভাবে এই রহস্য খুুঁজে বের করব? আমি এ বিষয়ে জানিটা কী?

“আমি যা-যা বলছি সেটা নোট করে নিন।”

ওর কথা শোনা ছাড়া আর কোনও উপায় দেখলাম না। সকাল হতে আর কত বাকি কে জানে!

“যে লোকটা খুন হয়েছে তার নাম হল গণেশ কাঞ্জিলাল।”

“কাগজে তো কই, নাম দেখলাম না।”

“খবরের কাগজওয়ালারা নাম জানতে পারেনি, তাই ছাপেনি। তবে পুলিশ এতক্ষণে নিশ্চয়ই পরিচয় বের করে ফেলেছে।”

“আর?”

“লোকটা নানা রকম অপরাদমূলক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল।”

“কিন্তু আপনি এসব জানলেন কী করে?”

আমার প্রশ্ন শুনে লোকটার মুখে একটা করুণ হাসি খেলে গেল।

“এসব খবর আমার চেয়ে বেশি আর কারও পক্ষেই জানা সম্ভব নয়, কারণ......”

হুইস্‌ল বাজিয়ে প্রচণ্ড গতিতে একটা আপ লাইনের ট্রেন পাশ দিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছিল। সেই শব্দে লোকটার কথাগুলো চাপা পড়ে গেল।

সেই ট্রেনের কামরাগুলোর আলো ছিটকে আসছিল আমাদের কামরায়। দেখলাম লোকটা, দু’চোখে হাত চাপা দিয়ে বসে আছে। এরপর আবার সেই আধো অন্ধকার কামরা। রাতের জমাট বাঁধা কুয়াশা আর অন্ধকার ভেদ করে আমাদের ট্রেনের দুলকি চালে চলার একটানা শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না।

আমি অপেক্ষা করছিলাম লোকটার বাকি কথাগুলো শুনব বলে। কৌতূহল যে হচ্ছিল না, তা নয়।

এর মধ্যে লোকটা হঠাৎ উঠে  পড়ে প্যাসেজের দিকের একটা জানলার শাটার তুলে বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। খোলা জানলা দিয়ে হিমঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা এসে কাঁপিয়ে দিল আমাকে। শাটার নামিয়ে লোকটা ঘড়ি দেখল। তারপর বলল, “আমার নেমে যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। রাত শেষ হয়ে আসছে কিনা। আপনাকে সবটা বলা হল না। সে যাগ গে, তবে আপনার কাছে আমার একটা বিশেষ অনুরোধ আছে, সেটা কিন্তু রাখতে হবে আপনাকে।”

মরেছে! টাকা-পয়সা চেয়ে বসবে নাকি?

আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটা ফের ফস করে জিজ্ঞেস করে বসল, “আপনার কাছে একটা কলম হবে?”

লোকটার প্রস্তাব শোনার আগ্রহ চেপে রেখে শার্টের বুকপকেট থেকে বিপুলদার থেকে উপহারে পাওয়া, একটা ঝকঝকে নতুন বেশ দামি কলম বের করে এগিয়ে দিলাম। লোকটা সেটা নিয়ে নিজের বাঁহাত থেকে রিস্টওয়াচটা খুলে ওর হাতের খবরের কাগজটায় কলম দিয়ে কিছু একটা লিখল। তারপর কাগজ দিয়ে রিস্টওয়াচটা ভাল করে মুড়ে আমার হাতে প্রায় জোর করে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এই ঘড়িটা কলকাতায় একজনের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। কাগজের গায়ে ঠিকানাও লিখে দিয়েছি। কলেজ স্ট্রিট পাড়ায় কাঞ্জিলাল বুক ডিপোর মালিক। নাম কার্তিক কাঞ্জিলাল।”

হঠাৎ এরকম একটা বেমক্কা আবদারে থতমত খেয়ে গেলাম। ‘অন্য কোনও মতলব নাকি?’

“আপনি যেন ভাববেন না এর পিছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে। খুবই সোজাসাপ্টা ব্যাপার। এই ঘড়ির আসল মালিক উনিই। ফেরত পেয়ে খুশি হবেন অবশ্যই। আপনি শুধু দয়া করে এটা পৌঁছে দিলেই হবে। ইয়ে, ওই দোকানটা শ্যামাচরণ দে স্ট্রিটে।”

আমি মারিয়া হয়ে বললাম, “আপনার পরিচয় কী দেব? সেটাই তো এখনও বলেননি। তাছাড়া, আপনার কাছে ঘড়িটা গেল কীভাবে?”

“ওটা আমি কুড়ি বছর আগে লোভে পড়ে চুরি করেছিলাম। এখন ফেরত দিয়ে একটু প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। আর হ্যাঁ, আমার নাম গণেশ কাঞ্জিলাল। আচ্ছা আসি, নমস্কার।”

আমি কিছু বলে ওঠার আগেই লোকটা তড়িৎ গতিতে দরজার কাছে চলে গেল। তারপর অনায়াসে ভারী পাল্লাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। আমি দৌড়ে দরজার দিকে গেলাম। দেখলাম ট্রেন ধীর গতিতে একটা প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে। সেই সুযোগে লোকটা নেমে গিয়ে ঘন কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গিয়েছে। হাতে কাগজের মোড়কটা নিয়ে কিছুক্ষণ ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। সংবিত ফিরল চাওয়ালার হাঁকে।

“কোন স্টেমন ভাই?”

“বোলপুর।”

⥮৪⥮ 

চোদ্দ তারিখ সকালে শিয়ালদায় ট্রেন থেকে নেমে আর মেসে ফিরে যায়নি। সোজা মেদিনীপুর চলে এসেছিলাম। 

এই ক’দিনের ধকলেই বেশ কাবু হয়ে গিয়েছিলাম। ঠান্ডাও লেগেছিল। হাওড়া স্টেশন থেকেই টের পাচ্ছিলাম শরীরে জ্বর-জ্বর ভাব। বাড়ি ফিরে একেবারে বিছানা নিলাম।

খবর পেয়ে সন্ধেবেলায় অলককাকু এসে দেখেটেখে ওষুধপত্র লিখে দিলেন। আমি ব্যাপারটা অলককাকুকে বলব কী বলব না ভাবতে-ভাবতে শেষ পর্যন্ত বলেই ফেললাম। শুনেটুনে তাঁর কপালে মস্ত ভাঁজ পড়ল।


“তুই যে একটা মস্ত বড় বোকামির কাজ করেছিস, সেটা বুঝতে পারছিস তো?”

“ঘড়ির ব্যাপারটা বলছ তো?”

“অবশ্যই।”

“তুমি যতটা সিরিয়াস ভাবছ ততটা নাও হতে পারে।”

“তা হলে আর ভাবনা কীসের? ঠিকানা খুঁজে ঘড়িটা যথাস্থানে পৌঁছে দে। তবে মনে রাখিস ঘড়িটার মধ্যে এমন কিছু থাকতে পারে, যা তোর হাত দিয়ে পাচার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।”

“তুমি কি সেই লালমোহনবাবুর হাত দিয়ে নওলাখা হার পাচার হওয়ার কথা ভাবছ?”

“অসম্ভব হয়।”

“একটা ছোট হাতঘড়ির মধ্যে কি এমন মূল্যবান জিনিস পাচারের জন্য লোকটা এত কষ্ট করবে?”

“হয়তো ঘড়িটা ইটসেল্ফ খুব মূল্যবান। অ্যান্টিকক পিস, কিংবা ওটার সঙ্গে কোনও ঐতিহাসিক ঘটনা জড়িয়ে আছে। দেখা দেখি একবার ঘড়িটা।”

আমি ব্যাগ থেকে কাগজে মোড়া ঘড়িটা বের করে অলককাকুর হাতে দিলাম। ব্রু কফিতে চুকুম দিয়ে উনি ঘড়িটা খুব ভাল করে ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখলেন। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, “কস্টলি ওয়াচ, নো ডাউট। হাজারতিনকের কম নয়। খোদ সুইটজারল্যান্ডের প্রোডাক্ট। তবে নট মোর দ্যান টোয়েন্টি ফাইভ ইয়ার্স ওল্ড। মনে হচ্ছে এটা সিম্পল কেস।”

“সে নয় বুঝলাম কিন্ত আমাকে ভাবাচ্ছে অন্য বিষয়,” আমি খবরের কাগজটা নিয়ে অলককাকুর হাতে দিলাম, “যে লোকটা মারা যাওয়ার খবর ১৩ জানুয়ারি সন্ধের কাগজে বেরল, সেই লোক ওই একই দিন মাঝরাতে ট্রেনে উঠে ঘড়িটা আমাকে দিয়ে গেল কীভাবে?”

“ভেবে নে, মৃত ব্যক্তির অশরীরী আত্মা এসে তোর কাছে ওটা রেখে গিয়েছে।”

এবার আমি হেসে ফেলি, “অশরীরী কেন হবে? দিব্যি লম্বা খাম্বা চেহারা। আমার সঙ্গে কথাও বলল বিস্তর। যদিও একটু বেখাপ্পা ধরনের।”

“আমি দুটো সম্ভাবনার কথা ভাবছি।”

“কীরকম?”

“প্রথমত, মৃত ব্যক্তি আর ট্রেনের সহযাত্রী একই লোক নয়। যেহেতু কাগজে কোনও নাম উল্লেখ করেনি, অন্য কোনও লোক খবরটা দেখে বিশেষ কোনও মতলবে সেটা কাজে লাগিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল মতলবটা কী?”

“আর দ্বিতীয় সম্ভাবনা?”

“সেক্ষেত্রেও ধরে নিতে হবে দুটো লোক আলাদা এবং ট্রেনের লোকটা সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ নয়। ও একটা বিরল মানসিক রোগের শিকার। সাইকায়ট্রির পরিভাষায় এটাকে বলে ওয়াকিং কর্পস ডিলিউশন বাকোটার্ড সিনড্রোম, যা এক ধরনের চরম মানসিক বিভ্রম। এতে আক্রান্ত হলে রোগী নিজেকে মৃত বলে মনে করে। লেট নাইন্টিনত সেঞ্চুরিতে ফরাসি নিউরেলজিস্ট জুল্‌স কোটার্ড এই রোগের উপর প্রথম আলোকপাত করেন। 

“এখন যাই হোক না কেন, তোর কাজ হল কলকাতায় ফিরে গিয়ে ওই ভদ্রলোকের ঠিকানা খুঁজে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘড়িটা ফিরিয়ে দেওয়া।”

“কিন্তু তিনি যদি জানতে চান ঘড়িটা আমি পেলাম কীভাবে? ট্রেনের ঘটনাটা বললে সেটা কি তাঁর কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে? উলটে আমাকেই পাগল না ভেবে বসেন।”

“বানিয়ে যা হোক একটা কিছু গল্প খাড়া করবি। বলবি দার্জিলিংয়ের হোটেলে আলাপ হয়েছিল। তুই কলকাতায় থাকিস শুনে তোকে অনুরোধ করেছিল ঘড়িটা ওই ঠিকানায় পৌঁছে দিতে। তবে খেয়াল রাখিস, ওই আলাপের তারিখটা যেন ১৩ জানুয়ারির বেশ কয়েকদিন আগের হয়।”

“আর যদি কার্তিক কাঞ্জিলাল নামে আদৌ কাউকে খুঁজে না পাই?”

“সেক্ষেত্রে ট্রেনের লোকটাকে পাগল বলে ধরে নেওয়া ছাড়া আর কোনও রাস্তা দেখছি না। তখন না হয় ঘড়িটা আমাকে উপহার দিয়ে দিস।”

⥮৫⥮

অলককাকুর সঙ্গে ঘটনাটা আলোচন করে একটু হালকা বোধ করলাম। কলকাতায় ফিরে প্রথম যেটা করলাম তা হল মেসের ম্যানেজার জীবনববুর কাছ থেকে টেলিফোন ডিরেক্টরি চেয়ে নিয়ে কার্তিক কাঞ্জিলালের খোঁজ করা।

সেদিন সন্ধেয় কার্তিকবাবুর কাছ থেকে তাঁর ভাইয়ের সম্বন্ধে অনেক কিছুই জানতে পেরেছিলাম। অল্প বয়স থেকেই অসৎ সংসর্গে পড়ে বিগড়ে যায় গণেশ কাঞ্জিলাল। তা নিয়ে বাপের সঙ্গে খিটিমিটি লেগেই থাকত। একদিন অনেক রাত করে বাড়ি ফেরায় অশান্তি চরমে ওঠে। পরদিন সকাল থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। পাওয়া যায়নি কার্তিকবাবুর মায়ের বেশ কিছু গয়নাগাটি আর তাঁর শখের রোলেক্স ঘড়িটি। 

পরিবারিক সম্মানের কারণে পুলিশে খবর দেওয়া হয়নি। আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের মাধ্যমে খোঁজখবর করা হয়েছিল। বেশ ‍কিছুদিন পর কানাঘুষোয় শোনা গিয়েছিল সে নাকি ডুয়ার্সের দিকে কোনও এক চা-বাগানে কাজ করছে। এরও প্রায় বছর পাঁচেক পরে একদিন বাড়িতে পুলিশ আসে। হলদিবাড়ির একটা ব্যাঙ্ক জালিয়াতির কেসে পুলিশ তখন গণেশ কাঞ্জিলালকে হন্যে হয়ে খুঁজছে।

এই ঘটনার পর কার্তিকবাবুর বাবা তাঁর এই কুপুত্রটিকে ত্যাজ্য ঘোষনা করেন। মারাও যান অল্পদিনের মধ্যে। আঘাতটা সহ্য হয়নি তাঁর। বাবার মৃত্যুর পর কার্তিকবাবুই ব্যবসার দায়িত্ব নেন। উন্নতিও করেন। বৃদ্ধা মাকে নিয়ে পৈতৃক বাড়িতেই থাকেন। বিয়ে-থা আর করেননি।

ঘড়িটা সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিতে পেরে নিশ্চিত হলাম বটে, কিন্তু আমার আসল প্রশ্নের উত্তর সেই অধরাই থেকে গেল। সেদিন রাতের দার্জিলিং মেলে আমার সহযাত্রীটি তবে কে ছিল? শেষমেশ আমাকেও কি ভূতে বিশ্বাস করতে হবে? এই ভাবনাটাই তাড়া করে বেড়াচ্ছিল তখন থেকে। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে বিষয়টা আলোচনা করতে কুন্ঠা বোধ করছিলাম, পাছে ঠাট্টা-তামাশা করে। কাজেই এক অদ্ভুত মানসিক অস্থিরতার মধ্যে দিন কাটছিল। লেখাজোখা বন্ধ। মাথায় কিছুই আসছিল না। একবার ভাবলাম এই ঘটনাটা নিয়ে কিছু একটা লিখি। কিন্তু শেষ করব কোথায়?

অনিচ্ছাসত্ত্বেও টিউশগুলোয় যেতে হচ্ছিল। একটা চাকরিবাকরি থাকলে ভাল হত। অনেকটা সময় অন্যদিকে ব্যস্ত থাকতে পারতাম। রোজগারের চিন্তাটাও করতে হত না। এভাবেই দিনসাতেক চলল। একদিন রাতে টিউশন সেরে সবে মেসে ফিরেছি, এমন সময় ম্যানেজার জীবনবাবু এসে একগোছা চিঠি দিয়ে গেলেন। ডাকবাক্সে এসে পড়েছিল। তিনটে তিন রকমের কাম। তার মধ্যে একটা ব্রাউন পেপারের খামে দার্জিলিংয়ের সেই স্কুলটার নাম আর লোগো ছাপা।এই খাম আমি চিনি। ইন্টারভিউয়ের চিঠিও এই রকম খামে এসেছিল। মনের মধ্যে একটা ক্ষীণ আশার সঞ্চার হল। চিঠিটা বের করে পড়তে বেশিক্ষণ সময় লাগেনি। ওরা রিগ্রেট লেটার পাঠিয়েছে। সেই সঙ্গে আমার ভবিষ্যৎ সাফল্যও কামনা করেছে। এত সুন্দর ভাষায় যে কাউকে প্রত্যাখ্যান করা যায়, সেটা শিখলাম।

পরদিন আর মেসের ঘর থেকে বাইরে পা রাখিনি। সারাদিনই মন খারাপ নিয়ে শুয়ে ছিলাম। এইভাবেই হয়তো আরও কয়েকদিন চলত, যদি না সেদিন বিকেলে সুরজিৎ এসে একরকম জোর করেই বাইরে নিয়ে যেত।

সুরজিৎ আমাদের মেদিনীপুরেরই ছেলে। আমার খুবই ঘনিষ্ঠ। কলকাতায় কস্ট অ্যাকাউন্টেন্সি পড়ত। ও এসে একটা সিনেমা দেখতে যাওয়ার জন্য জোরাজুরি করতে লাগল। বলল লাইটা হাউসে জেমস বন্ড-এর ছবি এসেছে। জমাটি ছবি বলে শুনেছে। আমার একটু চেঞ্জের দরকার ছিল। বেরিয়েই পড়লাম ওর সঙ্গে। 

⥮৬⥮

মৃত ডাব্‌ল-ও-সেভেনের দুর্ধর্ষ অভিযান দেখেতে-দেখতে আবার নতুন করে একটা অস্থিরতা পেয়ে বসছিল। মাথার ভিতরে বন্ধ হয়ে থাকা একটা জানলা যেন আস্তে-আস্তে খুলে যাচ্ছিল। আমি উসখুস করছিলাম। তবে কি গণেশ কাঞ্জিলাল......

ইন্টারভ্যালে বাইরে বেরিয়ে সুরজিৎকে বললাম, “তুই ছবিটা দ্রঅখ, আমাকে এক্ষুনি চলে যেতে হবে। একটা জরুরি কাজ মনে পড়ে গেল।”

“মানে? খেপেছ নাকি তুমি?”

“হ্যাঁ রে, সত্যিই খেপে গিয়েছি। তোকে পরে সব বলব। আর হ্যাঁ, এই ছবিটা দেখানোর জন্যে তোকে মস্ত বড় একটা থ্যাঙ্কস। আর-একটা ট্রিটও পাওনা রইল তোর।”

সুরজিৎকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে, হল থেকে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে হনহন করে হাঁটা দিলাম মেট্রো স্টেশনের দিকে। তখন টালিগঞ্জ পর্যন্ত মেট্রো চলত। ওখান থেকে গড়িয়ার অটো ধরলাম। 

আমাদের মেসবাড়িটার দু’-তিনটে ব্লক আগে একটা টেলিফোন বুথ ছিল। সেখানে ঢুকে যে নস্বরটা ডায়াল করলাম সেটা অলককাকুর। রহস্য উদ্‌ঘাটানের উত্তেজনায় আমি তখন ভিতরে-ভিতরে কাঁপছিলাম।

“কী রে? তোর যে সাড়াশব্দই নেই! লোকটা কে, খুঁজে পেলি?”

“হ্যাঁ পেয়েছি, আর ঘড়িটাও দিয়ে এসেছি।”

“সে কি সত্যিই গণেশ কাঞ্জিলালের দাদা?”

“হান্ড্রড পার্সেন্ট! চেহারাতেও অনেক মিল। যমজ কিনা।”

“স্ট্রেঞ্জ! তা, কথাবার্তায় কী বুঝলি?”

আমি অলককাকুকে আনুপূর্বিক সবই বললাম।

“তা হলে ওই গণেশ লোকটা সত্যই মৃত?”

“আদপেই না।”

“মানে?”

“গণেশ যদি ওই দুর্ঘটনায় মারা যেত, তা হলে রাতের দার্জিলিং মেলে আমার অদ্ভুত সহযাত্রীটিকে ভূত বলে মেনে নিতে হয়। যেহেতু সেটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়,  এই ক’দিন খুব অস্বস্তির মধ্যে কাটিয়েছি। বিশেষ করে কার্তিকবাবুর সঙ্গে মোলাকাত হওয়ার পর থেকে। আর আমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গিয়েছি।”

“কীরকম?”

“তুমি দুটো সম্ভাবনার কথা বলেছিলে। আমি তৃতীয় একটা সম্ভাবনা খুঁজে বের করেছি এবং সেটাই হয়তো সঠিক।”

“খুলে বল।”

“তোমার অনুমান মতো আমিও মৃত ব্যক্তি আর গণেশকে আলাদা লোক বলেই মনে করি। তুমি বলেছিলে লোকটা মানসিক রুগি হতে পারে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ও আদৌ কোনও রোগের শিকার নয়। যদি হয়, সেটা ওর অপরাধমনস্কতা। লোকটা আসলে একটা খুনি। খুব ঠান্ডা মাথার খুনি।”

“বলে যা, আমি খুব এক্সাইটেড ফিল করছি।”

“গণেশ অন্ধকার জগতের লোক ছিল। পুলিশের খাতায় ওয়ান্টেড ছিল। তাই পুলিশকে আর খুব সম্ভবত ওর পুরনো শাগরেদদের ফাঁকি দেওয়ার ফিকিরে নিজেকে মৃত বলে রটিয়ে দেওয়ার একটা পরিকল্পনা করেছিল। মৃত লোকটা সেই পরিকল্পনার শিকার। তাই লোকটাকে মেরে অথবা অচৈতন্য করে পাহাড় থেকে ফেলে দেওয়ার আগে রীতিমতো ছক কষেই তার সঙ্গে টাকা আর নিজের নোটবুকসহ ব্যাগটাও ফেলে দিয়েছিল। খবরের কাগজওয়ালাদের হয়তো ও-ই খবর দিয়েছিল আড়ালে থেকে।”

“এটা তোর কষ্টকল্পনা হয়ে যাচ্ছে না তো? তুই যে বললি ওর দাদা ছবি দেখে লাশ শনাক্ত করেছে?”

“ট্রেনের কামরায় কয়েকঘন্টা একটা লোকের সঙ্গে এত গল্প করার পরেও তাকে ভূত মনে করাটা আরও বড় রকমের কষ্টকল্পা হয়ে যায়। গণেশের ট্যাকরেকর্ড বলছে ও অপরাধী। কাজেই এই অপরাধ ওর পক্ষে করা অসম্ভব না। আর বিশ বছর না দেখা ভাইয়ের থেঁতলানো, বাসি মড়ার ছবি দেখে চিনতে পারাটা বেশ কঠিন ব্যাপার। তা ছাড়া ভাইয়ের প্রতি দাদার যে বিতৃষ্ণা দেখলাম, তাতে মনে হল ভাইয়ের মারা যাওয়ার খবরে তিনি হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন।”

“তবুও একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। তোর সঙ্গে ওর এই নাটকটা করার মানেটা কী?” 

“ফাঁকা ট্রেনের কামরায় আমাকে একা পেয়ে একটা তাৎক্ষণিক সুযোগ নেওয়ার মতলব খেলেছিল ওর মাথায়। হয়তো ভেবেছিল আমি কার্তিকবাবুর কাছে ঘড়িটা ফেরত দিতে গিয়ে এই অলৌকিক সাক্ষাৎকারের কথা বললে ওর মৃত্যুর খবরটা আরও বেশি চাউর হবে। ভূতের গপ্পো যত ছড়াবে, পরোক্ষে লোকে বিশ্বাস করে নেবে যে গণেশ লোকটা মৃত। মানুষের তো অলৌকিক বিষয়ে আকর্ষণ বেশি, বিশ্বাস করুক বা না করুক।”

“ব্র্যাভো! তা হলে গণেশের ভূত তোর মাথা থেকে নামল?”

“ভূত তো নেমেছে। কিন্তু ভূতের চেয়ে জ্যান্ত মানুষ যে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। সে তো পার পেয়ে গেল। তাই ভাবছিলাম পুলিশকে এ বিষয়ে কিছ......”

আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে অলককাকু এবার ধমক দিয়ে উঠল, “খবরদার ওসব করতে যাবি না! তাতে অনেক বড় ঝামেলায় জড়িয়ে পড়বি। তুই যেটা ভেবেছিস সেটা সঠিক হলেও হতে পারে, কিন্তু অনুমানমাত্র। প্রমাণ নেই তোর কাছে। কেবল অনুমানের উপর নির্ভর করে এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার কোনও যৌক্তিকতা নেই। যেসব প্রমাণের উপর নির্ভর করে পুলিশ ভেবেছে গণেশ কাঞ্জিলাল ‍মৃত, সেগুলো সবই পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ। তদন্ত সঠিকভাবে এগোলে আসল সত্য প্রকাশ পাবেই। পুলিশের কাজ পুলিশ করুক। তুই তোর কাজ কর। পুরো অভিজ্ঞতার উপর একটা ভাল গল্প লিখে ফ্যাল। ব্যস, এই পর্যন্তই।”

টেলিফোন বুথে বিল মেটাতে অনেক টাকা বেরিয়ে গেল। অলককাকুর কথায় যুক্তি আছে। সেটা মাথায় রেখে হালকা মেজাজেই মেসে ফিরে এলাম। নতুন গল্পের প্লট ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে উঠেছে তখন। পুলিশের হাতে পার পেয়ে গেলেও গণেশ কাঞ্জিলাল আমার গল্পে পার পাবে না। রাতেই শুরু করব লেখা।

মেসে ঢুকতেই জীবনবাবু ভুরুটুরু কুঁচকে বললেন, “কোথায় থাকেন বলুন তো মশাই? প্রকাশকের লোক ফোন করে ব্যতিব্যস্ত করে দিল। আপনাকে কল ব্যাক করতে বলেছে।”

“কোন প্রকাশক? নম্বর দিয়েছে কোনও?”

“ওরা যে কী চিঠি দিয়েছিল আপনাকে? নামটা বর্ণমালা না কী যেন একটা বলল! ফোন নম্বর সেই চিঠিতেই দেওয়া আছে নাকি।”

আমি দোতলায় উঠে ঘরে ঢুকে প্রথমেই টেবিল হাতড়ে চিঠিদুটো খুঁজে বের করলাম। আগের দিন এ দুটো খুলে দেখা হয়নি। একটা ছোট খামে বসিরহাটের এক পত্রিকা সম্পাদকের চিঠি। ওদের বসন্ত সংখ্যার জন্য লেখা চেয়েছে। অন্য খামটা বেশ বড় আর পুরু। উপরে বর্ণমালা নাম ছাপা। ভিতরে লেটারহেডে টাইপ করা চিঠি। সঙ্গে আর-একটা ছোট সাদা প্যাকেট। মনে হল পকেট ডায়েরিফায়েরি গোছের কিছু আছে। বছরের শুরুর ‍দিকটায় অনেক প্রকাশনা সংস্থার তরফ থেকে এরকম শুভেচ্ছাপত্র ও ছোটখাট উপহার আসে। চিঠিটা পড়তে শুরু করলাম।

⥮৭⥮

‘সুজনেষু,

‘আমি লেখক অনিকেত গুপ্তর এক গুণমুগ্ধ পাঠক। আপনার প্রায় সব গল্পই আমার পড়ার সৌভাগৗ হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই গল্প-উপন্যাস পড়ার ঝোঁক ছিল। বিশেষ কারণে বইপত্রের কোনও অভাব হয়নি। এখনও সেই অভ্যেস বজায় আছে। লেখালিখিও একটু আধটু করে থাকি।

‘সাম্প্রতিক কালের বাঙালি লেখকদের মধ্যে আপনি আমার বিশেষ প্রিয় এই কারণেই যে, আপনার রহস্যকাহিনিগুলো গতানুগতিক ছকের বাইরে গিয়ে এক নতুন স্বাদের সন্ধান দেয়। আপনার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হওয়ার বাসনা অনেকদিনের। কিন্তু সে সুযোগ সরাসরি পাইনি।

‘সম্প্রতি ব্যবসার কাজে দার্জিলিং যেতে হয়েছিল। চকবাজারে একটা নামী বুক স্টোরের ডিসপ্লে বোর্ডে সাঁটা সাহিত্যবাসরের পোস্টারে আপনার নাম দেখে পুলকিত হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে আপনার সঙ্গে আলাপ করে আসব। কিন্তু হঠাৎ করেই সর্দি-জ্বরে কাবু হয়ে পড়ায় সেই সন্ধেয় আর বাইরে বেরনো সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

‘ইচ্ছাশক্তি মানুষকে অনেক সময় তার কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি পেতে সময়মতো সহায়তা করে। তাই হয়তো আপনার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎকার অনিবার্য ছিল।

‘এবার একটি অন্য প্রসঙ্গে আসি। বই আমার নেশা ও পেশা। সেই আসক্তি ও বাধ্যতা থেকেই আমার নতুন প্রকাশনা সংস্থা ‘বর্ণমালা’ থেকে ছোটদের জন্য একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকা আগামী বাংলা নববর্ষে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে। আপনার মতো তরুণ, শক্তিশালী লেককের সহযোগিতা ছাড়া এই প্রয়াস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে বলেই আমার ধারণা। তাই সংস্থার পক্ষ থেকে পত্রিকারটির গল্প বিভাগের সম্পাদকের দায়িত্বটি গ্রহণ করার জন্য আপনার কাছে বিশেষ অনুরোধ জানাচ্ছি। আপনার উপযুক্ত পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা আমার পক্ষে ধৃষ্টতা হয়ে যাবে। সেই বিষয়টি পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতেই স্থির করা যেতে পারে।

‘আশাকরি এই প্রস্তাব বিবেচনা করে অনতিবিলম্বে আপনার উত্তর জানাবে। প্রয়োজনের টেলিফোনে যোগাযোগ করবেন।

‘আগামী যাত্রাপথে আপনাকে সহযাত্রী হিসেবে পাওয়ার অপেক্ষায় রইলাম।

‘নমস্কারান্তে,

‘কার্তিকচন্দ্র কাঞ্জিলাল।

‘পুনশ্চ: গল্প বিভাগের সম্পাদকের পদটিতে অভিষিক্ত হওয়ার জন্য আপনাকে কোনও ‘ইন্টারভিউ’ দিতে হবে না, কারণ ইতিপূর্বেই আপনি দু’-দি’টি ইন্টারভিউ সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। প্রমাণস্বরূপ এই চিঠির সঙ্গে আপনার একটি প্রয়োজনীয় জিনিস পাঠালাম। ফ্যান্সি মার্কেটে কেনা একশো কুড়ি টাকার রোলেক্স ঘড়ির চেয়ে সেটির দাম নিঃসন্দেহে বেশি। গ্রহণ করে বাধিত করবেন।’

⥮৮⥮

আমি যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো খামের ভিতর থেকে প্যাকেটটা বের করে খুললাম। উঁকি মেরে ভিতরে ঝকঝকে নতুন দামি কলমটা একবার দেখেই বুঝে নিতে অসুবিধে হল না, বিপুলদার আমাকে দেওয়া উপহার ফের একাবার ফিরে এসেছে তার মালিকের কাছেই। 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আমার গ্রন্থাগারের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url