নিউস্টাইনের দেশে

 নিউস্টাইনের দেশে

হঠাৎ ঘুমের মধ্যে সুমনের খুব অস্বস্তি হতে লাগল। খানিক্ষণ এপাশওপাশ করে বিছানার উপর উঠে বসল সে। দেখল, সারা শরীর ঘামে ভিজে গিয়েছে। অথচ মাথার উপর জোরে পাখা ঘুরছে, জানলা দিয়েও তিনতির করে হাওয়া আসছে। অক্টোবর মাসের শেষ দিক, ফলে গরমও তীব্র নয়। তা হলে এত ঘেমে যাওয়ার কারণ কী?

এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে-ভাবতে সুমন বিছানা থেকে নামল। বাথরুম ঘুরে এসে ফ্রিজ খুলে একটা ঠান্ডা জলের বোতল বের করে ঢকঢক করে প্রায় আধ বোতল জল খেয়ে নিল। তারপর নিজের ঘরে এসে জানলার কাছে দাঁড়িয়ে সে একটা সিগারেট ধরাল। ভাবতে লাগল, শরীরের মধ্যে হঠাৎ এরকম অস্বস্তি হচ্ছে কেন? মনটাকে অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য ঘরের কোনায় রাখা অসমাপ্ত ক্যানভাসটার দিকে সে তাকাল। ছবিটা এখনও শেষ হয়নি। আজই হয়তো শেষ হয়ে যেত, যদি না দু’টো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় রং শেষ মুহূর্তে ফুরিয়ে যেত। কালই ধর্মতলায় গিয়ে দু’টো রঙের টিউব কিনতে হবে। যতক্ষণ না ছবিটা পুরোপুরি শেষ হচ্ছে ততক্ষণ মনের মধ্যে থেকে এই অতৃপ্তিটা কিছুতেই যাওয়ার নয়। ছবির ক্যাপশন নিয়েও খানিক্ষণ ভাবল, ছবিটার নাম সে দিয়েছে ‘মর্ডান টাইমস’।

ক্যানভাসটার এক কোনায় একটা বড় ঘড়ি আঁকা হয়েছে। তাতে তিনটে চল্লিশ বাজে। সিগারেরটা শেষ করে শুতে যাওয়ার আগে সুমন দেওয়ালে টাঙানো ঘড়িটার দিকে অভ্যাসবশত তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। এই ঘড়িতেও তিনটে চল্লিশ বাজে। ভাবল, এ তো কাকতালীয় ব্যাপার! বিছানায় শুতে গিয়ে দেখল, বিছানাটা একদম তেতে আছে। যেরকম জ্যৈষ্ঠমাসের তীব্র গরমের রাতে থাকে, ঠিক সেরকম। কিছু না ভেবে ঠান্ডা মেঝেতেই সে শুয়ে পড়ল।

শোয়ার খানিকক্ষণ পর যখন চোখটা প্রায় লেগে এসেছ, হঠাৎ মাথার মধ্যে যেন কীরকম একটা চিনচিনে কম্পন হতে শুরু করল। দূর থেকে একটা ধাতব কিন্তু সুরেলা মেয়েলি কন্ঠস্বর তার মাথার মধ্যে যেন অনুরণিত হতে লাগল। সে দু’হাত দিয়ে কান চেপে ধরল এবং সঙ্গে-সঙ্গে বুঝতে পারল যে, শব্দটা তার কান দিয়ে ঢুকছে না। কারণ, কান চেপে ধরার পরেও শব্দের তীব্রতার কোনও পার্থক্য হল না। শব্দটা কোনওভাবে সরাসরি তার মাথায় ঢুকেছে।

সে মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করল ওই কন্ঠস্বরের বক্তব্যটা কী। আমাদের মা-ঠাকুরমারা যেরকম সুর করে লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়তেন, ঠিক সেইরকম সুর করে ওই কন্ঠস্বরটা কী যেন বলছে। সুমন প্রথমে ভাবল সে বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছে, আর ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছে। যদিও পরক্ষণেরই বুঝল, সে জেগে আছে। মাথার মধ্যে কীরকম ঝিমঝিমে একটা আমেজের ফলে চোখের পাতা দু’টো এত ভারী হয়ে গিয়েছে। তাই সে চোখ খুলতে পারছে না। এবার সুমন শুনতে পেল, মাথার মধ্যে ওই মেয়েলি কন্ঠস্বরটা সুর করে তার নাম ধরে ডাকছে, “সুমন, সুমন, সু-উ-উ-উ-মন।”

তার হঠাৎ কীরকম গা ছমছম করে উঠল। ভাবল, এ কী করে সম্ভব? এই অচেনা, অজানা কন্ঠস্বরের অধিকারী তার নাম জানল কী করে? সে চুপ করে রইল। কিন্তু দেখল, সে চুপ কের থাকলেও ওই কন্ঠস্বর চুপ করে নেই। অনবরত তার নাম ধরে ডেকেই চলেছে, আর তার মাথার মধ্যে সেই নামের প্রতিধ্বনি হচ্ছে। তখন সে ভাবল, একবার ওই ডাকে সাড়া দিয়ে দেখা যাক কী হয়? কিন্তু সে মুখে কোনও শব্দ উচ্চারণ করল না। মনে-মনে বলল, ‘আমাকে ডাকছ কেন?’

সাড়া দেওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে সুমন একটা প্রবল ঝাঁকুনি অনুভব করল। সেই সঙ্গে এটাও বুঝল, চোখের পাতা দুটো এখন আর অত ভারী নেই। চোখ খুলে সে চমকে গেল। দেখল, খুব হালকা একটা নীলচে সবুজ আলোয় তার ঘর ভরে গিয়েছে। খুব দ্রুতগতিতে তার ঘরের দেওয়াল, মেঝে, আসবাপত্র, তার তুলি, প্যালেট, ক্যানভাস সব কিছুর আকার বেড়ে যাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে তার ঘরের আকার আগের দু’গুণ, তিনগুণ, চারগুণ, তারপর আরও-আরও বড় হতে লাগল। তার সঙ্গে সমান তালে অন্য সব জিনিসও একই হারে বাড়তে লাগল।

এবার সুমন খুব ভয় পেয়ে গেল। যদিও একটু পরেই সে বুঝতে পারল, আসলে কিন্তু তার ঘর বা ঘরের আসবাব কিছুরই আকার বাড়ছে না। তার নিজের আকার ছোট হচ্ছে এবং সেটাও বেশ দ্রুতগতিতে। ছোট হতে-হতে তার আকার প্রায় একটা বিন্দুর মতো হয়ে গেল। সুমন মনে-মনে বলল, ‘কে তুমি? আমার এ অবস্থা করলে কেন?’

ওই কন্ঠস্বর তাকে বলল, “ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। তোমার আকার এরকম না হলে তুমি মাটির মধ্যে ঢুকতে পারতে না। এখন আমাদের পৃথিবীতে এসো।”

একথা শেষ হওয়ার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে সুমন দেখল, ওই সবুজ আলোর আভা তাকে ঘিরে পাক খেতে শুরু করেছে। ক্রমশ সেই আলোর পাক খাওয়ার গতি এত বেগে গেল যে, আলোর কেন্দ্রে একটা ঘূর্ণির সৃষ্টি হল। সুমন অনুভব করল, সে ধীরে-ধীরে কোনও অদৃশ্য কিছুর টানে ওই ঘূর্ণির মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর ‍বুঝতে পারল, সে মাটির মধ্যে ঢুকেছে। কোনও বহুতল বাড়ির লিফটের তার ছিড়ে গেলে লিফ্‌ট যেমন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মাটির দিকে নামতে থাকে, ঠিক সেইরকমভাবে সুমন মাটির গভীরে দ্রুতগতিতে ঢুকতে থাকল। সে তার দু’হাত দিয়ে আশেপাশের মাটির কণা, গাছের শিকড় ধরার চেষ্টা করলেও কিছুই ধরতে পারল না। কারণ, তার গতি এত বেশি ছিল যে, কোনও কিছু তার হাতের নাগালে এসেই চলে যাচ্ছিল।

সুমনের মনে হিল যেন দিন, মাস, বছর পেরিয়ে যাচ্ছে, তবু থামতে পারছে না। সে বুঝতে পারল, কিছুই আর তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। তখন হাল ছেড়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল যদি কখরও থামে। আর-একটা বিষয় অনুভব করতে পারছিল, সে যত মাটির গভীরে ঢুকছে, তত নিজেকে হালকা মনে হচ্ছে। তার আশপাশের তাপমাত্রা ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। এক সময় তার মনে হল, সে বোধ হয় পাখির পালকের চেয়েও হালকা। আর তার চোখের পাতা দু’টো ভারী হয়ে এল। তা ছাড়া একইভাবে অনেক্ষণ নীচের দিকে নামতে-নামতে সারা শরীরে কীরকম একটা ঝিমঝিমে ভাব। ফলে, সে একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল।

এইভাবে কতক্ষণ কটেছে মনে নেই, হঠাৎ তার তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল। চোখ খুলে প্রথমে খানিকক্ষণ কিছু দেখতে পেল না। আস্তে-আস্তে চোখ সয়ে যাওয়ার পর দেখল, চারদিক হালকা নীলচে সবুজ আলোয় ভরা, ঠিক যেরকম আলো সে তার নিজের ঘরে দেখেছিল। সুমন উঠে দাঁড়াল, চারদিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখল উঁচু পাঁচিলে চারদিক ঘেরা। হঠাৎ সে আবার সেই সুরেলা কন্ঠস্বর শুনতে পেল। কন্ঠটি তাকে বলছে, “ডান দিকের পাঁচিলটার কাছে চলে এসো! দ্যাখো, ওখানে এক জায়গায় চৌকো দাগ কাটা আছে। সেই দগের উপর পিঠ দিয়ে দাঁড়াও।”

সুমন সম্মোহিতের মতো পাঁচিলের দিকে এগিয়ে গেল। দাগটা খুঁজে বের করে সেখানে পিঠ দিয়ে দাঁড়াল। দেখল, তাকে নিয়ে দেওয়ালের ওই অংশটা একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গেল। পাঁচিলটা হঠাৎ ঘুরে যাওয়ার ফলে গতিজাড্যের কারণে ভারসাম্য না রাখতে পেরে সুমন হুমড়ি খেয়ে পড়ল। সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই আবার শুনতে পেল সেই কন্ঠস্বর, “আমাদের পৃথিবীতে স্বাগত জানাচ্ছি!”

সে মনে-মনে বলল, ‘তুমি কে? তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না কে?’

কন্ঠস্বরটি বলল, “ধৈর্য ধরো। আমাদের মধ্যে অনেককেই তুমি দেখতে পাবে। তবে যতক্ষণ না দেখতে পাও ততক্ষণই তোমার পক্ষে মঙ্গল। যাকগে, ও কথা বাদ দাও। তুমি আমাকে এটা বলো, তুমি কি বুঝতে পেরেছ, কোথায় এসে পড়েছ?”

সুমন বলল, “না, আমি বুঝতে পারছি না আমি কোথায়? এটা আমার কাছে সম্পূর্ণ নতুন জগৎ। তোমরা কারা? তোমরা আমাকে এখানে নিয়ে এলে কীভাবে? আর কেনই বা নিয়ে এলে? আমার শরীরকে এত ছোট বানিয়ে ফেললে কীভাবে?”

এবার ওই কন্ঠস্বর খুব জোরে হেসে বলল, “বাব্বা, একবারে এত প্রশ্ন! দাঁড়াও, দাঁড়াও, এক-এক করে সব জানতে পারবে। চিন্তা করো না।”

সুমন বলল, “আর-একটা কথা। তুমি আমার নাম জানো অথচ আমি তোমার নাম জানি না, এটা ঠিক নয়। তোমার নাম কী?” ওই কন্ঠস্বরটি বলল, “আমার নাম মাদাম দুভলভে। তুমি আমাকে ওই নামেই ডেকো। এখন শোনো, তোমকে আমার অনেক কিছু বলার আছে। কীভাবে তোমাকে এখানে আনা হয়েছে, কেন আনা হয়েছে, সব বলব। তবে এক্ষুনি তোমাকে যেটা বলব, সেটা শুনলে তুমি অবাক হয়ে যাবে। সেটা হল, তুমি এখন পৃথিবীর ঠিক কেন্দ্র আছ।”

এটা শুনে সুমন খুব জোরে হেসে বলল, “এই কথাটা ঠিক বিশ্বাস হল না।”

মাদাম দুভলভে বলল, “কেন? বিশ্বাস হল না কেন?”

সুমন বলল, “যদিও আমি শিল্পী, ছবি আঁকাই আমার নেশা পেশা, তবুও এটুকু জ্ঞান আমার আছে যে, পৃথিবীর কেন্দ্রের উষ্ণতা এমনই, যেখানে কোনও প্রাণী জীবিত থাকতে পারে না। তা ছাড়া পৃথিবীর কেন্দ্রে সবকিছুর ওজন শূণ্য হয়ে যায়। আমার ওজন শূণ্য হয়নি তা তো দেখতেই পাচ্ছি। কারণ , ওজন শূন্য হয়ে গেলে আমি হাঁটতে পারতাম না, ভেসে বেড়াতাম।”

মাদাম দুভলভে হেসে বলল, “ও, এই কথা! হ্যাঁ, এটা তুমি ঠিকই বলেছ। পৃথিবীর কেন্দ্রে কোনও প্রাণীর বেঁচে থাকারও কথা নয়। হেঁটে বেড়ানোরও কথা নয়। আমরা যেখানে আছি সেখানে কৃত্রিমভাবে প্রাণীদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা আর কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে কারও ওজন শূণ্য না হয়ে যায়। এবার বুঝতে পারলে তো? এখন আর সময় নষ্ট না করে সামনের দিকে এগোও।”

সুমন বলল, “আমার খুব খিদে পেয়েছে মাদাম।”

মাদাম বলল, “বেশ, তা হলে তুমি বাঁ দিকে খানিকটা দুর এগিয়ে গিয়ে দ্যাখো, একটা গোল বেদিমতো আছে। ওটার উপর উঠে দাঁড়াও।”

সুমন তাই করল। বেদিতে উঠে দাঁড়ানোর সঙ্গে-সঙ্গেই সুমনের উপর ঠিক যেন ফুলঝুরির মতো আগুনের ফুলকি ঝড়ে পড়তে শুরু করল। ভয় পেয়ে সুমন লাফ দিয়ে বেদি থেকে নেমে পড়ল।

মাদাম দুভলভে হালকা ধমক দিয়ে তাকে বলল, “কী হল? নেমে পড়লে কেন? তুমি যা ভাবছ তা নয়! ওগুলো আগুনের ফুলকি নয়।”

সুমন বলল, “তা হলে এগুলো কী?”

মাদাম বলল, “ওগুলো শক্তিকণা। তোমরা খাবার খাও কেন? তা থেকে শক্তি পাওয়ার জন্যই তো? আমরা এখানে সরাসরি শক্তি গ্রহণ করি। খাবার থেকে শক্তি পেতে অনেক সময় লাগে। প্রথমে খাবার খেতে হয়, তারপর নিশ্বাসের সাহায্যে গ্রহণ করা অক্সিজেন সেই খাবারের শক্তিকে মুক্ত হতে সাহায্য করে। তবে সেই শক্তি ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে। এখানে মুক্ত-অক্সিজেনের খুব অভাব। ফলে খাবার থেকে ওইভাবে শক্তি উৎপাদন সম্ভব নয়। তাই আমরা এখানে যন্ত্রের সাহায্যে কৃত্রিমভাবে শক্তি উৎপাদন করি। সেই শক্তি উৎপাদক যন্ত্রের আউটলেটগুলো ওইরকম বিভিন্ন বেদির উপর ফোকাস করা। যার যখন শক্তির দরকার হয়, সে তখন ওইরকম একটা বেদির উপর উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। দাঁড়ানোর সঙ্গে-সঙ্গে ওই যন্ত্রের আউটলেট দিয়ে প্রবলবেগে শক্তিকণা বের হতে থাকে। আর তার শরীরে সরাসরি ওই শক্তির আত্তীকরণ ঘটতে থাকে। আবার বেদি থেকে নেমে পড়লেই ওই শক্তিকণা নিঃসরণ বন্ধ হয়ে যায়, ঠিক যেমন তুমি বেদি থেকে নেমে পড়ার পর হল।”

একথা শুনে সুমন আবার ওই বেদির উপর উঠে পড়ল। ওইরকম আলোর ঝরনা শুরু হল। কিছুক্ষণ পর সে অনুভব করল, তার খিদে একেবারে চলে গিয়েছে। বরং সারা শরীরে বেশ একটা চনমনে  ভাব এসেছে। তখন বেদি থেকে সে নেমে পড়ল। সঙ্গে-সঙ্গে আলোর ঝরনাও বন্ধ হয়ে গেল। মাদাম দুভলভে বলল, “কী, খিদে মিটেছে তো? এবার সামনের দিকে এগোও।”

সুমন বলল, “মাদাম, আর-একটা প্রশ্ন আছে।”

মাদাম বলল, “ আবার কী হল?”

সুমন বলল, “এত ভাল বাংলা বলো কী করে? তুমি কি বাঙালি? তোমার নাম শুনে মনে হয় না তুমি বাঙালি।”

মাদাম বলল, “ এই প্রশ্নটা কি  তোমার মতো বুদ্ধিমান ছেলের করা উচিত হল? বাঙালি কাকে বলা হয়, যে বঙ্গে বাস করে, তাকে। এখানে তো বঙ্গদেশের কোনও অস্তিত্বই নেই। আর বাংলা ভাষার  কথা বলছ? আমাদের এখানে সকলেই পৃথিবীর সমস্ত ভাষা বলতে পারে, বুঝতে পারে।  সেইভাবেই সকলকে তৈরি করা হয়েছে।”

সুমন জিজ্ঞেস করল, “তৈরি করা হয়েছে মানে?”

মাদাম বলল, “ধীরে, বৎস, ধীরে। সব জানতে পারবে। জানানোর জন্যই তো তো তোমাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। একটু ধৈর্য ধরো। আপাতত তোমার সব প্রশ্ন শেষ হয়েছে কি?”

সুমন বলল, “না, শেষ হয়নি। আগে বলো, আমাকে এত ছোট বানিয়ে ফেললে কীভাবে?”

মাদাম দুভলভে বলল, “আলট্রাগ্রিন রশ্মির সাহায্যে। মনে পড়ছে, তোমার ঘর থেকে আমাদের জগতে ঢোকার ঠিক আগে তোমার ঘরটা নীলচে-সবুজ আলোয় ভরে গিয়েছিল? সেটা হয়েছিল ওই আলট্রাগ্রিন রশ্মির প্রভাবে। তুমি হয়তো একটা জিনিস বুঝতে পারোনি, তোমাকে শুধু ছোটই করে ফেলা হয়নি, তার সঙ্গে-সঙ্গে তোমার শরীরের প্রতিটি রোমকূপ দিয়ে প্রচুর পরিমাণে আয়রন পার্টিকল্‌স ঢোকানো হয়েছে। তুমি তো জানেই , পৃথিবীর কেন্দ্রে অত্যন্ত শক্তিশালী ম্যাগনেট অবস্থান করে। আমরা কৃত্রিমভাবে তার ম্যাগনেটিক পাওয়ার কিছুক্ষণের জন্য একশো গুণ করে দিতে পারি। এবং তার লক্ষ্য স্থির করে দিতে পারি, সেটা কাকে আকর্ষণ করবে। এইভাবে ওই চুম্বক দিয়ে আকৃষ্ট করে তোমাকে পৃথিবীর কেন্দ্রে আনা হয়েছে। তবে দুশ্চিন্তা কোরো না। তোমার কাজ হয়ে গেলে তুমি আবার আগের আকার ফিরে পাবে, আর নিজের জগতেও ফিরে যেতে পারবে। কী, এবার তোমার মনের সব অন্ধকার দূর হয়েছে তো? এখন সামনের দিকে এগোও।”

সুমন সামনের দিকে এগোতে থাকল। একটু এগনোর পরই সামনে একটা দেওয়াল পড়ল। মাদাম বলল, “এবার ওই দেওয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়াও।”

দাঁড়ানোর সঙ্গে-সঙ্গে ঠিক আগের মতো এই দেওয়ালটিও একশো আশি ডি্গ্রি ঘুরে গেল। তবে সতর্ক ছিল বলে সুমন নিজেকে সামলে নিল, পড়ে গেল না। সে দেখল, একটা বড় ঘরের মধ্যে রয়েছে। ঘরটার মাঝ বরাবর একটা ভারী পরদা টাঙানো। তার এপাশে একটা চেয়ার পাতা। মাদাম দুভলভে বলল, “এবার ওই চেযারে বসে পড়ো।”

সুমন বলল, “বসছি। কিন্তু মাদাম, আমি যেখানেই যাচ্ছি সেখানেই একইভাবে তোমার কন্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি। অথচ তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না। তুমি কী করে বুঝতে পারছ, আমি ঠিক কখন কোথায় আছি? এই যে তুমি এক্ষুনি আমাকে বললে ওই চেয়ারে বসতে। তুমি জানলে কী করে আমি এই মুহূর্তে ওই চেয়ারের সামনেই দাঁড়িয়ে আছি।”

মাদাম বলল, “যখন ঘরে তোমার উপর আলট্রাগ্রিন রশ্মি প্রয়োগ করে তোমাকে ছোট করে ফেলা হচ্ছিল আর তোমার ছোট করে ফেলা হচ্ছিল আর তোমার শরীরের রোমকূপ দিয়ে ছোট-ছোট আয়রন পার্টিক্‌ল ঢোকানো হচ্ছিল, তখন আরও একটা ব্যাপার করা হয়েছে। তোমার  দু’ কানের মধ্যে দিয়ে দু’টো অত্যন্ত শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপিক বায়োফিডব্যাক ক্যামেরা ঢুকিয়ে দু’চোখের মণিতে সেগুলো লাগানো হয়েছে। ফলে তুমি যখন যা দেখছ, আমিও আমার পর্যবেক্ষণ কক্ষের পরদায় তা দেখতে পাচ্ছি। এ ছাড়া তোমার মাথার মধ্যে অতি সূক্ষ্ম মাইক্রোফোনিক চিপ বসানো হয়েছে, যা দিয়ে তুমি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ। আমিও তোমার মনে-মনে বলা কথাগুলো শুনতে পাচ্ছি। এবার আর কথা না বাড়িয়ে ওই চেয়ারে বসে পড়ো। আমাদের এই জগতের চিফ তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়।”

সুমন চেয়ারে বসে পড়ে বলল, “ও বাবা, আমি তো এতক্ষণ তোমাকেই এই জগতের চিফ ভাবছিলাম। তুমি তা হলে কে?”

মাদাম একটু হেসে বলল, “আমাকে তুমি পৃথিবীর পদাধিকার অনুযায়ী জনসংযোগ অধিকারিক ভাবতে পার। যদিও আমাদের এখানে পদের কোনও নামকরণ হয় না। সকলকেই অল্পবিস্তর সবরকম কাজ জানতে হয়। এবার চুপ করো। এখনই আমাদের চিফ পরদার ওপাশে এসে বসবে।”

সুমন সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল, পরদার ওপাশে একটা জোরাল আলো জ্বলে উঠেই নিভে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে গম্ভীর কন্ঠস্বর শুনতে পেল, “হ্যালো সুমন!”

সুমন কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল, “হ্যালো স্যার।”

গম্ভীর কন্ঠস্বরটি বলল, “আমাকে ‘স্যার’ বলতে হবে না। আমার নাম নিউস্টাইন। তুমি আমাকে নাম ধরেই ডেকো। আমাদের এখানে সকলে সকলকেই নাম ধরে ডাকে এবং ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করে। কেউ কাউকে ‘স্যার’ বলে না, বুঝলে?”

সুমন মাথা নেড়ে বলল, “বুঝেছি স্যা.......না মানে নিউস্টাইন। কিন্তু এটা এখনও বুঝতে পারিনি, তোমরা কারা, আর আমাকেই বা এখানে নিয়ে এসেছ কেন? মাদাম দুভলভেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কিন্তু ও কিছুই বলেনি।”

নিউস্টাইন বলল, “তোমার এই কথাটা মানতে পারলাম না। মাদাম দুভলভে কিন্তু তোমার অনেক প্রশ্নের জবাব দিয়েছে। তবে এই প্রশ্ন দু’টোর জবাব আমি দেব। এই যে জগৎটা দেখছ, এটা প্রাথমিকভাবে আমারই সৃষ্টি। পরে অবশ্য অনেকে এটাকে ডেভেলপ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। তুমি তো জানো, পৃথিবীতে কেউ মারা গেলে তাকে হয় সমাধি দেওয়া হয়, নয তার শরীরটাকে পুড়িয়ে সেই ছাই মাটিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বা জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এইভাবে শরীরের সমস্ত উপাদান ধীরে-ধীরে পৃথিবীর গভীরে চলে যায় এবং অনন্তকাল সেখানে থাকে। কখনও-কখনও এক ব্যক্তির শরীরের কোনও উপাদান অন্য কোনও ব্যক্তির শরীরের উপাদানের সঙ্গে মিশে যায়।

এরকমভাবেই একদিন আইজাক নিউটন আর অ্যালবার্ট আইস্টাইনের শরীরের ইনটেলেকট্রিক মাইক্রো এলিমেন্ট মিশে আমার সৃষ্টি। এই দুই বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীর নাম নিশ্চয়ই তোমার অজানা নয়। সৃষ্টির পর মাটি থেকে জীবনধারণের সব রসদ সংগ্রহ করে ধীরে-ধীরে নিজেকে তৈরি করেছি। যেহেতু সাধারণ মানুষের তুলনায় আমার মাথা অনেক গুণ উর্বর, ফলে এই জগৎ সৃষ্টি করতে কোনও অসুবিধা হয়নি। শুধু আমি কেন, এই জগতের প্রত্যেকেই প্রথমে এইভাবে সৃষ্টি হয়েছে। সৃষ্টির পর প্রত্যেকের মাথায় পৃথিবীর বিভিন্ন বিষয় সংক্রান্ত তথ্য, এই যেমন ধরো, পৃথিবীর প্রত্যেকটি ভাষা ইত্যাদি দিয়ে ফিল করা অতি সূক্ষ্ম চিপ বসানো হয়েছে। তবে প্রত্যেকেই যে বিভিন্ন বিজ্ঞানীর শরীরের এলিমেন্ট থেকে তৈরি তা নয়। এখানে বিখ্যাত সব অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, সঙ্গীতশিল্পীর শরীরের ইনটেলেকট্রিক মাইক্রো এলিমেন্ট থেকে সৃস্ট ব্যক্তিরাও রয়েছেন।”

সুমন জানতে চাইল, “এই ইনটেলেকট্রিক মাইক্রো এলিমেন্টটা কী জিনিস?”

নিউস্টাইন বলল, “তুমি তো জানোই, যে-কোনও জিনিসই অসংখ্য পরমাণু বা অ্যাটম দিয়ে তৈরি। এই অ্যাটমের মধ্যে তিনটি আদি কণা থাকে, প্রোটন, নিউট্রন আর ইলেকট্রন। যেসব মানুষের ট্যালেন্ট, ইনটেলিজেন্স বা ইনটেলেক্ট-এর মধ্যে কিছু না-কিছু অসাধারণত্ব থাকে, তাদের  শরীরের মাইক্রো এলিমেন্টের সঞ্চার হয়। সেইসব মানুষের মৃত্যুর পরও ওই মাইক্রো এলিমেন্টের মধ্যে এই গুণগুলো বজায় থাকে। একেই বলা হয় ইনটেলেকট্রিক মাইক্রো এলিমেন্ট। মৃত্যুর পর সেইসব মানুষের শরীরের অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে এই বিশেষ গুণসম্পন্ন ইনটেলেকট্রিক মাইক্রো এলিমেন্টও মাটিতে মিশে যায়। বুঝতে পেরেছ?”

সুমন বলল, “হ্যাঁ, এতক্ষণে ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হল। এবার বলো, আমাকে নিয়ে এসেছ কেন?”

নিউস্টাইন বলল, “প্রধাণত চিত্রশিল্পীদের অনুরোধেই তোমাকে আনা হয়েছে। এখানে এক-একজন চিত্রশিল্পীর শরীরে দুই বা তারও বেশি বিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের এলিমেন্ট রয়েছে। এই যেমন, আমার সঙ্গে এই মুহূর্তে একজন চিত্রশিল্পী রয়েছে যার মধ্যে ভ্যান গঘ, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি আর রেমব্রান্টের শরীরের এলিমেনট আছে। এর নাম লিনগন্ট। এই শিল্পীরা জীবিত থাকাকালীন ‍পৃথিবীতে এককভাবে যেসব শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেছিলেন তার তুলনায় লিনগন্ট এখন যেসব কাজ করেছে সেগুলো অনেক-অনেক উচ্চমানের। এই তিনজন শিল্পীর সেরা গুণগুলো একসঙ্গে করলে যা হয়, তারই প্রতিফলন ঘটছে লিনগন্টের কাজে। ও  তোমাকে কিছু কথা বলতে চায়।”

সুমন উৎসাহিত হয়ে বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। আমি ওর সঙ্গে কথা বলতে খুবই আগ্রহী। আমার স্বপ্নের চিত্রকরদের সঙ্গে কথা বলতে পারব এ তো আমার পরম সৌভাগ্য।”

পর্দার ওপাশ থেকে এর-একটা কন্ঠস্বর ভেসে এল, “কী সুমন? তোমার ছবি আাঁকা কেমন চলছে? রঙের অভাবে ‘মর্ডান টাইমস’ ছবিটা শেষ করতে পারলে না তো?”

সুমন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি জানলে কী করে?”

লিনগন্ট বলল, “এক বছর ধরে আমরা তোমার অজান্তে তোমাকে পর্যবেক্ষণ করছি। সারা পৃথিবীতে তো অনেক চিত্রশিল্পী আছে, কিন্তু পর্যবেক্ষণের জন্য তোমাকে বেছে নেওয়ার পিছনেও একটা কারণ আছে। চিন্তাধারায় তুমি ছাড়া অন্য শিল্পীরা অনেক-অনেক পিছনে পড়ে। হয়তো ব্যবহারিক জীবনে তাদের অনেকেই তোমার চেয়ে বিখ্যাত, কিন্তু চিন্তাভাবনায় তুমি তাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। আমাদের ভাবনার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সঙ্গে একমাত্র তোমার ভাবনার তরঙ্গদৈর্ঘ্যেরেই কিছুটা মিল আছে। তাই তোমাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। দ্যাখো, আমরা সবসময়ই চাই পৃথিবীতে অসাধারণ সব শিল্পকর্মের সৃষ্টি হোক। কিন্তু ইদানীং লক্ষ করছি, শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে সেভাবে নতুন-নতুন পরীক্ষানিরীক্ষা হচ্ছে না। ব্যাপারটা আমাদের সব চিত্রশিল্পীকেই খুব নাড়া দিচ্ছে। তাই তোমাকে এখানে নিয়ে আসা। আমরা তো সরাসরি পৃথিবীর উপরিতলে গিয়ে এই ব্যাপারে কোনও ভূমিকা নিতে পারব না। তোমাকে আমাদের কিছু কাজ দেখাব এব কিছু কাজ শেখাব, যাতে তুমি পৃথিবীর উপরিতলে ফিরে যাওয়ার পর শিল্পের জগতে নতুন মোড় আনতে পার। তুমি কি আগ্রহী?”

সুমন খুব উৎসাহের সঙ্গে বলল, “নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। আমি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করব তোমাদের উদ্দেশ্য সফল করতে।”

লিনগন্ট তখন বলল, “বেশ, তা হলে বাঁ দিকের ঘরে যাও, আমিও আসছি।”

সুমন চেয়ার থেকে উঠে বাঁ দিকের ঘরের ভিতরে গিয়ে অবাক হয়ে গেল। বিশাল বড় ঘরটায় বড়-বড় ছবি টাঙানো, বিভিন্ন ভাস্কর্য রাখা, ইজেল, ক্যানভাস, রং-তুলি আরও কত কী। মোহিত হয়ে সে সেইসব কাজ দেখতে লাগল, আর ভাবল, এইরকম উন্নতমানের শিল্পকর্ম এককভাবে সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। পিছন দিক থেকে খুট করে একটা শব্দ হওয়ায় সংবিৎ ফিরে পেয়ে পিছন ফিরে সে আঁতকে উঠল। দেখল, তার প্রায় ঘাড়ের কাছে আপাদমস্তক কালো কাপড়ে ঢাকা কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। সুমন ভয় পেয়ে পিছু হটতে মুরু করল। সঙ্গে-সঙ্গে কালো কাপড়ে ঢাকা মূর্তিটা বলল, “ভয় পেও না, আমি লিনগন্ট।”

সুমন একটু আশ্বস্ত হয়ে বলল, “ও তুমি। তা তুমি এরকম কালো কাপড়ে নিজেকে মুড়ে রেখেছ কেন?”

লিনগন্ট বলল, “তোমার ভালর জন্য। শুধু আমি একা নই, আমাদের মধ্যে যাকেই তুমি সামনাসামনি দেখতে পাবে, তাকে ঠিক এইভাবেই দেখবে।”

সুমন অবাক হয়ে বলল, “কেন? কী কারণে?”

লিনগন্ট বলল, “বললাম তো তোমার ভালর জন্য। আমাদের সরাসরি দেখলে তুমি ভয় পেতে  পার। আমরা তোমাদের মতো তো সুন্দর নই।”

সুমন বলল, “কী যে বলো? আমরা সকলেই কি দেখতে সুন্দর নাকি?”

লিনগন্ট বলল, “সুন্দর বলতে আমি বোঝাতে চাইছি অবিকৃত শরীর। এখানে সকলের মাথা অত্যন্ত উন্নত কিন্তু শরীর বিকৃত, কুৎসিত, খানিকটা আবার যান্ত্রিকও। সেই শরীর তোমার না দেখাই ভাল।”

সুমনের জেদ চেপে গেল, “তবু আমি দেখতে চাই।”

লিনগন্ট বলল, “বেশ, আমি তোমকে কথা দিলাম, তোমার জগতে ফিরে যাওয়ার আগে আমি তোমাকে আমার আসল চেহারা দেখাব।”

সুমন বলল, “বেশ! কিন্তু কথাটা ভুলে যেও না যেন!”

লিনগন্ট হেসে বলল, “না না, তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। চলো, এবার বাজে কথা ছেড়ে কাজের কথায় আসা যাক। তোমাকে আমাদের কাজগুলো ভাল করে দেখাই।”

সুমন বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেই ভাল।”

ঘরের একপ্রান্ত থেকে তারা কাজগুলো দেখতে শুরু করল। সুমন বলল, “ছবিগুলো এত উঁচুতে টাঙানো যে, খুব খুঁটিয়ে দেখা যাচ্ছে না। তোমাদের উচিত ছিল, ছবিগুলো আর-একটু নীচে টাঙানো।”

লিনগন্ট হেসে বলল, “ও এই কথা, তা আগে বলবে তো! নাও, তোমার সমস্যার সমাধান করে দিলাম।”

এই বলে দরজার কোনায় আটকানো একটা লিভারে টান দিতেই ঘরটার দেওয়ালগুলো নীচের দিকে নেমে ঘড়ঘড় শব্দ করে মাটির মধ্যে খানিকটা ঢুকে গেল। এর ফলে ছবিগুলো খানিকটা নেমে এল। সুমন হতবাক হয়ে গেল এসব দেখে। লিনগন্ট বলল, “এই ছবিটা দেখেছ? এটা আমার আঁকা। আর পাশের ছবিটা মানোজার আঁকা।”

সুমন জিজ্ঞেস করল, “মানোজার মধ্যেও নিশ্চয়ই বিখ্যাত কয়েকজন শিল্পীর শরীরের এলিমেন্ট রয়েছে, তাই না?”

লিনগন্ট বলল, “অবশ্যই। ওর মধ্যে আছে মাতিস, রোনোয়া আর পল সেজানের শরীরের ইনটেলেকট্রিক মাইক্রো এলিমেন্ট।”

দেওয়ালের পাশে মেঝের উপর বেশ কয়েকটা অসাধারণ ভাস্কর্য রাখা ছিল। সুমন জিজ্ঞেস করল, “এগুলো কাদের তৈরি?”

লিনগন্ট বলল, “এই সবক’টা ভাস্কর্যই রোঙ্কর-এর তৈরি। রোঙ্করের মধ্যে আছে রঁদা আর রামকিঙ্কর বেজের শরীরের এলিমেন্ট বুঝলে?

এইভাবে ঘুরে-ঘুরে লিনগন্ট সুমনকে বিভিন্ন শিল্পীর কাজ দেখাতে থাকল এবং তার পরিচয় দিতে থাকল। ওই ঘরের সব কাজ দেখা হয়ে যাওয়ার পর লিনগন্ট সুমনকে জিজ্ঞেস করল,“কী সুমন, আরও কাজ দেখতে চাও?”

সুমন বলল, “নিশ্চয়ই। আমি তোমাদের সব কাজ দেখতে চাই। কীভাবে তোমরা কাজ করো তাও জানতে চাই।”

লিনগন্ট বলল, “বেশ, তা হলে আমাদের ওয়ার্কশপে চলো। সেখানে তোমাকে কিছু কাজও শেখানো হবে।”

সুমনকে নিয়ে ঘরের কোনায় ছোট্ট দরজাটা দিয়ে ভিতরে গেল লিনগন্ট। ঘরে ঢুকে সুমন দেখল, সে যেন একটা যন্ত্রের মধ্যে ঢুকেছে। তখন সে লিনগন্টকে জিজ্ঞেস করল, “এ আমাকে কোথায় নিয়ে এলে? তুমি যে আমাকে বললে তোমাদের ওয়ার্কশপে নিয়ে যাব?”

লিনগন্ট বলল, “আমাদের ওয়ার্কশপটা এখান থেকে অনেক দূরে। হেঁটে গেলে অনেক সময় লাগবে। তার চেয়ে এই যানে করে গেলে কয়েক সেকেন্ডে পৌঁছে যাওয়া যাবে। চলো, আমরা ওই সিট দু’টোয় বসি। সিটবেল্টটা বেঁধে নাও।”

তারা দু’জন সিটে বসে সিটবেল্ট বেঁধে নিল। লিনগন্ট যানের দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর সিটের হাতলের উপরের সুইচটা টিপে দিল। সঙ্গে-সঙ্গে প্রবল ঝাঁকুনি শুরু হল, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য। যানটি একদম স্থির হয়ে যাওয়ার পর লিনগন্ট সিটবেল্ট খুলে উঠে পড়ল। দেখাদেখি সুমনও তাই করল। দরজা খুলে যান থেকে বেরিয়ে সুমন একদম কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। দেখল, তারা একটা বিশাল হলঘরের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। আর ওই ঘরের মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় চার-পাঁচজন, যেন কালো কাপড়ে ঢাকা মূর্তি, কাজ করছে। কেউ স্কেচ করছে, কেউ ক্যানভাসের উপর রং-তুলি নিয়ে কাজ করছে, কেউ আবার স্কাল্পচার তৈরি করছে। সুমন মোহিত হয়ে ওদের কাজ দেখতে লাগল। লিনগন্ট বিভিন্ন শিল্পীর সঙ্গে সুমনের পরিচয় করিয়ে দিল। তাদের কাজ সম্বন্ধে অনেক আলোচনা করল। সুমন জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, তোমরা এই যে রং ব্যবহার করছ, এই কোয়ালিটির রং তোমরা কোথায় পাও? আমাদের জগতে তো এত ভাল রং পাওয়া যায় না।”

লিনগন্ট হেসে বলল, “কেন? সূর্য থেকে।”

সুমন অবাক হয়ে বলল, “মানে তোমরা তো থাকে পৃথিবীর কেন্দ্রে। সূর্যের সঙ্গে তোমাদের সম্পর্ক কী”

লিনগন্ট বলল, “আমরা পৃথিবীর উপরিতলে বিভিন্ন জায়গায় খুব ছোট-ছোট সোলারস্কোপ বসিয়েছি।”

সুমন বলল, “সোলারস্কোপ! সেটা আবার কী?”

লিনগন্ট বলল, “জিনিসটা দেখতে অনেকটা তোমাদের পেরিস্কোপের মতো। যন্ত্রটার উপরের অংশ থাকে পৃথিবীর উপরিতলে, আর শেষ অংশ থাকে পৃথিবীর কেন্দ্রে, মানে আমাদের এখানে। মোট সাতরকম সোলারস্কোপ আছে। এক-একটি সোলারস্কোপে সূর্যের সাত রঙের রশ্মি থেকে এক-একটি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রশ্মিকে শুষে নেওয়ার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। সেই শোষিত রশ্মি সোলারস্কোপের মধ্য দিয়ে আমাদের এখানে পৌঁছনোর পর তার সঙ্গে কিছু বায়োকেমিক্যাল পদার্থ মিশিয়ে আমাদের এই রং তৈরি হয়। এই রঙের ঔজ্জ্বল্য কোনও দিন কমে  না। এসো, তোমাকে আরও একটা জিনিস দেখাই।
ঘরটার একদিকের দেওয়ালে আটকানো একটা মেশিনের কাছে লিনগন্ট সুমনকে নিয়ে গেল। সুমন বলল, “আরে! এই মেশিনটা তো অনেকটা আমাদের ব্যাংকের এটিএম- এর মতো দেখতে।”

লিনগন্ট বলল, “হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। এটার কাজও খানিকটা ওইরকম। এর নাম এবিএম, মানে স্বয়ংক্রিয় ব্রাশ মেশিন। এই মেশিনটা টাচস্ক্রিন প্রযুক্তিতে চলে। এতে বিভিন্ন অপশন দেওয়া আছে, ফ্ল্যাট ব্রাশ না রাউন্ড ব্রাশ, কত নম্বরের ব্রাশ, সবরকম ক্রাইটেরিয়া ম্যাচ করিয়ে বোতাম টিপলেই রেডিমেড ব্রাশ বেরিয়ে আসবে। আদার্স অপশনে গিয়ে নিজের পছন্দমতো ব্রাশ ক্রিয়েটও করা যায়। অথ্যাৎ যে নম্বরের বা যে স্টাইলের কোনও ব্রাশ এখনও পর্যন্ত তৈরি হয়নি, দরকার মতো তাও তৈরি করে নেওয়া যায়। এ সুবিধে তোমাদের জগতে নেই। সেই চিরাচরিত একই রকমের ব্রাশ দিয়ে তোমাদের কাজ করতে হয়। তা ছাড়া ছবিতে বা স্কাল্পচারে এমন অনেক উপাদান আমরা ব্যবহার করি, যা সাধারণত ব্যবহৃত হয় না। যদিও তার অনেকটাই এক্সপেরিমেন্টাল ওয়ার্ক। যেমন ধরো, গত কালই আমি ট্রান্সপারেন্ট শিটের উপর বিভিন্ন রঙের ট্রান্সপারেন্ট মেটালের গুঁড়ো আটকে একটা নতুন ধরনের কাজ করেছি। ছবিটা যেহেতু ট্রান্সপারেন্ট, তাই একটা স্পেসিফিক অ্যাঙ্গেল থেকেই ওটাকে দেখা যাবে। কিন্তু ছবিটার সামনে দাঁড়ালে কিছুই বোঝা যাবে না।

আমরা চাই এইরকম কিছু টেকনিক শিখে তুমি তোমাদের জগতে ফিরে যাও আর সেগুলোকে অ্যাপ্লাই করো। আমি জানি, তুমি খুব বুদ্ধিমান ছেলে। তোমাকে হাতে ধরে কিছু শেখানোর দরকার নেই। তুমি ঘুরে-ঘুরে সকলের কাজ দ্যাখো। দেখবে প্রত্যেকেই নতুন-নতুন কিছু না কিছু কাজ করছে। প্রত্যেকের কাজ খানিকক্ষণ দ্যাখো। তারপর সেই স্টাইলটা কাজে লাগিয়ে তার সঙ্গে নিজের চিন্তাভাবনা মিশিয়ে নতুন সৃষ্টির চেষ্টা করো। কখনও কোথও কোনও অসুবিধে হলে যে-কারও কাছে সাহায্য চাইতে পার। আমরা প্রত্যেকেই শিল্পসৃষ্টির ব্যাপারে তোমকে সাহায্য করতে সবসময় প্রস্তুত। নাও, এবার তোমার কাজ শুরু করো। আমিও একটা নতুন কাজে বসি।”

সুমন প্রত্যেকের কাছে গিয়ে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে তাদের কাজ দেখতে লাগল। কোনও ব্যাপার বুঝতে না পারলে প্রশ্ন করে জেনে নিল। প্রত্যেকে খুব যত্ন করে তাকে বুঝিয়েও দিল। এইভাবে অনেক নতুন পদ্ধতি, নতুন কনসেপশন সুমন শিখে নিল। তারপর সে লিনগন্টকে বলল, “আমি এবার নিজে কিছু কাজ করতে চাই। আমার মাথায় একটা নতুন আইডিয়া এসেছে। সেই আইডিয়ার সঙ্গে তোমাদের কাছে শেখা আইডিয়া মিলিয়ে আমি একটা ছবি আঁকতে চাই। আমি কি তোমাদের ওয়ার্কশপের জিনিস ব্যবহার করতে পারি?”

লিনগন্ট বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।”

সুমন তখন এবিএম থেকে নিজের দরকার মতো ব্রাশ আর ওয়ার্কশপের মেঝে থেকে একটা ত্রিকোণ মেটাল প্লেট তুলে নিল। এবার সূর্যরশ্মি থেকে তৈরি রং দিয়ে সে ওই মেটাল প্লেটের উপর নিজের চিন্তাভাবনাকে ফুটিয়ে তুলতে শুরু করল। ছবিটা আঁকতে শুরু করার সঙ্গে-সঙ্গে সুমনের মধ্যে এমন একটা ঘোর কাজ করতে লাগল। ছবিটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সুমন ছবি থেকে মাথাই তুলতে পারল না। ছবিটা শেষ করার পর মাথা তোলার আগেই অনুভব করল, বেশ কয়েকজন চারপাশে দাঁড়িয়ে তার কাজ দেখছে। মাথা তুলে চারপাশে তাকিয়ে সে আঁতকে উঠল। দেখল, কদাকার, বীভৎস, বিকৃত, আবার কিছুটা যান্ত্রিক চেহারার কয়েকজন তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে থেকে একজন তার কাছে এগিয়ে এসে বলল, “আমি লিনগন্ট। তোমার ছবিটা খুব সুন্দর হয়েছে।”

সুমন ভয়ে চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেল। যখন তার জ্ঞান ফিরল, দেখল, সে তার ঘরের মেঝেয় শুয়ে আছে। সুমন ভাবল ওঃ, তা হলে এটাও একটা স্বপ্ন ছিল! ঘরের আলো জ্বালিয়ে দেখল, ঘড়িতে চারটে দশ বাজে। ঘরের কোনায় রাখা অসমাপ্ত ক্যানবাসটার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল। ক্যানভাসটা আর অসমাপ্ত নয়। সে ঠিক যেভাবে ছবিটা শেষ করতে চেয়েছিল, সেভাবেই ছবিটা শেষ করা হয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, ছবিটার ঘড়িতেও এখন চারটে দশ বাজে। অথচ তার স্পষ্ট মনে আছে, সে ছবিটা আঁকার সময় ঘড়িতে তিনটে চল্লিশ বেজেছিল। সে ভাবল, এটা কী করে সম্ভব? অস্থিরভাবে ঘরের মধ্যে পায়চারি শুরু করল। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই একটা কিছুতে হোঁচট খেয়ে সুমন ‍হুমড়ি খেয়ে পড়তে-পড়তে নিজেকে কোনও মতে সামলে নিল। কিসে হোঁচট খেয়েছে দেখতে গিয়ে সুমন দেখল, মেঝের উপর পড়ে রয়েছে পৃথিবীর কেন্দ্রে বসে আঁকা তার সদ্যসমাপ্ত ত্রিকোণ মেটাল প্লেটটা। যার রং এখনও পুরোপুরি শুকোয়নি...............।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আমার গ্রন্থাগারের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url